17/05/2026
#পুরুষোত্তম_মাস_কি ?
#কবে_থেকে_শুরু❓
#শাস্ত্রের_আলোকে_শ্রীশ্রী_পুরুষোত্তম_মাসের_মহিমা
কি?
আগামী ১৬ই মে ২০২৬ থেকে মহাপাপবিনাশী শ্রীপুরুষোত্তম মাস আরম্ভ হতে যাচ্ছে।
শাস্ত্র অনুসারে, পুরুষোত্তম মাস অন্যান্য মাস অপেক্ষা ১০০০ গুণ বেশী ফলদায়ক।
👉পুরুষোত্তম মাস কি?
হিন্দু সৌর পঞ্জিকায় একটি বিশেষ অতিরিক্ত মাস রয়েছে, যা “অধিক মাস”, “মলমাস”, “অধিমাস” এবং সর্বোপরি “পুরুষোত্তম মাস” নামে পরিচিত। বৈষ্ণব শাস্ত্রে এই মাসকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বীয় মাস বলা হয়েছে।
এই মাসে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি সামান্য ভক্তি করলেও প্রেমভক্তি বর্ধিত হয়। ভগবদ্ভজন, হরিনাম, গীতা পাঠ, শ্রীমদভাগবত শ্রবণ, দান, তীর্থস্নান ও বৈষ্ণবসেবা—সবকিছুই এই মাসে অসীম ফলদায়ক।
চন্দ্রবর্ষে থাকে প্রায় ৩৫৪ দিন এবং সৌরবর্ষে প্রায় ৩৬৫ দিন। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১১ দিনের পার্থক্য সৃষ্টি হয়। এই ব্যবধান পূরণ করার জন্য প্রতি প্রায় ৩২ মাস ১৬ দিন ৪ ঘণ্টা অন্তর একটি অতিরিক্ত চন্দ্রমাস যোগ করা হয়। এই অতিরিক্ত মাসই অধিকমাস বা পুরুষোত্তম মাস।
সূর্যসিদ্ধান্তে বলা হয়েছে—
এক মহাযুগে ১৫,৯৩,৩৩৬টি অধিকমাস এবং ৫১,৮৪০,০০০টি সৌরমাস বিদ্যমান।
এইভাবে জ্যোতির্বিদ্যাগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য অধিকমাসের আবির্ভাব ঘটে।
👉স্মার্ত ও পারমার্থিক শাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি
শাস্ত্র দুই ভাগে বিভক্ত—
১.স্মার্ত শাস্ত্র — কর্ম, যজ্ঞ, সামাজিক বিধি ইত্যাদি কেন্দ্রিক
২.পারমার্থিক শাস্ত্র — ভগবদ্ভক্তি ও আত্মোদ্ধার কেন্দ্রিক
স্মার্ত শাস্ত্রে অধিকমাসে বিবাহ, গৃহপ্রবেশ, নতুন ব্যবসা, যজ্ঞাদি নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। এজন্য একে “মলমাস” বলা হতো।
কিন্তু পারমার্থিক বৈষ্ণব শাস্ত্রে এই মাসকে সর্বোচ্চ ভক্তিময় মাস বলা হয়েছে। কারণ এই মাসে জাগতিক কর্মের বিঘ্ন কম থাকে এবং ভক্তি সহজে বৃদ্ধি পায়।
👉অধিকমাস কীভাবে “পুরুষোত্তম মাস” হলো?
(পদ্মপুরাণ ও নারদীয় পুরাণের কাহিনী)
প্রাচীনকালে অধিকমাসকে কেউ সম্মান করত না। কোনো দেবতার অধীনে ছিল না, কোনো উৎসবও ছিল না। মানুষ তাকে “অপবিত্র মাস” বলে ঘৃণা করত।
দুঃখে কাতর অধিকমাস বৈকুণ্ঠে গিয়ে ভগবান নারায়ণের শরণ নেয়। নারায়ণ তাকে নিয়ে গোলোকধামে শ্রীকৃষ্ণের কাছে যান। তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ করুণায় অভিভূত হয়ে বলেন—
“যেমন আমি ‘পুরুষোত্তম’ নামে জগতে প্রসিদ্ধ, তেমনি এই অধিকমাসও আজ থেকে ‘পুরুষোত্তম মাস’ নামে প্রসিদ্ধ হবে।”
তিনি আরও বলেন—
“অন্যান্য মাস জাগতিক কামনা পূরণ করে; কিন্তু এই পুরুষোত্তম মাস নিষ্কাম ভক্তির মাস।”
এবং—
“যে ব্যক্তি নিষ্কাম বা সকামভাবেই হোক না কেন, এই অধিকমাসে ভক্তিভরে ভজন করবে, তার পাপ দগ্ধ হবে এবং সে নিশ্চয়ই আমাকে লাভ করবে।”
👉দ্রৌপদীর পূর্বজন্মের কাহিনী
(নারদীয় পুরাণ)
দ্রৌপদী পূর্বজন্মে ঋষি মেধাবীর কন্যা ছিলেন। দুর্বাসা মুনি তাকে পুরুষোত্তম মাস পালনের উপদেশ দেন। কিন্তু তিনি অধিকমাসকে “মলমাস” ভেবে অবজ্ঞা করেন।
ফলে দুর্বাসা মুনি রুষ্ট হয়ে বলেন—“তুমি এই মাসকে অবজ্ঞা করেছো, তাই পরজন্মে বহু দুঃখভোগ করবে।”
পরবর্তীতে তিনি কঠোর তপস্যা করে শিবের নিকট স্বামী প্রার্থনা করেন। পাঁচবার “স্বামী দাও” বলায় শিব আশীর্বাদ করেন—“তোমার পাঁচজন স্বামী হবে।”
সেই কন্যাই পরজন্মে দ্রৌপদী রূপে জন্মগ্রহণ করেন এবং পাঁচ পাণ্ডবের পত্নী হন।
👉পাণ্ডবদের পুরুষোত্তম ব্রত পালন
বনবাসকালে শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবদের বলেন—
“তোমরা পুরুষোত্তম মাস উপেক্ষা করেছো, তাই দুঃখ ভোগ করছো।”
পরে পাণ্ডবগণ ভক্তিভরে পুরুষোত্তম ব্রত পালন করেন। “পাণ্ডবগণ বিধিপূর্বক পুরুষোত্তম ব্রত পালন করে সমস্ত দুঃখ অতিক্রম করে পুনরায় অতুলনীয় রাজ্য লাভ করেন।”
👉রাজা দৃঢ়ধন্বার কাহিনী
(স্কন্দপুরাণ)
বাদরিকাশ্রমে নারদ মুনি নারায়ণ ঋষির কাছ থেকে পুরুষোত্তম ব্রতের বিধি শ্রবণ করেন। পরে বাল্মীকি মুনি রাজা দৃঢ়ধন্বাকে সেই ব্রতের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন—“অশ্বমেধ যজ্ঞের চেয়েও অধিক ফল পুরুষোত্তম ব্রত পালনে লাভ হয়।”
👉শাস্ত্রে পুরুষোত্তম মাসের মহিমা
♦পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ঘোষণা: “পুরুষোত্তম মাস পালনকারী আমার নিকট অতি প্রিয়। তার পাপ ভস্মীভূত হয় এবং সে গোলোকধাম লাভ করে।”
♦দুর্বাসা মুনির উক্তি: “পুরুষোত্তম মাসে একবার তীর্থস্নান করলে বহু সহস্র বছর গঙ্গাস্নানের ফল লাভ হয়।”
♦নারদ মুনির উক্তি: “এই মাসের মাহাত্ম্য শ্রবণ করলেও কৃষ্ণভক্তি জাগ্রত হয়।”
♦বাল্মীকি মুনির উক্তি: “শত অশ্বমেধ যজ্ঞের চেয়েও অধিক ফল পুরুষোত্তম ব্রতে।”
♦নৈমিষারণ্যের ঋষিগণের প্রতি সুত গোস্বামীর উক্তি: “পুরুষোত্তম মাস ভক্তের ইচ্ছাপূরণকারী কল্পবৃক্ষস্বরূপ।”
♦ শ্রীমদ্ভাগবতের দ্বাদশ স্কন্ধে বর্ণিত মহিমা:
এই মাসে ক্ষুদ্র সৎকর্মও কোটিগুণ ফলদায়ক।
এই মাসে প্রতিদিন গীতা পাঠ মোক্ষদায়ক, গোদান, অন্নদান, বিদ্যাদান মহাপুণ্যময়, হরিনাম জপের ফল অসীম বৃদ্ধি পায়।
👉পুরুষোত্তম মাসে করণীয়:-
১. ব্রাহ্মমুহূর্তে জাগরণ
২.ভোরে উঠে স্নান ও জপ করা।
৩.তীর্থস্নান: শাস্ত্রে বলা হয়েছে—সমুদ্রে পতিত নদীতে স্নান শ্রেষ্ঠ।
৪.তিলক ধারণ: গোপীচন্দন তিলক ধারণ করা।
৫. রাধাকৃষ্ণ অর্চন: এই মাসের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ।
৬. হরিনাম জপ: হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র ও
গোবর্ধনধারী গোপাল স্তব
৭. গীতা ও ভাগবত পাঠ: বিশেষত গীতার ১৫তম অধ্যায় “পুরুষোত্তম যোগ”।
৮. প্রদীপদান: প্রতিদিন ঘৃত প্রদীপ অর্পণ।
৯. উপবাস ও সংযম: একাদশী পালন, নিরামিষ ভোজন, অল্প আহার।
১০. বৈষ্ণবসেবা: বৈষ্ণব ও ব্রাহ্মণদের ভোজন করানো।
১১. দান: অন্নদান, গোদান, বস্ত্রদান, বিদ্যাদান,
ভাগবত বিতরণ
👉পুরুষোত্তম মাসে বর্জনীয়
শাস্ত্রে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে—
১. পরনিন্দা
২. মিথ্যা কথা
৩. ক্রোধ ও কলহ
৪. বিষয়ীর অন্ন ভোজন
৫. ইন্দ্রিয়ভোগে আসক্তি
৬. জড়জাগতিক সাহিত্য পাঠ
৭. বৈষ্ণব অপরাধ
৮. জাগতিক ভোগবিলাস
৯. নিষিদ্ধ সম্পর্ক
১০. অহংকার ও কৃপণতা
👉পুরুষোত্তম মাসে নিষিদ্ধ জাগতিক কাজ:
স্মার্ত শাস্ত্রে নিম্নলিখিত কাজ এড়াতে বলা হয়েছে—
বিবাহ, গৃহপ্রবেশ, নতুন ব্যবসা শুরু, নতুন গৃহ নির্মাণ, যজ্ঞাদি, নামকরণ অনুষ্ঠান!
কারণ এই মাস মূলত জাগতিক কর্মের জন্য নয়, ভগবদ্ভজনের জন্য নির্ধারিত।
👉বিশেষ স্তব
গোবর্ধন ধরম বন্দে গোপালং গোপরূপিণম্ ।গোকুলোৎসবমীশানং গোবিন্দং গোপিকাপ্রিয়ম্ ॥
অর্থঃ
“আমি গোবর্ধনধারী গোপালকে বন্দনা করি, যিনি গোপবালকের রূপধারী ও গোপীদের প্রিয় গোবিন্দ।”
👉ধ্যানমন্ত্র
বন্দে নব ঘনশ্যামং দ্বিভূজম মূরলীধরম।
পীতাম্বর ধরম বন্দে সরাধং পুরুষোত্তমম।
অনুবাদ: “নবঘন মেঘসম শ্যামবর্ণ, বংশীধারী, পীতাম্বর পরিহিত শ্রীরাধাসহ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে আমি প্রণাম করি।”
👉এই মাসে ৩৩ সংখ্যাটি অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ যেমন ৩৩ মালা জপ, ৩৩ বার দণ্ডবৎ প্রণাম, ৩৩ বার স্তব ও ৩৩ বার ধ্যানমন্ত্র উচ্চারণ।
👉হরিভক্তিবিলাস অনুসারে ভক্তদের তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়:
১. স্বনিষ্ঠ ভক্ত: যারা নিজ ব্রত কঠোরভাবে পালন করেন।
২. পরনিষ্ঠ ভক্ত: যারা গুরু ও আচার্যের নির্দেশ অনুসারে ব্রত পালন করেন।
৩. নিরপেক্ষ ঐকান্তিক ভক্ত: প্রধানত হরিনাম, শ্রবণ ও স্মরণে নিবিষ্ট থাকেন।
শ্রীল সনাতন গোস্বামীর সিদ্ধান্ত:
"ঐকান্তিক ভক্তদের জন্য কৃষ্ণস্মরণ ও কৃষ্ণকীর্তনই সর্বোচ্চ সাধনা।”
👉পুরুষোত্তম মাস কোনো সাধারণ অতিরিক্ত মাস নয়; এটি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের করুণাময় মাস।
এই মাসে হরিনাম জপ ১০০০ গুণ বেশী ফলদায়ক,
ক্ষুদ্র দানও অক্ষয় পুণ্যদায়ক, ভগবদ্ভক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পায়, অপরাধ মোচন হয়, জীবনের দুঃখ দূর হয়।
অতএব ভক্তিভরে হরিনাম, গীতা পাঠ, শ্রীমদভাগবত শ্রবণ, বৈষ্ণবসেবা, রাধাকৃষ্ণ ভজন
—এইসবের মাধ্যমে পুরুষোত্তম মাস পালন করলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিশেষ কৃপা লাভ হয়।
“যে ব্যক্তি ভক্তিভরে পুরুষোত্তম মাস পালন করে, সে সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়ে পরিশেষে গোলোকধাম লাভ করে।"
আসুন আমরা যথাযথ নিষ্ঠা সহকারে পুরুষোত্তম মাসটি পালন করি এবং কৃষ্ণ প্রেম ভক্তি লাভে প্রয়াসী হই।