07/08/2026
টাকা আছে, তবু বরকত নেই—সমস্যা কোথায়?
হয়তো মাসের শুরুতে বেতন হাতে পেয়েই আপনি কিছু কেনাকাটা করলেন। নতুন পোশাক, খাবার, প্রয়োজনের চেয়ে একটু দামি কোনো জিনিস—এসবের পেছনে টাকা খরচ করতে খুব বেশি ভাবতে হলো না। কিন্তু কারও চিকিৎসার জন্য সাহায্য চাওয়া হলো, কোনো অসহায় পরিবারের কথা জানলেন কিংবা মসজিদ-মাদরাসার জন্য সদকার আহ্বান এলো—তখন একশ বা পাঁচশ টাকাও অনেক বড় মনে হলো।
মনের ভেতর সঙ্গে সঙ্গে হিসাব শুরু হয়ে গেল—
“এই মাসে খরচ অনেক।”
“আগে নিজের প্রয়োজনগুলো শেষ করি।”
“পরে সুযোগ হলে দেব।”
কিন্তু সেই “পরে” আর আসে না। নিজের ইচ্ছার জন্য টাকা বের হয় সহজে, অথচ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দিতে গেলে হাত শক্ত হয়ে যায়।
তারপর আমরা অভিযোগ করি, “এত আয় করি, তবু টাকা থাকে না। কোথায় চলে যায় বুঝি না!”
সমস্যা সবসময় আয়ের পরিমাণে নাও থাকতে পারে। কখনো সমস্যা হয়—আমরা সম্পদের সঙ্গে কেমন আচরণ করছি। কোথায় খরচ করছি, কোথায় অযথা নষ্ট করছি এবং কোথায় দেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নিজের হাত গুটিয়ে রাখছি।
অপচয় আর প্রয়োজন এক বিষয় নয়
ইসলাম আমাদের সুন্দর খাবার খেতে, ভালো পোশাক পরতে কিংবা পরিবারকে স্বাচ্ছন্দ্যে রাখতে নিষেধ করেনি। সমস্যা হলো প্রয়োজন ও সামর্থ্যের সীমা পেরিয়ে শুধু মানুষকে দেখানো, নিজের মর্যাদা প্রমাণ করা অথবা সাময়িক আনন্দের জন্য অর্থ নষ্ট করা।
একটি জিনিস সত্যিই প্রয়োজন কি না, তা না ভেবেই কিনে ফেললাম। ঘরে একই ধরনের জিনিস আছে, তবু নতুনটি না হলে মন ভরে না। মানুষ কী ভাববে—এই চিন্তায় এমন জীবনযাপন করছি, যা আমার সামর্থ্যের সঙ্গে মানানসই নয়। পরে ঋণ, দুশ্চিন্তা ও অশান্তি আমাদের পিছু ছাড়ে না।
আল্লাহ তাআলা আত্মীয়, অভাবী ও মুসাফিরের অধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। এরপর অপচয়কারীদের শয়তানের ভাই হিসেবে কঠিন সতর্কতা দিয়েছেন। অর্থাৎ অপচয় শুধু অর্থনৈতিক ভুল নয়; এটি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ আচরণও হতে পারে।
একটু থেমে ভাবুন—
যে টাকাটি আমি মানুষের চোখে বড় হওয়ার জন্য খরচ করছি, সেটি কি কোনো অভাবী মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে পারত না?
কৃপণতা মানে শুধু টাকা জমিয়ে রাখা নয়
অনেকে অপচয় করেন না, কিন্তু কাউকে দিতেও চান না। তারা বলেন, “আমি খুব হিসাব করে চলি।” হিসাব করে চলা ভালো; ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করাও দায়িত্বশীলতার অংশ। কিন্তু নিজের প্রয়োজনের সময় উদার আর অন্যের প্রয়োজনের সময় অজুহাত খোঁজা মিতব্যয়িতা নয়।
কৃপণতার গভীরে অনেক সময় একটি ভয় থাকে—
“দিলে যদি কমে যায়?”
“পরে যদি আমার প্রয়োজন হয়?”
“আমি কষ্ট করে আয় করেছি, অন্যকে কেন দেব?”
এই ভয়টি ধীরে ধীরে মানুষকে সম্পদের মালিক থেকে সম্পদের বন্দী বানিয়ে ফেলে। টাকা তার হাতে থাকে, কিন্তু তার হৃদয়কে নিয়ন্ত্রণ করে টাকা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“সদকা সম্পদ কমায় না।”
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮।
এই হাদিসের অর্থ এমন নয় যে, আপনি একশ টাকা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে দুইশ টাকা হাতে এসে যাবে। সদকা কোনো দ্রুত ধনী হওয়ার কৌশল নয়। দৃশ্যমান হিসাবে টাকা কমতে পারে, কিন্তু আল্লাহ অন্য ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারেন, অবশিষ্ট সম্পদে বরকত দিতে পারেন, অপ্রত্যাশিতভাবে প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন অথবা আখিরাতের জন্য এমন প্রতিদান জমা রাখতে পারেন, যার মূল্য এখন আমরা বুঝতে পারি না—এটি হাদিস ও কুরআনের প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে বোঝা যায়।
আমরা শুধু টাকার পরিমাণ দেখি, আল্লাহ দেখেন তার পরিণতি
একজনের আয় অনেক, কিন্তু প্রতিদিন নতুন সমস্যা। চিকিৎসা, অপ্রয়োজনীয় খরচ, নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিস, অশান্তি—টাকা আসে, আবার চলে যায়। আরেকজনের আয় তুলনামূলক কম, কিন্তু তার প্রয়োজনগুলো সুন্দরভাবে পূরণ হয়ে যায়, মন শান্ত থাকে এবং অল্পের মধ্যেও তৃপ্তি থাকে।
বরকত মানে শুধু সংখ্যার বৃদ্ধি নয়। বরকত হলো—অল্প সম্পদে প্রয়োজন মিটে যাওয়া, অপচয় থেকে বেঁচে থাকা, অপ্রত্যাশিত ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকা এবং সম্পদকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহার করার তাওফিক পাওয়া।
কখনো আমরা বেশি উপার্জনের জন্য এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে, যা ইতিমধ্যে পেয়েছি তার শুকরিয়া আদায় করতেই ভুলে যাই। অথচ আল্লাহ হয়তো আমাদের আয় বাড়ানোর আগে দেখতে চান—বর্তমান সম্পদটি আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি।
প্রতিদিন সকালে আপনার সম্পদের জন্যও দু‘আ হয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ জানিয়েছেন, প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। একজন দু‘আ করেন, “হে আল্লাহ, যে ব্যয় করে তাকে প্রতিদান দিন।” অন্যজন কৃপণের বিরুদ্ধে দু‘আ করেন।
—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ১৪৪২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১০।
ভাবুন, প্রতিটি সকাল শুধু নতুন কর্মদিবস নয়; আপনার সম্পদের সঙ্গে আচরণেরও নতুন পরীক্ষা।
আপনি কি সকালটি শুধু আরও পাওয়ার পরিকল্পনা দিয়ে শুরু করছেন, নাকি আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকে কাউকে দেওয়ার কথাও ভাবছেন?
সকালবেলা অল্প কিছু সদকা করা একটি সুন্দর অভ্যাস হতে পারে। তবে এটিকে এমন কোনো নিশ্চয়তা ভাবা ঠিক নয় যে, আজ দশ টাকা দিলেই আজই দশ গুণ টাকা ফিরে আসবে। সদকা ইবাদত—ব্যবসায়িক বিনিয়োগ নয়। আমরা দিই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য; প্রতিদান কীভাবে ও কখন আসবে, সেটি তাঁর হিকমাহর বিষয়।
একটি দানা—সাতশ দানার প্রতিদান
আল্লাহ তাআলা তাঁর পথে ব্যয়কারীর উদাহরণ দিয়েছেন এমন একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শিষ জন্মায় এবং প্রতিটি শিষে একশটি দানা থাকে। এরপর বলেছেন, তিনি যাকে চান আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেন।
আপনার কাছে যে অর্থটি ছোট, কোনো দরিদ্র পরিবারের কাছে সেটিই হয়তো এক দিনের খাবার। আপনার অপ্রয়োজনীয় একটি কেনাকাটার মূল্য দিয়ে হয়তো একজন অসুস্থ মানুষ ওষুধ কিনতে পারে। আপনি যে পোশাকটি মাসের পর মাস ব্যবহার করেন না, সেটি হয়তো অন্য কারও ঈদের আনন্দ হয়ে উঠতে পারে।
আল্লাহর কাছে বড় হতে সবসময় বড় অঙ্কের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় আন্তরিকতা, হালাল সম্পদ এবং এমন একটি হৃদয়—যে দেওয়ার সময় মানুষকে নিজের অনুগ্রহের পাত্র মনে করে না।
আজ থেকেই কীভাবে শুরু করবেন?
নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে দান করার প্রয়োজন নেই। পরিবারের আবশ্যিক খরচ, ঋণ এবং শরিয়ত নির্ধারিত দায়িত্ব অবহেলা করে নফল সদকা করাও ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ নয়। কিন্তু সব খরচ শেষ হওয়ার পর যা বাঁচবে, শুধু তা থেকেই দেব—এভাবে অপেক্ষা করলে অনেক সময় কিছুই দেওয়া হয় না।
তাই অল্প দিয়ে শুরু করুন। প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে অথবা বেতন পাওয়ার দিন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আলাদা রাখুন। অঙ্কটি ছোট হলেও নিয়মিত হোক। কোনো অভাবী আত্মীয়, অসুস্থ ব্যক্তি, ক্ষুধার্ত পরিবার, দ্বীনি শিক্ষা অথবা প্রয়োজনীয় মানবিক কাজে দিন।
আর দেওয়ার পর মনে করবেন না, “আমি তাকে উপকার করেছি।” বরং ভাবুন—
আল্লাহ তার প্রয়োজনের মাধ্যমে আমাকে আখিরাতের জন্য কিছু পাঠানোর সুযোগ দিয়েছেন।
আজ নিজের খরচের তালিকাটি একবার দেখুন। সেখানে এমন কতগুলো বিষয় আছে, যেগুলো ছাড়া সহজেই চলা যেত? আবার এমন কতজন মানুষ আছে, যাদের প্রয়োজন জানার পরও আপনি মনে মনে বলেছিলেন, “পরে দেব”?
হয়তো আপনার রিজিকের সবচেয়ে বড় সমস্যা টাকা কম আসা নয়। সমস্যা হলো—যেদিকে অর্থ প্রবাহিত হওয়ার কথা, সেদিকে তার পথ বন্ধ করে রাখা।
মুষ্টি শক্ত করে ধরে রাখলে হাতে যা আছে, শুধু সেটুকুই থাকে। হাত খুললে কিছু বেরিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু সেই খোলা হাতেই আল্লাহ নতুন নিয়ামত রাখেন—দুনিয়ায় যেভাবে কল্যাণকর মনে করেন এবং আখিরাতে বহুগুণ প্রতিদান হিসেবে।
আল্লাহ আমাদের অপচয়, কৃপণতা ও লোকদেখানো ব্যয় থেকে রক্ষা করুন। হালাল রিজিকে বরকত দিন, সম্পদের হক আদায় করার তাওফিক দিন এবং এমন উদার হৃদয় দান করুন, যা দেওয়ার পর কমে যাওয়ার ভয় নয়—আল্লাহর প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করে। আমিন।