27/07/2023
প্রসঙ্গঃ ঋত্বিকের হাতের লাঠি।
➤বেলা এগারোটার সময় ভাটপাড়া থেকে একজন এসে জিজ্ঞাসা করলেন- আপনার literary creation-এর (সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যে best কোনটা ?
শ্রীশ্রীঠাকুর- আমি কবি না, লেখক । create
(সৃষ্টি) করি ব'লে মনে হয় না। নিজে কিছু লিখিও না। যা দেখি, তাই বলি।
ওরা শুনে লিখে নেয়। আমি কী, তা' বলতে পারি না। আয়না না হলে মানুষ নিজেকে দেখতে পারে না। আমি কী, তা' আমি বলতে পারি না। যারা আমাকে দেখে, তা'রা বলতেসবসময়ই পারে।
☞বিনোদাবাবু (ঝা) আসলেন। তিনি বললেন, অনুগ্রহবাবু প্লেনে উঠতে গিয়ে দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর—অনুগ্রহবাবু লাঠি রাখেন না সঙ্গে?
☞বিনোদাবাবু—দেখি না তো!
শ্রীশ্রীঠাকুর—রাখায় তো কোনও ক্ষতি নেই। লাঠির উপর আমার খুব বিশ্বাস আছে।
☞বিনোদাবাবু কথাপ্রসঙ্গে বললেন—বিলিতী যে-সব ওষুধ তা' ওদের দেশের জলবায়ু ও খাদ্যের দিকে লক্ষ্য রেখে তৈরি করা হয়। তাই তা' আমাদের সম্পূর্ণ খাপ খায় না। ওদের খাদ্য প্রোটিন-প্রধান, আমাদের খাদ্য কার্বোহাইড্রেট প্রধান।
শ্রীশ্রীঠাকুর—হ্যাঁ!
কথায়-কথায় বিনোদাবাবু বললেন— আমরা পাশ্চাত্য মনোভাবাপন্ন হয়ে গেছি। আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা এর জন্য দায়ী। স্কুল-কলেজে ছেলেদের হত্যা করা হচ্ছে।
শ্রীশ্রীঠাকুর—একেবারে।
☞বিনোদাবাবু—শাসন, দেশরক্ষা ইত্যাদি সব ব্যাপারে আমরা পাশ্চাত্যের নকল করছি। স্বকীয়তা কিছু নেই।.. ওদের বিয়ের রেজিস্ট্রেশন দরকার, কিন্তু আমাদের বিয়ের কনের বাড়ির শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানই তো যথেষ্ট।
শ্রীশ্রীঠাকুর—ওইটেই স্বাভাবিক রেজিস্ট্রেশন।
☞বিনোদাবাবু আমাদের একটা ভুল ধারণা যে, আমাদের কিছু নেই।
শ্রীশ্রীঠাকুর—অত্যন্ত ভুল। আমাদের ঢের আছে। এই স্বীকৃতি না থাকায় আমাদের জৈবী সংস্কৃিতির অপকর্ষ হচ্ছে এবং ইউরোপ আমেরিকাও বঞ্চিত হচ্ছে। এইটে ঠিক না থাকলে জগৎকে ধরে তোলার কেউ থাকবে না।
[দীপ রক্ষী ৭/পৃঃ ২২৬/২২৭, ১৩৬৭, শনিবার (ইং ২০/৮/১৯৬০)]
সকালে শ্রীশ্রীঠাকুর বড় দালানের হলঘরে আছেন।
☞ কেষ্টদা (ভাচার্য) বলছিলেন—অফিসের উপর খুব চাপ। অনেকেই এসে আর্থিক সাহায্য বা ধার চান।
শ্রীশ্রীঠাকুর--আমার কাছ থেকে টাকা নেবার বুদ্ধি থাকলে মানুষের ভাল হয় না। এই যে দেবী কিছু নেয় না, রেবর্তী নেয় না, বরং ওরা দেয়। (ফোটাদাকে দেখিয়ে) ওদের কিছু দেন না তো আপনি?
☞কেষ্টদা-- শ্রীশ্রীঠাকুর-দিলেই কিন্তু নষ্ট হয়ে যাবে। এই দ্যাখেন, টাকার জন্য ধারা এখানে আছে, তারা একেবারে গেছে। আর এক কথা কয়ে রাখি। পুরীর বাড়িটা (হরনাথ লজ) ওরা নাকি দশ-বার হাজার টাকা হলে দিতে পারে। টা যদি কিনে নিতে পারেন। (বিষাদের সুরে) মা'র কথা মনে হ'লে আর আমার। পুরীতে যেতে ইচ্ছে করে না।
কেষ্ট চৌধুরীদা বাইরে যাবেন। তার জন্য শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে এসে যাওয়ার ভাড়া চেয়েছিলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর ১০ টাকা ভিক্ষা ক'রে বিশুদার (মুখোপাধ্যায়)কাছে রেখেছিলেন। এখন বিশুদাকে বললেন কেষ্টদাকে ডেকে ঐ টাকা দিয়ে দিতে।
বিকালে বড়দালানের বারান্দায় ব'সে ভক্তগণের সাথে কথা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর বলছিলেন- আসল জিনিস ঐ তিনটা, নিষ্ঠা, আনুগত্য, কৃতিসম্বেগ তার সাথে শ্রমপ্রিয়তা। এ যার থাকে তাকে আর কেউ আটকাতে পারে না। নিষ্ঠা থাকলে, চলার পথে যা-ই আসুক তাকে মানুষ সামাল দিতে পারে।
এরপরে ধ্যান সম্বন্ধে শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন-ধ্যান মানে ইষ্টচিন্তাপ্রবাহ। প্রবাহ কয় কেন? কারণ, স্রোতের মতন নানাদিক থেকে নানা বিষয় ভেসে আসে। সেগুলি ধরে ধরে কেমন ক'রে কথা বলব, কিভাবে চলব তা ঠিক করতে হয়, যাতে ইষ্টস্বার্থ রক্ষিত ও পরিপুরিত হয়।
তারপর শৈলেন ভট্টাচার্যাদাকে নির্দ্দেশ করে বাবা আমি ওকে ঐ যে লাঠি দিয়েছি, লাঠিখানা ঠিক সঙ্গে নিয়ে চলে। ছাতাটা রেখেছে, কিন্তু লাঠিখানা ঠিক সঙ্গে ক'রে ব'সে আছে। কখনও দেখলাম ও লাঠিখানা বাড়িতে রেখে এসেছে। এইভাবে indication (সূচনা)। তুই যে বহন করিস, তোর ভাল লাগে না?
শৈলেনদা—হ্যাঁ।
শ্রীশ্রীঠাকুর—চৈতন্যদেবের গুরু প্রদত্ত দন্ড নিত্যানন্দ ভেঙ্গে ফেলে দিয়েছিলেন। তাতে চৈতন্যদেব যা' shock (কষ্ট) পেলেন তা আর কওয়ার না। বিশেষ কিছু বললেন না। শুধু বললেন, 'তুমি আমার দণ্ড ভেঙ্গে ফেললে? তারপরে তিনি নিত্যানন্দকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন।
( কলকাতার সত্য দে --দা' কে,) তা' তোকে একখানা লাঠি দেব নাকি, না দিয়েছি?
সত্যদানা-- দেননি।
শ্রীশ্রীঠাকুর-দেব নাকি ?
সত্যদা--দয়া ক'রে যদি দেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর — কিন্তু লাঠি হারায়ো না, আর বহন ক'রো।
সত্যদা—করব। কিন্তু কোর্টে যাওয়ার সময়েও কি সাথে নিয়ে যাব? (সত্য দে কলকাতা হাইকোর্টের এ্যাডভোকেট)।
শ্রীশ্রীঠাকুর—সব সময় বহন করতে পারলেই ভাল।
জ্ঞানদা (গোস্বামী) নিজের লাঠিটা দেখিয়ে বললেন— স্টেনলেস স্টীলের এই মুণ্ডীটা যদি আর একটু চিকন হত তাহলে ভারটা কম হত।
শ্রীশ্রীঠাকুর—অত কথা ক'লে কাম হবে নানে। লাঠি লাঠিই। ভার যা’ আছে তা' আছেই, মোটা যা' আছে তা' আছেই। ধর, আমি যদি তোমার সঙ্গে থাকি আর আমাকে যদি ঘাড়ে ক'রে বহন করতে হয়, তাহলৈ কি বলবে যে ঠাকুরের ভার একটু কম হ'লে ভাল হত?
সবাই হেসে উঠলেন একথা শুনে।
রাতে অ্যালুমিনিয়ামের ঘরে শ্রীশ্রীঠাকুরকে ঘিরে বসেছেন ভক্তগণ। কথাবার্তা চলছে।
[আলোচনা-প্রসঙ্গে২৩/পৃঃ২২৭]