26/04/2025
*পণ্ডিতের চৈতন্য লাভ*
সেকালে শ্যামাপদ ন্যায়বাগীশ নামে একজন নামী পণ্ডিত ছিলেন। তিনি নানা শাস্ত্রে, বিশেষ করে ন্যায় ও ব্যাকরণে দারুণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁর এই জ্ঞান ও বিদ্যার জন্য বিদ্বজ্জনেরা তাঁকে বিশেষ শ্রদ্ধা করতেন। তবে তাঁর মনে নিজের বিদ্যা বুদ্ধি নিয়ে একটু অহঙ্কারও ছিল।
শ্যামাপদ পণ্ডিত থাকতেন হুগলী জেলার আঁটপুর গ্রামে। পরে এই আঁটপুর বিশেষভাবে বিখ্যাত হয়ে ওঠে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের এক অনুগত শিষ্য প্রেমানন্দ, অর্থাৎ বাবুরাম মহারাজের জন্যে।
বাবুরামের আঁটপুরের বাড়িতেই রামকৃষ্ণদেবের এগারজন সাক্ষাৎ শিষ্য, নরেন্দ্রসহ, বিরজা হোম করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তবে এই ঘটনার আগে শ্যামাপদ ও ঠাকুরের আলাপ হয়।
শ্যামাপদ ন্যায়বাগীশ ঠাকুরের নাম ও খ্যাতি শুনে, শরৎ (পরবর্তীতে সারদানন্দ) ও শশী (পরবর্তীতে রামকৃষ্ণানন্দ) ঠাকুরের সেবা করতে আসার পরে, একদিন দক্ষিণেশ্বরে এসে ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করেন।
পাণ্ডিত্যের জন্য শ্যামাপদবাবুর নাম বাংলার নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁকে ডাকা হত শাস্ত্রের বিধান দেওয়ার জন্য। ধনী লোকেদের বাড়িতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যজ্ঞ-যজন- পৌরহিত্য ইত্যাদি কাজেও তিনি নিয়মিত আমন্ত্রিত হতেন। এসব কাজ থেকে ভালোই রোজগার হত তাঁর।
জীবনের প্রায় পরিণত বয়স পর্যন্ত তিনি কেবল মাত্র শাস্ত্রচর্চা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। তিনি কিন্তু কখনো ধর্মের গভীরতর তত্ত্ব নিয়ে ভাবেননি, বা অধ্যাত্মজগতের প্রতি কোনো আকর্ষণও বোধ করেননি। সেই অভাব বা ঘাটতির কথাও কখনো তাঁর মনে জাগেনি।
আত্ম-সন্তুষ্ট ছিলেন শুকনো পাণ্ডিত্যের পরিধিতে। শাস্ত্রজ্ঞানের অহঙ্কারে অভিমানে তিনি পূৰ্ণ ছিলেন।
এই সময়েই একদিন উত্তরপাড়া থেকে তাঁর কাছে নিমন্ত্রণ এল। নিমন্ত্রণটি পাঠিয়েছিলেন সেখানকার বিখ্যাত জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়।
তিনি ছিলেন সমাজে প্রতিষ্ঠিত একজন ধনী ব্যক্তি, বিদ্যোৎসাহী এবং নানা জনকল্যাণমূলক কাজের পৃষ্ঠপোষক।
তাঁর নিজের সংগ্রহ করা বিরাট এক গ্রন্থাগার পরে তাঁরই স্মৃতিতে সাধারণ পাঠাগার হিসেবে গড়ে ওঠে উত্তরপাড়ায়।
শ্যামাপদ পণ্ডিতের যেসব প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাঁদের মধ্যে জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন অন্যতম।
সেদিন জয়কৃষ্ণবাবুর পরিবারের কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপলক্ষে শ্যামাপদ পণ্ডিতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে কিছু সময় পর বৈঠকখানায় দুজনের দেখা হয়। শ্যামাপদ পণ্ডিত বৈঠকখানায় ঢুকে দেখলেন, গৃহস্বামী চুপচাপ বসে একটি বই পড়ছেন।
জয়কৃষ্ণবাবুর হাতে ছিল ‘হরিদাসের গুপ্ত কথা’ নামের একটা বই। বইটি সেই সময় খুবই বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় ছিল। এর আকার ছিল বড়, কিন্তু তবুও একাধিকবার বইটি ছাপা হয়েছিল-সম্ভবতঃ এগারোবার, যা সেকালের বাংলা বইয়ের ইতিহাসে বিরল ঘটনা ছিল। বইটির ভাষা ছিল কথ্যভাষা, কিন্তু সেটা ছিল দারুণ সুবিন্যস্ত ও একটা গোছানো উপস্থাপন। সেই যুগে এই বইটা ছিল কথ্যভাষার চমৎকার ব্যবহার সম্বলিত ও সাহিত্য পরিপাট্যের এক উজ্জ্বল উদাহরন।
সে যা হোক, জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় তখন গুপ্তকথা পাঠ করছিলেন বৈঠকখানায়। তাঁকে দেখে পণ্ডিত শ্যামাপদ জিজ্ঞাসা করলেন, 'কি বই পড়ছেন।'
জয়কৃষ্ণ জানালেন পুস্তকটার নাম। শুনে, পণ্ডিত মশাই সহাস্যে বললেন, 'আপনার জীবন তো প্ৰায়
শেষ হয়ে এল। এখন আর গল্প উপন্যাস পড়া কেন? এসব ছেড়ে এবার গভীর তত্ত্ব সম্বলিত গ্রন্থ পাঠ করুন'।
এমন স্পষ্ট ভাষণেও কিন্তু জয়কৃষ্ণ বিরক্তিবোধ না করে তিনিও সোজা বলে দিলেন, 'তত্ত্ব কথাও অনেক পড়েছি। কিন্তু বুঝতে পেরেছি যে ওসব পড়লেও কিছুতেই কিছু হয় না।'
শ্যামাপদ ন্যায়বাগীশ ওরকম উলটো কথা শুনে একেবারে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর চটপটে মুখে একটাও উত্তর এল না। শুধু তাই নয়, তাঁর মনে হঠাৎ একটা তীব্র আত্মজিজ্ঞাসা জেগে উঠল। তিনি সচেতন হয়ে নিজের কথাই ভাবতে লাগলেন—ঠিক তো, আমি নিজেই বা গভীর তত্ত্ব থেকে কী বুঝেছি?
এতদিন ধরে কত সহস্র শাস্ত্র পড়ে এসেছি, কত আলোচনা করেছি। কিন্তু লাভ কী হয়েছে? বইয়ের পর বই পড়েছি, ব্যাখ্যা দিয়েছি, কিন্তু আসল জিনিসটা কোথায়? আমার তো অনেকটা জীবন কেটে গেল এইসব নিয়েই। কিন্তু এর মধ্যে কোনো আসল সার্থকতা পেলাম না। এখন কী করব?
সাধনা-ভজন করার মতো শিক্ষাও তো আমার নেই। তাহলে মুক্তি হবে কী করে? এইসব ভাবনা তাঁকে ভীষণ চিন্তিত করে তুলল।
এই চিন্তার মধ্যেই হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে গেল শাস্ত্রের একটা বিশেষ কথা-‘সাধু সঙ্গ করলে আসল বস্তু পাওয়া যায়।’ কথাটা তাঁর মনে বেশ গভীর প্রভাব ফেলল।
এরপর তিনি জয়কৃষ্ণের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে মনে মনে পাকা সিদ্ধান্ত নিলেন-এবার সাধুদের সঙ্গ করতেই হবে, মুক্তির পথ তো ওখানেই। আঁটপুরে ফিরে তিনি এ নিয়ে তৎপর হয়ে উঠলেন। কিন্তু সাধু খুঁজতে গিয়ে পড়লেন বড় বিপদে। কোথায় পাবেন এমন একজন সাধু? অনেক জায়গায় খোঁজ করেও তিনি কারও সন্ধান পেলেন না।
তবু আশায় আশায় দিন যাপন করতে লাগলেন ।
এইসময় শুনলেন দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসদেবের
কথা। গঙ্গার পূর্বকূলে দক্ষিণেশ্বর পল্লী। সেখানকার কালী মন্দিরে এই সাধুর অধিষ্ঠান। তাঁর খুব নাম ডাক। বহু ভক্ত রয়েছেন তাঁর। অনেকে তাঁর কাছে যান এবং শুনে আসেন ঈশ্বরীয় কথা।
শ্যামাপদ ন্যায়বাগীশও দক্ষিণেশ্বরে যাবার মনস্থ করলেন, তখন একবার অহমিকাও জাগল বটে। এত বড় পণ্ডিত আমি৷ অযাচিত একজনের কাছে যাব !
কিন্তু নিজেরই গরজ । না গিয়ে উপায় কি। সাধু তো এ পর্যন্ত পাওয়া গেল না । এখানে গিয়েই দেখা যাক। ইনি কেমন সাধু। বস্তু কিছু পাওয়া যায় কিনা এঁর কাছে৷ এমনি ভেবে একদিন তিনি দক্ষিণেশ্বরে এলেন।
মন্দির চত্বরে জিজ্ঞাসাবাদ করে পরমহংসদেবের সংবাদও পেলেন। গঙ্গাতীরের কক্ষটিতে উপনীত হলেন বারান্দার ধারে।
তখন প্রায় অপরাহ্ণ। ঠাকুর তাঁর ঘরে উপনীত। সামনে বসে ভক্তেরা। তিনি ঈশ্বর-প্রসঙ্গ করছেন পরমানন্দে। শ্রোতারাও সাগ্রহে সেই কথামৃত পান করছেন।
সেদিন বেশ কয়েকজন সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন ওই ভক্তদের মধ্যে ৷ তা তাঁদের পোষাক পরিচ্ছদেই বোঝা যাচ্ছিল । কেউ কেউ এসেছেন গাড়িতে ।
ন্যায়বাগীশ দরজার সামনে থেকে ভেতরে একবার দেখলেন। দাম্ভিক ব্যক্তি, তাই পাদুকাও খুললেন না। সরাসরি ঢুকে গেলেন ঘরের মধ্যে।
আগন্তুকের এই ঔদ্ধত্যে কিন্তু ভক্তেরা সঙ্কুচিত হয়ে গেলেন। বিস্ময়ে কোন কথা ফুটল না তাঁদের মুখে। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের দিকে তাঁরা চাইলেন । তাঁর অধরে মৃদু হাসি। শ্যামাপদ ভক্তদের প্রশ্ন করলেন, 'এখানে পরমহংস কে? আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।'
সৌজন্য বা বিনয়ের লেশমাত্র নেই তাঁর কণ্ঠস্বরে। তা হোক, ভক্তরা ঠাকুরকে দেখিয়ে দিলেন । তিনি তক্তাপোষে বসে। পণ্ডিত তাঁকে দেখতে লাগলেন তীক্ষ্মদৃষ্টিতে। নিতান্ত সাদামাঠা চেহারা। পরণের কাপড় খানিকটা কাঁধে ওঠানো। সাধারণ গৃহস্থের
মতনই দেখতে। সাধুর কোন চিহ্নই শরীরে নেই। গৈরিক বসন বা জটাজাল, ভষ্ম মাখা অঙ্গ-কিছুই না। খাটো ধুতিটা লাল পাড়। পান খাওয়া মুখে লাল ছোপ !
এত সামান্য এক বামুন। মুখে পাণ্ডিত্যেরও কোন ছাপ নেই। এই ভেবে শ্যামাপদ ন্যায়বাগীশ ঠাকুরের পাশেই বসে পড়লেন।
কৌতুক ঝিলিক দিয়ে উঠল পণ্ডিতের মুখে চোখে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে তিনি ঘরের সব দেখে নিলেন। তারপর তামাশাচ্ছলেই ঠাকুরকে বললেন, ‘তুমিই তাহলে পরমহংস? দেখে তো বোঝবার উপায় নেই। বাঃ বেশ মজায় এখানে রয়েছ তো ! কি করে এতসব লোক জড় করলে। এমন জমাট আসর বসালে ।”
ঠাকুর নির্বাক, যদিও হাসি-মুখ । ভক্তরা স্তম্ভিত এমন বিশ্রী বাক্যে।
বক্তা তেমনি ভঙ্গিতেই শোনালেন, ‘আমি এতকাল শাস্ত্রচর্চা নিয়ে আছি। কিন্তু কি আর হল আমার । আর তুমি কেমন পরমহংস নাম নিয়েই এমন পসার জমিয়ে ফেললে।'
শ্রীরামকৃষ্ণ কোন প্রতিবাদ করলেন না। রাগ বা বিরক্তিও দেখা গেল না তাঁর। বরং হাসির আভাস মুখে চোখে । অতিথির দিকে তিনি চেয়ে আছেন ।
আগন্তুক ঘরের জিনিসপত্রও দেখছিলেন মূল্য বিচারের দৃষ্টিতে।
খাটে ধবধবে পুরু বিছানা। পরিচ্ছন্ন মশারি। পাশে আরেকটা ছোট খাট বা তক্তাপোষ, বসার জন্যে। তার একদিকে মোটা তাকিয়া। মেঝেয় পাপোশ পাতা। ঘরের চার দেয়াল পরিস্কার চুনকাম করা। নানা দেব দেবীর ছবি টাঙানো। ঘরের এক কোণে গঙ্গাজলের জালা।
তার পাশের পাটাতনে কয়েক রকমের ফল রাখা। একদিকে কাপড়ের আলনা। আর একদিকে মিষ্টান্ন ইত্যাদি খাবার রয়েছে। ওপরের শিকেয় ঝোলানো হাঁড়ি৷
দেয়ালের এক কোণে রাখা হু’কো, তার মুখে বকুল -পাতার নল। একটা জলপানের পাত্র। কোন জিনিসই মূল্যবান নয়। তবে সবই পরিচ্ছন্ন,
পরিপাটি।
অতিথি নিরীক্ষণ করছেন জিনিসগুলি। আর ঠাকুরও তাঁকে আঙ্গুল তুলে একেকটা দেখিয়ে দিচ্ছেন। যেন বাদ না যায় কিছু। তিনিও এখন কৌতুকী।
রঙ্গ করছেন দাম্ভিক পণ্ডিতকে নিয়ে। তবে নির্বাক হাবভাবে। ভক্তরাও এবার বুঝেছেন যে ঠাকুর আগন্তুকের সঙ্গে রহস্য-পর হয়েছেন।
জিনিসপত্র দেখে, পণ্ডিত এবার লক্ষ্য করলেন উপস্থিত ব্যক্তিদের দিকে৷ তারপর ঠাকুরকে ব্যঙ্গভরেই বললেন, 'এতজনকে তুমি কি করে বশ করলে ? দেখে মনে হয় এদের অনেকেই অবস্থাপন্ন ঘরের। এতগুলি লোককে তুমি ধোঁকা দিয়ে নষ্ট করছ নিজে পরমহংস নাম নিয়ে।'
শ্রীরামকৃষ্ণ এখনও মৌন। অন্য সকলেও হতবাক। বক্তা এবার ভক্তদের শোনাতে লাগলেন, পাণ্ডিত্য ফলিয়ে - 'আমার কাছে শোন, পরমহংস কাকে বলে। শাস্ত্রে পরমহংসের সব লক্ষণ দেওয়া আছে।' এই বলে, শাস্ত্রবাক্য ও তার ব্যাখ্যা শোনালেন।
তাঁর বক্তব্য, প্রকৃত পরমহংস নন শ্রীরামকৃষ্ণ।
ঠাকুর এইসব কথার মধ্যে তেমনি হাসিমুখে রইলেন। এদিকে বিকেল প্রায় শেষ। তাই দেখে তিনি সবিনয়ে বললেন অতিথিকে, ‘সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আজ তুমি এখানেই থাকো। অনেক দূরে তো তোমার বাড়ি।'
নিরভিমান ঠাকুর। পরম কারুণিক। এতক্ষণ এমন অপমানের প্রতিদানেও তাঁর সৌজন্য। ন্যায়বাগীশ কি ভেবে রাজি হলেন। সন্ধ্যা সমাগত দেখে তিনি গঙ্গাতীরে গেলেন, আহ্নিক করতে।
এদিকে ঘরে ভক্তদের সঙ্গে ঠাকুর কিছুক্ষণ কথা- বার্তা বলে তারপর বাইরে এলেন বাগানে। আপন মনে বেড়াতে লাগলেন।
কখনো ফুলগাছের সামনে। কখনো গঙ্গার ধারে। পঞ্চবটীতে। তার ডালে ডালে পাখিদের কাকলি শোনা যাচ্ছে ৷ আকাশে চাঁদ উঠেছে তারাদলের মধ্যে৷
খানিক পরে ঘরে ফিরলেন। দেব দেবীর দিকে বিচরণ করতে লাগলেন, ভাবাবিষ্ট হয়ে। ওদিকে পণ্ডিত গঙ্গাতীরে রয়েছেন। চাঁদনীতে। প্রথমে সন্ধ্যাহ্নিক করে নিলেন। তারপর চোখ বন্ধ করলেন ইষ্টদেবতার স্মরণ মননে।
কিন্তু, আশ্চর্য ব্যাপার। যতবার তিনি ইষ্টকে মনে করতে চাইলেন ততবারই শ্রীরামকৃষ্ণের মূর্তি ফুটে উঠল। একবার নয়, প্রতিবার ।
তিনি তখন চিন্তা করলেন, চোখ খুলে। তাঁর মনে হল, অনেক ক্ষণ পরমহংসের কাছে ছিলেন। তাই কেবল এসে পড়ছে তাঁর রূপ। পরে আর এমন হবে না ৷
এই ভেবে তিনি আবার চোখ বুজলেন। কি বিচিত্র ব্যাপার। এবারও তাঁর মনে এল না ইষ্টমূর্তি। কেবল পরমহংস দেখা দিতে লাগলেন, তাঁর মানসপটে। এতকাল যাঁকে স্মরণ মনন করেছেন, যে রূপ চিরকাল মুদ্রিত ছিল চিত্তে, আজ শত চেষ্টাতেও তার সাক্ষাৎ মিলল না।
এবার নিরস্ত হলেন ন্যায়বাগীশ। ব্যাপারটি আবার বিবেচনা করতে চাইলেন । কিন্তু কোন কারণ ঠিক করতে পারলেন না।
এখন তাঁর মনে বিস্ময়ের চেয়ে বেশি জাগল এক সংশয়। বার বার চেষ্টা করেও ইষ্টদেবকে দেখতে পাচ্ছিনা, কেবলই পরমহংসের মূর্তি আসছে, তবে কি ইনিই আমার ইষ্ট?
পণ্ডিত চক্ষু মুদ্রিত করলেন পুনরায়। সন্দেহ এবার ধারণায় পরিণত হল ৷ প্রত্যয় করলেন যে পরমহংস -দেবই তাঁর ইষ্ট। তিনি চোখ মেলে উঠে দাড়ালেন। ছুটে গেলেন ঠাকুরের ঘরে । কোথায় সেই গর্বোদ্ধত ভাব। ঠাকুরের পাশে বসাও আর নয়। তাঁর পায়ের নীচে বসলেন মেঝেতে।
শ্রীরামকৃষ্ণ খাটে ভাবাবিষ্ট হলেন । আবেশের মধ্যে ডান পা রাখলেন পণ্ডিতের মাথায় ৷ ন্যায়বাগীশ এতক্ষণে সেই চরণের মাহাত্ম্য বুঝেছেন।
তিনি সসম্ভ্রমে পা দুটি নিলেন আপন হাতে। আর ঠাকুরের স্তব করতে লাগলেন।
চোখের জলে আপ্লুত হয়ে বার বার বললেন, 'আমায় চৈতন্য দিন । ভক্তি দিন।'
তারপর ঠাকুরের চরণ ধরে প্রার্থনা জানালেন, ‘রূঢ় বাক্য উচ্চারণের জন্যে আমায় মার্জনা করুন, দেব।'
আর ভক্তদের দিকে ফিরে বললেন, 'ইনি মানব দেহে ঈশ্বরের অবতার। আমি অন্ধ ছিলুম আমার পাণ্ডিত্যের দম্ভে। তাই এই জ্যোতি আমার চোখে পড়েনি। কিন্তু তিনি পতিতপাবন। আমাদের মত ব্যক্তিকে ত্রাণ করতে এসেছেন। তিনি আমার অপরাধ আগেই ক্ষমা করেছেন। এখন আপনারা আমায় মার্জনা করুন।’
প্রণাম নিও ঠাকুর।
দিলীপকুমার মুখোপাধ্যায়ের লিখিত অলৌকিক রহস্যে রামকৃষ্ণ থেকে সংগৃহীত।
।।সংগৃহীত তথ্য