07/08/2026
জীবন ও জীবনেশ্বরের মিলন
সাধক দুই মহামানব
---------------রবীন্দ্রনাথ ও শ্রীশ্রীঠাকুর-------------
লেখক: ডঃ দুর্গাশঙ্কর মুখোপাধ্যায়
এম-এ, পি.এইচ.ডি. (কলকাতা)
প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
-------------------------------------------------------------------
আলোচনার শুরুতেই আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের জীবনে গুরুকরণ বলতে আমরা যা বুঝি, তা হয়নি। তবুও তার প্রতি শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের এমন এক আশ্চর্য অন্তরের টান ছিল। দুজনের মধ্যে ছিল কতো বিষয়েই না মিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ হলেও দুজনের আবির্ভাব উনিশ শতকেই। একজনের ষাটের দশকে ও আর একজনের আটের দশকে। দুজনেই ৮০ বৎসর মাত্র মর্ত্যধামে ছিলেন। দুজনেই ছিলেন অভাবনীয় মানবপ্রেমিক— কোনো দেশকালেই তাদের চিন্তা ভাবনাকে সীমিত করা চলে না। দুজনেই বিশ্বপ্রেমিক— সারা বিশ্বের মানব ভাবনায় তাঁরা আকুল। দুজনেই গড়ে ছিলেন আশ্রম, দুজনেরই আশ্রমের নানা স্থানের নানা বিভাগের মধুর-সুন্দর সব নাম— একজনের নামে রোমান্টিক আবেগ ও আবেশ ও অন্যজনের নামে ক্ল্যাসিক্যাল রং ও মাধুর্য। দুজনেরই আমাদের প্রাচীন ভারতের কৃষ্টির প্রতি, তপোবন-আদর্শের প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা। দুজনেই প্রকৃতি প্রেমিক ও মহাকবি। দুই মহামানবই দিব্যতনুর অধিকারী, দুজনের একজন পিতার নিকট, অন্যজন মাতার নিকট দীক্ষিত— একজন তাঁর মায়ের কথা বলতে উচ্ছ্বসিত, অন্যজন স্বল্পবাক্— এইরূপ অনেক আছে।
এখন অবশ্য সে বিষয়ে কিছু বলতে চাইনে। এই সামান্য আলোচনায় যা বলতে চাইছি, উপরে কিছু তার আভাস দিয়েছি। অর্থাৎ সারা জীবনব্যাপী মানুষ গড়ার কাজে ব্যাপৃত শ্রীশ্রীঠাকুর নানা ভক্তদের সঙ্গে নানা আলোচনায়, তাঁদের অজস্র প্রশ্নের সমাধান দিতে গিয়ে মাঝে মাঝে ঠাকুর রবীন্দ্র প্রসঙ্গ এনেছেন। তাঁর কোনো গান বা কবিতার পংক্তি বারবার মনে পড়েছে ঠাকুরের এবং তখনই তিনি তার উল্লেখ করেছেন। আমি শুধু ‘আলোচনা প্রসঙ্গে’ গ্রন্থে ও অন্য দু’একটি স্থানে রবীন্দ্র-বিষয়ক ঠাকুরের মন্তব্য উল্লেখ করছি।
২৪/১২/৪৫ তারিখের ঘটনা। ঠাকুর সন্ধ্যার সময় মাতৃমন্দিরের বারান্দায় উপবিষ্ট। স্পেন্সারদা, কেষ্টদা (কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য), শরৎদা (হালদার), বীরেনদা (মিত্র), রবিদা (বন্দ্যোপাধ্যায়) প্রভৃতিও উপস্থিত আছেন। অনেকরকম কথা হচ্ছিল। ঠাকুর বললেন, দেশের জ্ঞানী-গুণীদের নিয়ে এসে এখানে একটা University স্থাপনের তাঁর প্রবল ইচ্ছে। “একটা কুশাঙ্কুর পায়ে বেঁধায় চাণক্য ক্ষেত শুদ্ধ কুশ উপড়ে ফেলেছিলেন। সৎকাজে ঐ রকম একরোখা হতে হয়। ক্ষুদ্র সাধ জলাঞ্জলি দিতে হয়।” (আলোচনা প্রসঙ্গে ষষ্ঠ খণ্ড, পৃ:- ১৯৫)। এ-কথার পরেই রবীন্দ্রনাথের গানটি ধরলেন— “তুমি ডাক দিয়েছ কোন্ সকালে কেউ তা জানে না।” এরপর থেমে, তিনি বললেন, “তিনি তো ডাকেন, অনেক ডাকেন— আয় আয়।” (ঐষষ্ঠ খণ্ড)।
এ-সময়, ঠাকুরের কণ্ঠস্বর ব্যথায় ভরা। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যে ভাব পরিবর্তন করে ঠাকুর বললেন— “কিন্তু প্রবৃত্তি কয়, কোথায় যাবি? আয় আমার কাছে ঢাকার অমৃত খাওবনে।” (ঐ ঐ)।
যথার্থ প্রেমিক ভক্তকে কোন সকালে ঈশ্বর ডাকেন, তা অন্য কেউ জানে না। ঐ ডাক শুনে ভক্তের সমস্ত প্রাণ আকুপাঁকু করে ওঠে, সে ঘরে স্থির থাকতেই পাবে না। ‘স্বরবিতান’ এবং ‘পূজা’ পর্যায়ের ঐ গানটিতে রবীন্দ্র বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ঠাকুর যথার্থ ইস্টনিষ্ঠ ভক্তদের ডাক দিয়ে বাঁচা-বাড়ার পথে কেমন নিয়োগ করেন— সে কথাই বলেছেন।
বিবেকানন্দের মতো শ্রীশ্রীঠাকুরের মুখেও শোনা যায় কয়েকজন মাত্র খাঁটি মানুষদের দ্বারা কী অসাধ্য-সাধন করা যায়, কীরকম ভাবে আমাদের এই অবহেলিত পরাধীন ভারত ভূমি ‘দেব ভূমি হয়ে উঠতে পারে’। আর সেই যথার্থ ও খাঁটি মানুষ হয়ে উঠেছে যাাঁরা তাঁদেরই তো ডাক আকাশে বাতাসে, পথে-পথে। সেই ডাক শুনে সেই বাঁশির মধুর স্বর শুনে শ্রীরাধার ঘরের রান্না করতে গিয়ে সব গোল হয়ে যায়। ছুটে আসবার জন্য তাঁর প্রাণ আকুলি-বিকুলি করে।
সেই ডাক শুনে সকলে যদি না আসে তাতে ক্ষতি কি? ‘তোর ডাক শুনে যদি কেউ না আসে’— তবে একলাই যে চলতে হবে। সে ডাকে সাড়া দিতে গেলে, প্রিয় সংসার, আদরের সব জিনিস, সব সঞ্চয়কে ফেলেই যে চলতে হবে। ৩০শে চৈত্র শুক্রবার ইংরেজি ১৯৪৫ সালের ১৩ই এপ্রিলের কথা। ২৮তম ঋত্বিক অধিবেশন চলছে— শ্রীশ্রীঠাকুর তখন বাবলাতলায় আশ্রম প্রাঙ্গণে বসে আছেন। বহু ভক্তের ভিড়। নানারকম প্রশ্ন করে চলেছে বহু ভক্তজন। হাসিমুখে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। কাউকে ডায়াবেটিস্ রোগের ওষুধ বাতলে দিচ্ছেন, কাউকে তার বাবার ইচ্ছানুযায়ী তাদের গ্রামে জলের জন্য পুকুর কাটতে বলছেন (জলাশয় প্রতিষ্ঠা), কাউকে বোঝাচ্ছেন তিনি ইষ্টভৃতির সঙ্গে ভ্রাতৃভোজ্য ও ভূতভোজ্য ইত্যাদি করলে কীভাবে পারস্পরিকতা religiously গজিয়ে ওঠে। এরপর খেয়ে এসে মাতৃমন্দিরের মাঝের ঘরে চৌকিতে বিছানায় এসে বসেই ডাকলেন ভক্ত রবি বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাঁর কাছে থেকে ঋত্বিক সম্মেলনের খবর নিয়ে হঠাৎ এক অদ্ভুত কাজ করলেন— ডান হাতখানি বাড়িয়ে দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গীতে তিনি বলে উঠলেন— “আমি মানুষ খুঁজি আমায় একটা মানুষ দেবে?” এখানে “একটা মানুষ” এই শব্দ দুটি লক্ষ্য করতে বলি। অর্থাৎ একটি মানুষের জন্য শ্রীশ্রীঠাকুরের কী আকৃতি! এ অবস্থায় তাঁর যে মানসিক অবস্থা— তা বুঝতে গেলে এই সময়ের ঘটনার আরো একটু অনুসরণ করা প্রয়োজন।
দেখা গেল, ঐ মানুষ চেয়েই সকলের সামনে, শ্রীশ্রীঠাকুর রবীন্দ্রনাথের একটি প্রসিদ্ধ কবিতা— ‘হে বিরাট নদীর’ খানিকটা অংশ আপনমনে আবৃত্তির সুরে বলতে লাগলেন—
“তীরের সঞ্চয় তোর পড়ে থাক তীরে,
তাকাসনে ফিরে।
সম্মুখের বাণী
নিক তোরে টানি
মহাস্রোতে
পশ্চাতে কোলাহল হ'তে
অতল আধারে অকূল আলোতে।”
এরপরই শ্রীশ্রীঠাকুর কালীদাসী-মা কে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থ আনতে বললেন। সে ঐ বই ও চশমাটি তাঁর হাতে দিল। তখন অনুপম ভঙ্গীতে ঠাকুর উপরের উদ্ধৃত অংশটি আবৃত্তি করলেন কয়েকবার। তারপর এর ব্যাখ্যা করলেন— “কি ছাই, তুচ্ছ অতি ক্ষুদ্র স্বার্থ আমাদের কত বড় বৃহৎ জীবন থেকে বঞ্চিত করে রাখে। তাই ‘তীরের সঞ্চয় তোর পড়ে থাক তীরে, তাকাস্ নে ফিরে’। এক মুহূর্তে ঝেড়ে কেটে দাঁড়াতে হয়। পিছনে তাকাতে গেলে, সেই কৌপীনকাওয়াস্তেই— সাধুর মত একের পর এক জড়িয়ে যেতে হয়, সম্মুখে এগোন আর হয় না। একটু একটু থেমে আবার হাসতে হাসতে গান ধরলেন— 'মন, ছাড় যদি দাগাবাজি, পেলেও কৃষ্ণ পেতে পার'। কয়েকবার গাওয়ার পর হাত ঘুরিয়ে তেহাই দিয়ে বললেন- “মন ছাড় যদি...’”
এরপর উপস্থিত মানুষেরা নিজেদের অপদার্থ ভেবে যখন হতাশ হয়ে পড়েছেন, তখন তিনি তাদের আশ্বাস দিয়ে বললেন— ঈশ্বরকে কখনো ভুলো না। তিনি সামান্য যা কিছু দেন, তারই ঠেলা সামলানো যায় না। অথচ ভক্তেরা হলেন ‘চিরদীপ্ত রোশনির আতসবাজি’। এদের আলো এক মুহূর্তে কোটি বৎসরের অন্ধকার দূর করে দেবে’। তাই ভক্তদের পরমপিতার কাছে ভাবটা হবে এইরূপ— “আমি কিছু চাই না, আমি চাই তোমাকে। কেবল তোমাকেই আমি চাই।” (আলোচনা প্রসঙ্গে, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃ: ৬৯-৭০)।
রবীন্দ্রনাথ এই মর্ত্যধাম থেকে চলে যাবার প্রায় চার বছর পরে ১৯৪৫-এ এক ঋত্বিক সম্মেলনে শ্রীশ্রীঠাকুর সেই যে নববর্ষের সময় ভক্তদের সামনে নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করেছিলেন, তারপর থেকে বেশ কয়েক মাস রবীন্দ্রনাথের কথা শ্রীশ্রীঠাকুর প্রায়ই আলোচনার সূত্রে নিয়ে আসতেন। তাঁর এই সকল রবীন্দ্র প্রসঙ্গ আমরা ‘আলোচনা প্রসঙ্গে’ গ্রন্থের চতুর্থ খণ্ডেই পেয়ে থাকি। একবার তিনি আমাদের দেশে ঠিকমতো বিবাহ হচ্ছে না, দেশে সুসন্তান জন্মাচ্ছে না একথা বলে আক্ষেপ করেছিলেন। আর সেই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের কথা নিয়ে এসে বললেন, ৪/৮/৪৫ তারিখে কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্যের অর্থাৎ কেষ্টদার একটি প্রশ্নের উত্তরে— “...একজন রবীন্দ্রনাথের তিরোধান হয়েছে, কিন্তু সেই ধরনের বা তার কাছাকাছি প্রতিভা কি দেশে আর একটা দেখা যাচ্ছে? এই সমস্যা সমাধানের জন্য আদর্শ সবর্ণ ও অনুলোম বিয়ের প্রবর্তন করতে হবে।”
‘স্ত্রীরত্নং দুষ্কুলাদপি’- অনুলোমের support (সমর্থন) সর্বত্র। বীজেরই গাছ, মাটির গাছ নয়— বীজের আনুপাতিক মাটি তৈরী করা এই পর্যন্ত’। কাঁঠালের বীচি থেকে আম গাছ হয় না। অনুলোম হতে গেলেও প্রথমে বিধিমাফিক সবর্ণে সমান ঘরে বিয়ে হওয়া দরকার, নইলে বংশের মূল ধারা ও বীজ ঠিক থাকে না। সদৃশ ঘরে উপযুক্ত বিয়ের ফলে সাধারণতঃ সন্তানের প্রকৃতি হয় সাম্যসংহতি (balanced)। অনুলোমে সন্তান হয় ঝাঁঝালো। যেমন ছিলেন ব্যাস, বশিষ্ঠ, বিদুর, নারদ। তবে বেশী (difference) (পার্থক্য) খারাপ। ফলকথা, newer blood (নতুন রক্ত) সব সময় প্রয়োজন, নচেৎ মানুষগুলি ধীরে ধীরে হয় dwarf (খর্বাকৃতি), dull (মূঢ়), Weak in
body and mind (শরীর-মনে দুর্বল) হয়ে যাবে।” (আঃ প্রঃ- ষষ্ঠ খণ্ড, পৃ: ৯৯-১০০)।
সুদীর্ঘ সময়ে নানা ব্যাপারে ভক্তদের সঙ্গে কথায় তাঁদের বিভিন্নরকম প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুর রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা থেকে দৃষ্টান্ত দিয়ে স্বয়ং তা গেয়ে উঠেছেন বা আবৃত্তি করেছেন। ‘আলোচনা প্রসঙ্গে ষষ্ঠ খণ্ড গ্রন্থের বিষয়গুলি যখন প্রফুল্ল (প্রফুল্লকুমার দাস) শ্রীশ্রীঠাকুরের মুখ থেকে শুনে লিখে রাখছিলেন, তখন একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ‘রবীন্দ্র-ভাবনা’ তাঁকে বেশ আকৃষ্ট করেছিল। নিজ চিন্তার সঙ্গে তাঁর চিন্তার যেখানেই তিনি মিল লক্ষ্য করছিলেন, তখনই আনন্দের সঙ্গে উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি তা ব্যক্ত না করে পারেননি। ১৯৪৪ এর ৩০শে নভেম্বর থেকে ১৯৪৫-এর ২৬শে ডিসেম্বর পর্যন্ত কালের কথোপকথন উক্ত গ্রন্থের ষষ্ঠ খণ্ডে মিলবে।
এই খণ্ডের ৩৭ পৃষ্ঠায় কেষ্টদা (কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য অসাধারণ গুণী ও ঠাকুরের অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন ভক্ত) অনেকক্ষণ ঠাকুরের সঙ্গ করার পর, একটুখানি বাইরে থেকে ঘুরে আসতে চাইলেন কে একজন তাঁর কাছে আসবে বলে। এ-কথা ঠাকুর শুনে সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে বললেন, “তাহলে আসেন। আপনি তো এখনই ঘুরে আসবেন। কিন্তু কেউ দূরে যাওয়ার সময় মনে হয়, পথ আগলে বলি, ‘যেতে নাহি দেব’। (বলে একটু ম্লান হাসি হাসলেন)।” বলা বাহুল্য রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থটিতে তাঁর অতিশয় প্রসিদ্ধ এই ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতাটি আছে। এ-কবিতায় পুজোর ছুটির পর একটি ছোট্ট মেয়ে তার বাবাকে চাকুরীর জন্য দূরে চলে যাওয়ার কথা শুনে ‘যেতে নাহি দেব’ কথাটি বলেছিল। এই কথাগুলি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঐ কবিতায় সারা বিশ্বজুড়ে যে ঐ ‘যেতে নাহি দেব’ কথার মধ্যে একটা কান্না শুনেছেন, তা আমাদের বিহ্বল করে দেয়— কারণ, যেতে নাহি দেব’ বললে তো চলে না—। তবু যেতে দিতে হয়। ঠাকুরের মনে নিশ্চয়ই তখন রবীন্দ্রনাথের উক্ত কবিতার মূল ভাব জেগে উঠেছিল— তাই তিনি কেষ্টদার কিছুক্ষণের জন্য যাওয়াকে কেন্দ্র করে সে-কথা উচ্চারণ করেছেন বলে ম্লান হাসি একটুখানি তাঁর মুখে দেখা দিয়েছে।
আবার উক্ত গ্রন্থের ষষ্ঠ খণ্ডের ১৫ পৃষ্ঠায় শ্রীশ্রীঠাকুর ৩/১২/৪৪ তারিখে মাতৃ মন্দিরের পিছন দিকে বকুল গাছটির পাশে একখানি বেঞ্চে বসে আছেন। অনেক ভক্তেরা এমনকি অনেক মায়েরাও উপস্থিত আছেন। এমন সময় সেখানে সেরপুরের খগেন ভাই (মালাকর) এলেন। তিনি সেরপুর ও তার কাছাকাছি অঞ্চলের সৎসঙ্গীরা নির্জীব হয়ে পড়েছেন শুনে ঠাকুর তাকে আশ্বস্ত করলেন। তিনি জানালেন যে তার চারদিকে ‘সাড়াশীল’ অনেক লোক আছেন। ঠাকুর তাকে নানাভাবে নানা উদাহরণ দিয়ে কীভাবে কাজ করতে হবে তা বলে উদ্দীপ্ত করলেন।
তিনি উদাহরণ দিয়ে চাণক্যের মতো স্বগতোক্তি করে নিজেকে চাঙ্গা করতে বললেন। “কখনও চাউনিতে, কখনও কথায় কখনও গানে, কখনও ভঙ্গীতে, আলাপে, আপ্যায়নে, ব্যবহারে নিজের ও পারিপার্শ্বিকের মনে তুফান তুলে” দিতে হবে। আর তখন ঠাকুর জানালেন যে গগন ভাই তোমাকে দেখে “তোমার ডগমগ, ফুল্ল, মাতোয়ারা ভাব, চেতন, দীপ্ত দরদ দেখেই মানুষ তখন ভাববে— ‘এ কী দেবতা/না মানুষ’। মনে জাগবে— “দেখে যেন মনে হয়, — চিনি উহারে”। (আলোচনা প্রসঙ্গে ষষ্ঠ খণ্ড, পৃ: ১৫)
এখানে ‘দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে’— উক্তিটি রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের ‘সোনার তরী’ নামক কবিতার। কবিতাটির বক্তব্য নিয়ে একদা এই বঙ্গদেশে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল এবং রবীন্দ্রনাথকে অনেকেই সেদিন কটাক্ষ করেছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলাল সেদিন এ-কবিতার একটি প্যারডি রচনা করেও সেদিন কবিকে আক্রমণ করেছিলেন। কবিতাটির মূল কথা হল রবীন্দ্রনাথ এই পৃথিবীতে এসে কবি বা সাহিত্যিক জীবনে বহু কবিতার ফসল ফলিয়েছেন। সেগুলি এখন মহাকালের হাতে সমর্পণ করতে চান। তাই একদিন সব ফসল তুলে নদীর তীরে অপেক্ষা করেছিলেন কবে তাঁর সেই ফসলগুলি নিতে তাঁর দেবতা আসবেন। এমন সময় দূরে তিনি দেখতে পেলেন—
‘গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে, পারে? দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।’ তিনি এলেন, ফসলগুলি কবি তাঁর সোনার তরীতে তুলেও দিলেন, কিন্তু সেই মহাকাল তাঁর তরীতে কবিকে নিলেন না। কবি শূন্য নদীর তীরে একাকী পড়ে রইলেন। তখন তো কবির কতইবা বয়স। এখন তাঁকে আরো প্রচুর ফসল ফলানোর জন্য তিনি কবিকে রেখে গেলেন। ঠাকুর অনুকুলচন্দ্র এখানে হতাশাগ্রস্ত মানুষকে উদ্দীপিত ও কর্মে নতুন করে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য সাহসী ও বীর্যদীপ্ত হতে বলেছেন এবং যেন তারা তাঁর রূপ দেখে মনে করবে বোধ হয় সে কোন দেবতা— অথচ তাঁকে চেনা চেনাও মনে হবে— রবীন্দ্রনাথের চিরচেনা রুদ্ররূপী ‘মহাকাল’-এর মতো। এইভাবে রবীন্দ্র উক্তির আলোকে নিজ উক্তিকে ঠাকুর আলোকিত করে নিয়েছেন। মনে রাখতে হবে এই খগেন ভাই ছিলেন খুব ভালো একজন বক্তা এবং অত্যন্ত নৈষ্ঠিক কর্মী। ঠাকুর তা জানতেন। তাই তাকে সেদিন বলেছিলেন, “যে বংশে জন্মেছ, তাদের খাজনাটা দিয়ে বাদ বাকী দিয়ে তুমি তোমার মাতলামি নেশা চালাও, হাফিজের মত ইষ্টটানের সুরায় পাগল হও, মাতাল সাজো দেখবে, জীবনটা উপভোগ করতে পারবে, ধর্ম, অর্থ, কাম-মোক্ষ, দাসী হয়ে তোমার সেবা করবে।” (আ: প্র:; ষষ্ঠ খণ্ড)
শ্রীশ্রীঠাকুরের বিশাল আলোচনার জগতে রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ যে কতবার কতভাবে এসেছে, তা বলে শেষ করা যায় না। তাই আর কিছু দৃষ্টান্ত ঐ ষষ্ঠ খণ্ড থেকেই উদ্ধৃত করব। রবিঠাকুরের আর একটি কবিতা ‘গুরু গোবিন্দ’— শ্রীশ্রীঠাকুরের অত্যন্ত প্রিয় ছিল। সেই কবিতায় ‘গুরু গোবিন্দ’ যিনি শিখদের অত্যন্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় গুরু, তিনি দীর্ঘকাল লোকচক্ষুর অন্তরালে নির্জনে তপস্যা করে নিজেকে একটি সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব গ্রহণের উপযোগী করে নিয়েছিলেন। পরে তিনি লোকজনদের সামনে আত্মপ্রকাশ করে তাঁদের গুরু হওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এই গুরু শিখদের সম্বোধন করে বলেছেন—
“আমার জীবনে লভিয়া জীবন
জাগো রে সকল দেশ।।”
গুরু গোবিন্দের জীবনাদর্শে উদ্বুদ্ধ হতে বলেছিলেন সেদিন শিখদের। শ্রীশ্রীঠাকুর শুধুমাত্র শিখদেরই নয়, সকল দেশবাসীকে এমনকি বিশ্ববাসীকেই ডাক দিয়েছেন ইষ্টের দিকে তাকিয়ে বিশ্ববাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে। বারবার নানা প্রসঙ্গে এ কবিতার কিছু পংক্তি ঠাকুর আবৃত্তি করেছেন। তিনি মনে করতেন গুরু গোবিন্দের মতো আদর্শ গুরুর দিকে চেয়ে যেমন অগণিত শিষ্য
বীর্যবত্তা ও কর্মপ্রেরণা পেয়েছেন, ঠাকুরের আদর্শ অনুসরণ করে সেই প্রেরণা শক্তি ও সাহস লাভ করে মানুষ যেন অসাধ্য সাধন করতে পারে।
“স্থির থাকো তুমি, থাক তুমি জাগি
প্রদীপের মত আলস তেযাগি
এ নিশীথ মাঝে তুমি ঘুমাইলে
ফিরিয়া যাইবে তারা’।”
গুরুর কাছ থেকে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে তো এই শিক্ষাই নিতে হবে। (ষষ্ঠ খণ্ড, আলোচনা প্রসঙ্গে, ৪৯ পৃ:)। এ-কবিতার কথা পরে আবার উল্লেখ করতে হবে।
আর একটি স্থানের উল্লেখ করছি। প্রফুল্ল দাস সংকলিত ‘আলোচনা প্রসঙ্গে’ গ্রন্থের চতুর্থ খণ্ডেও বিভিন্ন স্থানে শ্রীশ্রীঠাকুরের রবীন্দ্র প্রীতি লক্ষ্য করা যায়। একবার ইং-২২/১০/৪২ তারিখে বসন্তদার (পুততুণ্ড) সঙ্গে ঠাকুরের কথা হচ্ছিল। তিনি ইষ্ট সম্পর্কে কথা বলছিলেন। ‘...অকৃত্রিম নিঃস্বার্থ ভালবাসার রাজ্যে দাঁড়িয়ে যখন মানুষ, তখন সে সসীম হয়েও অসীম। একেই বলে মায়ার পারে যাওয়া।’ রবীন্দ্রকাব্যে আছে,—
“সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর
আমার মাঝে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর।”
চুনীলাল রায়চৌধুরী এলে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন গীতাঞ্জলির এ গানের পরের লাইনগুলি মনে আছে কিনা। তাঁর স্মরণে না থাকায় ‘গীতাঞ্জলি’ নিয়ে এসে তাঁকে পুরো গানটি শোনানো হল। এই সুন্দর কথাগুলি সম্পর্কে ঠাকুর বললেন, “বোধ না থাকলে এমনতর লেখা বেরোয় না। তাঁর যে আলো সে আলো অখণ্ড আধার বা ছায়া দিয়ে বারিত হয় না বা ব্যাহত হয় না।”
এমন অনেক স্থলেই ঠাকুরের আলো লক্ষ্য করব তাঁর কথায়।
৭/১২/৪৫ তারিখের (আলোচনা প্রসঙ্গে ষষ্ঠ খণ্ড) ভক্ত উপবিষ্ট হিমাইতপুর আশ্রমে। নানা কথার মধ্যে কেষ্টদা (কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য) বললেন যে রামকৃষ্ণদেব একদা বলেছিলেন গয়ায় গেলে তাঁর দেহ থাকবে না— এ কথার মানে কি? তখন শ্রীশ্রীঠাকুর জানান— ওখানে গেলে হয়তো বিষ্ণুবোধের এত প্রবল উদ্দীপনা হতো যে সত্তাটা তাতে merge করে (ডুবে) যেত। আমার পুরী যাওয়ার আগে মনে হত ওখানে গেলে অজ্ঞান হয়ে যাব। ছোট আমিসটা কোথায় যেন হারিয়ে যাবে।”
—এখানে শেষোক্ত বাক্যটি রবীন্দ্রনাথেরই অত্যন্ত প্রিয় ছিল। তিনি প্রায়ই মানুষের মধ্যে দুই আমি— ‘ছোট আমি’ ও বড় আমির কথা বলতেন। (ঐ পৃ: ১৫৭)।
৮/৫/১৯৪৮ তারিখে দেওঘরে কেষ্টদা প্রমুখ কয়েকজন বিশিষ্ট ভক্তদের সামনে শ্রীশ্রীঠাকুর তারিখটি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন শুনে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে মন্তব্য করেন— “ বহুমুখী প্রতিভা ও প্রজ্ঞার এমন অদ্বিত অভিব্যক্তি কমই দেখা যায়। (পৃ: ১৮৮)।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ওপরে লেখা একখানি বৃহৎ জীবনী-গ্রন্থে (ব্রজগোপাল দত্ত রায়) উল্লেখিত হয়েছে দুটি মূল্যবান তথ্য শ্রীশ্রীঠাকুর ও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে। গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, শ্রীশ্রীঠাকুরের স্ব-হস্তলিখিত পুস্তিকা ‘সত্যানুসরণ’ প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিন পর, রবীন্দ্রনাথকে পড়তে
দেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথ পুস্তিকাটি পাঠ করার পর একদিন জানিয়েছিলেন, “পুস্তিকার রচয়িতার বয়স কত?” এত অল্প বয়সে এমন রচনা দেখে তিনি অনেকখানি বিস্ময়বোধ করেছিলেন।
আর একটি ঘটনার কথাও ঐ বিশাল জীবনীগ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে। সে হলো শ্রীশ্রীঠাকুর ডাক্তারী পড়ার পর হিমাইতপুরে নিজ গ্রামে গিয়ে তখন প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। ডাক্তারীতে তখন তাঁর খুবই সুনাম। এই সময় শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথদের একটি কুঠিবাড়ী ছিল, যা জমিদারীর অন্তর্গত। শ্রীশ্রীঠাকুরের ডাক্তারীর সুনামের কথা তাঁদের কানে পৌঁছেছিল। তাই সেখান থেকে মাসিক একটা মোটা মাইনে দিয়ে তাঁকে সেখানে যাবার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সারা বিশ্বের মানুষের অসুখ সারাবার জন্যে যাঁর এ-পৃথিবীতে আবির্ভাব, তাঁকে ঐ ছোট সীমানায় কি বদ্ধ করা চলে? যাইহোক, এ-দুটি ঘটনার কথা আমি নিজে চোখে দেখার সুযোগ পাইনি, তবে অন্য ভক্তদের মুখে শুনেছি।
১৮/১০/৩৯ তারিখে হিমাইতপুর আশ্রমে একদল ভদ্রলোকের প্রশ্নের ঠাকুর উত্তর দিচ্ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে এক ভক্ত শ্রীশ্রীঠাকুরকে বলেছিলেন যে তাঁকে তিনি ‘ভগবান’ বলে মনে করেন না, বড় জোর superman (অতিমানব) বলতে পারি। তখন শ্রীশ্রীঠাকুর জানালেন, “আমি কিন্তু ভগবান বলতে মানুষ বাদ দিয়ে কিছু বুঝি না— যেমন ভগবান যদি থাকেনও, তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী? তিনি আমাকে একটা তিলের নাড়ু পর্যন্ত জুটিয়ে দেন না। ভগবান বলতে বুঝি সেই মানুষ যাঁর ভিতর ষড়ৈশ্বর্য জাগ্রত। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে তাঁর কবিত্ব বুঝি না— আগে মনে হয় রবীন্দ্রনাথের কথা তারপর তাঁর কবিত্ব।”
আবার একথাও আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে জীবনে কোনোদিন আমল দিতে চাননি। ভারতীয় দর্শনের আলোকেই মূলত রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু-ভাবনাকে বোঝা যায়। বৃহৎ জীবনের অনন্ত যাত্রার পথে মৃত্যু একটা সামান্য ঘটনা— আমরা চলেছি জন্ম-জন্মান্তরের মধ্য দিয়ে। দেহের বিনাশ হলেও আত্মা অবিনশ্বর। ‘সোনার তরী’ নামক কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ‘যেতে নাহি দিব’ নামক বিখ্যাত কবিতায় তিনি যা বলেছেন তাতে মৃত্যুকে স্বীকার করতে চায়নি মানুষের প্রেম। শ্রীশ্রীঠাকুরও বলেছেন “ভালবাসা কোনদিন মরণকে স্বীকার করতে চায় না। অমৃতলোকেই তার অভিযান। যে করেই হোক সে বাঁাকে ও বাঁচাতে বদ্ধপরিকর হয় আর তাই বুঝিয়ে দেয় যে মানুষের আত্মার শক্তি দুর্দ্ধর্ষ ও অমর। সে চায় মরণকে মারতে। পতনকে নিকেশ করতে। ...ভালবাসা বড় জবর জিনিস। তা কেবলই বলে নিজে বাঁচ, অন্যকে বাঁচাও আর সকলে মিলে প্রিয়-পরমের সেবায় অটেল হয়ে ওঠ।” (পৃ: ১৭৬, আলোচনা প্রসঙ্গে, ১০ম খণ্ড)।
শ্রীশ্রীঠাকুরের সমাজ-চিন্তা ও রাষ্ট্র-চিন্তা আলোচনার সময় আমরা এবিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মিল-অমিলের কথা এ’গ্রন্থেই বলেছি।
২৯/১/৪৬ তারিখে শ্রীশ্রীঠাকুর মাতৃমন্দিরের বারান্দায় উপবিষ্ট ছিলেন। মহেন্দ্রদা (পাল), লীলা মা (গুহঠাকুরতা), স্পেন্সারদা ও আরো অনেকে ছিলেন। নানা কথার মধ্যে এক সময় প্রফুল্লদা (দাস) শ্রীশ্রীঠাকুরকে প্রশ্ন করলেন, ‘বলাকা’য় (রবীন্দ্রনাথ) পড়েছি, ‘যে মুহূর্তে পূর্ণ তুমি, সে মুহূর্তে কিছু তব নাই, তুমি তাই পবিত্র সদাই’— যে মুহূর্তে পূর্ণ, সে মুহূর্তে কিছু
নাই— সে কী রকম?
প্রফুল্লদার এ-কথার জবাবে শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছিলেন, “সব অবস্থার মধ্য দিয়ে যে সমানভাবে চলে, কোনো কিছুতেই ব্যাহত হয় না, যার মধ্যে কোনরকম দ্বন্দ্ব নেই, তার এই রকম হয়। 'পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে, পূর্ণস্য, পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাব শিষ্যতে। '—এই পূর্ণতার অবস্থাই পবিত্রতা unadulterated stage (নির্ভেজাল অবস্থা)। ...এটা স-বিকার নির্বিকার (অবস্থার) পরে।
এরই মধ্যে একটি কথা কেষ্টদা (কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য) রবীন্দ্র প্রসঙ্গে তোলায় শ্রীশ্রীঠাকুর কথা না বলে পারেন না। যাঁরা লেখাপড়া বেশীক্ষণ করেন তাঁদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সচেতন হতে হয়। কেষ্টদা জানালেন, রবীন্দ্রনাথ কাঁচা মুগ ভিজান, কয়েকখানা লুচি ইত্যাদি খেতেন। তখন, শ্রীশ্রীঠাকুর জানান, “ঘরের ভাত খেলে ভালো। এতে বিশেষ করে লেখাপড়ার ক্লান্তি অপনোদন করে।” (আলোচনা প্রসঙ্গে, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ৪৮)।
রবীন্দ্রনাথ ‘ভালোবাসা'র আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন যে যাকে আমরা অত্যন্ত গভীরভাবে ভালোবাসি তার মধ্যে 'অনন্তের আভাস' পাই। 'অনন্ত প্রেম' নামে কবিতাটি এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। ঠিক এই কথাটিই ইষ্ট বা প্রিয়পরমের প্রতি ভালোবাসাকে বোঝাতে গিয়েও শ্রীশ্রীঠাকুর বহুবার বলেছেন। ১৯/১২/৪২ তারিখে হিমাইতপুরে একদা শ্রীশ্রীঠাকুরের মুখে শোনা গিয়েছিল প্রেম-তত্ত্বের অপূর্ব কথা। একজন ভক্ত কৃষ্ণপ্রেম কেন নিত্যসিদ্ধ বললে শ্রীশ্রীঠাকুর উত্তর দিয়েছিলেন, “কৃষ্ণপ্রেম কেন, সব প্রেমই নিত্যসিদ্ধ। Libido (সুরত) হলো ভগবদ্দত্ত সম্পদ। ঐ সম্পদ ও সংবেগ নিয়ে যাকেই ভালোবাসতে চাই তাকেই ভালোবাসতে পারি। ভালবাসার এই স্বাধীনতা ও অধিকার থেকে ভগবান কখনও আমাদের বঞ্চিত করেন না। তাই প্রেম আমাদের জীবনে নিত্যসিদ্ধ, এখন তাকে আমরা যেখানেই প্রভাবিত করি।” (পৃঃ ২১০, আলোচনা প্রসঙ্গে, ৪র্থ খণ্ড)।
এই গ্রন্থের নবমখণ্ডের ৪৭ পৃষ্ঠায় শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন ভালোবাসা ভগবানকে উপলব্ধি করতে পারে, ভালবাসাই জ্ঞান আনতে পারে, “Without love knowledge is sterile.” আবার “ভালবাসা মানে প্রিয়র ভালতে বাস করে। তার কল্যাণ চায়।” (পৃঃ ৭৫)। কিংবা “ভালবাসা যদি খাঁটি হয়, তবে সেই ভালবাসার সুতো হেঁটে হেঁটে ভগবান পর্যন্ত পৌঁছবেই।” (পৃঃ ১৭৬, নবম খণ্ড)।
আবার শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীমুখে তাঁর অতি প্রিয় রবীন্দ্রনাথের “গুরু গোবিন্দ” কবিতার কয়েকটি চরণ ভক্তদের সঙ্গে নানা কথা আলোচনায় নির্গত হয়েছে। ১৪/৯/৪২ তারিখে হিমাইতপুর আশ্রমে মাতৃমন্দিরে তিনি তখন উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁকে মানুষের ভোগসুখে মত্ততার দিকে অধিক আকর্ষণের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন, “তপস্যার ভিতর দিয়ে ছাড়া মানুষ বড়ও হয় না, সুখীও হয় না। অনেকদিন পরাধীন থেকে থেকে এই ধারণাটাই আমাদের উঠে গেছে। আমরা যে সুখ চাই তা মানুষের সুখ নয়, পশুর সুখ।” একথা বলার পরই তিনি রবীন্দ্রনাথের 'গুরুগোবিন্দ' কবিতাটি থেকে কয়েকটি চরণ উদ্ধৃত করলেন,
“হায় সে কি সুখ, এ গহন তাজি
হাতে লয়ে জয়তুরী
জনতার মাঝে ছুটিয়া পড়িতে,
রাজ্য ও রাজ্য ভাঙ্গিতে গড়িতে
অত্যাচারের বক্ষে পড়িয়া
হানিতে তীক্ষ্ণ ছুরি।”
ইষ্টের প্রতি টান যাতে বাড়ে, তার জন্য, ঋত্বিকদের কী করণীয় মূলত সেই যাজনের পন্থার কথা এখানে বলেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। এই ‘গুরু গোবিন্দ' কবিতাটি শ্রীশ্রীঠাকুরের ছিল অত্যন্ত প্রিয়; তিনি তাঁর আলোচনায় আরো অনেকবার এর বিশেষ-বিশেষ পংক্তি তিনি আবৃত্তি করেছেন। পরে সে-কথা বলছি।
এইভাবে শ্রীশ্রীঠাকুরের বহু বাণী, পত্র ও 'আলোচনা প্রসঙ্গে' 'নানা প্রসঙ্গে'র খণ্ডগুলি ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্য করলে তাঁর রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধার নিদর্শন মিলবে। তাছাড়া আমাদের এই আলোচনায় বহু স্থলেই শ্রীশ্রীঠাকুরের কৃষ্টি বা সংস্কৃতির আলোচনায়, তাঁর রাষ্ট্রবিষয়ক ভাবনায় ও বিশেষ করে শিক্ষাভাবনার আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমরা তুলনার প্রয়োজন মনে করেছি। আপাতত এখানে শিক্ষা-বিষয়ক শ্রীশ্রীঠাকুরের চিন্তার সঙ্গে রবীন্দ্রীয় চিন্তার সাদৃশ্য কিছু দেখাবার চেষ্টা করছি সূত্রাকারে।
রবীন্দ্রনাথ বয়সে শ্রীশ্রীঠাকুরের চেয়ে সাতাশ বছরের বড় ছিলেন। শিক্ষা-বিষয়ক তাঁর সকল ভাবনা প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর শিক্ষা নিয়ে চিন্তার অবসর আসে শ্রীশ্রীঠাকুরের। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা-বিষয়ক ধারণাটি অতি সংক্ষেপে প্রায় সূত্রাকারেই প্রথমেই একটুখানি বলছি।
প্রথমত, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমকালে জাতীয় শিক্ষা-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবেই যোগদান করেছিলেন। আবার নিজের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে প্রাচীন তপোবন-আদর্শে ব্রহ্মচর্য-আশ্রম গড়ে তুলেছিলেন দ্বিতীয়ত। 'শিক্ষার হেরফের' প্রবন্ধে তিনি ইংরেজি শিক্ষা যে জাতীয় জীবনের উপযোগী নয় তা বলেছিলেন। তিনি স্পষ্টভাবেই চতুর্থত জানিয়েছিলেন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অান্তরের উদ্বোধন। “আমাদের পুঁথির বিদ্যাকে আমাদের প্রাণের মধ্যে আয়ত্ত করতে 'পারিতেছেিনা।” একে রাখতে হবে “ধর্মের পথ আমাদের এই সর্বত্র প্রতিহত চিত্তকে মুক্তির দিকে টানিতেছে।...” পঞ্চমত তিনি জানালেন যে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা (তাঁর সমকালীন) একেবারেই যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে, এতে শিশুদের মনের বিকাশ ঘটছে না। এতে প্রাণস্পন্দন নেই, এ শিক্ষা মৃত। পুঁথি-সর্বস্ব শিক্ষা তাই তাঁর পছন্দ ছিল না। ষষ্ঠত তিনি চাইতেন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মৌলিক চিন্তার বিকাশ ঘটুক। তাই পরের রচনা যত কম পড়ে ততই মঙ্গল। এতে তাদের বিচার-বোধ ও চিন্তাশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। দেশের প্রচলিত শিক্ষা-ব্যবস্থা ছাত্রদের পরনির্ভরশীল করে তুলছে ও দাসত্বের পথেও নিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য একথা বললেও রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য শিক্ষাকে বিশেষ করে সেখানকার অতিমূল্যবান সাহিত্য ও বিজ্ঞানকে একেবারেই বর্জন করার কথা কখনোই বলেননি। 'শিক্ষার বাহন' নামক প্রবন্ধে সপ্তমত তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের কথা বললেও উচ্চতম শিক্ষাব্যবস্থায় গঙ্গা-যমুনার মতো বাংলার সঙ্গে ইংরেজি-মাধ্যমের প্রয়োজনকে অস্বীকার করেন নি।
রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার প্রেক্ষাপটে প্রকৃতির সান্নিধ্যকে খুব গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রকৃতির মাঝখানে খোলা আকাশের নীচে, মুক্ত প্রকৃতির বুকে শিক্ষাগ্রহণের তিনি সুব্যবস্থা করেছিলেন শান্তিনিকেতনে। আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা-গ্রহণের কথাও তাঁর। অষ্টমত, রবীন্দ্রনাথ সহশিক্ষাকে গ্রহণ করেছিলেন ঠিকই এবং মেয়েদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণকেও বরণ করে নিয়েছিলেন, কিন্তু বিধাতার মেয়াপুরুষ সৃষ্টির ভিন্নতায় কিছু কিছু ভিন্ন শিক্ষায় একমাত্র নারীদেরই গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছিলেন। তাই নবমত তাঁর মতে শিক্ষার থাকবে দুটি লক্ষ্য— একটি তার অর্থকরী দিকে যেখানে জীবিকার্জনের জন্যে বিশেষ বিশেষ শিক্ষার দিকে আগ্রহ-পূরণের প্রয়াস; আর একটিতে তার মানবীয় দিকে— যেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের 'হয়ে ওঠার' দিক— তার জন্য চলবে তাদের সাধনা ও নিরলস সাধনার দিক। এমন উচ্চতর শিক্ষার দিকটিতে নারী-পুরুষে কোনো ভেদ থাকবে না— এখানে ছাত্রছাত্রী একই সঙ্গে শিক্ষাগ্রহণ করবে। কিন্তু অর্থোপার্জনের দিকটিতে নারী-পুরুষ তাঁদের পছন্দমতো তাঁদের শরীর, স্বভাব স্বাস্থ্য ও গঠন অনুযায়ী চলবে। সহশিক্ষা এখানে চলবে না।
মানুষের স্বাধীনতা মুক্তি ও সৃষ্টির কথা পাই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা চিন্তায়। এর জন্য জীবনের যে সাধনা চলবে, সেখানে নারী-পুরুষে কোনো ভেদ নেই। তাই একই সঙ্গে তা চলবে। তবুও নারীদের জন্য আলাদা কিছু বিষয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে তিনি অস্বীকার করেননি। গোড়ার দিকে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় তাঁর মনকে প্রাচীন ভারতের তপোবনে গুরুগৃহে শিক্ষার আদর্শ ভরে রেখেছিল। সংস্কৃত শাস্ত্র ও সাহিত্য থেকে তিনি তপোবন-আদর্শ সম্পর্কে যে জ্ঞানলাভ করেছিলেন, তারই আলোকে তিনি নিজের আশ্রম বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। এ-কালের কয়েকটি প্রবন্ধে তিনি তাঁর আশ্রম-বিদ্যালয় বিষয়ে তাঁর সেই প্রাচীন ধারণাকে ব্যক্তও করেছেন। 'শিক্ষার বাহন'— প্রবন্ধে তিনি বাংলাভাষা বা মাতৃভাষাকেই শিক্ষার বাহনের পক্ষেই মূলত গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোড়টার কাছে ইংরেজি ও বাংলা দুটো বড় রাস্তা”— খুলে দেবার কথা তিনি বলেছেন।
এখানে গঙ্গা-যমুনার মতো দুটো ধারা মিলে যাক-একথা তিনি বলেছেন। (শিক্ষার বাহন)। স্ত্রীশিক্ষা, শিক্ষার হেরফের, শিক্ষা-সংস্কার, শিক্ষা সমস্যা, শিক্ষার মিলন ইত্যাদি রবীন্দ্র-প্রবন্ধ এই প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য। কিন্তু মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যে তিনি শিক্ষা-বিষয়ক একালের চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠেও তখন তিনি নূতন কালের শিক্ষার পক্ষে ওকালতি শুরু করেন। শিক্ষার লক্ষ্য বলতে গিয়ে, তাঁর সেই মানসিকতা ধরা পড়েছে। শান্তিনিকেতনে যখন 'বিশ্বভারতী'র প্রতিষ্ঠা হলো তখন তিনি শিক্ষার মানবীয় দিক ও তার সর্বজনীন দিকটির ওপর জোর দিলেন— তার দেশকালাতীত রূপ তাঁর চিন্তায় তখন ফুটে উঠলো— আর তখন তিনি সমন্বয়বাদী।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিক্ষাচিন্তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের এই বিষয়ক চিন্তা সম্পূর্ণভাবে ঘাটে ঘাটে কখনোই মিলবে না। তবুও যেটুকু যেভাবে সাদৃশ্য দেখানো চলে, সে বিষয়ে কিছু বলছি। বিস্তারিতভাবে জানার জন্য আমার আলোচিত প্রবন্ধটি পড়া দরকার প্রস্তুত গ্রন্থেই।
আচার্যের নিকট দীক্ষা নিয়ে শিক্ষা করার কথা বলেছেন শ্রীশ্রীঠাকুর; এর সঙ্গে রবীন্দ্রীয় বক্তব্যের কোনোই মিল নেই; তবে ঠাকুরের এই কথার মধ্যে একটি গভীর দর্শন আছে।
দীক্ষার অর্থ উপদেশ বা জ্ঞানদান। একে চরিত্রগত করতে হবে এবং তার জন্য বারবার তা অভ্যাস দরকার। আর এই অভ্যাসই তো শিক্ষা। এ-ও যেমন শ্রীশ্রীঠাকুরের কথা, তেমনি দীক্ষার মধ্য দিয়ে আচার্যকে 'সার' করার কথাও তাঁর। এই আচার্যই গুরু, ইষ্ট, আদর্শ, যুগপুরুষোত্তম, জীবনগুরু 'প্রিয়পরম'। অবশ্য বেদ-উপনিষদের যুগে যখন অবতারী বা অবতারবাদ ছিল না, তখন তপোবনের ঋষিই ছিলেন গুরু বা আচার্য। তিনি নিরাকার ব্রহ্মের সঙ্গে ছাত্রকে যুক্ত করে দিতেন। বাড়ী বাড়ী ভিক্ষা করে ছাত্রেরা সেবায় উদ্বুদ্ধ হতো। অব্যক্ত ব্রহ্মেরই প্রতীক গুরু ছিলেন আচার্যেরা। ভিক্ষার মধ্য দিয়ে ছাত্রদের জনসংযোগ ঘটতো— তাদের নানা সমস্যা-সমাধানের চেষ্টা করতো ছাত্রেরা। প্রয়োজনে আচার্য-গুরুর সাহায্য নিত। পৌরাণিক যুগে শ্রীকৃষ্ণ এলেন, তারো পূর্বে শ্রীরামচন্দ্রকে পেলাম। এরপর বুদ্ধদেব, হযরত মহম্মদ, খ