27/05/2026
আজ যদি কেউ পদ্মিনী একাদশীর ব্রত মাহাত্ম্য পাঠ করে তার একাদশীর পূর্ণফল অর্জন হবে:-
✸ স্মার্তগণ পুরুষোত্তম মাস বা অধিমাসকে ‘মলমাস’ বলে এই মাসে সমস্ত শুভকার্য পরিত্যাগ করে থাকেন। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই মাসকে পারমার্থিক মঙ্গলের জন্য অন্য সকল মাস থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে নির্ণয় করেছেন। তিনি নিজের নামানুসারে এই মাসের নাম ‘পুরুষোত্তম’ মাস রেখেছেন।
✸একদিন মহারাজ যুধিষ্ঠির ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন– “হে কৃষ্ণ! হে জনার্দন! আমি বহুধর্ম ও ব্রতের কথা শুনেছি। এখন পুরুষোত্তম মাসের সর্বপাপবিনাশিনী ও পুণ্যদায়িনী শুক্লপক্ষীয়া একাদশীর নাম কী? এবং এই একাদশী পালনের বিধিনিয়মই বা কি? আপনি সেই কথা আমার কাছে বর্ণনা করুন। যা শ্রবন করলে পরমপদ প্রাপ্ত হওয়া যায়।”
✸ শ্রী ভগবান বললেন, “হে অজাতশত্রু! অধিমাসের শুক্লপক্ষে একাদশী হল পদ্মিনী একাদশী। প্রসঙ্গত, প্রতি বছর ২৪টি একাদশী হয়। কিন্তু যখন অধিমাস বা মলমাস আসে, তখন আরও ২টি একাদশী বেড়ে একাদশীর সংখ্যা হয় ২৬।
অধিমাসে ২টি একাদশী হল — পদ্মিনী একাদশী (শুক্লপক্ষ) এবং পরমা একাদশী (কৃষ্ণপক্ষ)।
✸ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠির মহারাজকে বললেন, “এই পদ্মিনী একাদশী পালন করলে ভগবৎ পাদপদ্মে স্থান লাভ হয়। এটি ভক্তি প্রদায়িনী এবং সর্ব পাপনাশিনী একাদশী। দশমীর দিন থেকেই এই ব্রতের শুরু হয়। কাঁসার পাত্রে ভোজন, মুসুর, ছোলা, শাক এবং অপরের অন্ন ও আমিষ দশমীর দিন বর্জন করতে হয়। পরের দিন প্রাতঃকৃত্যের পর সুগন্ধী ধূপ, দীপ, চন্দনাদি দিয়ে ভগবানের পূজা করতে হয়। রাত্রিতে জাগ্রত থেকে ভগবানের নাম,গুণ কীর্তন করতে হয়। এখন এই ব্রতের পরিপেক্ষিতে একটি সুন্দর ঘটনা বর্ণন করছি, যা পূর্বে পুলস্ত মুনি দেবর্ষি নারদকে এই ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন।”
❖ রাজা কৃতবীর্যের কাহিনী ❖
✸ হে রাজেন্দ্র! ত্রেতাযুগে হৈহয় বংশের অধিপতি ক্ষত্রিয়রাজা কৃতবীর্য লঙ্কাপতি রাক্ষসরাজ রাবনকে পরাজিত করে তার কারাগারে বন্দী করে রাখেন। লঙ্কাপতি রাবণ হলেন মহামুনি পুলস্ত্য এর পৌত্র (নাতি)। এই পরাজয়ের খবর পেয়ে স্বর্গ থেকে তড়িগড়ি মহীষ্মতীপুর নগরে পৌঁছালেন। অমন তেজস্বী ওজস্বী পুলস্ত্য মুনিকে প্রণতি নিবেদন করে যথোপযুক্ত অভ্যর্থনা করলেন এবং মহর্ষির আগমনের কারণ জানতে চাইলেন। রাজার কাছে তিনি রাবনের মুক্তি প্রার্থনা করেন।
✸ মুনির আজ্ঞায় রাজা কৃতবীর্য রাবনকে মুক্ত করেন। এই আশ্চর্যজনক কথা শুনে নারদ পুলস্ত মুনিকে জিজ্ঞাসা করেন, “হে মুনিবর! ইন্দ্রসহ সকল দেবতা যখন রাবনের কাছে পরাজিত হল, রাজা কার্তবীর্য কীভাবে রাবনকে পরাজিত করলেন?” পুলস্ত্য মুনি তখন নারদের কাছে কার্তবীর্যের জন্মরহস্য বর্ণনা শুরু করলেন।
✸ ত্রেতাযুগে হৈহয় বংশে কৃতবীর্য নামে এক রাজা পুরীতে রাজত্ব করতেন। মহীষ্মতীপুরে তার রাজধানী ছিল। রাজার এক হাজার পত্নী ছিল। কিন্তু রাজ্যভার গ্রহন করার মত কোনো পুত্রলাভ তার ভাগ্যে হয়নি। অনেক চিকিৎসকের তত্বাবধানে থেকে পুত্র লাভের অনেক চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। দেবতাদের আরাধনা করে সুফল মেলেনি তার। অবশেষে সাধুদের আজ্ঞানুসারে বিভিন্ন ব্রত পালন করলেন, তবুও তিনি রইলেন অপুত্রক।
✸ তখন মন্ত্রীর ওপর রাজ্যভার অর্পণ করে তপস্যা করার সিদ্ধান্ত নেন রাজা কৃতবীর্য। রাণীদের মধ্যে রাণী পদ্মিনী ছিলেন মহারাজ হরিশ্চন্দ্রের কন্যা, ইক্ষ্বাকু রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, রাজার সাথে বনে যেতে রাজি হন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত পতিব্রতা। স্বামীর সাথে তিনিও তপস্যার জন্য মন্দার পর্বতে যাত্রা করেন। সেখানে তারা ১০ হাজার বছর ধরে কঠোর তপস্যা করেও পুত্রলাভ থেকে বঞ্চিতই রইলেন।
✸ এতে রাণী পদ্মিনী তিনি অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে গেলেন। তখন রাণী ভাবলেন – “এখন আমার কিছু একটা করা উচিত! পরম সতী নারী অনুসূয়ার কাছে আমি যাব।” সাক্ষাৎ হলে তিনি মহাসাধ্বী (অর্থাৎ পরম সতী) অনুসূয়াকে উপায় বিধানের আর্তি নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে সাধ্বী! পুত্রলাভের জন্য আমার স্বামী দশ হাজার বছর তপস্যা করেও বিফল হয়েছে। যে ব্রত পালনে ভগবান সন্তুষ্ট হন এবং অতিশ্রেষ্ঠ পুত্রলাভ হয়, এমন কোনো উপায় বিধান করুন।”
✸ পদ্মিনীর আকুল প্রার্থনায় অনুসূয়া প্রসন্ন হয়ে বললেন, “বত্রিশ মাস অন্তর এক অধিমাস বা পুরুষোত্তম মাস আসে। এই মাসে পদ্মিনী ও পরমা দুই একাদশী। পদ্মিনী ব্রত পালন করলে পুত্রদাতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শীঘ্রই প্রসন্ন হবেন।”
✸ অনুসূয়ার নির্দেশে পদ্মিনী পরম শ্রদ্ধায় এই একাদশী ব্রত পালন করলেন। সেই ব্রতে সন্তুষ্ট হয়ে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গরুড় বাহনে আরোহন করে পদ্মিনীর সম্মুখে উপস্থিত হলেন। ভগবান বললেন, “হে ভদ্রে! আমি প্রসন্ন হয়েছি। পুরুষোত্তম মাসের একাদশী আমার পরম প্রিয়। তুমি সেই ব্রত যথাযথ পালন করেছ। তাই আমি তোমার ইচ্ছানুরূপ বর প্রদান করব।”
✸ ভগবানের স্তব করে রাণী বললেন, “হে ভগবান! আমার বদলে আমার স্বামীকে আপনি বর দান করুন।”
ভগবান রাণীর ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে তৎক্ষণাৎ রাজার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বললেন, “হে রাজেন্দ্র! আপনার অভিলষিত বর প্রার্থনা করুন।”
মহানন্দে রাজা বললেন, “হে জগত্ পতি! হে মধুসূদন! দেবতা, মানুষ, নাগ, দৈত্য, রাক্ষস আদি কেউ তাকে পরাজিত করতে পারবে না, এমন পুত্র আমি প্রার্থনা করি।”
রাজার প্রার্থনা অনুসারে বরদান করে ভগবান অন্তর্হিত হলেন। রাজা পত্নী সহ রাজ্যে ফিরে এলেন। যথা সময়ে রানী পদ্মিনীর গর্ভে মহা বলশালী এক পুত্রের জন্ম হয়। মহারাজ কৃতবীর্য পুত্রের নাম রাখেন কার্তবীর্য। ত্রিলোকে তার সমান কোনো বীর ছিল না, কেবল হরি ছাড়া আর কারো দ্বারা পরাজিত হবে না। তাই দশানন রাবন যুদ্ধে তাঁর কাছে পরাজিত হয়ে বন্দী হয়েছিল। পরবর্তীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার পরশুরাম কর্তৃক নিহত হয়।
✸ শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “হে মহারাজ! এই ব্রত যিনি পালন করবেন, তিনি ভগবান শ্রীহরির শ্রীপাদপদ্মে অহৈতুকী ভক্তি লাভ করবেন।”
✸ শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে ধর্মরাজ সপরিবারে এই একাদশী ব্রত পালন করেন। যিনি এই ব্রত মাহাত্ম্য পাঠ ও শ্রবন করেন, তিনি বহু পুণ্যলাভ করেন।
🌸 জয় পদ্মিনী একাদশী 🌸
রাধে_রাধে 🌿