17/06/2024
বিবাহ জাতি ভেদাভেদ ⁉️
✍️ সেই অতীতযুগে যখন শত সহস্ৰ জাতি বা উপজাতির সৃষ্টি হয় নাই, যখন পার্শী জৈন, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, হিন্দু-মুসলমান বলিয়া কোন শব্দই সৃষ্ট হয় নাই, সমাজে এমনকি যখন ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র এই চারি বর্ণের উদ্ভবই হয় নাই তখন “ব্রাহ্মণ” বলিতে বুঝাইত বিশ্ববাসী নরনারী। মনুর সন্তান বলিয়াই মানব বা ম্যান । কিন্তু মনু যখন পৃথিবীতে জন্মগ্রহণই করেন নাই তখন একমাত্র ব্রহ্মের অগ্রজন্মা সন্তান “ব্রাহ্মণ” দ্বারাই জগৎ পরিপূর্ণ ছিল। তখন ধনীদরিদ্র, পণ্ডিত মুর্খ, চোর দস্যু রাজা প্রজা, ব্যবসায়ী শ্রমজীবী, শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, নরনারী মাত্রেরই ব্রাহ্মণ বলে অভিহিত হতো।
🔴মহর্ষি ভৃগু এই জন্যই বলেছেন--
“ন বিশেষোঽস্তি বর্ণনাং সৰ্ব্বং ব্রাহ্মমিদং জগৎ।
ব্রহ্মণ্য পূৰ্ব্বসৃষ্টং হি কৰ্ম্মাভিঃ বর্ণতাং গতম্।।
(মহাভারত শান্তি পর্ব ১৮৮–১০)
অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র বর্ণের মধ্যে কোনই প্রভেদ নাই। কেন না পূর্ব্বে এই পৃথিবীতে ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন ব্রাহ্মণ দ্বারাই জগৎ পূর্ণ ছিল। তাঁহারাই পৃথক পৃথক কৰ্ম্মে নিযুক্ত হইয়া ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য, শূদ্র নামে অভিহিত হইয়াছেন।”
🔴 ভীষ্ম বলিতেছেন --
“তস্মাদ্বর্ণা ঋজবো জ্ঞাতিবর্ণাঃ”
অর্থাৎ “ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র সকলেই সাধু এবং একে অন্যের জ্ঞাতি।”
ব্রাহ্মণই পরবর্ত্তী যুগে বিভিন্ন গুণ কৰ্ম্ম স্বভাব অনুসারে ঋষি মুনি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র, রাক্ষস দৈত্য দানব, নাগ ঋক্ষ কপি, আর্য্য অনাৰ্য্য যখন ম্লেচ্ছ নামে পৃথক ও বিভক্ত হইয়াছে। শাস্ত্রাকার ব্রাহ্মণকে দশ ভাগে বিভক্ত করিয়াছেন।
🔴অত্রি সংহিতা বলিতেছে --
"দেবো মুনির্দ্বিজো রাজা বৈশ্যঃ শুদ্রো নিষাদকঃ। পশু স্নেৰ্চ্চোঽপি চাণ্ডালো বিপ্রা দশবিধাঃ স্মৃতাঃ।।"(৩৬৪)
ব্রাহ্মণ দশ প্রকারের যথা দেব মুনি, দ্বিজ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, নিষাদ, পশু, ম্লেচ্ছ ও চাণ্ডাল। মহর্ষি অত্রির মতে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, নিষাদ, পশু, ম্লেচ্ছ ও চাণ্ডাল ইহারা সকলেই ব্রাহ্মণ।
🔴আবার পশু ব্রাহ্মণ সম্বন্ধে বলেছেন --
“ব্রহ্মতত্ত্বং ন জানাতি ব্রহ্মসূত্রেণ গৰ্ব্বিতঃ। তেনৈব স চ পাপেন বিপ্রঃ। পশুরুদাহৃতঃ। (৩৭২)
অর্থাৎ গলায় মাত্র পৈতা করিয়া যে ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণত্বের গর্ব্ব করে অথচ ব্ৰহ্ম তত্ত্ব জানে না এই পাপে তাহাকে পশু ব্রাহ্মণ বলা হয়।” তাহার গলায় পৈতা ও গো মহিষ ছাগাদের স্কন্ধে রজ্জু একই প্রকারের। এই শ্রেণীর ব্রাহ্মণের প্রাচুর্য্যেই ত দেশ ও সমাজ রসাতলে যেতে বসেছে। পূর্বকালে ব্রাহ্মণ বা নরগণ যখন শত্রুর হাত হইতে দেশকে রক্ষা করিতেন তখন তাদেরকে ক্ষত্রিয় (Military power) বলা হইত, কৃষি বাণিজ্য করিলে বৈশ্য (Trading class), সমাজ সেবা (Social Service) করিলে শূদ্র এবং শারীরিক পরিশ্রম না করিয়া চিন্তা শক্তির দ্বারা সমাজ সেবা করিলে তাদেরকে নূতন সংজ্ঞা বা উপাধি না দিয়া শুধু ব্রাহ্মণই বলা হতো। একই ব্যক্তি একই জীবনে বৃত্তি অনুসারে কখনও ব্রাহ্মণ কখনও ক্ষত্রিয়, কখনও বৈশ্য বা কখনও শূদ্র সংজ্ঞা পেত। চারি বর্ণের মধ্যে তখন অবাধে বৈবাহিক আদান প্রদান ও পান ভোজন চলতো, সকলেই বেদপাঠ ও ভগবদুপসনা করিতে পারতো। আর্য্য জাতি তখন সব একাকার ভারতের তখন স্বর্ণ যুগ।
তখন বিবাহে জাতিভেদ ছিল না। বর্তমান সমাজে যেমন আমরা দেখি বা শুনে থাকি এবং বিশ্বাস করি ব্রাম্মনের ছেলে শুধু ব্রাম্মনের মেয়েকেই বিবাহ করতে পারবে, শুদ্রের ছেলে শুধু শুদ্রের মেয়েকেই। আসলে কি তাই❓
👉চলুন আজকে শাস্ত্রের আলোকে অতীত জানি --
ব্রাম্মন শুদ্রের মেয়েকে বিবাহ করতে পারবে কি না, আবার শুদ্রের মেয়ে ব্রাম্মন, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যর ছেলেকে বিয়ে করতে পারবে কি না⁉️
🔴 “অক্ষমালা বশিষ্ঠেন সংযুক্তা ধর্মযোনিজা । শারঙ্গী মন্দপালনে জগামোভা হর্ণীয়তাম্।।
(মনু সংহিতা ৯২৩)
অর্থাৎ মহর্ষি বশিষ্ঠ নিকৃষ্ট কুলোপন্ন অক্ষমালাকে এবং মহর্ষি মন্দপাল অধম কুল হইতে উৎপন্না সারঙ্গীকে বিবাহ করিয়াছিলেন।” তাদের পুত্রেরা সকলেই পিতৃবর্ণ ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন ; কোন নূতন জাতির সৃষ্টি হয় নাই।
🔴 মহর্ষি কৌৎস বিবাহ করিলেন ক্ষত্রিয় রাজা ভগীরথের কন্যাকে।
🔴এইরূপে মহর্ষি অঙ্গিরা ক্ষত্রিয় মরুত্তের কন্যাকে, 🔴মহর্ষি হিরণ্যহস্ত ক্ষত্রিয় মদিরাশ্বের কন্যাকে,
🔴ব্রাহ্মণ ঋষ্যশৃঙ্গ ক্ষত্রিয় দশরথের কন্যা শান্তাকে, 🔴জমদগ্নি ক্ষত্রিয় প্রসেনজিতের কন্যা রেনুকাকে, 🔴মহর্ষি ভৃগুর ব্রাহ্মণ পুত্র চ্যবন ক্ষত্রিয় শর্য্যাতির কন্যা সুকন্যাকে,
🔴মহর্ষি ঋচিক ক্ষত্রিয় গাধির কন্যা বা বিশ্বামিত্রের ভগ্নী সত্যবতীকে অবাধে বিবাহ করিয়াছিলেন।
তখন ব্রাহ্মণ বংশেও অব্রাহ্মণ এবং অব্রাহ্মণ বংশেও ব্রাহ্মণ জন্মগ্রহণ করিতেন।
👉 মনুর পুত্র ধৃষ্ট হইতে ধার্ষ্ট নামক ক্ষত্রিয় বংশের উৎপত্তি। ধাষ্টগণ ক্ষত্রিয় হইতে ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন (শ্রীমদ্ভাগত-শ্রীধর টীকা ৯। ২। ১৭৬)। দিষ্ট ছিলেন 'ক্ষত্রিয় কিন্তু তার পুত্র নাভাগ বৈশ্য ; ইনি বৈশ্যকন্যা বিবাহ করিয়াছিলেন (মার্কন্ডেয় পুরাণ) নাভাগারিস্টের দুই বৈশ্য পুত্র ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন (হরিবংশ ১১।৬৫৮)। মনুর দৌহিত্র পুরূরবার বংশে জন্মিয়াছিল ক্ষত্ৰিয় শুনক। এই শুনকের বংশে চারি বর্ণই জন্মিয়াছে (বিষ্ণুপুরাণ ৩।৮১)। ক্ষত্রিয় বিজয়ের পুত্রই মহাত্মা কপিল। বিজয়ের অন্য পুত্র সুহোত্রের গৃৎসমতি নামক পুত্রের বংশেও চারিবর্ণের উৎপত্তি হয় (হরিবংশ ৩২ পুরূরবার বংশে ক্ষত্রিয় রভস জন্মগ্রহণ করেন, তাঁহার গোত্র হইতে বহু ব্রাহ্মণ জন্মগ্রহণ করেন (ভাগবত ৯।১৭।১০)। পুরুর বংশে ক্ষত্রিয় মেধা তিথি জন্মগ্রহণ করেন, এই মেধাতিথি হইতেই কাম্বায়ন গোত্রীয় ব্রাহ্মণগণ জন্মগ্রহণ করেন (বিষ্ণুপুরাণ ৪।১৯।২)। ক্ষত্রিয় রাজ অজমীঢ়ের বংশে প্রিয়মেধাদি ব্রাহ্মণ জন্মগ্রহণ করেন (ভাগবত ৯।২১।২১)। অজমীঢ়ের বংশে মুদ্গলের জন্ম, এই মুদ্গল হইতেই মৌদ্গল্য গোত্রীয় ব্রাহ্মণের উৎপত্তি (মৎস্য পুরাণ)। গর্গ, সংস্কৃতি ও কাব্য নামক তিনজন মহর্ষি ক্ষত্রিয় হইতে ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন (মৎস্য পুরাণ)। গর্গ হইতে শিনি এবং তাঁহা হইতে ক্ষত্রিয়-গার্গগণ ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন। গর্গের ভ্রাতা মহাবীর্য্যের পুত্র ক্ষত্রিয় উরুক্ষয়ের তিন পুত্র অরুণ, পুষ্করী ও কপি ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন (মৎস্য পুরাণ)। কুরুবংশীয় ক্ষত্রিয় ঋষ্টি সেনের পুত্র দেবাপি স্বীয় ভ্রাতা শান্তনুর পৌরহিত্য করিয়াছিলেন (নিরুক্ত ২।১০)। সিন্ধুদ্বীপ, দেবাপি ও বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয় হইয়াও ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিয়াছিলেন (মহাভারত শল্য ৪০)। ক্ষত্রিয় জনক ব্রাহ্মত্ব লাভ করেন (শতপথ ব্রাহ্মণ)।
👉 শুধু তাহাই নয়—
"জাতো ব্যাসস্ত কৈবৰ্ত্তাঃ শ্বপাক্যাশ্চ পরাশরঃ। শুক্যাঃ শুকঃ কণাদাখ্যঃ ততোলুক্যাঃ সুতোহ ভবৎ ।। মৃগীজঋষ্যশৃঙ্গোঽপি বশিষ্ঠো গণিকাত্মজঃ। মন্দপালো মুনিশ্রেষ্ঠো নাবিকাপত্য উচ্যতে।। মান্ডব্যো মুনিরাজস্তু মণ্ডুকী গর্ভসম্ভবঃ বহুবোহন্যোঽপি বিপ্রত্বং প্রাপ্তা যে শূদ্রযোনয়ঃ ।।
( ভবিষ্য পুরাণ ব্রাহ্ম পর্ব্ব- ৪২ অধ্যায়)—বজ্ৰসূচী দ্রষ্টব্য
অর্থাৎ কৈবর্ত কন্যার গর্ভজাত মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ বেদব্যাস, শ্বপাক অনার্য্য কন্যার গর্ভজাত শাস্ত্রকর্তা পরাশর (ব্যাসের পিতা), ম্লেচ্ছ কন্যা শুকীর গর্ভজাত শুকদেব (ব্যাসের পুত্র; অনাৰ্য্য কন্যা উলুকীর গর্ভজাত বৈশেষিক দর্শনাকার কণাদ ; শূদ্র কন্যা মৃগীর গর্ভজাত ঋষ্যশৃঙ্গ ; বেশ্যার গর্ভজাত মহর্ষি মন্দপাল ; ব্যাধ জাতীয় কন্যা মন্ডুকীর গর্ভজাত ঋষি মান্ডব্য; ইহারা সকলেই ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন। বারবিলাসিনী জবালার পুত্র সত্যকাম ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন (ছান্দোগ্যোপনিষৎ)। শ্রীকৃষ্ণ ক্ষত্রিয় বংশে জন্মিয়াও অভিমন্যুর জাতকর্ম্ম প্রভৃতি শুভকর্ম্মে পৌরহিত্য করিয়াছিলেন (মহাভারত আদি পর্ব্ব ২২১ বর্দ্ধমান রাজবাটীর)। ক্ষত্রিয়া রেনুকার গর্ভে জন্মিয়া পরশুরাম ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন (মহাভারত-বন ১১৫।১৬)। অন্ধ মুনি বৈশ্য ছিলেন। তাঁহার শুদ্রানী স্ত্রীর গর্ভে জন্মিয়াছিলেন ব্রাহ্মণ সিন্ধু মুনি । ইহাকেই বধ করিয়া দশরথ ব্রহ্ম হত্যার পাপে লিপ্ত হইয়াছিলেন (রামায়ণ, অযোধ্যা ৬৩।৫১)। দাসী পুত্র কক্ষীবাপ পূজনীয় ঋষি এবং দাসীপুত্র নারদ দেবর্ষি হইয়াছিলেন। ব্রাহ্মণ জরৎকারু অনার্য্য নাগ কন্যাকে বিবাহ করিয়াছিলেন, ইহারই গর্ভে ব্রাহ্মণ আস্তিক মুনি জন্মগ্রহণ করেন। ইহাই হইল ভারতের স্বর্ণযুগ। এই জন্যই ভারত ছিল স্বাধীন ও পরাক্রমশালী।
👉 তখন ভক্ষ্যাভক্ষ্যেরই বিচারমাত্র ছিল কিন্তু আহারাদিতেও জাতিভেদ ছিল না।
🔴ঈশ্বর আমাদের জন্য আদেশ দিয়েছেন —
“ও৩ম্ সমানী প্রপা সহবোঽন্ন ভাগাঃ সমানে যোস্ক্লেসহবো যুনভূমি।।
(অথর্ব্ব বেদ ৩।৩০।৬)
অর্থাৎ হে মনুষ্য! তোমাদের জলপানের স্থান এক হউক, তোমাদের ভোজন এক সঙ্গেই হউক। আমি তোমাদিগকে একসঙ্গে মিলাইয়াছি।”
🔴ঈশ্বর আমাদের জন্য আরো আদেশ দিয়েছেন--
"সংগচ্ছধ্বংসংবদধ্বংসহরো মনাংসি জানতাম। দেবাভাগং যথাপূর্ব্বে সংজানানা উপাসতে । সমানো মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানং মনঃ
সহচিত্তমেষাম্ | সমানং মন্ত্ৰমভি মন্ত্রয়ে বঃ সমানেন বো হৰিষা জুহোমি৷৷"
(ঋগ্বেদ ১০/১৯১/২-৩)
অর্থাৎ হে মনুষ্য । তোমরা একসঙ্গে চল, একসঙ্গে মিলে আলোচনা করো, তোমাদের মন উত্তম সংস্কারযুক্ত হোক৷ পূর্বকালীন জ্ঞানী পুরুষেরা যেরূপ কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করেছেন তোমরাও সেই রূপ করো। তোমাদের সকলের মত এক হোক, মিলন ভূমি এক হোক, মন এক হোক, সকলের চিত্ত সম্মিলিত হোক। তোমাদের সকলকে একই মন্ত্রে সংযুক্ত করেছি। তোমাদের সকলের জন্য উপভোগ একই প্রকারের দিয়েছি।
👉 অতএব এটাই প্রমান হলো যে অতীতে বিবাহ বন্ধনে জাতি,বংশ বা বর্ণের কোন ভেদাভেদ ছিল না। তাই সকলের কাছে বিশেষ অনুরোধ জাতপাতের ভেদাভেদ না করে সনাতনী হিন্দু হলেই ছেলে-মেয়েকে বিবাহ দিন।🙏