03/02/2026
আজ দিবাগত রাত পবিত্র শবে বরাত। আরবীতে বলে লাইলাতুল মুবারাকা বা বরকতময় রাত।এ রাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত ও অনুকম্পার দরোজা খুলে দেন। দুনিয়ার সংশোধিত বাজেট প্রণয়নের মত অতীতের আমলনামা নিয়ে কোন বান্দা অনুতপ্ত হলে তাকে ক্ষমা করে দেন। হায়াত- মৌওত ও রিজিকের ফয়সালা করেন বা তকদির লিপিবদ্ধ করেন।এজন্য এটি ভাগ্য রজনী হিসাবে মুসলিম বিশ্বে এক মহিমান্বিত ও পুণ্যময় এক রাত হিসাবে পালন করা হয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘এটা (ভাগ্য নির্ধারণ) এ জন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন তার জন্য হর্ষোত্ফুল্ল না হও। আল্লাহ পছন্দ করেন না উদ্ধত ও অহংকারীদের।’ (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ২৩)
মানুষের ভাগ্যে যা ঘটে তা পূর্ব থেকেই আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ থাকে। আল্লাহর পক্ষে এটা খুবই সহজ। ’ (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ২২)
আল্লাহ মানুষের জন্য যা নির্ধারিত করে রেখেছেন তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করবেনই; আল্লাহ সব কিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা। ’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৩)
হাদিস গ্রন্থ সহীহ বোখারী শরীফে বর্ণিত হাদিস।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আল্লাহ্ রেহেমে (মাতৃগর্ভে) একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, হে প্রতিপালক! এটি বীর্য। হে প্রতিপালক! এটি রক্তপিন্ড। হে প্রতিপালক! এটি মাংসপিন্ড। আল্লাহ্ যখন তার সৃষ্টি পূর্ণ করতে চান, তখন ফেরেশতা বলে, হে প্রতিপালক! এটি নর হবে, না নারী? এটি দুর্ভাগা হবে, না ভাগ্যবান? তার রিযক্ কী পরিমাণ হবে? তার জীবনকাল কী হবে? তখন (আল্লাহর নির্দেশমত) তার মায়ের পেটে থাকাকালে ঐ রকমই লিখে দেয়া হয়। (আধুনিক প্রকাশনী- ৬১৩৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬১৪৩)
মুমিনের ভাগ্যে বিশ্বাস নিয়ে আবু আবদুল্লাহ ইবনে দাইলামী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি উবাই বিন কা‘ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর কাছে আসলাম এবং তাঁকে বললাম, “ভাগ্যের ব্যাপারে আমার মনে কিছুটা খটকা কাজ করে, কাজেই আমাকে এমন কিছু হাদীস বলুন, হতে পারে এতে আমার মনের সেই খটকা দূর হয়ে যাবে।” তখন উবাই বিন কা‘ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, “যদি আল্লাহ তা‘আলা আসমানবাসী ও জমিনবাসীকে শাস্তি দিতে চান, তবে তিনি তাদের প্রতি জুলুম করা ছাড়াই তাদেরকে শাস্তি দিতে পারবেন। আর যদি তিনি তাদের প্রতি দয়া করেন, তবে তাঁর দয়া তাদের আমল অপেক্ষা উৎকৃষ্ট হবে। যদি তুমি আল্লাহর রাস্তায় উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ দান করো, তবুও আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন না, যতক্ষন না তুমি ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনয়ন করবে এবং যতক্ষন না তুমি জানবে যে, তুমি যা পেয়েছো, তা কখনই হারানোর ছিল না, আর যা তোমার হাতছাড়া হয়ে গেছে, তা কখনোই পাওয়ার বিষয় ছিল না। যদি তুমি এর থেকে ভিন্ন আক্বীদা-বিশ্বাস নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে, তবে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করতে।”
রাবী বলেন, “তারপর আমি আব্দুল্লাহ বিন মাস‘ঊদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর কাছে আসি, তিনিও অনুরুপ কথা বলেন। এরপর আমি হুযাইফা বিন ইয়ামান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর কাছে আসি, তিনিও অনুরুপ কথা বলেন। তারপর আমি যাইদ বিন সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর কাছে আসলে তিনিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অনুরুপ হাদীস বর্ণনা করেন।”
আবু দাঊদ: ৪৬৯৯; মুসনাদ আহমাদ: ৫/১৮২; ইবনু মাজাহ: ৭৭; ইবনু আবী আসিম, আস সুন্নাহ: ২৪৫; বাইহাকী, আস সুনান: ১০/২০৪; তাবারানী আল কাবীর: ৪৯৪০।
আল্লামা শু‘আইব আল আরনাঊত রহিমাহুল্লাহ হাদীসটির সানাদকে শক্তিশালী বলেছেন। আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। (আয যিলাল: ২৪৫।)
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, ‘এক রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি হারিয়ে ফেললাম। আমি তার খোঁজে বের হলাম। জান্নাতুল বাকিতে (সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ কবরস্থান) তাঁকে পেলাম। তিনি বললেন, ‘তুমি কি ভয় করছো যে, মহান আল্লাহ তাঁর রাসুলের ওপর অত্যাচার করেছেন?’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছি যে, আপনি অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে এসেছেন।’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালা শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বনু কালব গোত্রের বকরি-লোমের সংখ্যার চেয়ে বেশি মানুষকে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেন।’ [তিরমিজি- ৭৩৯; ইবনে মাজাহ-১৩৮৯]
পবিত্র শবে বরাত বা ভাগ্য রজনী এবং ভাগ্য মানা তকদিরের অংশ । আজ নামাজী বেনামাজী নির্বিশেষে এ রাতে কান্না কাটি করে নিজ নিজ ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন । সারা বছর আত্মীয় স্বজনদের খোঁজ খবর না রাখলেও বা গরীব মিসকিনদের দান-খয়রাত না করলেও যদি কেউ এদিন হালুয়াঘাট রুটি বানিয়ে বিতরণ করেন, তার মধ্যে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশা থাকে বা একদিনের জন্য হলেও নবীজীর সুন্নাত ( নবীজী ও তাঁর সাহাবিরা নিজে না খেয়েও মুসাফিরদের খাইয়েছেন) পালনের জন্য অপরকে খওয়ায় বা সাহায্য করেন- আমরা তো তাঁকে নিরুৎসাহিত করতে পারি না । বরং উৎসাহিত করা উচিত।