13/09/2026
বৃহত্তর সিলেট ও আসাম অঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিক যুগ (ইতিহাসের আগের যুগ) সম্পর্কে জানার অন্যতম সূত্র হল তন্ত্রসাহিত্য বা তন্ত্রশাস্ত্র। তন্ত্র হল খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রচলিত এক বিশেষ ধরণের উপাসনা ও সাধনপদ্ধতির নাম যা দ্বাদশ শতকের মধ্যে কামরূপ (সিলেট ও আসাম অঞ্চল), বাংলা ও কাশ্মীরের মানুষের ধর্মীয় জীবনের অংশে পরিণত হয়েছিল। তন্ত্রসাধনার সাথে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সাহিত্য বা গ্রন্থসমূহকে বলা হয় তন্ত্রশাস্ত্র বা আগম। এই শাস্ত্রটি কোন নির্দিষ্ট ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে এর চর্চা রয়েছে। এই শাস্ত্রে মূলত যোগ, মন্ত্র, জপ, আচার-অনুষ্ঠান এবং গূঢ় সাধনার মাধ্যমে মোক্ষ বা আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভের উপায়সমূহ আলোচিত হয়েছে। মূলত অবৈদিক বা লোকায়ত বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই এই শাস্ত্রটি গড়ে উঠেছে যা সময়ের পরিক্রমায় হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাশ্রিত সাহিত্যে পরিণত হয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে তন্ত্রসাধনার উৎপত্তি ঘটে খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতক থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যে। কামরূপ (সিলেট ও আসাম অঞ্চল), বাংলা ও কাশ্মীর অঞ্চল ছিল এর উৎপত্তিস্থল। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক থেকে অষ্টম শতকের মধ্যে এসব অঞ্চলে তন্ত্রসাধনা একটি সামাজিক ও আধ্যাত্মিক আন্দোলনে রূপ নেয়। এই সময়টিতে তন্ত্রের চর্চা ও এর উপাদানগুলো যথেষ্ট পরিপক্কতা লাভ করেছিল। খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতক পর্যন্ত তান্ত্রিক মতবাদের এই প্রচার ও প্রসার অব্যাহত ছিল। দ্বাদশ শতকে তন্ত্রসাধনা বা তন্ত্রচর্চা এর বিকাশের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল এবং সাধক সমাজের গণ্ডী পেরিয়ে তা জনসাধারণের ধর্মীয় জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। খ্রিষ্ঠীয় ষষ্ঠ শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত তন্ত্রসাধনার বিকাশের এই সময়কালকে বলা হয় তান্ত্রিক যুগ। এই সময়ের মধ্যেই অধিকাংশ তন্ত্রসাহিত্য রচিত হয়েছিল।
এক. তন্ত্রসাহিত্যে বিভিন্ন প্রাচীন জনপদের কথা
----------------------------------------
পৌরাণিক সাহিত্যে দেখা যায়, আদিযুগে বৃহত্তর সিলেট ও আসাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যে রাজ্যটি গড়ে উঠেছিল সেটি ছিল প্রাগজ্যোতিষপুর। কিন্তু তান্ত্রিক সাহিত্যে দেখা যায়, আদিযুগে সিলেট ও আসাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজ্যের নাম ছিল কামরূপ বা কামারূপা। গবেষকদের মতে, প্রাগজ্যোতিষপুর আর কামরূপ মূলত একই রাজ্য। সময়ের ব্যবধানে প্রাগজ্যোতিষপুরই ‘কামরূপ’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল (তান্ত্রিক যুগে ‘প্রাগজ্যোতিষপুর’ নামটি প্রচলিত ছিল না; এর স্থলে কামরূপ নামটিই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল)। তবে প্রাগজ্যোতিষপুরের চেয়ে কামরূপের আয়তন ছিল কম। মহারাজা ভগদত্তের পরবর্তী শত-সহস্র বছরের ব্যবধানে প্রাগজ্যোতিষপুরের মূল অংশটি কামরূপ নামে টিকে ছিল আর অন্যান্য অংশগুলি বিভিন্ন স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। তন্ত্রসাহিত্য থেকে জানা যায়, হরিকেল, সমতট, পুণ্ড্র ও বরেন্দ্র, রাঢ়, তাম্রলিপ্ত প্রভৃতি অঞ্চল ছিল কামরূপের প্রতিবেশী। শ্রীহট্ট ছিল কামরূপের অংশ। তবে জয়ন্তিয়া কামরূপের অংশ ছিল কিনা তা নিয়ে বেশ অস্পষ্টতা আছে। এর কারণ, তন্ত্রসাহিত্যে এ ব্যাপারে বিশদ কোন বর্ণনা নেই।
দুই. তন্ত্রসাহিত্যে জয়ন্তীয়ার কথা
---------------------------------
তন্ত্রশাস্ত্রে কামরূপের সীমান্তবর্তী অঞ্চল হিসেবে এবং জয়ন্তী দেবীর পীঠস্থান হিসেবে শ্রীহট্টের জয়ন্তিয়ার কথা এসেছে। এছাড়াও একটি জনপদ বা একটি পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবেও জয়ন্তীয়ার কথা এসেছে। একাধিক তন্ত্রগ্রন্থে জয়ন্তিয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল কামাখ্যাতন্ত্র। কামাখ্যাতন্ত্রে প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী জনপদ হিসেবে শ্রীহট্টের কথা এসেছে। এই শ্রীহট্টে ‘জয়ন্তী দেবী এবং জনার্দন অবস্থান করছেন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মানে হল, শ্রীহট্টে জয়ন্তী দেবীর মহাপীঠ বা পীঠস্থান রয়েছে এবং জনার্দন বা শিবের কোন একটি প্রাচীন মন্দিরও রয়েছে। শিবমন্দিরটি শ্রীহট্টের অন্যত্র হলেও জয়ন্তী দেবীর পীঠস্থান জয়ন্তীয়াতেই রয়েছে। আগেই বলা হয়েছে যে, পৌরাণিক যুগে জয়ন্তী ছিলেন জয়ন্তীয়ার একজন নারী শাসক বা রানী; সময়ের পরিক্রমায় তিনি স্থানীয়দের কাছে দেবীর মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তান্ত্রিক যুগেই তিনি জয়ন্তীয়ার অধিশ্বরী বা জয়ন্তেশ্বরী হিসেবে এক দৈব চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। কামাখ্যাতন্ত্রে শ্রীহট্ট নিয়ে যে শ্লোক রয়েছে তার দুটি পঙক্তি নিম্নরূপ।
কামরূপস্য দক্ষিণে শ্রীহট্টো নাম নামতঃ
তত্র জয়ন্তী দেবী চ লিঙ্গরূপী জনার্দনঃ
(অর্থ: কামরূপের দক্ষিণ ভাগে শ্রীহট্ট নামক স্থান অবস্থিত।
সেখানে জয়ন্তী দেবী এবং লিঙ্গরূপে জনার্দন অবস্থান করছেন।)
কামাখ্যাতন্ত্রের আরেকটি শ্লোকেও জয়ন্তীয়ার কথা এসেছে। এতে প্রাচীন প্রাগজ্যোতিষপুর বা কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত সাতটি প্রধান পর্বত ও দেবস্থানের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। শ্রীহট্ট (সিলেট) ও এর প্রতিবেশী অঞ্চলসমূহের প্রাচীন ভৌগোলিক অবস্থান এবং তীর্থক্ষেত্রসমূহ সম্পর্কে ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই শ্লোকটি ব্যবহৃত হয়। প্রথম সহস্রাব্দে ভারত উপমহাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যেসব রাজ্য ও জাতিসত্ত্বার অস্তিত্ব ছিল তাদের সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় না বললেই চলে। তাদের সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে যেসব নামমাত্র সূত্র রয়েছে তার মধ্যে আলোচ্য শ্লোকটি অন্যতম। এই শ্লোকের দুটি পঙক্তিতে প্রথম সহস্রাব্দের ভারত উপমহাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান প্রধান স্বাধীন রাজ্য, জাতিসত্তা এবং তাদের ভৌগোলিক সীমানার কথা একসাথে প্রকাশ পেয়েছে। এজন্য মধ্যযুগীয় বিভিন্ন গ্রন্থে এই শ্লোকের ব্যবহার দেখা যায় (অতীত ইতিহাস বর্ণনার ক্ষেত্রে)। ত্রিপুরার রাজপরিবারের ইতিহাস রাজমালাতেও এই শ্লোকের ব্যবহার দেখা যায়। শ্লোকটির বহুল আলোচিত দুটি পঙক্তি নিম্নরূপ।
ত্রিপুরা কৈকিকা চৈব জয়ন্তী মণি চন্দ্রিকা
কাছাড়ী মাগধী দেবী অশ্ননি সপ্ত পর্বত।
এই পঙক্তিদ্বয়ে উল্লিখিত ত্রিপুরা হচ্ছে প্রাচীন ত্রিপুরা রাজ্য বা প্রদ্যোত রাজবংশের শাসনাধীন অঞ্চল। কৈকিকা (কৈকিক) হচ্ছে প্রাচীন ‘কৈকেয়’ বা এর সংলগ্ন কোনো অঞ্চলের অপভ্রংশ। এটি ছিল জয়ন্তীয়া বা কাছাড়ের পার্শ্ববর্তী একটি প্রাচীন জনপদ। জয়ন্তী হচ্ছে প্রাচীন জয়ন্তীয়া রাজ্য। মণি হচ্ছে মণিপুর রাজ্য, যা মহাভারতের যুগ থেকেই একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। চন্দ্রিকা হচ্ছে প্রাচীন চন্দ্রপুর। চন্দ্রপুর ছিল শ্রীহট্টের অংশবিশেষ। কাছাড়ী হচ্ছে বর্তমান আসামের কাছাড় জেলা বা প্রাচীন ডিমাসা বা কাছাড়ি রাজ্য। মাগধী দেবী বলতে প্রাচীন মগধ রাজ্যের প্রভাব বলয়ে থাকা পূর্বাঞ্চলীয় কোনো পবিত্র স্থান বা দেবীপীঠকে বোঝানো হয়েছে (অনেকে একে কামাখ্যা বা প্রাচীন কামরূপের সীমানার সাথেও তুলনা করেন)। ‘অশ্ননি সপ্ত পর্বত’ বলতে বোঝানো হয়েছে যে, এ সমস্ত অঞ্চল সাতটি পর্বতমালা বা গিরিধারা দ্বারা বেষ্টিত ও সুরক্ষিত।
কামাখ্যাতন্ত্র ছাড়াও তন্ত্রশাস্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ তন্ত্রচূড়ামণিতে জয়ন্তীয়ার কথা এসেছে। এই গ্রন্থে মূলত সনাতন ধর্মের ৫২টি (বা ৫১টি) সতীপীঠের বিশদ বিবরণ, অবস্থান এবং দেব-দেবীর নাম উল্লেখ রয়েছে। সনাতন পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, দেবী সতীর মৃতদেহ নিয়ে মহাদেব যখন প্রলয় নৃত্য করছিলেন, তখন বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়। এই স্থানগুলোই পবিত্র ‘সতীপীঠ’ হিসেবে পরিচিত। সতীর দেহের কোন অংশ কোথায় পড়েছিল তার বিবরণ তন্ত্রচূড়ামণিতে দেওয়া আছে। এছাড়াও প্রতিটি পীঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবী এবং তাঁর সঙ্গী ভৈরবের নামও এতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সতীপীঠগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান নির্ধারণ এবং আধ্যাত্মিক গুরুত্ব ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তন্ত্রচূড়ামণিই প্রধান হিন্দুশাস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, সতীদেবীর বাম জঙ্ঘা বা বাম উরু পতিত হয়েছিল জয়ন্তীয়ায়। তন্ত্রচূড়ামণিতে উল্লিখিত জয়ন্তীয়া সংক্রান্ত কিছু পঙক্তি নিম্নরূপ।
জয়ন্ত্যাং বামজঙ্ঘা চ জয়ন্তী ক্রমদীশ্বর।
(অর্থ: জয়ন্তী নামক স্থানে দেবীর বাম জঙ্ঘা পতিত হয়েছিল। এখানকার অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম জয়ন্তী। এখানকার ভৈরবের নাম ক্রমদীশ্বর।)
বামজঙ্ঘা জয়ন্ত্যাং তু জয়ন্তী ভৈরবস্তথা
ক্রমদীশ্বরস্তত্র দেবী জাগ্রতী সর্বদা।
(অর্থ: জয়ন্তী নামক স্থানে দেবীর বাম জঙ্ঘা পতিত হয়েছিল। এখানকার দেবী জয়ন্তী এবং ভৈরব ক্রমদীশ্বর সর্বদাই জাগ্রত থাকেন।)
কৈলাশে দশ লক্ষ্যেণ জয়ন্ত্যাং পঞ্চ লক্ষত।
(অর্থ: কৈলাস পর্বতে দশ লক্ষ বার মন্ত্র পাঠে যে পূণ্য বা সিদ্ধি লাভ হয় জয়ন্তী তীর্থে পাঁচ লক্ষ বার মন্ত্র পাঠে সেই একই পূণ্য বা সিদ্ধি লাভ হয়।)
কামাখ্যাতন্ত্র ও তন্ত্রচূড়ামণির পাশাপাশি কালিকাপুরাণেও জয়ন্তী দেবীর কথা উল্লিখিত হয়েছে। কালিকাপূরাণ মূলত একটি শাক্ত উপপুরাণ হলেও এতে তন্ত্রশাস্ত্রের গভীর প্রভাব রয়েছে। তাই একে শাক্ত-তান্ত্রিক সাহিত্য বা তন্ত্রসাহিত্য হিসেবেও গণ্য করা হয়। এই উপপুরাণের ৬১তম অধ্যায়ের ৩৯ তম শ্লোকের অংশবিশেষ নিম্নরূপ।
ওম জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী
দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোহস্তুতে।
(অর্থ: হে দেবী, তুমি জয়ন্তী, মঙ্গলা, কালী, ভদ্রকালী, কপালিনী,
দুর্গা, শিবা, ক্ষমা, ধাত্রী, স্বাহা ও স্বধা। তোমাকে প্রণাম।)
তিন. জয়ন্তীয়ার পীঠস্থানের কথা
---------------------------------
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সত্যযুগের দেবী সতী ছিলেন মহাদেব শিবের প্রথম স্ত্রী। তিনি ছিলেন খুবই পতিভক্ত একজন নারী। কিন্তু তাঁর পিতা দক্ষ প্রজাপতি মহাদেব শিবকে মোটেও পছন্দ করতেন না। তাই দক্ষযজ্ঞের সময়ে তিনি প্রকাশ্যে শিবের নিন্দা করেন। পিতা কর্তৃক পতি অপমানের এই ঘটনায় মর্মাহত হয়ে সতী প্রাণত্যাগ করেছিলেন। তখন ক্রোধে উন্মত্ত শিব সতীর নিথর দেহ নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে প্রলয়নৃত্য শুরু করেন। এতে জগৎ ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হলে সকল দেবতার অনুরোধে জগৎপালক বিষ্ণু জগৎ রক্ষায় এগিয়ে আসেন। তিনি নিজ সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেন। সনাতন ধর্মের শাক্তরা বিশ্বাস করেন, সতীদেহের এসব খণ্ডিত অংশ ভারতবর্ষের মোট ৫১টি জায়গায় পড়েছিল। এসব স্থানকে ‘শক্তিপীঠ’ বা ‘পীঠস্থান’ বলা হয়। শাক্তদের কাছে এসব পীঠস্থান পবিত্র তীর্থস্থানরূপে গণ্য হয়ে থাকে।
শাক্তদের বিশ্বাস, প্রতিটি পীঠস্থানের অধিষ্ঠাত্রী একজন দেবী এবং এর পাশাপাশি একজন রক্ষাকর্তা দেবও আছেন। পীঠস্থানের অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে বলা হয় ‘ভৈরবী’ এবং রক্ষাকর্তা দেবকে বলা হয় ‘ভৈরব’। জয়ন্তী দেবী হলেন এমন একটি পীঠস্থানের ভৈরবী যেখানে সতী দেবীর বাম জঙ্ঘা বা বাম উরু পতিত হয়েছিল। এই পীঠস্থানের ভৈরব হলেন ক্রমদীশ্বর। পীঠস্থানটির অবস্থান জয়ন্তীয়ায়। কিন্তু জয়ন্তীয়ার ঠিক কোথায় এই পীঠস্থানটি অবস্থিত তা নিয়ে দু’ধরণের বিশ্বাস প্রচলিত আছে। জয়ন্তীয়া সমতল এবং সিলেটের সনাতনীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, পীঠস্থানটির অবস্থান সমতলেই। বর্তমান সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপ্রাসাদ পশ্চিম ইউনিয়নের বাউরভাগ দ্বিতীয় খণ্ড গ্রামে এটি অবস্থিত (এলাকাটি সুরইঘাটের সনাতনপুঞ্জি নামেও পরিচিত)। এই এলাকাটি অতীতে জয়ন্তীয়ার ফালজুর রাজ বা পরগনার অন্তর্গত ছিল। তখন এই পীঠস্থানটি ‘ফালজুরের বামজঙ্ঘা মহাপীঠ’ নামেই পরিচিত ছিল।
আরেকদল লোকের বিশ্বাস, জয়ন্তী দেবীর পীঠস্থান অর্থাৎ ‘সতীদেবীর বামজঙ্ঘা পতিত হওয়ার’ স্থানটি জয়ন্তীয়া পাহাড়ের নারতিয়াং পুঞ্জিতে অবস্থিত। সেখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, বর্তমান নারতিয়াং দূর্গা মন্দিরটিই হচ্ছে জয়ন্তী দেবীর শক্তিপীঠ বা সতীদেবীর বামজঙ্ঘা পতিত হওয়ার স্থান। উভয় পীঠস্থানই আবিষ্কৃত হয়েছে জৈন্তিয়ার (ব্রিটিশ আমল থেকে জয়ন্তীয়ার স্থলে ‘জৈন্তিয়া’ উচ্চারণটির প্রচলন হয়) সিন্টেং রাজবংশের রাজাদের শাসনামলে। সিন্টেং রাজা প্রথম বড়গোসাঁইয়ের আমলে (আনুমানিক ১৫৫০ সালের আগে) রূপনাথ নামক এক ধর্মযাজক ফালজুরের বামজঙ্ঘা পীঠটি শনাক্ত করেছিলেন। এর পরবর্তীতে (আনুমানিক ১৬০৭-০৮ সালে) রাজা যশোমাণিক স্বপ্নালোকে আদিষ্ট হয়ে নারতিয়াং পুঞ্জির পীঠস্থানটিকে চিহ্নিত করেছিলেন। উভয় পীঠস্থানই বর্তমানে সনাতনীদের কাছে তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।
শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ) গ্রন্থের লেখক অচ্যুতচরণ চৌধুরীর মতে, জয়ন্তী দেবীর নামেই এই অঞ্চলের নাম ‘জয়ন্তীয়া’ এবং এর সংলগ্ন পাহাড়ের নাম ‘জয়ন্তীয়া পাহাড়’ হয়েছে। তবে এর উল্টোটাও হওয়া বিচিত্র নয়। এমন হতে পারে যে, জয়ন্তী দেবীর আগেই এই অঞ্চলের নাম জয়ন্তী বা জয়ন্তীয়া ছিল এবং এখানকার রানী হিসেবে তিনি স্ব-নামের পরিবর্তে জয়ন্তী বা জয়ন্তেশ্বরী (জয়ন্তীয়ার অধিশ্বরী) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। জয়ন্তীয়া পাহাড় বা জৈন্তিয়া পাহাড়ের (বর্তমানে জয়ন্তীয়ার স্থলে জৈন্তিয়া শব্দটি উচ্চারিত হয়) অধিবাসীরা সিন্টেং জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই জনগোষ্ঠীটি ‘জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠী’ নামেও পরিচিত। আনুমানিকভাবে, সুদূর অতীতে জয়ন্তী দেবী ছিলেন এই জনগোষ্ঠীরই আদি জনগোষ্ঠীর একজন সরদার বা রানী। সময়ের পরিক্রমায় (তান্ত্রিক যুগে) তিনি হয়ে উঠেছিলেন সনাতনবৈদিক ধর্মের একজন দেবী। একপর্যায়ে তিনি একটি পীঠস্থানের ভৈরবী হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেন। কিন্তু পীঠস্থানটি চিহ্নিত ছিল না। অবশেষে সিন্টেং জনগোষ্ঠীর দুজন রাজা জৈন্তিয়ার দুটি স্থানকে পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত করে তোলেন।
সিন্টেং জনগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা মূলত নিয়েমত্রে বা নিয়েমট্যানরাই ধর্মের অনুসারী ছিলেন। এই ধর্মের সাথে সনাতনবৈদিক বা আর্যবৈদিক ধর্মের তেমন কোন মিল নেই। নিয়েমত্রে বা নিয়েমট্যানরাই ধর্মের সাথে জয়ন্তী দেবীর পীঠস্থানেরও কোন যোগসূত্র নেই। কিন্তু জয়ন্তী দেবী তাদেরই আদি জনগোষ্ঠীর রানী বা সরদার হিসেবে অনুমেয়। এই গোলযোগের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এমন হতে পারে যে, পুরাকালে জৈন্তিয়া পাহাড় ও সমতলে সিন্টেংদের আদি জনগোষ্ঠীর যে রাজ্য ছিল তা একসময় (তান্ত্রিক যুগে) সংকুচিত হয়ে কেবল পাহাড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন জৈন্তিয়া সমতলের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় শ্রীহট্ট বা কামরূপের অধিবাসীদের হাতে। এরা ছিলেন সনাতনবৈদিক ধর্মমতের অনুসারী। নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও চেতনার আলোকে তারা এখানকার আদি শাসক জয়ন্তী দেবীকে একজন দেবী-সত্তা জ্ঞান করতেন।
তাদের দৈনন্দিন ধর্মীয় জীবনের চর্চায় জয়ন্তী দেবী একজন মাতৃরূপী শক্তি দেবী হিসেবে উপাস্য হয়ে উঠেছিলেন। আর মূল সিন্টেং জনগোষ্ঠী তাদের আদি ধর্মের রীতিনীতিই পালন করে যাচ্ছিল। অবশেষে ১৫০০ সালের পর থেকে যখন এই জনগোষ্ঠীর রাজারা জৈন্তিয়া সমতলের শাসক হয়ে উঠলেন তখন থেকে রাজপরিবারের মধ্যে সনাতনী ধর্মবিশ্বাসের চর্চা শুরু হয়। কিন্তু পাহাড়ি সিন্টেংদের মধ্যে এর কোন প্রভাব ছিল না। আনুমানিক ১৬০৭-০৮ সালের দিকে সিন্টেং রাজা যশোমাণিক নারতিয়াং মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করলে সেখানকার লোকজন সনাতনী জয়ন্তী দেবীর সাথে পরিচিত হয়। মন্দিরটি মূলত নিয়েমত্রে এবং সনাতন- উভয় ধর্মেরই মন্দির। সিন্টেংদের মধ্যে এই মন্দির খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি। সিন্টেং রাজপরিবারের সদস্যরা নিয়েমত্রে ধর্মের অনেক রীতিনীতি পালনের পাশাপাশি সনাতন ধর্মের চর্চা করলেও সাধারণ সিন্টেংরা তাদের আদি ধর্মই পালন করতো। ব্রিটিশ আমলে তাদের মধ্যে খ্রিষ্টধর্ম প্রসার লাভ করে। বর্তমানে তাদের অধিকাংশই খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী।
চিত্র :
ফালজুরের বামজঙ্ঘা মহাপীঠ
বামজঙ্ঘা মহাপীঠের প্রাচীন দেয়াল
নারতিয়াং মন্দির
নারতিয়াং মন্দিরের বেদি