06/10/2025
জীবনে অনেক লক্মী পাঁচালী পড়েছেন শুনেছেন এবার ২০ টা মিনিট সময় নষ্ট করুন শ্রীশ্রীঠাকুরের দৃষ্টিতে লক্মী দেবী সম্পর্কে জানার জন্য। সত্যি সত্যি বলছি আপনার মধ্যে লক্মী স্বরূপ দেখতে পাবেন লক্মী সম্পর্কে সত্যি টা জানতে পারবেন। স্বার্থক হবে লক্মী পূজা। নিজেই লক্মী হয়ে উঠবেই।
শ্রীশ্রীঠাকুরের দৃষ্টিতে দেব-দেবী---- (লক্ষ্মী)
দেবীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
মহামায়া দুর্গাদেবীর দক্ষিণ পার্শে লক্ষ্মীদেবীর অধিষ্ঠান। মা-দুর্গার দুই খ্যাতনামা কন্যা লক্ষ্মী এবং সরস্বতী। কথায় বলে, রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী। মায়ের পূজার সঙ্গে তাঁর এই দুই কন্যারও পূজা হ'য়ে থাকে। তা' ছাড়াও পৃথকভাবে বিশেষ তিথিতে লক্ষ্মী ও সরস্বতী পূজা হয়। লক্ষ্মীপূজা সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় দেবীপক্ষের শেষ পূর্ণিমায়, যার নাম কোজাগরী পূর্ণিমা।
মা-লক্ষ্মী ধনধান্য ও সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, বাঙ্গালীর ঘরে-ঘরে মহাধুমধামে তাঁর আরাধনা হ'য়ে থাকে। পূজাশেষে গৃহস্থ তাঁর কাছে অভ্যুদয়, সম্পদ ও শ্রী প্রার্থনা করে। মা-লক্ষ্মীর কৃপালাভের জন্য বাংলার মায়েরা প্রতি বৃহস্পতিবারে নিষ্ঠার সঙ্গে লক্ষ্মীর ব্রত পালন করেন। তখন ঘটে সিন্দুরের ফোঁটা ও ঘটের উপরে আম্রপল্লব দেওয়া হয়, পান-সুপারি সাজিয়ে দেওয়া হয়, এয়োতিরা একত্রে বসে লক্ষ্মীর পাঁচালী পাঠ ও শ্রবণ করেন, পরে পরস্পরের সিঁথিতে সিন্দুর পরিয়ে দেন।
ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনে বিভব, উন্নতি, সৌন্দর্য্য কে না কামনা করে ? আর, লক্ষ্মীদেবী এসবের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। লক্ষ্মীর আরাধনা যেখানে ঠিকমত হয় সেখানে এগুলি স্বতঃস্ফূৰ্ত ভাবেই জেগে ওঠে। তাই, লক্ষ্মীপূজা আমাদের জাতীয় জীবনে এক বিশেষ আসন অধিকার ক'রে আছে। নিতান্ত গরীব যে, সে-ও তার সাধ্যমত যা' হোক কিছু উপকরণ সংগ্রহ ক'রে লক্ষ্মীপূজা সম্পাদন করে।
কিন্তু এমন যদি কোন বাড়ী দেখা যায়, যেখানে লক্ষ্মীপূজার আয়োজন খুব, বাজী-বাজনার বিরাট ধুম, প্রসাদেরও বেশ ঘটা, অথচ সেখানকার মানুষগুলির মন অপরিচ্ছন্ন, তারা সদাচারী নয়, অখাদ্যকুখাদ্য ভোজন-বিলাসী, নারীরা স্বেচ্ছাচারী ও কলহপরায়ণা, পুরুষদের আছে চরিত্রের অধঃপতন বা হীন স্বার্থপরতা, সেখানে কি লক্ষ্মী অধিষ্ঠিত থাকেন ? ঐখানেই লক্ষ্মী চঞ্চলা হ'য়ে ওঠেন। চঞ্চলা মানে তিনি এক জায়গায় স্থির থাকেন না। হ্যাঁ, থাকেন না সেখানে, যারা তাঁকে রাখতে পারে না। কারণ, লক্ষ্মীপূজা মানে শুধু কতগুলি মন্ত্ৰপাঠ বা পাঁচালীপনা, শঙ্খধ্বনি করা, আলপনার বাহার, পান-সুপারী ও ঘট-পল্লব-সিন্দুর সাজানো নয়। লক্ষ্মীপূজা মানেই লক্ষ্মীদেবী যেমনভাবে চলতে আদেশ করেন সেইভাবে চলা, তিনি যা' পছন্দ করেন তাই করা, তাঁর দৈবী ভাবকে বিহিত অনুশীলন ও অভ্যাসের ভিতর দিয়ে চরিত্রে ফুটিয়ে তোলা, এক কথায়, লক্ষ্মীদেবী হ'য়ে ওঠা।
যে সমস্ত দেব-দেবীর পূজা আমাদের দেশে চলিত আছে, সে পূজাগুলির অনুষ্ঠান হয় বৎসরের বিশেষ বিশেষ সময়ে। পূজাকালে পাথর বা মাটির মূর্ত্তিকেই দেবতা ভেবে, তাঁর সামনে ধূপ-দীপ-নৈবেদ্য দিয়ে পুঁথিতে লিখিত মন্ত্রাদি পাঠ করা হয়। পূজা সাঙ্গ হয়। তারপর দেবতার সঙ্গেও সম্বন্ধ চুকে যায়। নিজেদের সংসারে বা কর্মস্থলে ফিরে যেয়ে যে যার মত চলি। অবশ্য নিত্যপূজার ব্যবস্থা যাখানে, সেখানকার কথা আলাদা। কিন্তু সেখানেও ঐ পূজার সময়টুকুতেই যা' কিছু তৎপরতা। তাও অনেক বাড়ীতেই দেখা যায়, সেটা একটা দায়সারা কর্ত্তব্যের মত হয়। দেবতার সঙ্গে প্রাণের যোগ কতটুকু স্থাপিত হয় ? তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছা আমরা কতটুকু বুঝে চ'লে থাকি ? তা' চলি না ব'লে যে পূজার যে-ফল হওয়া উচিত তা' আর আমাদের জীবনে পাওয়া হ'য়ে ওঠে না। সেইজন্য আজকাল পূজার হৈ-হুল্লোড় একটা সাময়িক মাদকতায় এসে পর্য্যবসিত হয়েছে।
পরমপ্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্ৰ কোন দেবতাকেই আমাদের কাছে শুধু মন্দিরের প্রতিমা মাত্র ক'রে রাখতে দেননি। দেবতার ভাবমূৰ্ত্তিকে তিনি আমাদের জীবনে জীবন্ত ক'রে তোলার কথাই বলেছেন। তাঁর কাছে দেবতার অপরিচিত দূরের কোন সত্তা নন। তিনি ঘরের মানুষ। দেবতার ইচ্ছা আছে, অনিচ্ছা আছে, পছন্দ-অপছন্দ আছে। তাঁকে পূজা করা মানেই তাঁর ইচ্ছা বুঝে ও জেনে সেইমত চলা, যাতে তিনি তৃপ্ত ও প্রীত হন। লক্ষ্মীপূজা মানেও লক্ষ্মী যাতে প্রীত হন সেইভাবে চলা।
মা-লক্ষ্মী যেমন ধনধান্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, তেমনি সৌন্দর্য্যেরও দেবী। জগতে যা' কিছু সুন্দর, শোভার আধার, পবিত্রতার প্রতীক, সেখানেই লক্ষ্মীর বসবাস। ঈশ্বর সত্য, শিব ও সুন্দর। অতএব, সৌন্দর্য্য ঈশ্বরের একটি গুণ, আর লক্ষ্মী সেই সৌন্দর্য্যের দেবী। যাদের বাক্য সুন্দর, ব্যবহার সুন্দর, পরিচ্ছদ সুন্দর, চরিত্র সুন্দর, খাদ্যখানা, ঘরসংসার, কাজকর্ম্ম, খেলা-ধুলা, লেখাপড়া, সবই সুন্দর ও নয়নানন্দকর, সেখানেই লক্ষ্মী অচলা হ'য়ে অবস্থান করেন। সুন্দর তাকেই বলে যা' আমাদের চোখকে, কানকে বা মনকে পীড়া দেয় না, বরং স্নিগ্ধ করে, জুড়িয়ে দেয়। সুন্দর তাই, যা' দেখেশুনে মনটা বিমল আনন্দে ভ'রে ওঠে এবং নীচতা, সঙ্কীর্ণতা ও অপরিচ্ছন্নতা থেকে মুক্তি লাভ করে। তাই, লক্ষ্মীর আর এক নাম শ্রী অর্থাৎ সৌন্দর্য্য। আর, লক্ষ্মী ষেখানে বিরাজিতা নন, তাই-ই হয়ে পড়ে হতশ্রী, যার চলতি নাম লক্ষ্মীছাড়া।
এই হতশ্রী বা লক্ষ্মীছাড়া অবস্থা মানুষের কিভাবে আসে তার সুন্দর বর্ণনা আছে শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথার মধ্যে। সেখানে আছে-----
"দিবানিদ্রা অনাচার ক্রোধ অহঙ্কার
আলস্য কলহ মিথ্যা ঘিরিছে সংসার ।।
উচ্চ হাসি উচ্চ ভাষা কহে নারীগণে ।
সন্ধ্যাকালে নিদ্রা যায় ঝগড়া জনে জনে ।।
দয়ামায়া লজ্জা আদি দিয়া বিসর্জ্জন ।
যেথায় সেথায় করে সেচ্ছায় গমন ।।
... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
শ্বশুর শাশুড়ীগণে নহে ভক্তিমতী।
বাক্যবাণ বর্ষে সদা তাহাদের প্রতি ।।
পতিরে করিছে হেলা না শুনে বচন ।
ছাড়িয়াছে গৃহস্থালী ছেড়েছে রন্ধন ।।
পুরুষেরা পরিহাসে সময় কাটায় ।
মিথ্যা ছাড়া সত্য কথা কভু নাহি কয় ।।
এমনতর অবস্থা যেখানে সেখানেই তো লক্ষ্মী চপলা বা চঞ্চলা। এমনতর মানুষেরা যদি লক্ষ্মীদেবীর পূজা করে, সে-পূজা বাহ্যাড়ম্বরপূৰ্ণ প্রাণহীন অনুষ্ঠানমাত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। লক্ষ্মী সেখানে কিছুতেই থাকতে পারেন না। তাঁর থাকার মত যে অনুকূল পরিবেশটি দরকার, সেখানে তার অভাব ঘটে গেছে।
যদিও পুরুষ-নারী সকলেই লক্ষ্মীপূজা করেন, তবুও যেহেতু লক্ষ্মী স্ত্ৰী-দেবতা, সেইজন্য লক্ষ্মীপূজায় মায়েদের তৎপরতাই বেশী দেখা যায়। লক্ষ্মীর আড়ি তাঁরা পাতেন, বৃহস্পতিবারে যদি পূর্ণিমা দেখা দেয় তাহ'লে সেদিন তাঁরাই উপবাস ক'রে লক্ষ্মীব্ৰত পালন করেন, পূজাশেষে তাঁরাই এয়োতির চিহ্নস্বরূপ পরস্পরকে সিন্দুর দেন। আবার, মা-লক্ষ্মীর তরফ থেকেও দেখা যায়, নারীজাতির জন্যই যেন তাঁর মাথাব্যথা বেশী। স্কন্দপুরাণে লক্ষ্মীর উক্তি--- "যে সকল স্ত্রী গুণভক্তিযুক্তা, পতির আজ্ঞানুবর্ত্তিনী, সদা সন্তুষ্টা, ধীরা, প্রীয়াবাদিনী, সৌভাগ্যযুক্তা, লাবণ্যময়ী, প্রীয়দর্শনা, সুশীলা, এইসকল গুণযুক্তা স্ত্রীতে আমি সর্ব্বদা অবস্থান করি।" আগেকার দিনে গ্রামে-গঞ্জে পীরের গান শোনা যেত। সে গানে ছিল চলার পথের ছোট বড় অনেক রকম সঙ্কেত। ঐ গানেরই একটি অংশ----
" সকালবেলায় ছড়া ঝাঁট সন্ধ্যাবেলায় বাতি ।
লক্ষ্মী বলেন সেইখানেতে আমারই বসতি ।।"
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে একদিনের কথা। একটি মা সংসারের কাজকর্ম্ম সেরে এসে দাঁড়িয়েছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সামনে। উদ্দেশ্য তাঁর, একটু ঠাকুর দর্শন করে আবার কাজে যাবেন। কিন্তু তাঁর পরণের শাড়ীটা ছিল ময়লা, মাথায় চুল ভাল ক'রে আঁচড়ানো নয়। সমস্ত বেশভূষাটাই একটু অবিন্যস্ত রকমের। মৃদু ভর্ৎসনায় ঐ মাকে সচেতন ক'রে দিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন--- "তোরা সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবি, সদাচারে চলবি, তবেই না সংসারে লক্ষ্মীশ্ৰী আসবে। তোদের অনেককে দেখি চুলটা ভাল ক'রে আঁচড়াস্ না, সিঁথিতে সিন্দূরটা রীতিমত দিস্ না, কপালে সিন্দূরের টিপটা ভাল ক'রে পরিস্ না, অগোছাল চলনায় চলিস। তোদের দেখে ছেলেমেয়েদের অভ্যাস অমনি হয়। এটা ভাল না। সব কাজের মধ্যে চাই সৌন্দর্য্য ও শৃঙ্খলাবোধ।"
তাহ'লে দেখা যাচ্ছে, শরীরে, মনে, বাক্যে, আচারে, ব্যবহারে, গৃহস্থালীতে, সাজসজ্জায় যেখানে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা, সেইখানেই লক্ষ্মী অচলা।
লক্ষ্মীর বীজমন্ত্র শ্রীং, অর্থাৎ তিনি শ্রী-স্বরূপিনী। তাই, যে-মানুষে বা যে-সংসারে অনাচার, কদাচার, ব্যভিচার দাপটে রাজত্ব করে, সেখান থেকে অচিরেই শ্রী অন্তর্হিত হয়। যেখানে হীন-স্বার্থপরতা, অর্থলোভ, ঝগড়াঝাটি, খিটিমিটি করা মেজাজ, অপরকে সহ্য করতে না পারা, হিংসা, স্বেচ্ছাচারী চলন, গুরুজনকে অশ্রদ্ধা করা, অহংমত্ততা, অপরকে দাবিয়ে রাখার বুদ্ধি, অভিমান বা ঠুনকো মানের আধিপত্য, শ্রী সেখানে থাকে না। ঐসব যাদের অন্তর-সম্পদ, তাদের মন হ'য়ে পড়ে কুৎসিত। মনের সেই ছবি তাদের বাইরের চেহেরা ও আচরণেও ফুটে বেরোতে থাকে। শান্ত সৎ স্বভাবের লোক এদের কাছে গেলেই বিরক্তি ও অস্বস্তি বোধ করে। ঐরকম যারা তারা মানুষের সহানুভূতি ও ভালবাসাও হারাতে থাকে। কথায় বলে, 'মানুষই লক্ষ্মীর বরযাত্রী'। মানুষ-সম্বল যার যত বেশী, সে তত বড় ঐশ্বর্য্যশালী। মানুষের জীবন পথ যিনি তিনিই নারায়ণ। তাই, মানুষের সেবাতেই নারায়ণের সেবা হয়। সেই নারায়ণকে যেখানে অগ্রাহ্য করা হয়, সতী-স্ত্রী লক্ষ্মী কি সেখানে থাকতে পারেন ? আর লক্ষ্মী যেখানে নাই, সেখানে তাঁর শ্রীও নাই।
❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️
সেইজন্য দয়াল ঠাকুর শ্রীঅনুকূলচন্দ্ৰ বলেন, "মায়েদের লক্ষ্মীপূজা করা মানে ব্যক্তিগতভাবে তারা এক একটি লক্ষ্মী হ'য়ে উঠুক"। শুধু মুখে মুখে 'লক্ষ্মীস্ত্বং সৰ্ব্বভূতানাং' ব'লে মন্ত্ৰপাঠ করলেই হবে না। মন্ত্রের অর্থগুলি অনুশীলনের ভিতর দিয়ে চরিত্রে মূর্ত্ত ক'রে তোলা চাই। তাই, 'লক্ষ্মী'-শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করার সময় তিনি শব্দটির ধাতুগত অর্থের উপর দাঁড়িয়েছেন। 'লক্ষ্মী' এসেছে 'লক্ষ্'-ধাতু থেকে, অর্থ---- অংকন, চিহ্নীতকরণ, জ্ঞান, দর্শন, আলোচনা। শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে ধাত্বর্থ--- 'অঙ্কন' মানে কী জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেছেন, 'মনে এঁকে রাখা' ; আর, 'চিহ্নীতকরণ' মানে বললেন, 'চিনে (জেনে) রাখা'। লক্ষ্মীর গুণের মধ্যে এই মনে রাখা বা বিষয় ও ব্যাপারগুলি জেনে বুঝে ঠিক রাখার প্রকৃতি আছেই। তাহ'লে ধাতুগত সমস্ত অর্থ নিয়ে ভাবলে লক্ষ্মী মানে বলা যায়---- যিনি দেখেন, আলোচনা করেন, গুণাগুণ বিচার করে যেখানে যেটি যেমনভাবে প্রযোজ্য তাকে সম্যকভাবে চিহ্নিত ক'রে রাখেন।
গুণবতী সেবাতৎপর মেয়েকে অনেকে লক্ষ্মী মেয়ে ব'লে আদর করেন, প্রশংসা করেন। এমনিতে মেয়েদের গুণের কথা অনেক জানা থাকলেও প্রকৃত লক্ষ্মী মেয়ে বলতে কী বোঝায় সে-সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুব পরিষ্কার নয়। এক একজন হয়তো এক এক ধরণের মত পোষণ করি। একদিন এই বিষয় নিয়ে কথা চলছিল দয়াময় শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে। 'লক্ষ্মী'-শব্দের ধাতুগত অর্থকে ভিত্তি ক'রে তিনি ছন্দোবদ্ধ ভাষায় ব্যক্ত ক'রে দিলেন প্রকৃত লক্ষ্মী মেয়ের স্বরূপ। তিনি বললেন----
"সব যা'-কিছু মনে আঁকা
চিহ্ন দেখে চেনে,
জ্ঞান-বোধনার ব্যবস্থিতি
গেঁথে রাখে প্রাণে,
শ্রেয়নিষ্ঠ এমন মেয়েই
লক্ষ্মী মেয়ে হয়,
এমন মেয়ে থাকলে ঘরে
নাইকো কোনো ভয়।"
(অনুশ্রুতি -- ৩য়)
এমনতর হ'য়ে ওঠাই লক্ষ্মীত্ব লাভ। এ যার হয়, লক্ষ্মীপূজা তারই ঠিক ঠিক করা হয়। প্রকৃত গৃহলক্ষ্মীকে যে কত বড় ক'রে দেখেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্ৰ তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর আর একটি ছড়ার বাণীতে----
"ঘরের যিনি গৃহলক্ষ্মী
তাঁরই কিন্তু সব,
সেবাতীর্থ হৃদয় যে তাঁর
নারায়ণই বিভব।"
'লক্ষ্মী'-র মধ্যে আছে জ্ঞান, তাই যেখানে লক্ষ্মীর আবাস সেখানে অজ্ঞানতা থাকে না। 'লক্ষ্মী'-র মধ্যে আছে দর্শন, তাই লক্ষ্মী যেখানে থাকেন, সেখানে অদৃষ্ট তার পরিহাস সৃষ্টি করতে পারে না। কারণ সবটাই থাকে দেখা ও জানার মধ্যে। আবার, 'লক্ষ্মী'-র মধ্যে আছে সৌন্দর্য্য, তাই কুৎসিত কিছুই সেখানে ঠাঁই পায় না। এক কথায়, 'লক্ষ্মী'-তে আছে আলো, তাই সবরকম অন্ধকার সেখান থেকে বিদূরিত। এই প্রসঙ্গে পরমদয়াল শ্রীশ্রীঠাকুর একদিন বড় সুন্দর ক'রে বলেছিলেন----
"No light, no sight, no knowledge" (আলো না থাকলে দর্শনও থাকে না, জ্ঞানও থাকে না)। আমরা তো আলোই চাই। জ্ঞানই চাই। আর জ্ঞানোচ্ছল, ভক্তি-উচ্ছল চলন যেখানে সেখানেই তো লক্ষ্মী অৰ্থাৎ সমৃদ্ধির আবাস।
লক্ষ্মীর রূপবৰ্ণনায় আছে--- তিনি অতিশয় সুন্দরী, নারায়ণের বাম ভাগ থেকে উৎপন্না, গৌরবর্ণা, দ্বিভুজা, স্থিরযৌবনা। তিনি নারায়ণের সঙ্গে বৈকুণ্ঠে অবস্থান করেন। এই বৈকুণ্ঠ কী ?---- বিগত কুণ্ঠা যেখানে, অর্থাৎ কুণ্ঠা যেখানে নেই এমনতর যে মানসিক অবস্থা তাই বৈকুণ্ঠ। কুণ্ঠা অর্থে সমস্ত রকম সঙ্কোচ, সঙ্কীর্ণতা, হীনতা ইত্যাদি। এগুলি যেখানে থাকে না তাই বৈকুণ্ঠ। এগুলির জাল থেকে যে নিজেকে মুক্ত রাখে, ঈশ্বরমুখী তথা ইষ্টমুখী চেতনায় চেতন থেকে সমস্ত কুণ্ঠার অপনোদন ঘটিয়ে ইষ্টপ্রীত্যর্থে জীবন পরিচালিত করে, সেই-ই বৈকুণ্ঠ ধামে স্থিতিলাভ করে।
নারায়ণের সঙ্গে লক্ষ্মী অবিচ্ছেদ্যভাবে অবস্থান করেন। আমাদের পুরাণাদিতে লক্ষ্মী-নারায়ণের কতরকম কাহিনী আছে। লক্ষ্মী নারায়ণের স্ত্রী ব'লে কথিতা। তাই, লক্ষ্মীপূজার সময় নারায়ণপূজা অবশ্য কর্ত্তব্য। নারায়ণকে যে অগ্রাহ্য করে, লক্ষ্মী তার কাছে অবস্থান করেন না, তার পূজাও গ্রহণ করেন না। কেউ যদি নারায়ণকে বাদ দিয়ে লক্ষ্মীর আরাধনা করতে চায়, তার কাছ থেকে লক্ষ্মী চঞ্চলা হ'য়ে স'রে যান।
নারায়ণকে বাদ দেওয়া মানে মানুষের সাথে অসৎ ব্যবহার করা, মানুষকে সইতে-বইতে না পারা, কদাচারী চলনে চলা, শরীরে বা মনে অথবা উভয়তঃই অপরিচ্ছন্ন থাকা, কাম-ক্রোধ-লোভ ইত্যাদির বশীভূত হ'য়ে চলা এবং তার জন্য যা' খুশী তাই করা, ইত্যাদি। এরকম চলনে চললে নারায়ণ সেখান থেকে অন্তর্দ্ধান করেন। আর নারায়ণ যেখানে নেই সেখানে সতী স্ত্রী লক্ষ্মী থাকেন না। ঐখানেই লক্ষ্মী চঞ্চলা হ'য়ে ওঠেন।
লৌকিক জগতেও আমরা কী দেখে থাকি ? কোন বাড়ীতে যেয়ে কেউ যদি সেই বাড়ীর কর্ত্তার খোঁজখবর না নিয়ে বাড়ীর বধূটির সাথে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করে, প্রকৃত সতী নারী কখনও অমন মানুষকে পাত্তা দেবে না। এমন প্রকৃতির লোক ঘরে এলে, 'এখন উনি বাড়ী নেই, বাড়ী এলে আসবেন' ব'লে হয়তো মুখের উপর দরজাই বন্ধ করে দেবে। আবার, সতী নারী যদি দেখে, কোন লোক তার স্বামীকে অন্তরের সঙ্গে শ্রদ্ধা করে, তাঁর কাজে সাহায্য করছে, তাঁর কোন প্রয়োজনে না ডাকতেই এসে দাঁড়াচ্ছে, তখন ঐ লোকটি সতী নারীর শ্রদ্ধা, ভালবাসা, আদর, স্নেহ লাভ করেন। ঠিক তেমনি নারায়ণকে যে ভালবাসে, তাকে মা-লক্ষ্মীও দয়া করেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্ৰ জগতের কাছে লক্ষ্মী-চরিত্রের এই আদর্শই তুলে ধরেছেন। কোন এক সময়ে জনৈকা মাকে লিখিত একখানা চিঠির মধ্যে শ্রীশ্রীঠাকুর লিখেছিলেন-----
"যেখানে নারায়ণ নেই সেখানে কি লক্ষ্মী থাকতে পারে ? আর, লক্ষ্মীকে অপমান ক'রে, জোর ক'রে আটক ক'রে যদি কেউ রাখে, তবে রাবণের মত দশা হয় বোধ হয়। কিন্তু নারায়ণকে কেউ তুষ্ট রাখতে পারলে লক্ষ্মীকে সে পাবে---- পাবেই নিশ্চয়।..... যে কর্ম্ম নারায়ণকে (সৎ থাকা, বৃদ্ধি পাওয়া) বরণ করে না, তাতে শ্রী বা লক্ষ্মী (সেবা করা) অতুষ্ট বা অবমানিত, তা সর্ব্বনাশ এনে দেয়।"
টাকা-পয়সা যারা উপার্জ্জন করতে চায়, তাদের নারায়ণের সেবা করতেই হয়। 'নারায়ণ' শব্দটির মধ্যে আছে--- 'নার' (নরসমূহ, জনসমূহ) ও 'অয়ন' (চলন, পথ)। আর, 'নারায়ণ' শব্দের অর্থ--- সর্ব্বজীবের আশ্রয় বা পথ ; প্রাপ্তি ও বর্দ্ধনার পথ ; মানুষের জীবনপথ। তাই, নারায়ণপূজা মানে মানুষের সেবা করা, মানুষগুলি যাতে সুস্থ, সক্ষম ও তাজা থাকে, তাই ক'রে চলা। কিন্তু টাকা-বাগানোর ফন্দী নিয়ে যারা মানুষের সেবা করে, তারা শেষ পর্য্যন্ত ব্যর্থ হয়। একটি ছড়ায় বলেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর----
"টাকার টানে পিরীত হয়,
সে-প্রেম কিন্তু কিছুই নয়।"
(অনুশ্রুতি ৭ম)
বিশ্বসত্তার দুই সমবিপরীত সত্তা---- লক্ষ্মী এবং নারায়ণ। নারায়ণ যেন 'পজিটিভ্' শক্তি, আর লক্ষ্মী 'নিগেটিভ্'। তাই কথিত আছে, নারায়ণ অনন্তশয্যায় শায়িত, আর লক্ষ্মী তাঁর পদসেবা করছেন। পদ হচ্ছে চরণ। নিগেটিভ্ প্রকৃতি 'চর', আর পজিটিভ্ পুরুষ 'স্থির'। দুইয়ের মিলনে সৃষ্টির উদ্ভব। নারায়ণের নাভিপদ্ম থেকে জাত হলেন ব্রহ্মা। তিনি সৃষ্টিকর্ত্তা। 'ব্রহ্মা' মানে যার বৃদ্ধি ও দীপ্তি আছে। সৃষ্টির প্রথম প্রকাশ ঐ ব্রহ্মার মধ্যে। ব্রহ্মা অর্থাৎ বিরাট বিস্তৃতির মাঝেই ধীরে ধীরে উদ্ভূত হয়ে উঠল নীহারিকা, গ্রহ, নক্ষত্র, পৃথিবী, বায়ুমণ্ডল, পাহাড়, নদী, সাগর, গাছপালা, জীবকুল, ইত্যাদি যা' কিছু সব। এই দিক দিয়ে দেখলে নারায়ণ ও লক্ষ্মীর কথা সমগ্র সৃষ্টি-ধারার আদিতম উৎসেরই কথা।
পূরাণে আছে, দেবাসুরের সমুদ্রমন্থনের ভিতর দিয়ে অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে লক্ষ্মীও উঠেছিলেন। তাই, তাঁর অপর নাম 'ক্ষীরাব্ধিতনয়া' বা 'জলধিজা'। এ ব্যাপারটা কী ? এইসবের তাৎপর্য্য ঠিকমত বোধ না করার দরুণ অনেক জিনিস আমাদের কাছে দুর্ব্বোধ্য বা রহস্যাবৃত থেকে যায়।
সমুদ্র মন্থন ক'রে লক্ষ্মীলাভ করতে হয়, তা' হ'ল সংসার-সমুদ্র। এ সংসারে বিহিত চেষ্টা ও অনলস পরিশ্রমের ভিতর দিয়েই সৌভাগ্যলাভ হয়ে থাকে। এই চেষ্টা ও পরিশ্রমই হচ্ছে মন্থন (আলোড়ন)। আর, মন্থনদণ্ড হচ্ছে নিজের দাঁড়া (principle)। উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য নিজের দাঁড়া ঠিক রাখতে হবে। কোন সংশয়, সংকোচ বা জড়তায় টললে-দুললে হবে না। নিজ দাঁড়ায় দাঁড়িয়ে উদ্দেশ্যে স্থির লক্ষ্য রেখে, পুরাণে বর্ণিত দেবতাদের মত সংগ্রামী, অধ্যবসায়ী, কর্ম্মকুশল তৎপরতায় এগিয়ে চলতে পারলে মানুষ সৌভাগ্যলক্ষ্মীর দেখা পায়। এই হ'ল সমুদ্রমন্থনের ভিতর দিয়ে লক্ষ্মীলাভের তাৎপর্য্য। আর, যারা শ্রমবিমুখ, তাদের ভাগ্যও পিছিয়ে চলতে থাকে, জীবনের দৌড়ে পরাজিত হয় তারা, বঞ্চিত হয় লক্ষ্মীর কৃপালাভে।
লক্ষ্মীর আর এক নাম 'ইন্দিরা'। 'ইন্দিরা' এসেছে 'ইন্দ্'-ধাতু থেকে, মানে--- পরমৈশ্বর্য্য। তিনি পরম ঐশ্বর্য্যবতী, তাই তিনি ইন্দিরা। লক্ষ্মীর আর এক নাম 'কমলা', কারণ তিনি কমভাব বা কান্তির প্রতীক। তিনি আবার 'পদ্মা'। পদ্মও সৌন্দর্য্য ও কমনীয়তা প্রকট করে। এগুলি সবই লক্ষ্মীর রূপের বিভিন্ন দিক। তাঁর 'রমা' নামের তাৎপর্য্য হ'ল--- অনুগত সন্তানগণের প্রতি তিনি স্নেহপরায়ণা, তাদের কল্যাণবিধানে নিয়ত রত বা তৎপর।
লক্ষ্মীর বাহন হ'ল অন্ধকারের জীব। সে রাতেই চরে বেড়ায়। সে মাংসাশী এবং হিংস্র। এই পেচক-চরিত্রের মানুষ সংসারে আছ। মা-লক্ষ্মী তাদের বহন করে রাখেন। তার মানে নিজ কর্ত্তৃত্বাধীনে রেখে তাদিগকে মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করতে শেখান, সাথে সাথে তাদের স্বভাব সংশোধনেরও চেষ্টা করেন।
অন্ধকারে কারা বিচরণ করে ? ---- যারা আলোয় আসতে ভয় পায়। দুনিয়ায় যত পাপ অনুষ্ঠিত হয় অন্ধকারে, লোকচক্ষুর অগোচরে। কালো টাকার লেনদেন যেখানে হয়, নারীর শ্লীলতা নিয়ে যেখানে ছিনিমিনি খেলা হয়, পরকে ফাঁকি দিয়ে নিজের পেট ভরানোর ব্যবস্থা যেখানে প্রধান কর্ম্ম হ'য়ে ওঠে, এ সবই অন্ধকারেরই কর্ম্ম। আলোর মাঝে অর্থাৎ প্রকাশ্যে এসব কাজ হয় না। আবার, দম্ভ, অভিমান, নিষ্ঠুরতা, কপটতা, আত্মসুখপ্রবণতা ইত্যাদি অবগুণ যাদের প্রবল, তাদের মনের মধ্যেও ঘোর অন্ধকার বাসা বেঁধে আছে।
কিন্তু অন্ধকারের হোক আর আলোকেরই হোক, সমস্ত জীবেরই স্রষ্টা সেই এক পরমপিতা। তিনি চান না---- যারা অন্ধকারে আছে তারা চিরকাল অন্ধকারে থেকেই শেষ হ'য়ে যাক, তাদের মনের ময়লা যেন কোনদিন দূর না হয়। বরং তারা আলোর সংস্পর্শে আসুক, তাদের অন্তরের অন্ধকার দূর হোক, পরার্থপরতায় তৎপর হওয়ার ভিতর দিয়ে তাদের হৃদয় প্রসারিত হোক, এই তাঁর চাহিদা। কিন্তু শুধু মনে মনে চাহিদা থাকলেই তো প্রাপ্তি ঘটে না, চাহিদা-অনুপাতিক কর্ম্ম বা প্রয়োগ-পদ্ধতি চাই। আর, নিকৃষ্ট-চরিত্রদিগকে উৎকৃষ্ট ক'রে তোলার একটা বিশেষ পদ্ধতি হ'ল তা'দিগকে শ্রেষ্ঠ, সুনিষ্ঠ, সদাচারী, দরদী মানুষের সংসর্গে রাখা, তাঁদের সেবা-অনুচর্য্যা নিয়ে যাতে চলতে পারে তার ব্যবস্থা করা। তার ভিতর দিয়ে আসবে ঐ শ্রেষ্ঠের প্রতি আসক্তি বা টান। তখন তিনি যেমন পছন্দ করেন সেইভাবে চলতে ইচ্ছা করে। এইভাবে যেমন আলো জ্বললেই অন্ধকারের বিনাশ ঘটে, তেমনি শ্রেয়-অনুরক্তি যত বাড়বে, অশ্রেয়-অনুরক্তি তত ক'মে যাবে আপনা থেকে। এই চমৎকারী পদ্ধতির কথা ভগবান শ্রীকৃষ্ণও বলেছেন----
"দুরাচারী যত্নে করি আমার ভজন
ধর্ম্মাত্মা হইয়া শীঘ্র, পায় শান্তি ধন ;
জানিবে হে ধনঞ্জয় একথা নিশ্চয়,----
কখনো আমার ভক্ত বিনষ্ট না হয়।"
(গীতা : কুমারনাথ সুধাকর)
মা-লক্ষ্মীর যে পেচকবাহন তার তাৎপর্য্যও এইখানে।
লক্ষ্মীপূজার অপরিহার্য্য অঙ্গ ধান-দূৰ্ব্বা। কেন ? কারণ, ধান আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য। পূজার উপকরণ-হিসাবে ধান রাখা মানে প্রধান খাদ্যশস্যকে অবহেলা না-করা, ফসলের যত্ন করা। যাকে রাখা যায়, সে-ই রাখে। পূর্ব্ব থেকেই বিহিত প্রস্তুতি নিয়ে, প্রাকৃতিক নানা বিপর্য্যয়কে এড়িয়ে, কৃষিকাজের যথাযোগ্য সুব্যবস্থা ক'রে ধান্যাদি ভাল উৎপাদনের ও সুরক্ষার ব্যবস্থা যদি করা হয়, তবে প্রয়োজনের সময়ে ধানও আমাদের মুখে খাদ্য যুগিয়ে আমাদের রক্ষা ক'রে চলবে একথা অতি নিশ্চয়। লক্ষ্মীপূজায় ধান্যের এই বিশিষ্ট স্থান নির্দেশ দ্বারা ফসলের প্রতি যত্ন নেওয়ার ইঙ্গিতই বুঝতে হবে।
আর দুর্ব্বা হ'ল সজীবতা ও মৃত্যুহীনতার প্রতীক। সাধারণতঃ দুর্ব্বাঘাস সহজে মরে না। এর শিকড় যদি কোনভাবে মাটিতে থেকে যায়, সেখান থেকে আবার নতুন দূর্ব্বা গজায়। দূর্ব্বা হাতে নেওয়া মানে অমরত্বের শরণ নিয়ে চলা। তাছাড়া দূর্ব্বা চিরশ্যামল। এই শ্যামলতা হ'ল সজীবতা তথা নবীণপ্রাণতার প্রতীক। দূর্ব্বা হাতে নেওয়ার ভিতর দিয়ে প্রাণবত্তা ও চিরনবীনতাকেই বরণ করা হয়।
এইভাবে তাৎপর্য্যগুলি জেনে ও বুঝে যদি লক্ষ্মীর উপাসনা করা হয়, তখনই লক্ষ্মীপূজা সাৰ্থক হয়। আবার, শুধু জানলে বা বুঝলেই হবে না, সেগুলিকে জীবনে বিহিতভাবে প্রয়োগ ও ব্যবহার করা চাই। তা' করতে গেলেই প্রয়োজন তদনুপাতিক চলন। আর, এই চলা ঠিক থাকলেই মানুষ লক্ষ্মীর আশীর্ব্বাদে ভরপুর হ'য়ে উঠতে পারে।
সমাপ্ত----
*** [ উক্ত লেখাটি - 'সৎসঙ্গ' - দেওঘর, ঝারখণ্ড থেকে প্রকাশিত 'আলোচনা' পত্রিকা আশ্বিন, ১৩৯১ (৩৬- বর্ষ, একাদশ সংখ্যা, অনুূকূলাব্দ - ৩৯) -এর শ্ৰীদেবীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রচিত -- "শ্রীশ্রীঠাকুরের দৃষ্টিতে দেব-দেবী - 'লক্ষ্মী'"- নামক নিবন্ধ থেকে নেওয়া। ]