বাংলাদেশ ওয়ার্সী ফাউন্ডেশন

বাংলাদেশ ওয়ার্সী ফাউন্ডেশন এই পেজ আহলুল বাইত এবং তরিকা সম্পর্কিত

ইতিহাসগত বিভ্রান্তির রহস্য  - পর্ব-০১লেখক: মুফাখ্খারুল ইসলাম।অভিনন্দনইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস সম্বন্ধে মুসলমানদের অজ্ঞতা অ...
24/08/2026

ইতিহাসগত বিভ্রান্তির রহস্য - পর্ব-০১

লেখক: মুফাখ্খারুল ইসলাম।

অভিনন্দন

ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস সম্বন্ধে মুসলমানদের অজ্ঞতা অসীম। এই অজ্ঞতা জন্ম দিয়েছে অহমিকার, ধর্মান্ধতার ও আত্মশ্লাঘার। তাই শুধু ইতিহাস চর্চার-ই নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের যাবতীয় শাখা-প্রশাখায় মুসলমানদের কর্ম-তৎপরতা মধ্যযুগেই শেষ হয়ে যায়। অবশ্য তখনো যা গবেষণার নামে চর্চিত হতো, তাতে আজকের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণধর্মী সমালোচনার সন্ধান করা বৃথা। তা ছিল ঘটনাবলির সাধারণ বিবরণ মাত্র। দৃশ্যত ঘটনার অন্তরালে যে জটিল কার্যকারণ এবং তা ভেদ করে সঠিক তথ্যে পৌঁছবার যে রীতিনীতি তা তখন অনাবিষ্কৃত ছিল।

ইসলামের ইতিহাসের উৎস হচ্ছে কুরআন ও হাদিস। হাদিসও নির্ভরযোগ্য নয় যদি না তা কুরআনের কষ্টিপাথরে বিবেচিত ও নির্বাচিত হয়। এই কাজ নিতান্ত দুরূহ। মুসলমানদের শত্রু ইহুদি ও খ্রিস্টান পণ্ডিতগণ এই দুরূহ কাজ করার কিছুটা প্রয়াস পেয়েছেন। কিন্তু তথাকথিত মুসলমান পণ্ডিত ও ইতিহাসবেত্তাগণ, লু-হাওয়ার মধ্যে বালিতে মুখ গুঁজে-থাকা উটের মতো চোখ-কান-মন বন্ধ রেখে ইতিহাস-চর্চা করে চলেছেন। আজ ইসলামের আসল ইতিহাস জানতে হলে, কোনো মুসলমান লেখকের বই পড়া পণ্ডশ্রম মাত্র। আঠারো থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত কুরআন ও হাদিস এবং যাবতীয় ইসলামী বিষয়ে যে বিপুল গবেষণা ইউরোপে হয়েছে তা থেকে যৎসামান্য ধার নিয়ে আজকের মুসলমান ইতিহাসবিদগণ 'অপাঠ্য' গ্রন্থ রচনা করে সস্তা খ্যাতি লাভের প্রচেষ্টায় ব্যাপৃত আছেন। সামান্য কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন কোনো ব্যক্তির যদি কোন একটি ইউরোপীয় ভাষার জ্ঞান থাকে, তবে তার কাছে আজকের মুসলমানদের রচিত ইসলামের ইতিহাসের অসারতা ও বাকসর্বস্বতা সহজেই ধরা পড়বে।

এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ বাঙালি কবির ইসলামের ইতিহাসের ব্যতিক্রমধর্মী ব্যাখ্যাদানের দুঃসাহসী প্রয়াসকে আমি অভিনন্দন জানাই।

স্বাক্ষর
পারেশ ইসলাম
(ডক্টর পারেশ ইসলাম সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান)
ইসলামী ইতিহাস ও কালচার,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভূমিকা:

১৯৭১ সনে মুসলমানেরা পশ্চিমা ও পূবা দুই দলে বিভক্ত হইয়া কেন মারামারি করে, তাহার মূল সন্ধান-ব্যপদেশে তখন করাচি উর্দু কলেজের ইসলামীয়াতের অধ্যাপকের 'ইসলাম ও উমাইয়া রাষ্ট্রনীতি' প্রবন্ধের পর্যালোচনা করি। দীর্ঘ পর্যালোচনাই ছিল। পরে তাহাতে এখানে-সেখানে একটু আধটু সংযোজনায় এই গ্রন্থ রচনা।

তবে জনাব দেলওয়ার হোসেন সাহেবের সম্পূর্ণ সাহায্য ব্যতীত ইহা যে ছাপাখানার মুখ দেখিতে পারিত না ইহা সকলেই বুঝিবেন। প্রকাশিকা আমার বিবি সুরাইয়া সুলতানা মুফলিহা (এম এ) এ গ্রন্থের নাম সুনির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছেন। ইহাদের জন্য আল্লাহর দরগায় আমার প্রাণ-ভরা দোয়া-প্রীতি।
ডক্টর এ.বি.এম. হাবীবুল্লাহ ও ডক্টর মাহদী হুসায়ন মরহুমন্বয় অন্যান্য অনেকের সঙ্গে এ গ্রন্থ প্রকাশনার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। আফসোস্! তাঁহারা এখন হায়াতে নাই। যাঁহারা আছেন তাঁহাদের জন্য কৃতজ্ঞতা।

ইতিহাসগত চরিত্র বিচারের মানদণ্ডঃ

ইতিহাস রচনায় বা ঐতিহাসিক তথ্য উদ্ধারে প্রবাদ, কিংবদন্তী, সমসাময়িক বিবরণী, দলীল-দস্তাবীজ, কাতাবা প্রভৃতি ঘাঁটাঘাঁটি করিতে হয়, এইভাবেই ঘটনা-পরম্পরা ও প্রত্যেক ঘটনার রহস্য ও তাৎপর্য উদঘাটন করিতে হয়। সে সব আমরা জানিয়াছি। কিন্তু ইতিহাসগত চরিত্রাবলীর বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কোন্ মানদণ্ডের বিচারে আলোচনা করিতে হয়, সে বিষয়ে আমাদের সম্যক ধারণা দেওয়া নাই। যে ঐতিহাসিক যেরূপ ধারণা পোষণ করিবেন, সেই তুলাদণ্ডেই কি তিনি ইতিহাসগত চরিত্র তৌল করিবেন?

আমরা দেখিয়াছি, ব্রিটিশ দ্বীপের ও ইউরোপীয় অন্যান্য রাষ্ট্রের ঐতিহাসিকেরা বীরকেশরী নেপোলিয়ন বোনাপার্টের চরিত্র-বিশ্লেষণের যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করিয়াছেন, ফরাসি ঐতিহাসিকেরা তাঁহার বিচারে ঠিক সেরূপ দৃষ্টভঙ্গি পোষণ করেন নাই। ইহা আমরা বাহিরের লোকেরা কিছুটা অনুধাবন করিতে পারি। ফরাসি দেশের জন্য নেপোলিয়ন যে মর্যাদা অর্জন করেন, তাহা হয়তো অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রের মর্যাদাহানির বিনিময়েই। এই জন্যই বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক বিভিন্ন দৃষ্টিতে তাঁহার কার্যকলাপ লক্ষ্য করিয়াছেন।

মধ্যযুগে বহুদিন যাবৎ 'বয়তুল মুকাদ্দস' এলাকা লইয়া খ্রিস্টান ইউরোপের সঙ্গে মুসলিম এশিয়ার যে জিহাদ বা ক্রুসেড হইয়া গিয়াছে, তাহার ভূমিকায় যাহারা নিযুক্ত-হইয়াছিলেন, তাহাদের কার্যকলাপ ও চরিত্রবিচারে খ্রিস্টান লেখকেরা একরূপ অভিমত ও মুসলিম লেখকেরা অন্যরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। অ-মুসলিম ও অ-খ্রিস্টান লেখকেরা হয়তো আরো ভিন্নমত পোষণ করেন।

কোনো কোনো জাতীয় চরিত্র ও সম্প্রদায়গত চরিত্রের বিচারেও নানা সমস্যা দেখা দেয়। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক আবু রায়হান আল-বীরুনী তাঁহার 'ভারত তত্ত্বে' ভারতীয়দের যে সব কুপমন্ডুকতা ও সংকীর্ণতাকে তাহাদের মিথ্যা অহমিকার কারণ-স্বরূপ বিশ্লেষণ করিয়াছেন, তাহা হয়তো হালের হিন্দু ইতিহাসবিদদের ভালো লাগে না; তাহারা সে কুপমন্ডুকতা ও সংকীর্ণতার অন্য ব্যাখ্যা দাঁড় করাইয়া তাহার তারিফ করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন।

আমাদের এই উপমহাদেশের সুলতানী আমলীয় আলাউদ্দীন খিলজী, মুহম্মদ বিন তুঘলক প্রমুখ সুলতানদের চরিত্র-বিচারে ঐতিহাসিকেরা যে এক এক জনে এক একরূপ অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, তাহাও আমরা দেখিয়াছি।
মরক্কোদেশীয় আরব মুসলিম ইবনে বতুতার সফরনামায় দেখা যায়, সফীর স্বচক্ষে হিন্দুদের সহমরণ বা সতীদাহ প্রথা লক্ষ্য করিয়া মর্মাহত হইয়াছেন। তিনি তাহাতে যে মন্তব্য করিয়াছেন, তাঁহার প্রায় সমসাময়িক ভারতের একমাত্র সুর-'নায়েক' এখানকার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম সুবিখ্যাত কবি, Leonardo Da-Vinci of India, আমীর খসরু স্বামী-স্ত্রীর প্রণয়-প্রসঙ্গ উল্লেখে সহমরণগামিনীদিগকে বাহবা দিয়াছেন। হিন্দুদের মধ্যে এই সহমরণ বা সতীদাহ প্রথার সমর্থকগণ এই প্রথার প্রতি কটূক্তিকারীর জন্য আক্রোশ পোষণ করিয়াছে, আর হিন্দু নারীর সতীত্ব-মহিমা কীর্তন করিয়াছে। পক্ষান্তরে হিন্দুদের মধ্যেই যাহারা সহমরণকে বর্বরতা ও জাতীয় মর্যাদাহানিকর প্রথা মনে করিয়া লজ্জাবোধ করেন, তাঁহারা এই প্রথার বিরুদ্ধবাদীদের কথায় স্বস্তি পান।

এই উপমহাদেশে বাদশাহী আমলের জালালুদ্দীন মুহম্মদ আকবর বাদশাহর বিষয়ে- বাদশার বন্ধু ও শিষ্য আবুল ফজল আল্লামীর ইতিহাস গ্রন্থে সমুচ্চ তারিফ দেখা যায়, আর সমসাময়িক মুল্লা আবদুল কাদির বদাউনীর ইতিহাস গ্রন্থে হয়তো সেই সব স্থলেই কোথাও নিন্দা, আবার কোথাও বিদ্রূপ পর্যন্ত অভিব্যক্ত হইয়াছে। শতবর্ষ-যাবৎ হিন্দু লেখকগণ ইতিহাস-চর্চা শুরু করিয়াছেন। সুলতান-বাদশাহ আমীর-রইসদের সম্পর্কে তাঁহাদেরও অভিব্যক্তি বিভিন্ন। কোনো কোনো হিন্দু লেখক মিথ্যা ঘটনা দ্বারা বাদশাহ আওরঙ্গজীবকে হেয় প্রতিপন্ন করিতে চাহিয়াছেন। পক্ষান্তরে যাহাদের ধর্মীয় শরিয়তী গ্রন্থে-পিতাকে অস্বীকারকারী কাফিররূপে ফতোয়াপ্রাপ্ত- সেই লোকেরা কেউ কেউ আওরঙ্গজীবের মতো কঠিন পিতৃদ্রোহীকে জিন্দাপীর রূপে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যেমন নাকি নামাজের মধ্যে হযরত মুহম্মদের আল্-আউলাদের বংশ বৃদ্ধি ও বরকত-ময় কল্যাণ-কামনা আল্লাহর দরগায় পেশ করিয়া আসিয়াই হযরত মুহম্মদের বংশ যাহারা নিপাত করিয়াছে, আজ পর্যন্ত ঠিক তাহাদের সমর্থনের যুক্তিতেই যত ধর্মীয় ব্যাখ্যা-গ্রন্থ প্রণয়ন হইতেছে। দেখা যায়, অযৌক্তিক যুক্তিও দুনিয়ায় প্রচলন হইয়া রহিয়াছে, নির্বিচারে গৃহীতও হইতেছে।

বাংলাদেশী ইতিহাসের অনেক বিষয়েও মতের বিভিন্নতা দেখা যায়। ১৯৭৭ সনের বাংলাদেশী ইতিহাস পরিষদের ঢাকাস্থ সম্মেলনের এক বিশেষ অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগীয় দুই ডক্টর নতুন কিছু বলার ঝোঁকে পড়িয়া বলিয়া বসিলেন:

"সুলতান হুসায়ন শাহকে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক বলিয়া যে প্রশংসা করা হয়, তিনি সে প্রশংসার যোগ্য নন; কারণ আসলে তিনি তাঁহার দরবারে বাংলা ভাষার কোনো কবিকেই পরিপোষণ করেন নাই। তবে যে বাংলা-ভাষার কবিরা তাঁহার প্রশংসা-সূচক উক্তি করিয়াছেন, তাহা দেশের বাদশাহ-হিসাবে উল্লেখ রাখিবার পদ্ধতি অনুসরণ মাত্র।"

কাহারো বিষয়ে সমালোচনা করিতে চাহিলে সমালোচ্যের মৌলিক কর্তব্য সম্পর্কে সামান্য ধারণাও রাখা দরকার। সেই দিকে লক্ষ্য রাখিয়া আমি জওয়াব দিয়াছিলাম:

"দেশের কোনো ভাষার কবিকে দরবারে পোষণ করা সেই দেশের সুলতান বাদশা-র কর্তব্য নয়। তাঁহার সর্বপ্রথম কর্তব্য- দেশের সকল মানুষের জীবনের সর্বমুখী নিরাপত্তা বিধান করা। দ্বিতীয়তঃ কর্তব্য হইতেছে- নিজ আয়ত্তে সম্ভবপর দেশের সকল রকম সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য (শুধু খাদ্য নয়) মোটামুটি সকলের দ্বারে সমপরিমাণে পৌঁছাইবার তদারক করা। সুলতান হুসায়ন শাহ-র প্রতি কবিদের স্বতঃস্ফূর্ত তারিফ শুনিয়া বুঝা যায়, এই উভয় সুলতানী কর্তব্যই তিনি সুষ্ঠুভাবে সমাধান করিতে পারিয়াছিলেন- যে জন্য কবিরা তাঁহার তারিফে বাক্য ব্যয় না করিয়া পারেন নাই। অনেক কবিই তাহাদের সময়ের সুলতানের উল্লেখ এড়াইয়া গিয়াছেন।"

আসলে প্রশ্ন হইতেছে, ইতিহাসগত চরিত্রবিচারের মানদণ্ড কি? কোন্ মানদণ্ডে তাহাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করিতে হইবে? যে ঐতিহাসিক যেরূপ ধারণা পোষণ করেন, সেইরূপ তুলাদণ্ডেই কি তিনি ইতিহাসগত চরিত্র তৌল করিবেন? নাকি এইজন্য কোনো সর্বসম্মত অভিমত আছে?

নাকি যে চরিত্রটির বিচার-বিশ্লেষণ করিতে হইবে- যে কোন্ নীতি বা ধর্ম স্বীকার করিয়াছেন, সেই নীতি বা ধর্মের বিচারে লোকটির কার্যকলাপ বিচার করিতে হইবে? কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন আছে। বাদশাহ্ আকবর কোন ধর্মাবলম্বী ছিলেন সমসাময়িক খ্রিস্টান পাদরীরা কি তাঁহার কোনো হদিস পাইয়াছিলেন? হিন্দুদের জন্য যে বাদশাহ ঝরোকা-ই-দর্শনে দর্শন দান করিতেন, তখন হিন্দুরা যে তাঁহাকে 'দিল্লীশ্বরো বা জগদীশ্বরো বলিয়া তাঁহার জয় ঘোষণা করিত, তাহাতে কি বাদশাহকে হিন্দুরা 'যবন' ম্লেচ্ছ' মনে করিতে পারিত? মানসিংহ তাঁহাকে কি মনে করিতেন? প্রতাপসিংহই বা তাঁহাকে কি মনে করিতেন? এই সব বিবেচনা করিবার দরকারকে কি উড়াইয়া দেওয়া যায়?

আফ্রিকার জঙ্গলবাসী এক জাতির মধ্যে- বাপ-মা সন্তানকে অনেকদিন পেটে-পিঠে রাখে বলিয়া বৃদ্ধ হইলে বাপ-মাকেও লোকে জবাই করিয়া খাইয়া অন্তত একদিনের জন্যেও বাপ-মাকে পেটে-পিঠে রাখিয়া পিতৃমাতৃ-ঋণ কিছুটা পরিশোধ করে। উহাদের কার্যকলাপের বিচার কেমনভাবে করিতে হইবে?

আরব মরুতে মানব জাতির উদ্ধারসাধনের আশাতেই হযরত মুহম্মদ মুস্ত ফা (দ.) অল্প সময়ের ভিতরে যে বিপ্লব সমাধা করেন, তাঁহার ওফাতের পরপরই কৌশলী প্রতিবিপ্লবীরা তাঁহার সাহাবা-খিতাবে ভূষিত থাকিয়াই এমন প্রবল হইয়া উঠে যে ধীরগতি সংগীন কূটকৌশলের সাহায্যে গোত্রীয় আক্রোশভরে নবীর বংশই নিপাত করিয়া ফেলিয়াছে এবং এমন সব যুক্তি আবিষ্কার করিয়া ফেলিয়াছে, যে ঐ লোকের বংশ যে নিপাত করাই উচিত, সেদিকেই এখন সকলের অভিমত গঠিত হইতেছে। অথচ প্রতিবিপ্লবীদের কার্যকলাপের সামান্য সমালোচনাও করিতে দেওয়া হয় না। সেই জন্য মুসলিম ঐতিহাসিকেরা অনেকেই শুধু ঘটনাবলী উল্লেখ করিয়াছেন, কোনো চরিত্রেরই বিচার-বিশ্লেষণ তাঁহাদের স্বীকৃত ধর্ম-মতানুযায়ীও করিতে যান নাই।

প্রতিবিপ্লবীদের গোঁজামিল ব্যাখ্যানুযায়ীই আজো 'ইসলাম' নামক ধর্ম প্রচলিত রহিয়াছে। ইহার সত্যাসত্য-বিচারকারী কাহাকেও টিকিতে দেওয়া হয় নাই।

খলিফা উমর বিন আবদুল আজীজ ও হযরত ইমাম আবু হানিফা আসল ইসলামের কথা তুলিতে গিয়া কেমন নির্মমভাবে নিহত হন ঐতিহাসিকেরা তাহা জানেন। এই সেদিন নরমভাবে শাহ ওলীউল্লাহ দিহলভী একটু বলিতে গিয়াছিলেন, তাহাতে জামে মসজিদের চত্বরেই তাঁহাকে হত্যার জন্য কায়েমী স্বার্থবাদীরা ঘিরিয়া ধরিয়া হাত ভাঙিয়া দিয়াছিল।

কাজেই, ইতিহাসগত চরিত্রের বিশ্লেষণ ছাড়া যদি মানবজাতির ভবিষ্যৎ উদ্ধার না হয়, তাহা হইলে তাহার বিচারের একটি মানদণ্ড নির্ণয় প্রয়োজন।

বিচার-সমস্যা:

হিন্দুশাস্ত্রে বেশ জন্মান্তরবাদ থাকায় সেই সুযোগে রাক্ষসরাজ রাবণ নিজের সর্বনাশ দেখিয়া আক্ষেপ করে, 'পূর্বজন্ম-দোষে হায় ঘটিছে এরূপ!' ইহজন্মে যে এক নির্বাসিত অসহায় রাজপুত্রের আস্ত স্ত্রীটিকে চুরি করিয়া আনিয়া রাখিয়া দিয়াছে, চিত্রাঙ্গদা মনে করাইয়া দিলেও সে-কথা সে আমল দেয় না, তখন আর এক ফতোয়া বাহির করে 'গ্রহদোষে দোষীজনে কে ভর্ৎসে, সুন্দরী?' জ্যোতিষশাস্ত্রে চলিয়া যায়। মরণকে ও দারিদ্র্যকে যে ভয় করে না, তাহাকে ন্যায়পথ হইতে কেউ সরাইতে পারে না।

তবে কোন উপায়ে ইবলিস বড়ো বড়ো মানুষকে নিজ খপ্পরে ঘেরাও করেই।'
[সূরাহ সাবা: ৩৪: আমরা যখনই কোনো জনপদে পথপ্রদর্শক পাঠাইয়াছি, তখন উহার ধনী বাসিন্দারা বলিয়াছে, "তোমাদিগকে যেসব (নির্দেশ বা হিদায়াত) সহ পাঠান হইয়াছে সেইসব বিষয়ে আমরা বিশ্বাস করি না।"
সূরাহ যুখরুফ: ২২-২৪: আর এইরূপেই-তোমার পূর্বেও যখনই আমরা কোন জনপদে সতর্ককারী পথপ্রদর্শক পাঠাইয়াছি, তখনই ধনবান লোকেরা বলিত, 'নিশ্চয় আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদিগকে এই পথে পাইয়াছি এবং আমরা অবশ্য তাহাদেরই পদচিহ্ন অনুসরণ করিয়া চলিব।'-তাহাদের পথপ্রদর্শক বলিত, 'আমি তোমাদের কাছে তোমাদের পিতৃপুরুষের অনুসরণীয় যাহা পাইয়াছ তাহা হইতে উত্তম হিদায়াত যদি উপস্থিত করিয়া থাকি, তবুও তোমরা মানিবে না?' তখন তাহারা বলিয়াছে, 'তোমাদিগকে যে নির্দেশ দিয়া পাঠান হইয়াছে নিশ্চয় আমরা তাহা মানি না।'
(খিলাফতের ইতিহাস ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ। দ্বিতীয় সংস্করণ: ৬৪ পৃষ্ঠা।)]

মুসলিম জাহানেও বিভ্রান্তি ছড়াইবার বহু রকম কলকাঠি আবিষ্কৃত ও বিস্তৃত হইয়া আছে যাহার দৌলতে মুসলিমেরাও এক অভয় পাইয়া গিয়াছে, নিশ্চয়ই ইবলিস হইতে পাইয়াছে, (তখনও মক্কায় আল্লাহর হজ্জের প্রতিদ্বন্দ্বী- টুঙ্গিতে ইবলিস স্বতন্ত্র হজ্জের বন্দোবস্ত করিয়াছিল কি?) অন্যান্য নবীদের আমলদারিতে তাঁহাদের উম্মতের জঘন্য অন্যায়ের জন্য যে দুনিয়াতেই গজব নামিয়া আসিয়া দুনিয়ার চোখে তাহাদের হেয় প্রতিপন্ন করিয়াছে, আখেরী নবীর উম্মতকে খাতির করিয়া তেমন যিল্লতিতে ফেলিবে না। এতটুকু ভাবিবার জ্ঞান তাহাদের আজো হইল না, যে যদি যিল্লতিতে তাহাদিগকে না-ই ফেলা হইবে, তবে অমন করিয়া বার বার আগেকার উম্মতের যিল্লতির ঘটনা স্মরণ করানো হইবে কেন?

আল্লাহ-রসূলের নির্দেশিত আদর্শ চরিত্রের অনুসরণ ও অনুশীলন বিসমিল্লাহতেই ত্যাগ করায় এবং তৎস্থলে ত্রুটিপূর্ণ নিম্নতর চরিত্রকে আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠায় যাওয়াতে এমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হইয়াছে যে ইবলিসই ঐ ভাবে তাহাদের চোখ ও হৃদয়-মন মোহরবদ্ধ করিতে সমর্থ হইয়াছে, যেমন জন্মান্তরবাদের ধূয়ায় হিন্দুদের চোখ নিজ নিজ অন্যায়ের প্রতি অন্ধ হইয়া আছে। কাকে কি ভাবে বদ্‌ কাজে মুতায়িন রাখা যায়, ইবলিস সে-বিষয়ে উস্তাদ।

ইবলিস এমনভাবে চিন্তাকে আটকাইয়া রাখে এবং এমনভাবে অভয় দেয়, যে মুসলমান বড়রা ঘোর জঘণ্য অন্যায় করিতেও পরওয়া করে না।' কিসের পরওয়া? আখিরাতের বিচার-আচার আছে কিনা তাহা কে জানে! ঐসব আমাদিগকে ভালো রাখিবার কৌশল-মাত্রও তো হইতে পারে? তাহা হইলে ভালো থাকুক ঐ গরিবগুলি! আমরা তাহাদের উপর ফাঁকি মারিয়া বাহাদুরী উড়াইয়া যাই। এই তো সুযোগ। কেউ তো আর বিচার-আচার দেখিয়া আসিয়া বলে নাই? এই সাহসে কঠোরভাবে আল্লাহ-রসূলের মানা করা বহু জঘণ্য অন্যায় বিনা-ওজরে বড়রা প্রথম হইতেই করিয়া আসিতেছে।' বড়দের চাপে অতীষ্ঠ হইয়া ছোটরা তো করিবেই! তাহাদেরও যে রেহাই আছে, তাহা দেখা যায় না। তবে তাহারা বড়দের চাপ কুলাইতে না পারিয়া হয়তো অন্যায় পথে চলিয়াছে। ছোটরা বড়দের অন্ধ অনুসরণ করিয়া থাকে। অবশ্য অন্ধত্বরও রেহাই নাই।

এই সেদিন বিশ্বাসী লোকেরা ইসলামকে সমাজে রূপায়িত করিবার একটি স্থানরূপে পাকিস্তান আশা করিয়াছিলেন। ওরে বাপরে! সুবহান আল্লাহ! আল্লাহর মর্জিতে তাহা এমন এক তারিখে হইয়াছিল, যাহাকে লোকে শবে কদর বলিয়া আসিতেছে। এই ফাঁকে বড়দের মধ্যে ইবলিস ঢুকিয়া পড়িল। মুনাফিকেরা এই সুযোগ হেলায় হারাইল না। তাহারা ইবলিসের সঙ্গে গলা মিলাইয়া প্রচার করিল, 'শবে কদরে পাকিস্তান দিয়া আল্লাহ আটকিয়া গিয়াছে, (নাউজুবিল্লাহ!) এই সুযোগ আর কাড়িয়া লইতে পারিতেছে না।' ইহার পরবর্তী অংশ পরহেজগার মুনাফিকেরাই ঠিক করিয়া ফেলিল, "এই সুযোগ আর হেলায় হারান চলে না। যথাসম্ভব জঘন্যতম অন্যায় অনাচার করিয়া ইহার সদ্ব্যবহার করিয়া লওয়া যাক।"

এখন আল্লাহ কোনো সুযোগ দিয়া যে আর উঠাইয়া লইতে পারে না। তাহা দেখাইয়া দিয়াছে কি?

আল্লাহ-রসূল নবীবংশকে মুসলমানের কাছে আমানত রাখিয়াছেন। শুধু আমানত নয়, তাহাদিগকে ভালোবাসিতেও সনির্বন্ধ হুকুমজারি করিয়াছেন।
[সূরা শুরা:২৩- (আল্লাহ্ রাসূলুল্লাহকে তাকিদ দিতেছেন) লোকদের বলিয়া দাও, ইহার (আল্লাহর হিদায়েত ও নেয়ামত আনিয়া দওয়ার) জন্য আমি আমার আজুরা (বদলা) ঘনিষ্টতম প্রতি তোমাদের অকুন্ঠ অনুরক্তি ছাড়া আর কিছুই চাই না]
নবীবংশ ও আল-কুরআন কখনো একে অপরকে ছাড়িবে না (তিরমিজি শরীফ)।

অতএব ইহারা ব্যতীত আর কেউ কাহারো অনুসরণীয় নয়, ইহাদেরই হুকুমের মুখাপেক্ষী থাকিতে হইবে, ইহাদের প্রতি সালাতের চূড়ান্ত অংশে দরূদ ভেজিতেও হয়, তৎ সত্ত্বেও মুসলমানেরা যে ইহাদিগকে একে একে নিঃশেষ করিয়া আসিতেছে, তাহাতে আল্লাহ-রসূল (দ.) তো মুসলমানের কিছুই করিতে পারিতেছে না। কারবালায় নবীবংশনাশের জন্য যাহারা দায়ী, ইয়াজিদ, উবায়দুল্লাহ হইতে শুরু করিয়া নিম্নতম সিপাহী পর্যন্ত যাহারা নবীবংশের উপর আঘাত করিতে কসুর করে নাই, এই দুনিয়াতেই জঘন্য অবস্থার ভিতর দিয়া গিয়া তাহাদের মৃত্যুবরণ কেহ রোধ করিতে পারে নাই, সে খবরে মুসলমানের প্রয়োজন কি?

সওয়ায়িক-ই-মুহরিকা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে হজরত হুসায়ন ও তাঁহার পরিজন-হত্যায় যাহারা সহযোগিতা করিয়াছে, তাহারা আখিরাতের শাস্তির আগেই দুনিয়ায় যথেষ্ট ভোগ করিয়াছে। এই কথা এক মজলিসে আলাপ হইবার সময় একজন দাঁড়াইয়া মুসলমানের মতোই বলিল, 'আমি ইমাম হত্যায় সহযোগী ছিলাম, কিন্তু কৈ, আমার তো কিছুই হইল না।' হইয়াছে। কিন্তু গণ্ডারের চামড়ায় কি বোধশক্তি আছে? একটু পরেই সে রাতের আলো দিবার মশালের পাশে দাঁড়াইতে গেলে তাহার গায়ে আগুন ধরে। 'আগুন-আগুন' বলিয়া চিৎকার করিয়া সে দরিয়ায় ঝাঁপ দেয়। কিন্তু কোথাও আগুন তাহাকে ছাড়ে না। ধীরে ধীরে আগুনের তাড়নায় ও যন্ত্রণায় সে মৃত্যুর দিকে আগাইয়া যায়।

আবুশ্ শায়খ এই ঘটনা বয়ান করিয়াছেন।

তবে মুসলমানেরা পণ্ডিত হইয়া আসিতেছে, ইদানীং বুদ্ধিজীবীও হইতেছে। তাহারা ভাবিবে, ও-সব নৈবাৎ ঘটিয়াছে। বুদ্ধিজীবীরা বলিবে, আল্লাহ, যদি এতোই পারে তবে আর সেই কারবালা ময়দানে সেই ১০ই মুহররমে তাহার দাদ লইল না কেন? আসলে মুসলমানকে অযথা ভয় ধরাইয়া তাহাদিগকে মজাদার অন্যায়-অনাচার হইতে ফিরাইয়া রাখিবার এইসব কৌশল মাত্র। কতো লোক অন্যায় কাজ করিয়া কতো বড় হইয়া যাইতেছে, শুধু মুসলমানেরই যতো বাধা। এ কথা কী ভাবে, যে কতো জানোয়ার খাইয়া নাদাইয়া পয়মাল করিয়া যাইতেছে তাহাদের কিছু হয় নাই? এইরূপ বুদ্ধিমত্তা আদি হইতেই দেখাইয়া জঘণ্য অন্যায় করিয়া আসিতে কখনো মুসলমানেরা দ্বিধাবোধ করে নাই। তাই তাহারা বড় হইতে হইতে আজ একদিকে ইহুদির আর অন্যদিকে মুশরিকের বিনামার তলদেশে মাথা ঠেকাইয়া মাত্র ঠেলিতেছে, (কারণ এই দুই জাতিকেই আল্লাহ্ মুসলমানের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দুশমন-রূপে শনাক্ত করিয়া দিয়াছিল) এদিকে অন্যজাতির বেয়নেটের আশ্রয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া

আল্লাহ-রসূল নবীবংশকে মুসলমানের কাছে আমানত রাখিয়াছেন। শুধু আমানত নয়, তাহাদিগকে ভালোবাসিতেও সনির্বন্ধ হুকুমজারি করিয়াছেন। নবীবংশ ও আল-কুরআন কখনো একে অপরকে ছাড়িবে না (তিরমিজি শরীফ)।

অতএব ইহারা ব্যতীত আর কেউ কাহারো অনুসরণীয় নয়, ইহাদেরই হুকুমের মুখাপেক্ষী থাকিতে হইবে, ইহাদের প্রতি সালাতের চূড়ান্ত অংশে দরূদ ভেজিতেও হয়, তৎ সত্ত্বেও মুসলমানেরা যে ইহাদিগকে একে একে নিঃশেষ করিয়া আসিতেছে, তাহাতে আল্লাহ-রসূল (দ.) তো মুসলমানের কিছুই করিতে পারিতেছে না। কারবালায় নবীবংশনাশের জন্য যাহারা দায়ী, ইয়াজিদ, উবায়দুল্লাহ হইতে শুরু করিয়া নিম্নতম সিপাহী পর্যন্ত যাহারা নবীবংশের উপর আঘাত করিতে কসুর করে নাই, এই দুনিয়াতেই জঘন্য অবস্থার ভিতর দিয়া গিয়া তাহাদের মৃত্যুবরণ কেহ রোধ করিতে পারে নাই, সে খবরে মুসলমানের প্রয়োজন কি?

সওয়ায়িক-ই-মুহরিকা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে হজরত হুসায়ন ও তাঁহার পরিজন-হত্যায় যাহারা সহযোগিতা করিয়াছে, তাহারা আখিরাতের শাস্তির আগেই দুনিয়ায় যথেষ্ট ভোগ করিয়াছে। এই কথা এক মজলিসে আলাপ হইবার সময় একজন দাঁড়াইয়া মুসলমানের মতোই বলিল, 'আমি ইমাম হত্যায় সহযোগী ছিলাম, কিন্তু কৈ, আমার তো কিছুই হইল না।' হইয়াছে। কিন্তু গণ্ডারের চামড়ায় কি বোধশক্তি আছে? একটু পরেই সে রাতের আলো দিবার মশালের পাশে দাঁড়াইতে গেলে তাহার গায়ে আগুন ধরে। 'আগুন-আগুন' বলিয়া চিৎকার করিয়া সে দরিয়ায় ঝাঁপ দেয়। কিন্তু কোথাও আগুন তাহাকে ছাড়ে না। ধীরে ধীরে আগুনের তাড়নায় ও যন্ত্রণায় সে মৃত্যুর দিকে আগাইয়া যায়।

আবুশ্ শায়খ এই ঘটনা বয়ান করিয়াছেন।

তবে মুসলমানেরা পণ্ডিত হইয়া আসিতেছে, ইদানীং বৃদ্ধিজীবীও হইতেছে। তাহারা ভাবিবে, ও-সব নৈবাৎ ঘটিয়াছে। বুদ্ধিজীবীরা বলিবে, আল্লাহ, যদি এতোই পারে তবে আর সেই কারবালা ময়দানে সেই ১০ই মুহররমে তাহার দাদ লইল না কেন? আসলে মুসলমানকে অযথা ভয় ধরাইয়া তাহাদিগকে মজাদার অন্যায়-অনাচার হইতে ফিরাইয়া রাখিবার এইসব কৌশল মাত্র। কতো লোক অন্যায় কাজ করিয়া কতো বড় হইয়া যাইতেছে, শুধু মুসলমানেরই যতো বাধা। এ কথা কী ভাবে, যে কতো জানোয়ার খাইয়া নাদাইয়া পয়মাল করিয়া যাইতেছে তাহাদের কিছু হয় নাই? এইরূপ বুদ্ধিমত্তা আদি হইতেই দেখাইয়া জঘণ্য অন্যায় করিয়া আসিতে কখনো মুসলমানেরা দ্বিধাবোধ করে নাই। তাই তাহারা বড় হইতে হইতে আজ একদিকে ইহুদির আর অন্যদিকে মুশরিকের বিনামার তলদেশে মাথা ঠেকাইয়া মাত্র ঠেলিতেছে, (কারণ এই দুই জাতিকেই আল্লাহ্ মুসলমানের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দুশমন-রূপে শনাক্ত করিয়া দিয়াছিল) এদিকে অন্যজাতির বেয়নেটের আশ্রয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া হজ্জ করিবার সুবিধাও তেল দিয়া কিনিয়া ফেলিয়াছে। খারিজী ধর্মে কি সহজ সুবিধা! যাহারা সামনে আছে, 'লা হুকমা ইল্লালিল্লাহ' বলিয়া তো তাঁহাদিগকে অগ্রাহ্য করিয়াছে। আল্লাহকে হাজির নাজির ভাবার দরকার রাখে নাই; তবে আর যাহা-খুশি-তাহাকে ধর্ম বলিয়া প্রকাশ করায় অসুবিধা কি?

প্রথম হইতেই আল্লাহ্-রসূলের উপরে অধিকতর চালাকীর সঙ্গে গলত করিয়া আসিতে আসিতে মুসলমানেরা অন্যের নজরে ইসলামের চেহারা গ্রহণের অযোগ্য দেখাইয়া আসিয়াছে, (মুসলমানেরা আঘাতের ডরে তাহাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ বলে নাই) ঐভাবে আল্লাহ্-রসূলকে অবজ্ঞা করার কৌশল তাহারা শিখাইয়া তুলিয়াছে। এখন তাহাদের ছেলেরা জীবন বাঁচাইবার জন্য সে-'ইসলাম' ছাড়িয়া পালাইতেছে। তাই নানা কূটকৌশলে সেই গলত ঢাকিবার জন্য মুসলমানরা সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করিবার প্রাণপণ প্রচেষ্টায় পুস্তকের উপর পুস্তক লিখিয়া ইসলামী সাহিত্য (?) স্তুপীকৃত করিতেছে। কিন্তু আল্লাহ্-রসূল যাঁহাদিগকে আদর্শ চরিত্র বলিয়া অনুসরণীয়রূপে ধরিতে নির্দেশ করিয়াছেন, তাঁহাদিগকে এখনো ধরিতে না গেলে মুসলমানের দলে উপদলে ফসাদ মিটিবে কি? কাজেই, শান্তিপ্রিয় লোকেরা জঘণ্যদের 'ইসলাম' ছাড়িয়া না দিয়া আর কোথায় পথ পাইবে?

সম্পূর্ণ বইটির ধারাবাহিক পোস্ট
চলবে

হযরত খাদিজার (সা.আ.) সাথে হযরত মুহাম্মদের (সা.) বিবাহহযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন ব্যবসার কাজে মক্কা থেকে শামে (সিরিয়া) গিয়েছ...
23/08/2026

হযরত খাদিজার (সা.আ.) সাথে হযরত মুহাম্মদের (সা.) বিবাহ

হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন ব্যবসার কাজে মক্কা থেকে শামে (সিরিয়া) গিয়েছিলেন, তখন খাদিজার সাথে তাঁর পরিচয় হয়েছিল এবং তাঁর সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের কাজ শুরু করেন। খাদিজা (সা.আ.) হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আখলাক ও চরিত্র দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁর স্বপ্নের সাথে সব মিলে যাচ্ছিল। খাদিজা মুহাম্মদ (সা.) কে ডাকলেন এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন।

হযরত খাদিজার (সা.আ.) স্বপ্ন ও বিবাহ

রাসূলের (সা.) সাথে পরিচয় হওয়ার পূর্বে তিনি এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নের কথা তার চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নওফলের কাছে বর্ণনা করেন। তার স্বপ্নটি ছিল এ রকম যে, আকাশ হতে আমার কোলে একটি চাঁদ নেমে আসল এবং সেটা আবার সাত ভাগে বিভক্ত হল।

ওরাকা বিন নওফেল বলল: এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা হল শেষ যুগে এক রাসূলের আবির্ভাব ঘটবে এবং তার সাথে তোমার বিবাহ হবে। আর সেই বিবাহের ফলে তোমাদের থেকে সাতটি সন্তান জন্ম নিবে।

হযরত খাদিজার (সা.) সাথে হযরত মুহাম্মদের (সা.) সাক্ষাত ও বিবাহের প্রস্তাব

হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন ব্যবসার কাজে মক্কা থেকে শামে (সিরিয়া) গিয়েছিলেন, তখন খাদিজার সাথে তাঁর পরিচয় হয়েছিল এবং তাঁর সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের কাজ শুরু করেন। খাদিজা (সা.আ.) হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আখলাক ও চরিত্র দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁর স্বপ্নের সাথে সব মিলে যাচ্ছিল। খাদিজা মুহাম্মদ (সা.) কে ডাকলেন এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই প্রস্তাবে একটু চিন্তিত হলেন। কারণ, হযরত খাদিজা ছিলেন ধনী এবং তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষ তেমন ধন-সম্পদ ছিল না। হযরত মুহাম্মদ (সা.) খাদিজার প্রস্তাবের কথা তাঁর চাচা আবু তালেবকে বললেন। আবু তালেব এই প্রস্তাবের কথা অত্যন্ত খুশি হলেন এবং রাজী হলেন। হযরত খাদিজা ও মুহাম্মদ (সা.) এর বিয়ে অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করলেন। খাদিজার নিবিড় ভালবাসাকে মুহাম্মদ (সা.) উপলগ্ধি করেছিলেন এবং তিনি হৃদয়ে উপলগ্ধি করলেন যে, আকাশ থেকে শব্দ এলো ও বলল: "নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র নারীকে পবিত্র ও সত্যবাদী স্বামী দান করে থাকেন।" তখন তাদের চোখের সামনে থেকে পর্দা সড়ে যায় এবং বেহেস্তের হুরগুলো যে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল তা অবলোকন হয় এবং আতরের গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আর সবাই বলতে থাকে যে, এত সুন্দর সুগন্ধ এই সততা থেকেই উৎসারিত হয়েছে।

অভিযোগকারী নারীদের প্রতি হযরত খাদিজার (সা.আ.) উপযুক্ত জবাব

কুরাইশ বংশের একদল ত্রুটি অন্বেষকারী মূর্খ নারী হযরত খাদিজা (সা.আ.) সম্পর্কে অভিযোগ ও উপহাস করতে লাগল। তারা উপহাস করে বলতো:

"খাদিজার মত একজন প্রসিদ্ধ ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী বিত্তশালী নারীর এটা মানায় না যে একজন ইয়াতীম, রিক্তহস্ত, দরিদ্র ব্যক্তিকে বিয়ে করবে আর এটা কি নেক্কারজনক একটা বিষয় নয়?।"

যখন এই কথাটি হযরত খাদিজার (সা.আ.) কানে পৌঁছালো তিনি তার কর্মচারীদেরকে সুস্বাদু খাবার তৈরীর নির্দেশ দিলেন। আর ঐ সকল নারীদেরকে দাওয়াত করলেন। যখন সবাই আহারে ব্যস্ত তখন হযরত খাদিজা (সা.আ.) তাদের উদ্দেশ্যে বললেন:

"হে নারী সমাজ! তোমরা নাকি হযরত মুহাম্মদকে (সা.) বিয়ে করার বিষয়কে কেন্দ্র করে আমাকে উপহাস করছো। আমি তোমাদের কাছে জানতে চাই:

"হযরত মুহাম্মদের (সা.) মত ঐ ধরনের ভাল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি কি তোমাদের নজরে আছে? মক্কা ও মদীনার আশে পাশে এমন ব্যক্তিত্ববান কেউ কি আছে যিনি হযরত মুহাম্মদের (সা.) মত চরিত্র ও মর্যাদার দিক থেকে এত সৌন্দর্য্যপূর্ণ এবং পরিপূর্ণতার অধিকারী? আমি তার এই পূর্ণতার কারণেই তাকে বিবাহ করেছি, আর এমন কিছু তার সম্পর্কে শুনেছি ও দেখেছি যা অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। সুতরাং এটা উচিত নয় যে, তোমরা যা খুশি তাই বলবে ও অজ্ঞতাবশে কাউকে অশোভনীয় অপবাদ দিবে।"

হযরত খাদিজার (সা.আ.) এ ধরনের হৃদয়গ্রাহী কথা শুনে সমস্ত নারীরা নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাদের এই নিস্তব্ধতা তারই সাক্ষ্য বহন করে যে, এ সম্পর্কে তাদের আর বলার মত কোন ভাষা নেই। হযরত খাদিজা (সা.আ.) এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তার সাথে ও আল্লাহর সন্তুষ্টচিত্তে তাদের কৃতকর্মের জবাব দিয়েছিলেন।

হযরত আদমের (আ.) বাণীতে হযরত খাদিজার (সা.আ.) কৃতিত্বের কথা

হযরত খাদিজার (সা.আ.) কৃতিত্ব বা মর্যাদার কথা বিশ্বের প্রথম মানব হযরত আদমের (আ.) সময় অর্থাৎ হযরত খাদিজার (সা.আ.) জন্মেরও বহু শতাব্দী পূর্বে আলোচিত একটি বিষয় ছিল (হযরত আদম (আ.) হতে বর্ণিত) তিনি বলেছেন: কিয়ামতের দিন আমি সকল মানবজাতির সর্দার ও নেতা, কিন্তু এমন এক ব্যক্তি আসবে যিনি আমারই সন্তানগণের মধ্য থেকে আর তিনি রাসূলগণের মধ্যেও একজন রাসূল যার নাম মুহাম্মদ তিনি দু'দিক থেকে আমার চেয়েও বেশী মর্যাদার অধিকারী:

তার স্ত্রীর ক্ষেত্রে যিনি ছিলেন তার সর্বোত্তম সঙ্গী কিন্তু আমার স্ত্রী হাওয়া সে ধরনের ছিল না।

তিনি পরিপূর্ণভাবে অশুভ আত্মার উপর কর্তৃত্বের অধিকারী (এমন কি তারকে আউলা পর্যন্ত আঞ্জাম দেন নি) কিন্তু আমি ঐ রকম নই।

স্বামীর প্রতি হযরত খাদিজার (সা.আ.) সহমর্মীতা

রাসূল (সা.) নবুয়্যত ঘোষণার প্রাক্কালে এক সাড়া জাগানো স্বপ্ন দেখেছিলেন ও খাদিজার (সা.আ.) নিকট এসে এভাবে বর্ণনা করলেন: আমি স্বপ্নে দেখলাম আমার পেটের ভুরিকে স্বস্থান হতে সরে আনা হয়েছে। অতঃপর সেটাকে ধৌত ও পবিত্র করা হয়েছে এবং আবার সেটাকে স্বস্থানে রাখা হয়েছে।

হযরত খাদিজা (সা.আ.) রাসূলের (সা.) স্বপ্নের কথা শুনে বললেন: "আপনার এই স্বপ্ন অতি উত্তম ও সৌভাগ্যের চিহ্ন বহন করে, আপনাকে সম্ভাষণ জানায়, আল্লাহ আপনার প্রতি কল্যাণ ব্যতীত কিছু করেন না।"

হযরত খাদিজা (সা.আ.) এরূপ পরিস্থিতেও রাসূলের (সা.) সহচর, বন্ধু, বিশ্বস্ত সাথী ও দূর্দিনে সহমর্মী ছিলেন। যে কোন দূর্ঘটনা যেটা রাসূলের (সা.) অশান্তি বা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতো, আল্লাহ তায়ালা হযরত খাদিজার (সা.আ.) মাধ্যমে সেই অশান্তি বা দুশ্চিন্তা দূর করে দিতেন এবং হযরত খাদিজাও (সা.আ.) তাঁর কষ্ট দূর করে দিয়ে তাঁকে প্রশান্তি দান করতেন। হযরত খাদিজার (সা.আ.) এই কর্মসূচীটি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

ইসলামের অগ্রগতির ক্ষেত্রে হযরত খাদিজার (সা.আ.) ধন-সম্পদের ভূমিকা

ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, হযরত খাদিজা (সা.আ.) রাসূলের (সা.) সাথে পরিণয় হওয়ার পূর্বেও আরবদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ধণাঢ্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার প্রায় সত্তর হাজার উট ছিল ও বাণিজ্য কাফেলাগুলি দিবা-রাত্রি তায়েফে, ইয়েমেনে, শামে (সিরিয়ায়), মিশরে এবং অন্যান্য রাষ্ট্রে বাণিজ্যিক লেন-দেন করতো, তার অনেকগুলি ক্রীতদাস ছিল যারা তার ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল।

হযরত খাদিজার (সা.আ.) বিস্ময়কর আত্মত্যাগসমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে রাসূলের (সা.) সাথে বিবাহের পর ইসলাম পূর্ব ও ইসলাম পরবর্তী যত সম্পদ ছিল সমস্ত সম্পদ রাসূলের (সা.) অধীনে দিয়ে দিয়েছিলেন যাতে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে তিনি সেগুলিকে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে পারেন।

এমন অবস্থা দাঁড়ালো যে, রাসূল (সা.) দরিদ্র অবস্থা থেকে সম্পদশালী অবস্থাতে রূপান্তরিত হলেন এবং আল্লাহ তায়ালা তাঁর অনূগ্রহের অবদান সম্পর্কে রাসূলকে (সা.) উদ্দেশ্য করে বলতে গিয়ে এভাবে আয়াত অবর্তীর্ণ করেন:

আল্লাহ আপনাকে অভাবী অবস্থায় পেয়েছেন অতঃপর অভাবমুক্ত করেছেন।

বর্ণনানুসারে অর্থাৎ হযরত খাদিজার (সা.আ.) সম্পদের মাধ্যমে আপনাকে অমুখাপেক্ষী করেছেন।

হযরত খাদিজার (সা.) ধন-সম্পদের ব্যয়ক্ষেত্র

রাসূল (সা.) বলেছেন: "দুনিয়ার কোন ধন-সম্পদই আমাকে এতটা লাভবান করেনি যতটা খাদিজার সম্পদ করেছে।" এমতাবস্থায় এ প্রশ্ন মনে ভেসে উঠতে পারে যে, রাসূল (সা.) খাদিজার (সা.আ.) এই অঢেল সম্পদকে কোন পথে কিভাবে ব্যয় করলেন?

এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে রাসূল (সা.) খাদিজার (সা.আ.) সম্পদ হতে ঋণগ্রস্থদের ঋণমুক্ত করার কাজে, রিক্তহস্তদেরকে সাহায্যের কাজে, ইয়াতীমদের প্রতিপালনের কাজে, মুসলমানরা যারা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করত, মুশরিকরা তাদের মাল-সম্পদকে লুট করত, রাসূল (সা.) তাদেরকে খাদিজার (সা.আ.) সম্পদ থেকে সাহায্য করতেন যাতে তারা মদীনায় পৌঁছতে পারে। এক কথায়, রাসূল (সা.) যেভাবে ভাল মনে করতেন সেভাবে হযরত খাদিজার (সা.আ.) সম্পদকে ব্যয় করতেন।

রাসূল (সা.) সর্বদা হযরত খাদিজাকে (সা.আ.) স্মরণ করতেন

যদিও পরবর্তীতে উল্লেখ করা হবে যে, হযরত খাদিজা (সা.আ.) নবুয়্যত ঘোষণার দশ বছর পর ইন্তেকাল করেছেন, রাসূল (সা.) তার ইন্তেকালের দশ বছর অথবা তার কিছু বেশী দিন যাবৎ জীবিত ছিলেন। এই সময়গুলিতে তিনি (সা.) সারাক্ষণ হযরত খাদিজাকে (সা.আ.) স্মরণ করতেন, তার আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করতেন। কখনো কখনো এমনও হয়েছে যে, তিনি হযরত খাদিজার (সা.আ.) কথা স্মরণ করে এমনভাবে ক্রন্দন করতেন যে তার দু'চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়তো। কারণ, রাসূল (সা.) হযরত খাদিজার (সা.আ.) গভীর ভালবাসা ও দয়ার ঝর্ণাধারাকে অবলোকন করেছিলেন। হযরত খাদিজার (সা.আ.) প্রতি রাসূলের (সা.) এই ধরনের আচরনের কথা ঐতিহাসিকভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। তার একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করবো:

একদিন রাসূল (সা.) তাঁর কয়েকজন সহধর্মিনীর সাথে ছিলেন হঠাৎ করে হযরত খাদিজার (সা.আ.) প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু হল, রাসূল (সা.) এত বেশী স্পর্শকাতর হয়ে উঠলেন যে, তাঁর দু'চোখ থেকে অশ্রু ঝড়তে লাগলো।

হযরত আয়েশা তাঁকে বললেন: "আপনি কাঁদছেন কেন? একজন বয়োঃবৃদ্ধ মহিলার জন্য এভাবে কাঁদতে হবে?" রাসূল (সা.) প্রতিত্তোরে বললেন:

যে সময় তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলতে সে সময় সে আমাকে সত্যবাদী হিসেবে মেনে নিয়েছিল ও যে সময় তোমরা কাফির ছিলে সে সময় সে আমার প্রতি ঈমান এনেছিল, সে আমাকে সন্তান দান করেছে আর তোমরা তো বন্ধ্যা।

হাসান রেজা

রাসুল এ কায়নাৎ (সঃ) ও মালিকাতুল আরব বিবি খাদীজা সালামুল্লাহ এর শাদী মোবারক এর দিন মোকাররার হয় ১০ রবিউল আউয়াল।নবী'র শাদীর...
23/08/2026

রাসুল এ কায়নাৎ (সঃ) ও মালিকাতুল আরব বিবি খাদীজা সালামুল্লাহ এর শাদী মোবারক এর দিন মোকাররার হয় ১০ রবিউল আউয়াল।

নবী'র শাদীর দাওয়াত নামা ঐখান হতে ছাপা হয় যেখান হতে কোরআন ছাপা হয়।দাওয়াত নামা বন্টন করতে হযরতে আবু তালেব পুরানা খাদেম জিব্রীল কে ডাকেন।
দাওয়াত নামা পৌঁছে যায়। আরশ হতে বারাতী আসতে থাকে।
যে ঘরে শাদী হয় সেই ঘরের আত্নীয় স্বজন দুই পাচদিন আগে আসে। এসে ঘরের কর্তা কে বলেন জনাব এতবড় বিয়ের কাজ আমরা ও আপনাকে সহযোগিতা করি আমাদের কোন দ্বায়িত্ব দিন।
সোয়া লাখ আম্বিয়া আবু তালেব এর আঙিনায় দাড়িয়ে বলেন আমাদের কোন দ্বায়িত্ব দিন।
আবু তালেব যার যার নবুয়্যতের আন্দাজে দ্বায়িত্ব দেন।
আবু তালেব বলেন ইব্রাহীম আপনি আমার মোহাম্মদ এর মাথায় তাজ এ খুল্লাত পড়াবেন।
ইউসুফ আপনি আমার মোহাম্মদ এর হুসন এর সদকা দিবেন।
মক্কার কাচা রাস্তা বারাতী আরশওয়ালা পথিমধ্যে পানির এন্তেজামের দ্বায়িত্ব তাকে দেওয়া হয় যার কদমের ঠোকরে জমজম জারি হয়।
বারাত সাজ ধাজে আবু তালেব এর দরজায় তৈয়ার দুলহা'র অপেক্ষায়।
কিছুক্ষণ পরে হুজরার পর্দা উঠে দুলহা'র পহেলা কদম মক্কার বাজারে আসে।

দুলহা'র হালত কি?
ইয়াসীন এর শেহরা
মোজাম্মেল এর মেহেন্দি
তাহা'র লারীয়া
ইয়ামশাউ আরজ এর নালায়েন
ইন্নামা ইউরিদুল্লাহ'র চাদর
ইন্নামা ওয়ালিদুল্লাহ'র আংটি
চারিদিকে কুল আউযুবি রাব্বিল ফালাক এর ধ্বনি।
জনাবে আবু তালেব তার ভাতিজা মোহাম্মদ এর হাত ধরে এলান করে বলেন ওহ মক্কাওয়ালা দরজা খুলে দেখো ইয়াতীমের বারাত নয় আমার সরদারের বারাত যাচ্ছে।
যখন কোন বারাত যায় তখন ঐ খান্দানের বড় বড় ব্যক্তিদের সামনে রাখে যাতে তাদের রৌফ সম্পর্কে লোকে জানতে পারে।
মোহাম্মদ এর বারাত যাচ্ছে আগে আগে ইব্রাহিম ইসা মুসা ইউসুফ ইয়াহিয়া জাকারিয়া নুহ। দাউদ তার নিজ কন্ঠে শেহরা পড়েন।
বারাত বিবি খাদীজা'র আঙিনায় পৌছে।বারাত থমকে যায়। বারাত বরন করতে আসেন মারীয়াম হাওয়া হাজেরা আছিয়া সারা।
বারাত বিবির মহলের দরবারে বসেন।
যেখানে বারাত বসে সেখানে ইরানী কালীন রেশমী পর্দা মুল্যবান ফানুস সোনার থালা চান্দীর পানির পাত্র।
মীর আনিস লিখেছেন তাত্বহিরের কালীন
ইন্নামা ইউরিদুল্লাহ এর পর্দা সুরা আলে ইমরান এর ফানুস তুবা'র পাত্রে কাওসার পান করানেওয়ালা জিব্রীল।
সময় আসে ওয়াক্ত নিকাহ
রাসুল বসা হজরতে আবু তালেব এগিয়ে আসেন মোহাম্মদ নিজ জায়গা হতে সরে চাচা কে বসার স্থান দিয়ে সীনায় হাত রেখে বলেন বিসমিল্লাহ সরকার বসেন।
জনাবে আবু তালেব বসেন খুৎবায়ে নিকাহ পড়েন।
আবু তালেব বলেন আলহামদুলিল্লাহ
তারিফ ঐ আল্লাহর যে আমাদের নসলে ইব্রাহীম এ রেখেছেন
তারিফ ঐ আল্লাহর যে আমাদের জুররিয়াতে ইসমাঈল এ রেখেছেন
যে আমাদের মাথায় নবুয়্যতের তাজ পড়িয়েছেন
সাফা ও মারওয়ার ওয়ারিশ করেছেন
খানা এ কাবার মোতওয়াল্লি করেছেন
কাবার চাবি আমাদের দিয়েছেন।
হাজীর খানা পানি বিতরনের তৌফিক আতা করেছেন।
মক্কার ক্ষুদার্থ কে রুটি দানের সামর্থ আতা করেছেন।
হামদ পড়ে জনাবে আবু তালেব মোহাম্মদ এর দিকে ইশারা করে বলেন মোহাম্মদ আমার বড় ভাইয়ের বেটা। পুরা আরবে আমার ভাতিজার চেয়ে শরীফ কেউ নেই।পুরা আরবে আমার ভাতিজার ফজিলতের সানী কেউ নেই। পুরা আরবে মোহাম্মদ এর মত কেউ নেই বলে হযরতে আবু তালেব পর্দার দিকে ইশারা করে বলেন
ওয়া হাজা হি খাদিজাতুল মোয়াজ্জেমা মোহতারিমা মোকাররমা।
খাদিজা সারা আরবের সবচেয়ে ইজ্জতদার
তাহেরা বিবি সবচেয়ে সন্মানিত দানশীল বিবি।
খাদিজা'র সাথে আমার বেটা মোহাম্মদ এর শাদী সম্পন্ন করলাম।
সোয়ালাখ নবী'র গুঞ্জ উঠে আলহামদুলিল্লাহ সুবহানাল্লাহ আল্লাহু আকবর।
জনাবে আবু তালেব দাড়ান বিবি খাদিজা'র খান্দানে সকলের চোখের দিকে চোখ রেখে বলেন রকম কত চান আপনারা নির্ধারণ করেন হাক্বমেহের আমি আদায় করছি।

আসেন আবু তালেব আঃ এর কাছে সবিনয়ে জানতে চাই মাওলা আপনি যাদের হাক্বমেহের নির্ধারণ করতে বললেন তাদের
রাস্তায় ইরানী কালীন বিছানো গোলামের খায়মার রশি সোনার মাওলা জমিন চাইলে কোথায় হতে দিবেন? আসমান চাইলে কোথায় হতে দিবেন?
হযরতে আবু তালেব বলেন গোস্তাখি না কর আল্লাহ কায়নাতে ঐ চিজ পয়দা ই করে নাই যেখানে আমার আলী'র হুকুমত নেই।

একমাত্র বিবি যাকে মোহাম্মদ দুলহা বেশে বারাত নিয়ে যেয়ে নিকাহ করেন।

বিবি খাদীজা দুলহান হয়ে হাশমী প্রাসাদে আসেন।
বিবি জাহরা সালামুল্লাহ এর জহুর এর ঘড়ি চলতে শুরু করে।

তোফা এ কায়নাতের শ্রেষ্ঠ সাদী মুবারক

By ১২ বাহাত্তর শহিদানে কারবালা।

আল্লাহুম্মা সাল্লে আলা মোহাম্মদ ওয়া আলে মোহাম্মদ ওয়া আজ্জীল ফারাজাহুম

[[ ঈদে 'ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর দিবস। তাঁর শত্রুর ধ্বংসে আনন্দ, কোনো ‘তাজপোশি’র বিদআত নয়। ]]পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আ...
23/08/2026

[[ ঈদে 'ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর দিবস। তাঁর শত্রুর ধ্বংসে আনন্দ, কোনো ‘তাজপোশি’র বিদআত নয়। ]]

পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।

হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ও তাঁর আহলে বাইতের ওপর দরুদ প্রেরণ করুন এবং তাঁদের সম্মানিত ফারাজ তথা আবির্ভাবকে ত্বরান্বিত করুন।

ফারহাতুয 'ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর দিবস। তাঁর শত্রুর ধ্বংসে আনন্দ, কোনো ‘তাজপোশি’র বিদআত নয়।

না, এটি কোনো তাজপোশির দিন নয়; আমাদের যুগের অধিপতি তো—
সৃষ্টির অস্তিত্ব প্রকাশেরও পূর্ব থেকেই ইমাম ছিলেন।
বরং এটি ফাতিমা (সা.আ.)-এর হত্যাকারীর নিহত হওয়ায় আনন্দের দিন, যার আলো ও শান্তি শীতল প্রশান্তির মতো হৃদয়ে নেমে আসে।

হে আমার ভাই ও বোনেরা! হে মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধর আহলে বাইতের শিয়াগণ! আল্লাহ তাঁদের ওপর অশেষ দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন।

এমন একটি বিষয় রয়েছে, যা শুধু আবেগের দৃষ্টিতে নয়, বরং নিরপেক্ষভাবে পাঠ করা উচিত। একই সঙ্গে ইমামতের মর্যাদা এবং আল্লাহর কোনো একটি দিনকে আনন্দ ও উল্লাসের দিন হিসেবে অভিহিত করার কারণ—এই দুই বিষয়কে পরস্পরের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা থেকেও বিরত থাকা উচিত।

কারণ ৯ই রবিউল আউয়াল সম্পর্কে—এই বক্তব্যের সমর্থনে যেসব বর্ণনা পেশ করা হয়েছে, সেগুলোর ভিত্তিতে—এটি এমন নয় যে, ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর শাহাদাতের কারণে সেদিন ইমাম মাহদি (আজ্জাল্লাহু তাআলা ফারাজাহুশ শরীফ) ইমাম হয়ে গেলেন এবং তাই সেদিন তাঁর ‘তাজপোশি’ হয়েছিল।

বরং এ ধরনের ধারণা দুটি পৃথক বিষয়কে এক করে ফেলে:

প্রথমত: ইমাম হুজ্জাত (আ.)-এর ইমামত প্রতিষ্ঠিত হওয়া।

দ্বিতীয়ত: ৯ই রবিউল আউয়ালের বিশেষ মর্যাদা এবং আহলে বাইত (আ.)-এর জন্য এটিকে আনন্দ ও উল্লাসের দিন হিসেবে গণ্য করা।

এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আহলে বাইতের আকীদা অনুযায়ী, কোনো ইমাম কোনো অনুষ্ঠান, ঘোষণা কিংবা তাজপোশির মাধ্যমে ইমাম হন না। ইমামত কোনো মানবীয় পদ নয়, যা পূর্ববর্তী ইমামের শাহাদাতের পর প্রদান করা হয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি বিষয়, যা নস্‌ ও ওসিয়তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত।

🌼 প্রথমত: ইমাম হুজ্জাত (আ.)-এর কোনো ‘তাজপোশির’ প্রয়োজন ছিল না 🌼

ইমাম মাহদি (আজ্জাল্লাহু তাআলা ফারাজাহুশ শরীফ) হলেন নিষ্পাপ ইমাম এবং সমগ্র সৃষ্টির ওপর আল্লাহর হুজ্জাত। তাঁর ইমামত ৯ই রবিউল আউয়ালে কোনো নতুন ঘটনা হিসেবে সৃষ্টি হয়নি।

ইমাম আল্লাহর নির্দেশে ইমাম হন এবং পূর্ববর্তী ইমামের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর নস্‌ ও স্পষ্ট নির্দেশের মাধ্যমে তাঁকে চেনানো হয়; পরবর্তীতে মানুষের আয়োজিত কোনো আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নয়।

তাই যদি বলা হয় যে ৯ই রবিউল আউয়াল হলো ইমাম মাহদি (আ.)-এর ‘নিযুক্তির দিন’, অর্থাৎ এই দিন থেকেই তাঁর ইমামত শুরু হয়েছে—তাহলে এর জন্য আহলে বাইত (আ.)-এর স্পষ্ট বক্তব্য থেকে প্রমাণ প্রয়োজন।

কেবল ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর শাহাদাতকে এমন একটি কারণ হিসেবে গ্রহণ করা যে, ঠিক সেই মুহূর্তে ইমামতের পদ সৃষ্টি হলো—এটি সঠিক হতে পারে না, যদি না কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় এরূপ অর্থ স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

বরং ইমামত তার আগেই প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং ইমাম হুজ্জাত (আ.) তাঁর পিতা ও আহলে বাইতের কাছে তাঁর মর্যাদা ও পরিচয়ের দিক থেকে অজ্ঞাত ছিলেন না।

এখানেই পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়:

পূর্ববর্তী ইমামের শাহাদাত ইমামতের দায়িত্বের প্রকাশ্য হস্তান্তর ঘটায়, কিন্তু শূন্য থেকে ইমামের মর্যাদা সৃষ্টি করে না।

অতএব, ইমাম মাহদি (আ.) কোনো দিনকে ঈদ হিসেবে অভিহিত করার আগে, এবং ৯ই রবিউল আউয়াল এই বিশেষ মর্যাদা লাভ করার আগেই ইমাম ছিলেন।

🌼 দ্বিতীয়ত: ‘তাজপোশি’কে আনন্দের কারণ বলার দলিল কোথায়? 🌼

যদি বলা হয় যে ৯ই রবিউল আউয়াল ইমাম মাহদি (আ.)-এর তাজপোশির কারণে ঈদের দিন, তাহলে একটি সহজ প্রশ্ন:

আহলে বাইত (আ.)-এর এমন কোন বর্ণনা রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে এই দিনটি ঈদ, কারণ এই দিন ইমাম মাহদি (আ.)-এর তাজপোশি হয়েছিল?

ধর্মীয় বিধান ও ধর্মীয় অর্থ কেবল অনুমান কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় না। কোনো বক্তব্য মানুষের কাছে উপযুক্ত মনে হলেই তা আহলে বাইতের নামে বর্ণনা করা যায় না।

আর যদি বর্ণনাগুলো নিজেরাই এই আনন্দের অন্য কোনো কারণ উল্লেখ করে থাকে, তাহলে নিষ্পাপ ইমামদের (আ.) কাছ থেকে যা বর্ণিত হয়েছে সেটিই গ্রহণ করা অধিক যুক্তিসঙ্গত; এমন কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে মূল বক্তব্যকে প্রতিস্থাপন করা নয়, যার পক্ষে কোনো স্পষ্ট বর্ণনা নেই।

এখানে এই দিনের বিশেষত্ব ব্যাখ্যা করার জন্য যে বর্ণনাটি পেশ করা হয়, তা সামনে আসে।

ইমাম আবু হুসাইন আল-আসকারি (আ.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইমাম হাসান (আ:) ও ইমাম হুসাইন (আ.)-কে বলেছেন:

> «وَأَيُّ يَوْمٍ أَعْظَمُ حُرْمَةً عِنْدَ أَهْلِ الْبَيْتِ مِنْ هَذَا الْيَوْمِ؟ فَإِنَّهُ الْيَوْمُ الَّذِي يُهْلِكُ اللَّهُ فِيهِ عَدُوَّهُ وَعَدُوَّ جَدِّكُمَا، وَيَسْتَجِيبُ فِيهِ دُعَاءَ أُمِّكُمَا»

অর্থ:

“আহলে বাইতের কাছে এই দিনের চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ দিন আর কোনটি হতে পারে? কারণ এটি সেই দিন, যেদিন আল্লাহ তাঁর শত্রু এবং তোমাদের নানা (রাসুলুল্লাহ সা:)-এর শত্রুকে ধ্বংস করবেন এবং এই দিনে তোমাদের মায়ের দোয়া কবুল করবেন।”

এখানে দৃষ্টিভঙ্গিই সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যায়।

বর্ণনাটি এই দিনের বিশেষত্বকে কোনো ‘ইমামের তাজপোশি’র ওপর নির্ভরশীল করেনি; বরং এর সঙ্গে অন্য একটি বিষয়কে যুক্ত করেছে:

আল্লাহর শত্রু, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শত্রু এবং আহলে বাইতের (আ:) শত্রুর ধ্বংস এবং ইমাম হাসান (আ:) ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাতা ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর দোয়া কবুল হওয়া।

এটি এমন একটি বক্তব্য, যার নিজস্ব তাৎপর্য রয়েছে। কেবল ‘তাজপোশি’ শব্দটি প্রচলিত হয়ে গেছে বলে এর মূল বক্তব্যকে উপেক্ষা করা সঙ্গত নয়।

🌼 তৃতীয়ত: ফারহাতুয্-যাহরা (সা.আ.) কোনো সাধারণ আনন্দ নয় 🌼

যখন আমরা এই বাক্যটি নিয়ে চিন্তা করি—

“এবং এই দিনে তোমাদের মায়ের দোয়া কবুল করবেন।”

তখন দেখতে পাই, বিষয়টি সরাসরি হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, কিংবা শুধু একজন ইমামের কাছ থেকে অন্য ইমামের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়ও নয়। বরং এখানে তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত:

সাইয়্যিদা ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর দোয়া → আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই দোয়া কবুল → তাঁর শত্রুর ধ্বংস।

এটাই সেই অর্থ, যা এই দিনকে ‘ফারহাতুয্-যাহরা’ বা হযরত যাহরা (সা.আ.)-এর আনন্দের দিন হিসেবে বোঝার ক্ষেত্রে বর্ণনার প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

তাঁর কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেন:

> «بَقَرَ اللهُ بَطْنَكَ كما بَقَرْتَ صَحيفتي»

অর্থ:

“আল্লাহ তোমার পেট চিরে দিন, যেমন তুমি আমার পৃষ্ঠা/লিখিত পত্র ছিন্নভিন্ন করেছ।”

এরপর অন্য বর্ণনায় হাসান (আ:) ও হুসাইন (আ.)-এর মায়ের দোয়া কবুল হওয়া এবং তাঁর শত্রুর ধ্বংসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে আরও গভীর একটি চিত্র ফুটে ওঠে:

সাইয়্যিদা ফাতিমাা যাহরা (সা.আ.) কেবল ইতিহাসের একজন নির্যাতিত ব্যক্তি ছিলেন না; বরং তাঁর দোয়া ছিল, অবস্থান ছিল, মজলুমিয়াত ছিল এবং আল্লাহর কাছে তাঁর অধিকার ছিল। আর আল্লাহ তাআলা কোনো মজলুমের অধিকার নষ্ট করেন না।

🌼 চতুর্থত: আমরা কেন ‘ফারহাতুয্-যাহরা’ বলি? 🌼

কারণ যে বর্ণনাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, তার আলোকে এই আনন্দের দিনটি এমন একটি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা আহলে বাইত (আ.)-এর জন্য আনন্দের কারণ হয়েছিল—অর্থাৎ যাকে তাঁদের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, তার ধ্বংস।

তাই এই দিনটির অর্থকে শূন্য করে দিয়ে এমন একটি অর্থ দ্বারা প্রতিস্থাপন করা উচিত নয়, যার পক্ষে উল্লিখিত বর্ণনায় কোনো বক্তব্য নেই।

যদি বর্ণনায় বলা হয়:

“সেই দিন, যেদিন আল্লাহ তাঁর শত্রু এবং তোমাদের নানা (রাসুলুল্লাহ সা:)-এর শত্রুকে ধ্বংস করবেন।”

তাহলে প্রথমে এই বক্তব্যই আলোচনার কেন্দ্র হওয়া উচিত।

আমরা এমন বলতে পারি না যে বর্ণনাটি একটি বিষয়ের কথা বলছে, অথচ পুরো অনুষ্ঠানকে এমন একটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত করব, যা বর্ণনায় উল্লেখই করা হয়নি।

সঠিক পদ্ধতি হলো:

প্রথমে নস্‌ → তারপর উপলব্ধি → তারপর সিদ্ধান্ত।

এটি নয়:

প্রথমে ধারণা → তারপর সেই ধারণার সমর্থনে বর্ণনা খোঁজা।

🌼 পঞ্চমত: ইমামত কোনো ‘তাজপোশি’র মাধ্যমে শুরু হয় না 🌼

ইমামতকে এমনভাবে উপস্থাপন করা ভুল যে, এটি যেন একটি রাজত্ব, যা পিতা থেকে পুত্রের কাছে স্থানান্তরিত হয় এবং নতুন ইমামের ইমাম হওয়ার জন্য কোনো তাজপোশির অনুষ্ঠানের প্রয়োজন হয়।

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) ইমামতের 'মালিক' ছিলেন না যে তিনি নিজে তাঁর পুত্রকে ইমামত প্রদান করবেন। বরং তিনিও আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত ইমাম ছিলেন এবং ইমাম মাহদি (আ.)-ও আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত ইমাম।

পূর্ববর্তী ইমাম পরবর্তী ইমামের ব্যাপারে নস্‌ প্রকাশ করেন এবং মানুষকে তাঁর পরিচয় দেন; কিন্তু তিনি নিজে ইমামের মর্যাদা সৃষ্টি করেন না।

অতএব, ইমাম হুজ্জাত (আ.) আল্লাহর নির্দেশে ইমাম ছিলেন, তাঁর পিতার কাছে পরিচিত ছিলেন, তাঁর ব্যাপারে নস্‌ করা হয়েছিল এবং আল্লাহর হেফাজতে সংরক্ষিত ছিলেন।

পিতার শাহাদাতের পর তাঁর ইমামতের প্রকাশ্য দায়িত্ব ও আল্লাহর হুজ্জাত হিসেবে তাঁর দায়িত্বের প্রকাশ ঘটে।

কিন্তু ৯ই রবিউল আউয়ালকে তাঁর ইমামতের সূচনার দিন হিসেবে গ্রহণ করা এবং এর ওপর ভিত্তি করে পুরো ‘ফারহাতুয্-যাহরা’র ঈদকে ব্যাখ্যা করা হলে এর জন্য সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন।

🌼 ষষ্ঠত: ‘পৃথিবী কখনো হুজ্জাত থেকে শূন্য থাকে না’ 🌼

আহলে বাইত (আ.)-এর আকীদার অন্যতম বিষয় হলো—পৃথিবী কখনো আল্লাহর হুজ্জাত থেকে শূন্য থাকে না এবং আল্লাহর হুজ্জাতের ধারাবাহিকতা কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না।

তাই ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর শাহাদাতের পর ইমামতের বিষয়টি এমন কোনো স্থানান্তর নয়, যা কোনো অপেক্ষার সময়ের পর শুরু হয়েছে। বরং এটি আল্লাহর হুজ্জাতদের ধারাবাহিকতারই অব্যাহত অংশ।

এমন কোনো সময় ছিল না যে পৃথিবী ইমামবিহীন হয়ে গিয়েছিল, যাতে বলা যায় ৯ই রবিউল আউয়ালে পৃথিবীতে নতুন করে ইমামকে ‘নিযুক্ত’ করা হলো।

বরং ইমাম হুজ্জাত (আ.) সেই ইমামি নূরেরই ধারাবাহিকতা, যা কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না।

এখানে শব্দ ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত:

৯ই রবিউল আউয়াল ইমাম সৃষ্টি করে না; বরং আহলে বাইত (আ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী অন্য কোনো কারণে এই দিনটি বিশেষ মর্যাদা লাভ করে থাকতে পারে।

🌼 সপ্তমত: ‘তাজপোশি’র অর্থের ওপর এত জোর কেন? 🌼

যদি ‘তাজপোশি’ শব্দ দ্বারা কেবল বোঝানো হয় যে ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর শাহাদাতের পর ইমাম হুজ্জাত (আ.)-এর ইমামত প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাহলে শব্দের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি নেই—যতক্ষণ না এটিকে স্বতন্ত্র আকীদা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

কিন্তু যদি এর দ্বারা বোঝানো হয় যে ইমাম মাহদি (আ.) ওই দিনের আগে ইমাম ছিলেন না এবং ৯ই রবিউল আউয়ালেই তাঁর ইমামত শুরু হয়েছিল, তাহলে অবশ্যই এর জন্য দলিল প্রয়োজন।

কারণ ইমামতের মর্যাদা কোনো উৎসবের বিষয় নয়, কোনো রাজনৈতিক পদ নয় এবং মাথায় পরিয়ে দেওয়া কোনো মুকুটও নয়।

এটি হলো আল্লাহর অঙ্গীকার, তাঁর পক্ষ থেকে নির্বাচিত মর্যাদা এবং সৃষ্টির ওপর আল্লাহর হুজ্জাত।

আল্লাহ যাঁকে ইমাম হিসেবে নির্বাচিত করেছেন, তাঁকে মানুষ সৃষ্টি করে দিতে পারে না। যেমন সূর্যকে সূর্য হওয়ার প্রমাণ হিসেবে মানুষের সাক্ষ্যের প্রয়োজন হয় না।

🌼 অষ্টমত: ঈদ তিন দিন 🌼

এই বিষয়ে যা বর্ণিত হয়েছে, তার ভিত্তিতে এই ঈদের বিশেষত্ব কেবল একটি মুহূর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বলা হয়েছে যে এটি তিন দিনের।

এটিও দেখায় যে এই উপলক্ষকে শুধু ইমামের ‘তাজপোশির’ একটি মুহূর্তে সীমাবদ্ধ করা যথাযথ নয়। কারণ মূল আলোচনা হওয়া উচিত সেইসব বর্ণনার দিকে, যেখানে এই দিনের ফযিলত ও বিশেষত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ঈদ হলো আনন্দ ও উল্লাসের দিন—আহলে বাইতের শত্রুর ধ্বংস এবং হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর দোয়া কবুল হওয়ার কারণে।

🌸 উপসংহার 🌸

হে মুহাম্মদ ও তাঁর আহলে বাইতের (আ.) ভালোবাসায় নিবেদিতগণ!

‘ইমাম মাহদি (আ.)-এর তাজপোশি’ কথাটি এত বেশি প্রচলিত হতে দেবেন না যে, মানুষের মনে এটি এমন একটি বর্ণনায় পরিণত হয়, যা আদৌ বর্ণিত হয়নি।

ইমাম মাহদি (আ.) আল্লাহর নির্দেশে ইমাম—মানুষের তাজপোশির মাধ্যমে নয়।

তাঁর ইমামত নস্‌ ও ওসিয়তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর শাহাদাত ইমামের মর্যাদা সৃষ্টি করেনি; বরং তাঁর পিতার পক্ষ থেকে যাঁর ওপর নস্‌ করা হয়েছিল, তাঁর কাছে প্রকাশ্য হুজ্জাতের দায়িত্বের স্থানান্তর ঘটেছে।

আর ৯ই রবিউল আউয়ালের বিশেষত্ব সম্পর্কে উল্লিখিত বর্ণনায় এর কেন্দ্রবিন্দু করা হয়েছে:

আল্লাহর শত্রু, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শত্রু এবং আহলে বাইতের (আ.) শত্রুর ধ্বংস এবং হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর দোয়া কবুল হওয়া।

এই কারণেই বর্ণনার আলোকে এটিকে ফারহাতুয্-যাহরা (সা.আ.)-এর দিবস বলা অর্থবহ। পক্ষান্তরে, এই ঈদের কারণ হিসেবে ‘তাজপোশি’কে নির্দিষ্ট করার জন্য আহলে বাইত (আ.)-এর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন।

তাই আমরা চাই না যে মুহাম্মদ ও তাঁর আহলে বাইতের (আ.) বক্তব্যের পরিবর্তে মানুষের বক্তব্যকে গ্রহণ করি।

আমরা চাই না যে প্রচলিত রীতিকে দলিল বানাই, ব্যাপক প্রচলনকে হুজ্জাত মনে করি কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দকে বর্ণনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি।

যাঁরা ঈদের অধিকারী, তাঁরাই তাঁদের ঈদ সম্পর্কে অধিক জ্ঞান রাখেন। আর আহলে বাইত (আ.)-ই অধিক জানেন, আল্লাহ তাঁদের কাছে কোন বিষয়কে মর্যাদা দিয়েছেন।

হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ও তাঁর আহলে বাইতের (আ.)-এর বেলায়েতকে দৃঢ়ভাবে ধারণকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন; তাঁদের অঙ্গীকারের ওপর অবিচল রাখুন; তাঁদের আনন্দে আনন্দিতদের অন্তর্ভুক্ত করুন; তাঁদের বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনকারী এবং তাঁদের শত্রুদের সঙ্গে শত্রুতা পোষণকারী করুন; এবং তাঁদের প্রকৃত অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান দান করুন।

আল্লাহ মুহাম্মদ ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ওপর দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন।

⚠️ দায়মুক্তির ঘোষণা ⚠️

এই গবেষণামূলক লেখাটি উল্লিখিত বর্ণনা ও সূত্রসমূহের আলোকে একটি পাঠ ও বিশ্লেষণ। এর উদ্দেশ্য হলো ইমাম মাহদি (আ.)-এর ইমামত প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং ৯ই রবিউল আউয়ালের বিশেষত্বের কারণ—এই দুই বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা।

এর মধ্যে যা সত্য ও সঠিক, তা মুহাম্মদ ও তাঁর আহলে বাইতের (আ.) বরকতের ফল। আর এতে কোনো ভুল বা ত্রুটি থাকলে তা আমার পক্ষ থেকে। তাঁদের মর্যাদার উসিলায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।

📚 সূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

📙 আল-মুহতাদার, পৃষ্ঠা ৯৩।

📘 আল-ইকদুন নাদীদ, পৃষ্ঠা ৬১।

📗 বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৩১, পৃষ্ঠা ৩৫১।

📕 মুস্তাদরাকু সাফিনাতিল বিহার, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৭৪।

📙 মিনহাজুল বারাআহ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৭৯।

📘 মাজমাউন্নূরাইন, পৃষ্ঠা ২৩৪।

📗 মিসবাহুল বালাগাহ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৬৪।

📕 মুস্তাদরাকুল ওয়াসায়েল, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩২৬।

📙 জামিউ আহাদিসিশ শিয়া, খণ্ড ১৬, পৃষ্ঠা ৬৯৯।

📘 আল-আওয়ালিম — আস-সাইয়্যিদাতুয্-যাহরা (সা.), খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৫০।

📗 আল-লুমআতুল বাইদা, পৃষ্ঠা ৩১০।

📘 আল-আনওয়ারুল আলাভিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ২৯৩।

📙 আল-মাওসুয়াতুল কুবরা আন ফাতিমাতুয্-যাহরা (সা.), খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ৩০৯।

Address

Joydebpur

Telephone

+8801750088099

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when বাংলাদেশ ওয়ার্সী ফাউন্ডেশন posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Place Of Worship

Send a message to বাংলাদেশ ওয়ার্সী ফাউন্ডেশন:

Shortcuts

Share