28/04/2018
বুদ্ধ পূর্ণিমার তাৎপর্য
++++++++++++++++++++++++++++
কঠোর ধ্যানমগ্নে থাকতে থাকতে সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থের সমস্ত শরীর এক চর্মাবৃত কঙ্কালে পরিণত হলো। এতেও তার অভীষ্ট লক্ষ্য সিদ্ধ হচ্ছে না, তখন তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করে আবার ধ্যানেরত হলেন। সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থ অভিনব সাধনা পদ্ধতি অবলম্বন করে হৃত স্বাস্থ্য ফিরে পেলেন। বৈশাখীর শুক্লপক্ষের চাঁদ যতই বাড়তে শুরু করল ততই আসন্ন সিদ্ধিলাভের পুলকস্পর্শে তার হৃদয় দ্রবীভূত হচ্ছে। সেদিন ছিল বৈশাখী পূর্ণিমার চতুর্দশ তিথি।
শতদল বড়ুয়া
আজ শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। আজকের এ পূর্ণিমা তিথিক্ষণে মাতৃদেবী মহামায়া বাপের বাড়িতে যাওয়ার জন্য রাজা শুদ্ধোধনের কাছে অভিলাষ জ্ঞাপন করলেন। রাজা কালবিলম্ব না করে রাজন্যবর্গসহ সকল দাসদাসীকে ডেকে রানীর বাপের বাড়িতে যাওয়ার সকল ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিলেন। দেবদহে নগর ও কপিলাবস্তু নগরীকে অপরূপে সজ্জিত করা হলো নানা বর্ণের পুষ্পরাজী ও ধর্মীয় পতাকাসমেত।
রানীকে বহনকারী রথ দেবদহ নগরের অভিমুখে যাত্রা করে লুম্বিনী কাননে যখন পেঁৗছালো তখন রানীর প্রসববেদনা শুরু হলো পরক্ষণে পালবৃক্ষের উন্মুক্ত আকাশতলে বোধিসত্ত্ব ভূমিষ্ঠ হলেন। সপ্তপদ সামনে অগ্রসর হয়ে তিনি উদাত্ত কণ্ঠে তখন ঘোষণা করেছিলেন। "জগতে আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ।" বোধিসত্ত্ব জীবনে তিনি তিন জন্মে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে কথা বলেছিলেন। জন্মগুলো হলো : ওষুধ প-িত জন্মে, বেসাসন্তর জন্মে এবং বুদ্ধাংকুর সিদ্ধার্তরূপে জন্মগ্রহণের সময়ে। এতদসঙ্গে দেবী যশোধরা, সারথী ছন্দ, অমাত্য কালুদায়ী, হস্তরাজ আজানেয়্য, অশ্বরোজ কণ্টক, মহাবোধি বৃদ্ধ ও চারি নিধিকু- জন্ম নিয়েছিল।
সেই সময়ে শুদ্ধোধন কুল পুরোহিত সমাপত্তি লাভী কালদেবল ঋষি দেবলোকে বিশ্রাম করতে গিয়ে দেখলেন দেবগণ উৎসবে মাতোয়ারা। তিনি এত আনন্দ-উল্লাসের কারণ কী জানতে চাইলে দেবগণ বললেন_ "মানবকূলে রাজা শুদ্ধোধনের ঔরসে মায়াদেবীর গর্ভের কালজয়ী বুদ্ধাঙ্কুর জন্মগ্রহণ করায় আমরা উৎসবে মেতে উঠেছি।"
কালদেবল ঋষি দেবগণের নিকট হতে এ সংবাদ শুনে দেবলোক থেকে কপিলাবস্তু নগরীতে অবতরণ করে রাজপ্রাসাদে গিয়ে রাজা শুদ্ধোধনের নিকট ইচ্ছা পোষণ করলেন রাজপুত্রকে একবার দেখানোর জন্য। কালদেবল তাপসের আশীর্বাদ কামনা করে রাজা আপন ছেলেকে অলঙ্কৃৃত করে বন্দনা করার জন্য নিয়ে আসলে ছেলের দুই পা তাপসের জটা স্পর্শ করলো।
অসতর্ক হয়ে যদি ঋষি বোধিসত্ত্বের মাথায় পা রাখতেন তাহলে ঋষির নিজের বিপদের সম্ভাবনা ছিল বেশি। কারণ কালদেবল ঋষি অনাগত চলি্লশকল্পের বিষয়ে চিন্তা করতে পারতেন। তিনি দেখলেন এ শিশু আগামীতে সম্যক সম্বুদ্ধ হবেন। এতে তার হৃদয় মন আনন্দে পুলকিত হয়ে উঠলো। এরপর তিনি একবার হাসলেন আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।
রাজা শুদ্ধোধন ঋষির এসব আচরণ নীরবে অবলোকন করলেন আবার পরক্ষণে ছেলের অমঙ্গল হবে এই আশঙ্কায় রাজা ঋষিকে বললেন_ "ঋষিবর আপনি এ রকম করছেন কেন? আমাকে বিস্তারিত খুলে বলুন।" ঋষি এবার রাজাকে উদ্দেশ্য করে বললেন_ আপনার এ শিশু সামান্য শিশু নহে। তিনি হলেন স্বয়ং বুদ্ধাঙ্কুর। তিনি যখন সম্বোধি লাভ করবেন তখন আমি থাকবো না, এ আপসোসে কান্না করছি। আর তিনি যে জগৎ ত্রাণকর্তা বুদ্ধ হবেন। এটাই আমার আনন্দের কারণ।
কঠোর ধ্যানমগ্নে থাকতে থাকতে সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থের সমস্ত শরীর এক চর্মাবৃত কঙ্কালে পরিণত হলো। এতেও তার অভীষ্ট লক্ষ্য সিদ্ধ হচ্ছে না, তখন তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করে আবার ধ্যানেরত হলেন। সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থ অভিনব সাধনা পদ্ধতি অবলম্বন করে হৃত স্বাস্থ্য ফিরে পেলেন। বৈশাখীর শুক্লপক্ষের চাঁদ যতই বাড়তে শুরু করল ততই আসন্ন সিদ্ধিলাভের পুলকস্পর্শে তার হৃদয় দ্রবীভূত হচ্ছে। সেদিন ছিল বৈশাখী পূর্ণিমার চতুর্দশ তিথি।
জোৎস্নালোকে তার হৃদয়ে আনন্দের ঢেউ প্রবাহিত হচ্ছিল। তিনি উরুবেলা বটবৃক্ষের ছায়ায় ভাব-বিভোর হয়ে ধ্যানমগ্ন হলেন। সুজাতা আপন মনোরথ পূর্ণ হওয়ায় তার ইস্ট দেবতার পূজার অর্ঘ্য নিয়ে সেই বটবৃক্ষ তলে উপস্থিত হলেন। সুজাতা এদিক-সেদিকে দেখে আপন পূজার ডালি ক্ষীরভাত নবীন সন্ন্যাসীর হাতে তুলে দিলেন। যোগী সিদ্ধার্থ সুজার দেয়া ক্ষীরভাত ৪৯ গ্রাসে ভাগ করে পরিভোগ করেন। এতে তার দেহ ও মনের জড়তা দূরীভূত হলো। তার কৃচ্ছ্র সাধনার পুঞ্জিভূত গ্লানি অপসারিত হলে দূর হতে নৈরঞ্জনা নদীর কুলুকুলু আওয়াজ সিদ্ধার্থের কানে এলো। এতে তার দেহ-মনে অপূর্ব শিহরণ জাগলো।
জোৎস্না আলোকিত রাতে তিনি একের পর এক ধ্যানস্তর অতিক্রম করে চতুর্থ ধ্যানে উপনীত হলে রাতের প্রথম যামে সমাহিত চিত্তে তার অনাদি অনন্ত জীবনের ভাসমান জীবনচরিত্র একের পর এক তার স্মৃতিপটে উদিত হলো। যার নাম জাতিস্মর জ্ঞান। এতে তার জন্মজন্মান্তরের যবনিকাভেদ হলো। রাতের দ্বিতীয় যামে চ্যুতি উৎপত্তি জ্ঞান, জন্ম-মৃত্যুর জীবন রহস্য উদ্ঘাটিত হলো। সমস্ত মার সৈন্য হলো পরাভূত। তিনি হলেন, মৃত্যুঞ্জয়ী, মুক্তি, বন্ধন শূন্যমহাপুরুষ। সেদিন ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা।
বুদ্ধ ভিক্ষু সংঘসহ পাবা হতে কুশীনগরাভিমুখে যাত্রা করেন। কিছু দূর যাওয়ার পর বৃক্ষতলায় উপবেশন করার জন্য তার সঙ্ঘটি ভাজ করে বিছানোর জন্য বললেন। সে সময়ে চুন্দ স্থবির পাশেই ছিল। তিনি সঙ্ঘটি ভাজকরে বিছিয়ে দেয়ার পর বুদ্ধ আনন্দকে বললো, আমার বড়োই পিপাসা পেয়েছে, আমার জন্য জল নিয়ে এসো।
আনন্দ বললেন, ভন্তে ভগবান@ এই ছোট নদীর পানি অবিলতাপূর্ণ। বুদ্ধ তারপরও দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার জল আনার জন্য বলায় আনন্দ জল আনতে গিয়ে দেখে জল অবিলতাশূন্য, স্বচ্ছ। আনন্দ পানি নিয়ে আসলে তথাগত তা প্রাণভরে পান করেন।
বুদ্ধ যখন অন্তিমশয্যায় শায়িত তখন আয়ুষ্মান উপবান ভগবানের সামনে বসে ভগবানকে ব্যাজন করছিলেন। ভগবান তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলায় আনন্দ বুদ্ধকে বললেন, ভন্তে ভগবান এই নির্দেশ কেন দিলেন। তখন ভগবান বললেন, আনন্দ, অসংখ্য অপ্রমেয় দেবগণ আমর সামনে বসে আছে আমাকে পূজা দেয়ার জন্য এবং এক নজর দেখার জন্য।
অদ্য রাতের শেষভাবে তথাগত পরিনির্বাণ লাভ করবেন। ভিক্ষু উপবান ভগবানের সামনে অবস্থান করায় আমরা ভগবানকে দেখতে পাচ্ছি না। ভগবান বললেন, আনন্দ চারটি স্থান খুবই শ্রদ্ধাবান ও স্মরণীয়। কুলপুত্র, উপাসক-উপাসিকা, ভিক্ষু-ভিক্ষুনীগণের সংবেদকজনক স্থান। যে স্থলে বোধিসত্ত্ব জন্মগ্রহণ করেন অর্থাৎ লুম্বনী, যে স্থলে তিনি সম্বোধি জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়েছেন অর্থাৎ বুদ্ধগয়া, যে স্থলে ধর্মচক্র প্রবর্তন করেছেন অর্থাৎ সারনাথ আর যে স্থানে তিনি নির্বাণপ্রাপ্ত হচ্ছেন অর্থাৎ কুশীনগর।
সে সময়ে সুভদ্র নামক পরিব্রাজক জানতে পারলো তথাগত বুদ্ধ আজ রাতে পরিনির্বাচিত হবেন। তিনি তাঁর কাছে অন্তিম শিষ্যরূপে দীক্ষা নিয়েছিলেন। অতঃপর ভগবান বললেন_ আনন্দ তোমরা আমার মৃত্যুর পর এ কথা মনে করো না যে তোমাদের শাস্তা নেই। আমার মৃত্যুর পর আমার উপদিষ্ট চুরাশি হাজার ধর্ম স্কন্দই তোমাদের শাস্তা বলে মনে করবে।
ভগবান বললেন_ আপাতদৃষ্টিতে আমার আশপাশে যেসব ভিক্ষুরা আছো সকলে ষড়াভিজ্ঞ, ত্রিবিদ্যা সম্পন্ন, যে ভিক্ষু সবার ছোট সেও স্রোতাপন্ন। অতএব বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘ তথা মাগৃ প্রতিপদায় সন্দেহ থাকার কোনো অবকাশ নেই। ভিক্ষুগণ তোমাদের বলছি যে, সংস্কার ধর্মসমূহ একান্ত ক্ষয়শীল, অপ্রমত্ত হয়ে সকল কার্য সম্পাদক করবে_ এটাই আমার অন্তিম উপদেশ।
অতঃপর ভগবান ধ্যানানুশীলন করে সংজ্ঞাবেদয়িত নিরোধ ধ্যানে উপনীত হলেন। আনন্দ স্থবির অনুরুদ্ধ স্থবিরকে জিজ্ঞাসা করলেন_ তদন্ত অনিরুদ্ধ, ভগবান কি পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হয়েছেন? স্থবির বললেন_ এখনো তিনি সংজ্ঞাবেদয়িত নিরোধধ্যানে তন্ময় আছেন। অতঃপর ভগবান সংজ্ঞাবেদয়িত নিরোধ ধ্যান হতে ওঠে প্রথম ধ্যানে প্রত্যাবর্তন করে পুনঃপুনঃ চতুর্থ ধ্যানে উপনীত হয়ে পরিনির্বাপিত হলেন। সে দিনও ছিল শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। আর এই তিথিকেই বলা হয়ে থাকে বুদ্ধ পূর্ণিমা।
পরিশেষে আজকের বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে শুধু একটি কথাই বলতে চাই_ আসুন সকলে জাতি ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক কাতারে সামিল হয়ে অশান্ত এই বিশ্বে মানব কল্যাণের শপথ নেই। সবাইকে বৈশাখী তথা বুদ্ধ পূর্ণিমার লালগোলাপ শুভেচ্ছা। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।
Collected post