08/09/2026
🔴রাজা হরিশ্চন্দ্র—সত্য রক্ষার এক কঠিন পণ তাঁকে রাজসিংহাসন থেকে টেনে নামিয়ে এক মুহূর্তের মধ্যে ভিখারির দশা এনে দিয়েছিল।
একদিন দেবর্ষি নারদ স্বর্গসভায় হরিশ্চন্দ্রের সত্যবাদিতা ও ধর্মপরায়ণতার উচ্চ প্রশংসা করলে, মহর্ষি বিশ্বামিত্র তা পরীক্ষার ব্রত নেন।
বিশ্বামিত্র তাঁর স্বপ্নের এক ঘটনার কথা রাজাকে জানান, যেখানে রাজা তাঁকে নিজের সমস্ত রাজত্ব দান করার কথা দিয়েছিলেন। স্বপ্নের কথা হলেও রাজা হরিশ্চন্দ্র বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তাঁর পূর্ণ রাজ্য বিশ্বামিত্রকে দান করে দেন।
দুঃখে মোড়া সেই যাত্রাপথ আরও মর্মান্তিক হয়ে ওঠে যখন বিশ্বামিত্র দান গ্রহণের পর দক্ষিণা হিসেবে ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা দাবি করেন। সমস্ত রাজত্ব ও সম্পত্তি দান করে দেওয়ায় হরিশ্চন্দ্রের কাছে সেই দক্ষিণা দেওয়ার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
বিশ্বামিত্র মুনি রাজাকে এক মাসের সময় দেন দক্ষিণা পরিশোধ করার জন্য।
সহায়-সম্বলহীন রাজা তখন নিজের প্রিয়তমা স্ত্রী শৈব্যা এবং একমাত্র অবুঝ পুত্র রোহিতাশ্বকে পর্যন্ত কাশীধামে এক ব্রাহ্মণের কাছে দাস হিসেবে বিক্রি করতে বাধ্য হলেন। তিনি নিজেও চণ্ডালের দাস হিসেবে শ্মশানে চাকরি নেন। শ্মশানে মৃ'তদেহ দা'হ করার বিনিময়ে কর আদায় করা ছিল রাজা হরিশ্চন্দ্রের কাজ। একদিন এমন এক ম'র্মান্তিক পরীক্ষা এসে হাজির হলো, যা পাথর হৃদয়কেও গলিয়ে দেয়। সাপের কা'মড়ে ম'র্মান্তিক মৃ'ত্যু হয়েছে তাঁর একমাত্র আদরের ছেলে রোহিতাশ্বের। পুত্রশোকে পাথর হয়ে রানী শৈব্যা ছিন্নবস্ত্র পরে রক্তিম চোখে মৃ'ত ছেলেকে নিয়ে শ্মশানে এলেন দা'হ করতে।
শ্মশানের নিয়ম অনুযায়ী, মৃ'তদেহ সৎকার করতে হলে নির্ধারিত কর বা শুল্ক চণ্ডালকে প্রদান করতে হতো। রাজা হরিশ্চন্দ্র নিজের স্ত্রী ও মৃ'ত সন্তানকে চিনতে পারলেও, তিনি শ্মশানের নিয়ম ও মালিকের প্রতি সততা ভঙ্গ করেননি। রাজধর্ম ও সত্য পালনের চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবে তিনি কর ছাড়া পুত্রকে দা'হ করতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অস্বীকার করেন।
রানি শৈব্যার কাছে শ্মশানের শুল্ক দেওয়ার মতো কোনো অর্থ বা মুদ্রা ছিল না; তাঁর গায়ে পরিধানের সম্বল বলতে ছিল মাত্র একখণ্ড চেরা কাপড়। রানি সেই কাপড়ের একটি অংশ ছিঁড়ে কর হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
স্বামী-স্ত্রীর এই চরম নিষ্ঠা ও বেদনার দৃশ্য দেখে স্বর্গমণ্ডল কেঁপে ওঠে। দেবতারা আর সহ্য করতে না পেরে মর্ত্যে নেমে আসেন।দেবর্ষি নারদ, বিশ্বামিত্রসহ সকল দেবতারা মর্ত্যে নেমে এসে হরিশ্চন্দ্রের এই অটল সত্যনিষ্ঠা ও ধর্মবোধ দেখে ধন্য ধন্য করেন।
রোহিতাশ্বকে জীবনদান করা হয় এবং হরিশ্চন্দ্র তাঁর হারানো রাজ্য ও সম্মান ফিরে পান।
🔴এই করুণ ও পরম পবিত্র আখ্যানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্নদা একাদশী ব্রতের মহিমা। অন্নদা একাদশী ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিতে পালিত হয়। হরিশ্চন্দ্র যখন চরম দুর্দশা ও অন্তহীন কষ্টের মধ্যে শ্মশানে চণ্ডালের দাসত্ব করছিলেন, তখন মহর্ষি গৌতম তাঁকে এই ব্রতের কথা উপদেশ দিয়েছিলেন।
সত্য ও ধর্মের পথ সবসময় কুসুমাস্তীর্ণ নয়, বরং তা কণ্টকাকীর্ণ। কিন্তু শত বিপদের মাঝেও এই পথে টিকে থাকাই মানুষের নৈতিকতার সর্বোচ্চ জয়।