21/05/2026
👉🏻স্বামী অচলানন্দ স্বামীজীর সম্পর্কে বলছেন➖
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে স্বামীজীর বিশেষ দৃষ্টি ছিল। মঠে অগোছালো ভাব তিনি মোটেই দেখতে পারতেন না। প্রত্যেক জিনিস যাতে যথাস্থানে থাকে, বিছানাপত্র, কাপড়চোপড় সুপরিষ্কৃত থাকে, সেবিষয়ে তিনি লক্ষ্য রাখতেন। প্রত্যেকের বিছানার চাদর রোজ সকালে ঝাড়তে হোতো এবং রোদ হাওয়া লাগাতে হোতো, যাতে বিছানা পরিষ্কার থাকে ও ছারপোকা না থাকতে পারে। এজন্য তিনি কারো কারো বিছানায় শুয়ে পরীক্ষা করতেন। একবার মঠে স্বামীজী কি একটা অপরিষ্কার জিনিস দেখেছিলেন। আমি কাছে ছিলাম।
তিনি রাখাল মহারাজকে ডেকে বললেন; "রাজা, এমন অপরিচ্ছন্নতা কেন? মঠ যদি পরিষ্কার না রাখতে পারো, তবে গাছতলায় থাকলেই তো হয়। মঠ যখন হয়েছে, তখন ঠিক ঠিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।" এইভাবে তিনি সামান্য বিষয়েও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শিক্ষা দিতেন।
কারো নখে ময়লা থাকলে তিনি তার হাতে জল খেতে চাইতেন না। একদিন এজন্য তিনি আমাকে তিরস্কারই করেছিলেন। বলেছিলেন; "দ্যাখ্, তোর নখে যদি ময়লা থাকে, তবে তোর হাতে জল খাবো না।” হাতে জল লাগলে কাপড়ের কোঁচায় হাত মুছলে তিনি রাগ করতেন। একবার তাঁর বেদানা ছাড়িয়ে হাত ধুয়ে পরবার কাপড়ে হাত মুছেছিলাম। তা দেখে তিনি বললেন; "ঐ কাপড়ে হাত মুছে আবার আমাকে খাবার দিবি? খবরদার, কখনো এরূপ করিসনি।" এ-সবের জন্য তিনি তীব্র ভাষায় গালি দিয়েছেন।
প্রস্রাব করবার সময় তিনি জল নিতে বলতেন।
বলতেন; "যদি জল না নিস, তবে ঠাকুর বড় রাগ করেন। কাজেই প্রস্রাবের সময় জল নিবি এবং আমাকেও মনে করিয়ে দিবি।"
এইরূপে তিনি ঠাকুরের নাম করে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। শুনেছি, ঠাকুর নাকি এইরূপ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করতেন এবং শিষ্যদের তা শিক্ষা দিয়ে গেছেন। যেখানকার জিনিস সেখানে রাখা, গোছানো ভাব ঠাকুরও পছন্দ করতেন।
হরি মহারাজ বলতেন; "যার ভিতরে গোছানো ভাব আছে, তার বাইরেও গোছানো আছে। যার ভিতরে গোছানো নেই, তার বাইরেও গোছানো নেই।'
অভ্যাগত সাধু-ব্রহ্মচারীদের মধ্যে সাধুভাব জাগিয়ে রাখার জন্য তিনি যেভাবে শিক্ষা দিতেন এবং গুরুভ্রাতাদের যা বলতেন, তাই এখন বলছি। স্বামীজীর ইচ্ছা ছিল-মঠে দুই শ্রেণীর সাধু থাকবে। একদল নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী, আর একদল সন্ন্যাসী। নৈষ্ঠিক ব্রহ্ম-চারীরা আজীবন নিষ্ঠাবান ব্রহ্মচারী থাকবে। তারা দাড়ি-গোঁফ রাখবে, আত্মপাকী হবে, পঠন-পাঠন করবে এবং খুব নিষ্ঠার সঙ্গে চলবে। আর একদল সন্ন্যাসী থাকবে, তারা "বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়" এবং "আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ" (নিজের মুক্তি ও জগতের হিতের জন্য) জীবন যাপন করবে। কোন নূতন ব্রহ্মচারী মঠে প্রথম এলে তিনি তাকে বেলুড় গ্রাম ও তার নিকটবর্তী স্থানে ভিক্ষা করতে পাঠাতেন। তাকে ভিক্ষালব্ধ তন্ডুল নিজে পাক করে ঠাকুরকে ভোগ দিতে হোতো এবং পরে তা প্রসাদরূপে গ্রহণ করতে হোতো। সন্ন্যাসীদের মাঝে মাঝে তিনি মাধুকরী অন্নগ্রহণ করতে বলতেন। "আমরা সাধু"-এই ভাবটা সব সময় রাখতে বলতেন। এই ভাবটা কার্যে পরিণত করবার জন্য শরীরত্যাগের একমাস পূর্বে তিনি পূজনীয় রাখাল মহারাজ, মহাপুরুষ মহারাজ, শরৎ মহারাজ প্রভৃতিকে মাধুকরী করে আনতে বলেছিলেন। তাঁরা মাধুকরী করে আনলে স্বামীজী তা থেকে একটু অতি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেন। সেই সময় স্বামীজী পূজনীয় মহাপুরুষ মহারাজকে বলেছিলেন; "মাধুকরী-বৃত্তি ত্যাগ করবেন না, সহ্য হোক আর নাই হোক।" মহাপুরুষ মহারাজের তখন কাশীতে আসবার কথা হচ্ছিলো। আমরা যে সাধু-এই ভাবটি জাগিয়ে রাখাই স্বামীজীর উদ্দেশ্য ছিল।
তিনি সাধুদের সঙ্গে গৃহস্থদের বিশেষ মেশামেশি বা ঘনিষ্ঠতা করাও বেশি পছন্দ করতেন না। সাধুদের বিছানায় গৃহস্থদের বসা-তাঁর অপছন্দ ছিল। এমনকি গৃহস্থদের সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসে সাধুদের আহার করাও তিনি অপছন্দ করতেন। এজন্য মঠে প্রত্যেক সাধুকে তিনি নিম্নলিখিত শ্লোকটি মুখস্থ করতে বলতেনঃ
মেরুসর্ষপয়োর্যদ্, যৎ সূর্যখদ্যোতয়োরিব।
সরিৎসাগরয়োর্যদ্ যৎ তথা ভিক্ষুগৃহস্থয়োঃ।।
গৃহস্থদের সঙ্গে সাধুদের এক পঙক্তিতে খাওয়া সম্বন্ধে তিনি কত strict (কড়া) ছিলেন, তা নিম্নলিখিত ঘটনাটি থেকে বোঝা যাবে। তখন মঠে ঠাকুরঘরের নিচের হলে খাওয়া হতো। ভিতরে সাধুরা এবং বারান্দায় গৃহস্থরা বসতেন। একবার স্বামীজীর গৃহস্থ ভক্ত-শিষ্য সাঁতরাগাছির গোবিন্দবাবু ভিতরে বসলে স্বামীজী তাঁকে বললেন; "তুমি সাধুদের সঙ্গে বসেছ কেন? বাইরে এসে বোস।" পরে ভক্তটি বাইরে বারান্দায় এসে বসলেন। এইরূপে তিনি গৃহস্থদের সঙ্গে সাধুদের পৃথকভাব বজায় রাখতে চেষ্টা করতেন।
স্বামীজী কাজ-কর্ম ও ধ্যান-ধারণা-দুটিই একসঙ্গে করতে বলতেন; বলতেন, "একসঙ্গে তো বেশিক্ষণ ধ্যান-ধারণা করতে পারবে না, অতএব ধ্যান-ধারণার পর বাকি সময় কাজ-কর্মে লিপ্ত থাকবে। কাজ-কর্মে মন শুদ্ধ হয়।" ধ্যান-ধারণা বা কাজ-কর্ম না করে শুধু গল্প করা বা আড্ডা দেওয়া তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। কুড়েমি তিনি অত্যন্ত ঘৃণা করতেন। যখন কোনো কাজ-কর্ম থাকতো না, তখন কোনো কাজ আবিষ্কার করে আমাদের তাতে লাগিয়ে দিতেন। চুপ করে থাকা বা গল্প করা তাঁর একেবারে রীতিবিরুদ্ধ ছিল। স্বামীজী নিজে পঠন-পাঠন, পড়াশুনার চর্চা যেমন করতেন, তেমনি মঠে যাতে এসব নিয়মিতভাবে হয়, তাতেও উৎসাহ দিতেন। নিয়মিত পঠন-পাঠন, রাত্রে আহারের পর আলোচনা-ক্লাস তাঁর সময়ে খুবই হতো। সেবাকার্যের জন্য পূজনীয় গঙ্গাধর মহারাজের অনাথাশ্রম ও কাশীর সেবাশ্রম—এই দুই প্রতিষ্ঠানই তখন আরম্ভ হয়েছিল। কাশীর সেবাশ্রমের প্রতি তাঁর খুবই সহানুভূতি ছিল এবং এবিষয়ে সেবকদের তিনি খুব উৎসাহ দিতেন। এজন্য তিনি নিজে আবেদন পর্যন্ত লিখে দিয়েছিলেন। আগে সেবাশ্রমের নাম ছিল "Home of Relief—Poormen's Relief Association"। এটি তখন গৃহস্থদের অধীনে ছিল। তিনি বললেন; "Home of Relief কিরে? কেউ কি কাউকে রিলিফ দিতে পারে? 'Home of Service' নাম দে। ত্যাগীদের হাতে এসব কাজ দে। তা না হলে কি এসব জিনিস স্থায়ী হতে পারে?" স্বামীজীর দেহত্যাগের পর কাশী সেবাশ্রমের নাম 'Home of Service' রাখা হোলো এবং কর্মীরা এটি রামকৃষ্ণ মিশনের হাতে দিয়ে দিলেন। জীবৎকালে কলকাতার প্রসিদ্ধ ধনী কালীকৃষ্ণ ঠাকুর পূজনীয় স্বামী নিরঞ্জনানন্দকে বলেছিলেন, "আমি কাশীর অনাথাশ্রমের যা কিছু দরকার, করে দেবো।” এই সংবাদ শুনে স্বামীজী স্বামী নিরঞ্জনানন্দকে এক পত্রে অন্যান্য খবরের মধ্যে এ কথাও লেখেন, "কালীকৃষ্ণ ঠাকুর যদি কাশীর অনাথাশ্রমের জন্য কিছু করে দেন, তবে তাঁর সহস্র শিব-প্রতিষ্ঠার ফল হবে।"
স্বামীজী নিজেও একদিন কালীকৃষ্ণ ঠাকুরের কাছে যেতে মনঃস্থ করেছিলেন। তাতে গঙ্গাধর মহারাজ বললেন; "একজনের কাছ থেকে আমরা সব নেবো কেন? সকলে মিলে দেবে, তাই হচ্ছে ঠিক।" ১৯০২ খ্রীস্টাব্দে স্বামীজী যখন কাশীতে আসেন, তখন তিনি সেবাশ্রমের কার্য দেখে খুব আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন; "গৃহস্থ, ব্রহ্মচারী– যত কর্মী আছে, সব আমার কাছে নিয়ে আয়। সবাইকে দীক্ষা দেবো।” সেসময় যে-কয়জন কর্মী ও সেবক ছিলেন, সবাইকেই তিনি দীক্ষা দিয়েছিলেন।