Al-Manar Institute

Al-Manar Institute কুরআন এবং সুন্নাহর প্রচারের জন্য নিবেদিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

27/08/2026

অন্তরে কষ্ট জিইয়ে রাখা যেভাবে আমাদের ক্ষতি করে
ড. মারিয়া খান

26/08/2026

স্ত্রী শশুর-শাশুড়ির সাথে থাকতে না চাইলে করণীয় কী?
উস্তাদ জাভেদ আহমেদ গামিদি

25/08/2026

মৃত্যুকে সৃষ্টি করার তাৎপর্য
মইজ আমজাদ

মদ্যপানের শাস্তি হিসেবে আশিটি বা চল্লিশটি বেত্রাঘাত আমাদের প্রচলিত ফিকহে একটি প্রতিষ্ঠিত মত। সাধারণভাবে এটিকে শরিয়ার বি...
24/08/2026

মদ্যপানের শাস্তি হিসেবে আশিটি বা চল্লিশটি বেত্রাঘাত আমাদের প্রচলিত ফিকহে একটি প্রতিষ্ঠিত মত। সাধারণভাবে এটিকে শরিয়ার বিধান হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে শরিয়ার মূলনীতি এবং মদ্যপানের শাস্তি নির্ধারণের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মদ্যপানের শাস্তি হিসেবে আশিটি বা চল্লিশটি বেত্রাঘাতকে শরিয়ার নির্ধারিত বিধান বলা সঙ্গত নয়। মদ্যপান হারাম হওয়া কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ, কিন্তু এর শাস্তি নির্ধারণের বিষয়টি ভিন্ন একটি বিষয়।

কোনো বিষয় শরিয়ার বিধান হতে হলে তা কুরআন বা সুন্নাহে শরিয়ার বিধান হিসেবে নির্ধারিত হতে হবে। অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে পাঁচটি অপরাধের জন্য কুরআন নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান দিয়েছে। সেই অপরাধগুলো হলো: হত্যা বা আঘাত, সামাজিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ব্যভিচার, ব্যভিচারের অপবাদ এবং চুরি।

এর বাইরে অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে কুরআন বা সুন্নাহে নির্দিষ্টভাবে কোনো শাস্তির বিধান দেওয়া হয়নি। তাই, এগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও শাসকের দায়িত্ব হলো অপরাধের প্রকৃতি, সামাজিক ক্ষতি, জননিরাপত্তা, অপরাধের ব্যাপকতা এবং সংশোধনের প্রয়োজন বিবেচনা করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে এসব শাস্তির ধরন ও মাত্রাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

মদ্যপানের বিষয়টি এই মূলনীতির আলোকে দেখলে স্পষ্ট হয়। কুরআনে মদ্যপান থেকে বিরত থাকার সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে এবং একে অপবিত্র ও শয়তানের কাজ হিসেবে উল্লেখ করে তা পরিহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মদ্যপানের জন্য কুরআন নির্দিষ্ট কোনো শাস্তির বিধান দেয়নি। এমনকি হাদিসেও শরিয়াতের বিধান হিসেবে এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো শাস্তি বর্ণিত হয়নি।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মদ্যপানের অপরাধে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন হাদিসে এর বিভিন্ন ধরন বর্ণিত হয়েছে। কোথাও জুতা দিয়ে, কোথাও লাথি-কিল-ঘুষি দিয়ে এবং কোথাও খেজুরের ডাল দিয়ে প্রহার করার কথা এসেছে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি বা নির্দিষ্ট সংখ্যক বেত্রাঘাতকে স্থির করে দেওয়া হয়নি।

পরবর্তীকালে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর আমলে মদ্যপানের জন্য চল্লিশটি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করা হয়। এরপর হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে যখন মদ্যপানের প্রবণতা বেড়ে যায়, তখন তিনি সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং শাস্তির পরিমাণ আশিটি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেন। ইবনে রুশদ বিদায়াতুল মুজতাহিদ-এ উল্লেখ করেছেন, হজরত আলী (রা.) মদ্যপানের শাস্তিকে ব্যভিচারের অপবাদের শাস্তির সঙ্গে তুলনা করে আশিটি বেত্রাঘাতের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল—মদ্যপানকারী মাতাল হয়ে অসংলগ্ন কথা বলে এবং এর ফলে অন্যের ওপর অপবাদ আরোপের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। (বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ২/৩৩২)

যদি আশিটি বা চল্লিশটি বেত্রাঘাত শরিয়ার নির্ধারিত বিধান হত, তাহলে তা এভাবে পরামর্শ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হত না। কোনো সাহাবি নিজের সিদ্ধান্তে বা অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে শরিয়ার বিধান প্রবর্তন করতে পারেন না। শরিয়ার বিধান প্রবর্তনের এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরে কিয়ামত পর্যন্ত এই এখতিয়ার কারও নেই।

এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাসক হিসেবে ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আল্লাহর রাসুল এবং শরিয়ার বাহক; একই সঙ্গে তিনি মুসলিম সমাজের শাসকও ছিলেন। ফলে তাঁর প্রশাসনিক কার্যক্রম বা সিদ্ধান্তকে শরিয়ার বিধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যেসব বিষয়কে তিনি শরিয়ার বিধান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, তা কুরআন এবং সুন্নাহে শরিয়ার বিধান হিসেবেই নির্ধারিত ও প্রতিষ্ঠিত।

এজন্য আমরা মনে করি, মদ্যপানের শাস্তি সম্পর্কিত প্রচলিত ফিকহি মতটির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।

কোনো অপরাধের জন্য শরিয়াতে নির্দিষ্ট শাস্তি না থাকলেও রাষ্ট্রের শাসক ও আইনপ্রণেতাগণ মানুষের অধিকার ও সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করতে পারেন। মদ্যপান যেহেতু ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর, তাই রাষ্ট্র পরিস্থিতি অনুযায়ী এর জন্য উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারণ করবে। সেই শাস্তি বেত্রাঘাত হতে পারে, আবার অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থাও হতে পারে—এটি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সময়ের সামাজিক বাস্তবতা ও রাষ্ট্রের নীতির ওপর।

মাওলানা উমর ফারুক

23/08/2026

আল্লাহ কীভাবে প্রতিপালন করেন?
মইজ আমজাদ

22/08/2026

মানুষের নৈতিক যোগ্যতা
মইজ আমজাদ

21/08/2026

নিজেকে তুচ্ছ ভাববেন না
ড. মারিয়া খান

20/08/2026

ইসলামের উদ্দেশ্য কি রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করা?
ড. মারিয়া খান

19/08/2026
ইলমে কালামের ওপর গ্রিক দর্শনের প্রভাবইলমে কালামের বিবর্তন এবং প্রভাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এর ভিত্তি কেবল ইসলামি ...
17/08/2026

ইলমে কালামের ওপর গ্রিক দর্শনের প্রভাব

ইলমে কালামের বিবর্তন এবং প্রভাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এর ভিত্তি কেবল ইসলামি শাস্ত্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ওপর গড়ে ওঠেনি; বরং এটা গ্রিক দর্শনের দ্বারাও গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। আল্লামা ইকবাল, শিবলি নুমানি এবং জাভেদ আহমেদ গামিদি-এর মতে, ইলমে কালাম গ্রিক দর্শনের প্রভাবে কুরআনের সহজ ও সহজাত প্রকৃতির ওপর ভিত্তিশীল শিক্ষা থেকে দূরে সরে একটি জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোতে রূপ নিয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে ইলমে কালামের চিন্তাধারায় এমন এক মাত্রা যুক্ত হয়েছে, যা আসমানি গ্রন্থের চিরাচরিত পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শিবলি নুমানির মতে, মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিক বা মুতাকাল্লিমগণ যখন গ্রিক দর্শনের মূলনীতিগুলো গ্রহণ করতে শুরু করেন, তখন তাদের আলোচনা ধীরে ধীরে কুরআনের স্বতঃস্ফূর্ত শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হতে থাকে এবং বিমূর্ত যুক্তি ও তাত্ত্বিক পরিভাষা সেখানে প্রধান হয়ে ওঠে। তিনি আরও বলেন, ধর্মতাত্ত্ববিদরা নিজেদের বিশ্বাস রক্ষার জন্য গ্রিক তর্কবিদ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন, যার ফলে ধর্মীয় বিতর্ক স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে দর্শনের জটিল মারপ্যাঁচে আটকে পড়ে।

আল্লামা ইকবালও এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থক ছিলেন। তার মতে, ইলমে কালাম ইসলামি চিন্তাধারাকে উল্টে দিয়েছে এবং সেটাকে এমন এক যুক্তিকাঠামোর মধ্যে বন্দী করে ফেলেছে, যেখানে যুক্তি ও দর্শনই হয়ে উঠেছে প্রধান মানদণ্ড। তিনি মনে করতেন, ইসলামি বিশ্বাসকে যুক্তি ও দর্শনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করার ফলে ধর্মের প্রকৃত বাণী উপেক্ষিত হয়েছে; আর ইলমে কালামের জটিলতাগুলো ধর্মের সহজ সত্যকে জড়িয়ে ফেলেছে নানাবিধ অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে। ফলে ধর্ম তার সহজাত প্রকৃতি এবং আধ্যাত্মিক প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। কারণ এটা যুক্তি ও তর্কের এমন এক ছাঁচে আটকা পড়েছে, যা মানুষের চেতনার অভ্যন্তরীণ প্রবাহের সাথে মোটেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

জাভেদ আহমেদ গামিদি-ও এই মতামতকে সমর্থন করেন। তিনি মনে করেন, মুসলমানরা যখন গ্রিক দর্শন, খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্ব এবং জরথুস্ত্রীয় চিন্তাধারার আদর্শিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, তখন তারা প্রতিপক্ষের সেই সব তর্কমূলক নীতি গ্রহণ করতে শুরু করে। এর ফলে ইসলামি বিশ্বাসের মধ্যে এমন সব বিমূর্তায়ন ঢুকে পড়ে, যা ধর্মের মূল বাণীর প্রমাণ ও যুক্তিপদ্ধতিকে তার নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো থেকে বিচ্যুত করে।

পক্ষান্তরে, উপরে উল্লিখিত এই দৃষ্টিভঙ্গির যারা সমালোচনা করে, তাদের দাবি হলো: ইলমে কালামের শিকড় সম্পূর্ণভাবে ইসলামি উৎসের মধ্যে প্রোথিত। তাদের মতে, কোনো বিদেশি দর্শনের প্রভাবে নয়, বরং মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও বিশ্বাসগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়েই এর বিবর্তন ঘটেছে।

তাদের যুক্তি হলো, আল্লাহতায়ালার গুণাবলি, তাকদির ও মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা কিংবা ইমান ও আমলের পারস্পরিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো ইসলামি শাস্ত্রের মধ্যেই বিদ্যমান ছিল। তারা এই দাবি মানতে নারাজ যে, ইসলামি ধর্মতাত্ত্ববিদগণ গ্রিক দর্শন গ্রহণ করেছিলেন। তাদের প্রশ্ন হলো, যদি তা-ই হতো, তবে ইমাম আশআরি এবং ইমাম মাতুরিদির মতো মনীষীদের চিন্তাধারা গ্রিক দর্শনের সাথে মুসলমানদের পরিচিত হওয়ার আগেই কীভাবে বিকশিত হলো?

সমালোচকরা আরও বলেন, আবু হাশিম আল-জুব্বাইয়ের মতো পণ্ডিতদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা গ্রিক দর্শনের ফল ছিল না; বরং তা ছিল নিছক ইসলামি শাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অভ্যন্তরীণ বিতর্কের ফসল। তাদের দৃষ্টিতে, ইলমে কালামের উদ্ভব হয়েছিল ইমান রক্ষার তাগিদে। এর মূল চালিকাশক্তি গ্রিক দর্শন ছিল না, বরং কুরআনের শিক্ষা এবং প্রাথমিক যুগের মুসলিম ফিরকার মধ্যকার আদর্শিক মতভেদ ছিল এর মূল চালিকাশক্তি।

তবে ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ এই দাবিকে সমর্থন করে না। আব্বাসি খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে (১৭০–১৯৩ হিজরি) বাইতুল হিকমা প্রতিষ্ঠা এবং আরবি ভাষায় গ্রিক দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক গ্রন্থসমূহের অনুবাদ ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটা ইসলামি চিন্তাধারাকে নতুন এক বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই অনুবাদগুলো কেবল ইলমে কালামের যুক্তিপদ্ধতিকেই বদলে দেয়নি, বরং এর আদর্শিক অভিমুখকেও প্রভাবিত করেছিল। এই প্রক্রিয়ার ফলেই মুসলিম আলেমরা তাদের বিতর্কে গ্রিক দর্শনের মূলনীতিগুলো গ্রহণ করতে শুরু করেন এবং ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে বিমূর্ত ও যৌক্তিক আলোচনাগুলো উত্তরোত্তর প্রধান হয়ে ওঠে।

আল-কিন্দি (১৮৫–২৫৬ হিজরি)-কে ইসলামি দর্শনের আদি চিন্তাবিদদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি অ্যারিস্টটলীয় এবং নব্য-প্লেটোবাদী দর্শনের সাথে ইসলামি বিশ্বাসের সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছিলেন। তার রচিত ‘আল-ফালসাফা আল-উলা’ গ্রন্থে আল্লাহর অস্তিত্বের সপক্ষে এমন সব যুক্তি দেওয়া হয়েছে, যেখানে নব্য-প্লেটোবাদের ‘পরম সত্তা’ (Absolute One)-র ধারণার প্রভাব স্পষ্ট। এই প্রবণতা পরবর্তীকালে আল-ফারাবি (৩৩৯ হিজরি) এবং ইবনে সিনার (৪২৯ হিজরি) মতো দার্শনিকদের কাজে আরও প্রকট হয়ে ওঠে, যারা দার্শনিক মূলনীতির আলোকে ইসলামি বিশ্বাসগুলোকে উপস্থাপনের ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন।

আব্বাসি খিলাফতের আমলে, বিশেষ করে খলিফা আল-মামুনের শাসনামলে (১৯৮–২১৮ হিজরি), বাইতুল হিকমার মাধ্যমে গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞানের এক বিশাল অনুবাদ কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। এই অনুবাদ আন্দোলনের মাধ্যমেই অ্যারিস্টটল, প্লেটো, গ্যালেন এবং টলেমির মতো প্রথিতযশা গ্রিক চিন্তাবিদদের গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কাজগুলো আরবি ভাষায় অনূদিত হয়। হানাইন ইবনে ইসহাক (২৬০ হিজরি), ইয়াহিয়া ইবনে আদি (৩৬৩ হিজরি) এবং আবু বিশর মাত্তা ইবনে ইউনুসের (৩২৯ হিজরি) মতো অনুবাদকগণ গ্রিক দর্শনকে ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সাথে একীভূত করেন। এর ফলে পরবর্তী সময়ে ইলমে কালামের আলোচনাগুলো সম্পূর্ণ নতুন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো লাভ করে।

গ্রিক দর্শনে সুপণ্ডিত নেস্টোরিয়ান খ্রিষ্টীয় চিন্তাবিদগণ ইসলামি খিলাফতের বিভিন্ন কর্মতৎপরতায় যুক্ত হয়ে গ্রিক দর্শনকে আরবিতে রূপান্তর করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। একই সময়ে জ্যাকোবাইটরা নব্য-প্লেটোবাদী ধারণাগুলো প্রচার করতে শুরু করে; অন্যদিকে জরথুস্ট্রীয় পণ্ডিতরা ইসলামি তাকদির বা নিয়তিবাদের বিপরীতে তাদের নিজস্ব ‘আলো ও অন্ধকার’-এর দর্শন উপস্থাপন করেন।

এসব আদর্শিক চ্যালেঞ্জ মুকাবিলায় ইলমে কালামের পণ্ডিতরা গ্রিক দর্শনের মূলনীতিগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন। কারণ খ্রিষ্টীয় ও জরথুস্ট্রীয় দার্শনিকদের সাথে বিতর্কের ক্ষেত্রে কেবল প্রথাগত বা গতানুগতিক যুক্তি তখন যথেষ্ট ছিল না। গ্রিক দর্শনের এই যৌক্তিক ও যুক্তিবাদী পদ্ধতি মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিকদের এমন এক মজবুত তাত্ত্বিক ভিত্তি দান করে, যার সাহায্যে তারা নিজ নিজ বিশ্বাসকে আরও জোরালোভাবে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। এভাবেই ইসলামি ধর্মতত্ত্বের প্রধান প্রধান ধারা — যেমন মুতাজিলা, আশআরি এবং মাতুরিদিদের মতাদর্শে গ্রিক দর্শনের প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

উদাহরণস্বরূপ, মুতাজিলা সম্প্রদায় মানুষের স্বাধীন কর্ম ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিল, যা অ্যারিস্টটলের ‘কার্যকারণ শৃঙ্খল’ (causal chain) নীতির বেশ কাছাকাছি। তাদের মতামত ছিল — মানুষ নিজেই তার কর্মের স্রষ্টা এবং সেই কর্মের পরিণামের জন্য সে নিজেই দায়ী। এই তত্ত্বটি কেবল খ্রিষ্টীয় ও জরথুস্ট্রীয় চ্যালেঞ্জেরই জবাব দেয়নি, বরং ইসলামি দার্শনিক ঐতিহ্যের সপক্ষে এক ধরনের যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরিরও প্রয়াস চালিয়েছিল। এর ফলে গ্রিক দর্শনের মূলনীতিগুলো মুসলিম পণ্ডিতদের ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তিপদ্ধতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়, যা তাদের জন্য একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং দার্শনিক আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

একইভাবে, তাদের তাওহিদের ধারণায় নব্য-প্লেটোবাদের ‘পরম এক’ (Absolute One)-এর প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। আশআরিদের মতে, আল্লাহর গুণাবলি তাঁর মূল সত্তা থেকে পৃথক নয়; বরং এগুলো কোনো বিশেষ ধরণ বা প্রকৃতি (modality) ছাড়াই বিদ্যমান — যা অ্যারিস্টটলের ‘সত্তা ও উপনিহিত গুণ’ (Substance and Accidents) দর্শনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। অন্যদিকে, মাতুরিদিরা নিয়তিবাদ ও স্বাধীন ইচ্ছার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন, যা মূলত নব্য-প্লেটোবাদের ‘নির্গমন নীতি’ বা ‘ইমানেশন’ (Emanation)-এরই অনুরূপ।

সুতরাং যারা বলেন, ইমাম আশআরি, ইমাম মাতুরিদি এবং আবু হাশিম আল-জুব্বাই গ্রিক দর্শনের আরবি অনুবাদ আরব দেশে ছড়িয়ে পড়ার আগেই ইসলামি ধর্মতত্ত্বের এসব আলোচনার ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, তাদের এই ধারণা মোটেও সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, এই ধর্মতাত্ত্ববিদগণ তখনই জ্ঞানচর্চার অঙ্গনে সক্রিয় হয়েছিলেন, যখন গ্রিক দর্শনের অনুবাদ সম্পন্ন হয়ে তা ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সাথে পুরোপুরি মিশে গিয়েছিল। তাদের ব্যবহৃত যুক্তিপদ্ধতি, যৌক্তিক কাঠামো এবং বিমূর্ত প্রকাশভঙ্গি একথাই প্রমাণ করে যে, তাদের চিন্তাধারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গ্রিক যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। সুতরাং, এটাই অধিক যুক্তিযুক্ত যে, এই বিষয়গুলো যদিও প্রাথমিকভাবে ইসলামি শাস্ত্র এবং অভ্যন্তরীণ ফেরকাগত দ্বন্দ্ব থেকে উৎসারিত হয়েছিল, কিন্তু সেগুলোর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে বিদেশি দর্শনের প্রভাব ছিল অত্যন্ত প্রকট।

মুতাজিলা মতাদর্শের অনুসারী আবু হাশিম আল-জুব্বাই (৩২১ হিজরি) আব্বাসি খিলাফতের সেই স্বর্ণযুগে বসবাস করতেন, যখন বাইতুল হিকমার অনুবাদ আন্দোলন ছিল মধ্যগগনে — অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরি শেষভাগ থেকে তৃতীয় হিজরি মাঝামাঝি পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যেই দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ গ্রিক গ্রন্থগুলো আরবিতে অনূদিত হয়েছে। আবু হাশিমের পিতা আবু আলি আল-জুব্বাইও (৩০৩ হিজরি) এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন, যেখানে গ্রিক দর্শনের সাথে ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তাধারার সমন্বয় সাধনের নিরন্তর প্রচেষ্টা চলছিল।

একইভাবে, ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরি (২৬০–৩২৪ হিজরি), যিনি শুরুতে মুতাজিলা ছিলেন, পরবর্তীকালে সুন্নি আকিদা রক্ষার তাগিদে অনন্য এক ধর্মতাত্ত্বিক পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। তার বুদ্ধিবৃত্তিক পটভূমি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং অবরোহী যুক্তিপদ্ধতি (deductive reasoning) একথাই প্রমাণ করে যে, তিনিও গ্রিক প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না। যদিও তিনি মুতাজিলাদের কিছু সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করতেন, কিন্তু তার উপস্থাপিত যুক্তিপ্রক্রিয়া ছিল সেই যৌক্তিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা গ্রিক দর্শনের মাধ্যমেই ইসলামি চিন্তাধারায় প্রবেশ করেছিল।

ইমাম মাতুরিদি (৩৩৩ হিজরি) ছিলেন ইমাম আশআরির সমসাময়িক। তিনি নিজে প্রথাগত অর্থে কোনো দার্শনিক না হলেও তার ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাগুলোতে যুক্তি ও তর্কের প্রাধান্য স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তার যুক্তিপদ্ধতিতে যে ধরনের বিমূর্ত ধারণা, জটিল আলোচনা এবং সূক্ষ্ম যৌক্তিক বিতর্কের উপস্থিতি দেখা যায়, তা এটাই নির্দেশ করে যে, তার সময়কার পাণ্ডিত্যপূর্ণ পরিবেশ গ্রিক যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের প্রভাব থেকে মোটেও মুক্ত ছিল না।

তবে আল্লাহর গুণাবলি, নিয়তিবাদ ও স্বাধীন ইচ্ছা কিংবা ইমান ও আমলের মতো বিষয়গুলো ইসলামি শাস্ত্রের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকালেই অভ্যন্তরীণভাবে উৎসারিত হয়েছিল। এমনকি সাহাবি ও তাবেয়িদের যুগেও এসব বিষয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ধর্মতাত্ত্ববিদগণ যেভাবে একটি যৌক্তিক, বিমূর্ত ও তর্কমূলক পদ্ধতিতে এসব প্রশ্নের অবতারণা করেছেন, গ্রিক যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের অনুপ্রবেশ ছাড়া তা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা — যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘সিলজিজম’ (Syllogism) বা অনুমিতি, তা ইলমে কালামের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। এটা ধর্মীয় চিন্তাধারাকে তার সহজাত প্রকৃতি ও শাস্ত্রীয় রূপ থেকে সরিয়ে এক বিমূর্ত ও দার্শনিক ছাঁচে ফেলে দিয়েছে।

তাই কেবল সময়ের পরম্পরা বা কালানুক্রমিক ধারাবাহিকতার দোহাই দিয়ে কোনো ধর্মতাত্ত্ববিদকে গ্রিক প্রভাবমুক্ত মনে করা মোটেও সঠিক নয়। বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব কেবল সময়ের ক্রমানুসারে দৃশ্যমান হয় না; বরং তা ফুটে ওঠে চিন্তার গভীরে এবং যুক্তি প্রদানের ধরণে। আর এই ধর্মতাত্ত্ববিদগণ যখন জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্কে সক্রিয় ছিলেন, ততদিনে গ্রিক দর্শন ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের মেজাজ, ভাষা এবং পদ্ধতির সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে গিয়েছিল।

যদিও তারা প্রায়শই গ্রিক দর্শনের কঠোর সমালোচনা করতেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের যুক্তিপ্রক্রিয়া, দার্শনিক আলোচনা এবং তর্কের ভিত্তি বহুলাংশেই ছিল গ্রিক দর্শনের মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইমাম গাজালি (৫০৫ হিজরি) তার ‘তাহাফুতুল ফালাসিফা’ গ্রন্থে দর্শনের তীব্র সমালোচনা করলেও তার নিজের যুক্তিপদ্ধতিতে গ্রিক যুক্তিবিদ্যার প্রভাব ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। একইভাবে ইমাম রাজিও (৬০৬ হিজরি) দর্শনের মূলনীতির আলোকেই ইসলামি বিশ্বাসকে প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন।

এই সমস্ত তথ্যপ্রমাণ আল্লামা ইকবাল, শিবলি নুমানি এবং জাভেদ আহমেদ গামিদি-র সেই অবস্থানকেই সমর্থন করে যে, ইলমে কালাম নিছক কোনো অভ্যন্তরীণ ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক আন্দোলন ছিল না; বরং এর গঠন ও বিকাশে গ্রিক দর্শনের মূলনীতি ও প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মতাত্ত্ববিদগণ দার্শনিক পরিভাষা ও আলোচনা গ্রহণ করে ধর্মীয় চিন্তাধারাকে এমন এক তাত্ত্বিক রূপ দিয়েছিলেন, যা সহজ, স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত উপলব্ধির পরিবর্তে মূলত বিমূর্ত ও যৌক্তিক বিতর্কে পর্যবসিত হয়েছিল। আর এভাবেই ইসলামের মূল বাণীর ওপর দর্শনের জটিল আবরণ তৈরি হয়েছিল।

মুহাম্মদ হাসান ইলিয়াস
অনুবাদ: মোহাম্মদ সিয়াম হোসেন

Address

Matikata
1206

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Al-Manar Institute posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Place Of Worship

Send a message to Al-Manar Institute:

Shortcuts

Share