03/03/2026
❤️💛হোলি উৎসব ও তার ইতিহাস 💜🧡
হোলি উৎসব কি? কিভাবে এর প্রচলন হলো? হোলি ও দোল উৎসবের মধ্যে পার্থক্য আছে কি ? মাহাত্ম্য কি এই উৎসবসমূহের? তা নিয়ে কিছু কথা তুলে ধরা হলঃ
বাংলা ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই দোল বা হোলি উৎসব পালন করা হয়। বিবাহিত নারীরা তাদের পরিবারের কল্যাণ এবং মঙ্গল কামনায় দোল উৎসবে মেতে উঠেন এদিন। বাংলাদেশের বাইরেও নানা দেশে এই উৎসব ব্যাপকভাবে পালিত হয়।
স্কন্দপুরাণের পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু ছিলেন ঘোর বিষ্ণুদ্বেষী। অহংকারী এই রাজার ওপর ব্রহ্মার বরদান ছিল যে, দিন বা রাত, গৃহের ভিতর বা বাইরে, মানুষ বা পশু কেউই হিরণ্যকশিপুকে বধ করতে পারবেনা। তাই নিজেকে ঈশ্বর ঘোষণা করেছিলেন তিনি। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর রাজ্যের প্রত্যেকেই যেন কেবল তাঁর উপাসনা করে, অন্য কারোর নয়। এই রাজা হিরণ্যকশিপু নিজেই তার সন্তানকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন কারণ তার পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর পরমভক্ত। এজন্য হিরণ্যকশিপু বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করেন প্রহ্লাদের প্রাণনাশের। কিন্তু বিষ্ণুর আশীর্বাদে প্রহ্লাদের কোনও ক্ষতি হয় না।
হিরণ্যকশিপু নিজের বোন হোলিকার কাছেও সাহায্য প্রার্থনা করেন। রাজার আদেশে তারই বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে বসেছিলেন। কারণ আগুনকে প্রতিরোধ করার মতো ক্ষমতা ছিল হোলিকার, তবে সেই আগুনেই পুড়ে গিয়েছিলেন হোলিকা, আর অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছিলেন প্রহ্লাদ। আর এর থেকেই পালিত হচ্ছে হোলিকা দহন। এরপরই ভগবান বিষ্ণু নৃসিংহ অবতার ধারণ করে হিরণ্যকশিপুকে দিন ও রাতের সন্ধিকালে নখ দিয়ে রক্তাক্ত করে বধ করেন। হোলিকার এই অগ্নিদগ্ধ হওয়ার কাহিনিই দোলের পূর্বদিনে অনুষ্ঠিত হোলিকাদহন বা চাঁচর উৎসবের সঙ্গে সম্পর্কিত।
#হোলিকা_দহন অশুভ শক্তির বিপরীতে শুভের জয় নির্দেশিত করে। আজও বিভিন্ন জায়গায় দোল পূর্ণিমার আগের দিন ন্যাড়াপোড়া, চাঁচর বা হোলিকা দহন উৎসব পালিত হয়। আর পরের দিন অর্থাৎ দোল পূর্ণিমার দিন আনন্দ উৎসব পালন করা। হোলিকা থেকেই হোলি শব্দের উৎপত্তি। ধারণা করা হয় সেখান থেকেই উৎপত্তি এই উৎসবের।
হোলি উৎসবের উৎপত্তির সাথে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সম্পৃক্ততার ইতিহাসও লক্ষণীয়। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, দোল পূর্ণিমার দিনই বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীনীদের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। যা পরবর্তীতে, সময়ের সাথে সাথে বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়ে আজকের হোলি উৎসব এর রূপ নিয়েছে। তা নিয়েই নিচে সংক্ষিপ্ত আলোচনা আছে।
শ্রী কৃষ্ণকে স্মরণ করার পিছনে একটি কাহিনীও রয়েছে। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, একবার কৃষ্ণের মনে ভাবনা আসে যে, উজ্জ্বল বর্ণের রাধা ও অন্যান্য গোপিরা তার শ্যাম বর্ণের কারণে পছন্দ করবে কিনা। এতে কৃষ্ণের মা কৃষ্ণের আক্ষেপে ক্লান্ত হয়ে তাকে বলেন, রাধার কাছে গিয়ে সে রাধার মুখমণ্ডলকে কোনো রঙ দিয়ে রাঙ্গিয়ে দিতে পারে। কৃষ্ণ তাই করে, কৃষ্ণ নিজের উপর এবং তার প্রিয় রাধা ও অন্যান্য গোপীদের উপর রঙ প্রয়োগ করে এবং এরপর রাধা ও কৃষ্ণ জুড়ি হয়ে যায়। এভাবে রঙে রঙে রঙ্গিন হয়ে উঠে চারিদিক। আর সেই দিনটি ছিল পূর্নিমার দিন যা আজ দোল পূর্ণিমা হিসেবে পালিত হয়। সেই থেকে রাধা এবং কৃষ্ণের রঙের খেলা হোলি হিসাবে স্মরণ করা হয়। রাধা ও কৃষ্ণের এই রঙ নিয়ে খেলাই হোলি বা দোলযাত্রা হিসেবে পালিত হয়।
হোলি উৎসবটি দোল বা দোলযাত্রা নাম হওয়ার সাথেও একটি বৈষ্ণব বিশ্বাস অর্থাৎ রাধা কৃষ্ণের প্রেমের বৈষ্ণবীয় উপাখ্যান যুক্ত আছে। বৈষ্ণবদের বিশ্বাস, ফাল্গুনী পূর্ণিমার তিথিতে বৃন্দাবনের কুঞ্জবনে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধিকা দোলায় চড়েছিলেন। দোলায় ঝুলনকালে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধিকা প্রেমের রঙে রঞ্জিত হয়েছিলেন। গোপবালারা সহ সবাই তখন রঙ খেলায় মেতে উঠেছিলেন। পন্ডিতরা বলেন, রাধাকৃষ্ণের ঝুলন থেকেই দোল কথার উদ্ভব। আর এই পূর্ণিমা তিথি থেকেই বৈষ্ণবরা অপূর্ব দোল উৎসব সূচনা করেন।
আবার এই দোল পূর্ণিমা তিথিতেই আবির্ভাব হয়েছিল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর। রাধাকৃষ্ণের জুড়ি হয়েছিল যেই তিথিতে ধরাধামে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবও সেই তিথিতে। তাই এই দিনটির মাহাত্ম্য অনেক। এই মহাপুরুষ, সেই সময় ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থায় বদল আনতে মানুষকে কৃষ্ণপ্রেম এর উপর ভরসা করতে শিখিয়েছিলেন। তিনি যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই চলেছে শ্রী কৃষ্ণের মাহাত্ম্যকথা। মনে করা হয় তখন থেকেই কৃষ্ণপ্রেমে আপ্লুত বাঙালিরা আরো নতুনত্বের সাথে ফাল্গুনী তিথিতে দোল বা দোলযাত্রা উৎসব পালন করে আসছেন।
আর অন্যদিকে হোলি উৎসব যে বার্তা দেয় তা হলো রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনীর মাহাত্ম্যকে স্মরণ, হোলিকারূপী অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়ের আনন্দ উৎসব। হোলি বা দোলযাত্রা উৎসব এর নামগত যত পার্থক্যই থাকুক না কেন, উৎসবের আঙ্গিকটা সর্বত্রই এক ধরণের। হোলি ও দোলের মধ্যে পার্থক্য শুধু ইতিহাসগত। তাছাড়া হোলি ও দোল উৎসবের মূল কেন্দ্রটি একই তা হলো "রাধাকৃষ্ণের অপার প্রেমলীলা"। অর্থাৎ, হোলি বা দোলযাত্রা এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ উৎসব যা রাধা ও কৃষ্ণের শাশ্বত ও ঐশ্বরিক প্রেম উদযাপন করে।
শৈব ও শক্তিবাদের মতো অন্যান্য সনাতন ঐতিহ্যের মধ্যে হোলির কিংবদন্তি (লোকপরম্পরায় শ্রুত কাহিনি) এর তাৎপর্য, যোগ ও গভীর ধ্যানের ক্ষেত্রে শিবের সাথে জড়িত। দেবী পার্বতী শিবকে সংসারে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন ও এর জন্য বসন্ত পঞ্চমীতে কামদেবের কাছ থেকে সাহায্য চেয়েছিলেন। প্রেমের দেবতা শিবের দিকে তীর ছুঁড়েছিলেন। তার ফলে আদিযোগী শিব তাঁর তৃতীয় নয়ন খুলে কামদেবকে পুড়ে ছাই করেছিলেন। এতে কামদেবের স্ত্রী রতি (কামদেবী) এবং শিবের স্ত্রী পার্বতী উভয়েরই মন খারাপ করে। রতি চল্লিশ দিন ধরে তাঁর নিজস্ব ধ্যানমূলক তপস্যা সম্পাদন করলে, শিব বুঝতে পারেন এবং করুণা থেকে ক্ষমা করে দেন ও প্রেমের দেবতাকে পুনরুদ্ধার করেন। প্রেমের দেবতার এই প্রত্যাবর্তন, বসন্ত পঞ্চমী উৎসবের ৪০ তম দিনে হোলি হিসাবে পালন করা হয়। কাম কিংবদন্তি এবং হোলির এই তাৎপর্যটির বিশেষত দক্ষিণ ভারতে বিভিন্ন রূপ রয়েছে।
বৈষ্ণব ধর্ম ছাড়াও শাক্ত-শৈবরাও এই হোলি/দোল উৎসব পালন করেন। পরিবারিক, বৃহত্তর সমাজ জীবনের ক্ষেত্রে এই দোল পূর্ণিমার তথা হোলি উৎসবের গুরুত্ব অনেক।
🙏
#হোলিউৎসব #হোলি #দোলপূর্ণিমা #দোলযাত্রা