24/08/2026
ইতিহাসগত বিভ্রান্তির রহস্য - পর্ব-০১
লেখক: মুফাখ্খারুল ইসলাম।
অভিনন্দন
ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস সম্বন্ধে মুসলমানদের অজ্ঞতা অসীম। এই অজ্ঞতা জন্ম দিয়েছে অহমিকার, ধর্মান্ধতার ও আত্মশ্লাঘার। তাই শুধু ইতিহাস চর্চার-ই নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের যাবতীয় শাখা-প্রশাখায় মুসলমানদের কর্ম-তৎপরতা মধ্যযুগেই শেষ হয়ে যায়। অবশ্য তখনো যা গবেষণার নামে চর্চিত হতো, তাতে আজকের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণধর্মী সমালোচনার সন্ধান করা বৃথা। তা ছিল ঘটনাবলির সাধারণ বিবরণ মাত্র। দৃশ্যত ঘটনার অন্তরালে যে জটিল কার্যকারণ এবং তা ভেদ করে সঠিক তথ্যে পৌঁছবার যে রীতিনীতি তা তখন অনাবিষ্কৃত ছিল।
ইসলামের ইতিহাসের উৎস হচ্ছে কুরআন ও হাদিস। হাদিসও নির্ভরযোগ্য নয় যদি না তা কুরআনের কষ্টিপাথরে বিবেচিত ও নির্বাচিত হয়। এই কাজ নিতান্ত দুরূহ। মুসলমানদের শত্রু ইহুদি ও খ্রিস্টান পণ্ডিতগণ এই দুরূহ কাজ করার কিছুটা প্রয়াস পেয়েছেন। কিন্তু তথাকথিত মুসলমান পণ্ডিত ও ইতিহাসবেত্তাগণ, লু-হাওয়ার মধ্যে বালিতে মুখ গুঁজে-থাকা উটের মতো চোখ-কান-মন বন্ধ রেখে ইতিহাস-চর্চা করে চলেছেন। আজ ইসলামের আসল ইতিহাস জানতে হলে, কোনো মুসলমান লেখকের বই পড়া পণ্ডশ্রম মাত্র। আঠারো থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত কুরআন ও হাদিস এবং যাবতীয় ইসলামী বিষয়ে যে বিপুল গবেষণা ইউরোপে হয়েছে তা থেকে যৎসামান্য ধার নিয়ে আজকের মুসলমান ইতিহাসবিদগণ 'অপাঠ্য' গ্রন্থ রচনা করে সস্তা খ্যাতি লাভের প্রচেষ্টায় ব্যাপৃত আছেন। সামান্য কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন কোনো ব্যক্তির যদি কোন একটি ইউরোপীয় ভাষার জ্ঞান থাকে, তবে তার কাছে আজকের মুসলমানদের রচিত ইসলামের ইতিহাসের অসারতা ও বাকসর্বস্বতা সহজেই ধরা পড়বে।
এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ বাঙালি কবির ইসলামের ইতিহাসের ব্যতিক্রমধর্মী ব্যাখ্যাদানের দুঃসাহসী প্রয়াসকে আমি অভিনন্দন জানাই।
স্বাক্ষর
পারেশ ইসলাম
(ডক্টর পারেশ ইসলাম সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান)
ইসলামী ইতিহাস ও কালচার,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ভূমিকা:
১৯৭১ সনে মুসলমানেরা পশ্চিমা ও পূবা দুই দলে বিভক্ত হইয়া কেন মারামারি করে, তাহার মূল সন্ধান-ব্যপদেশে তখন করাচি উর্দু কলেজের ইসলামীয়াতের অধ্যাপকের 'ইসলাম ও উমাইয়া রাষ্ট্রনীতি' প্রবন্ধের পর্যালোচনা করি। দীর্ঘ পর্যালোচনাই ছিল। পরে তাহাতে এখানে-সেখানে একটু আধটু সংযোজনায় এই গ্রন্থ রচনা।
তবে জনাব দেলওয়ার হোসেন সাহেবের সম্পূর্ণ সাহায্য ব্যতীত ইহা যে ছাপাখানার মুখ দেখিতে পারিত না ইহা সকলেই বুঝিবেন। প্রকাশিকা আমার বিবি সুরাইয়া সুলতানা মুফলিহা (এম এ) এ গ্রন্থের নাম সুনির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছেন। ইহাদের জন্য আল্লাহর দরগায় আমার প্রাণ-ভরা দোয়া-প্রীতি।
ডক্টর এ.বি.এম. হাবীবুল্লাহ ও ডক্টর মাহদী হুসায়ন মরহুমন্বয় অন্যান্য অনেকের সঙ্গে এ গ্রন্থ প্রকাশনার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। আফসোস্! তাঁহারা এখন হায়াতে নাই। যাঁহারা আছেন তাঁহাদের জন্য কৃতজ্ঞতা।
ইতিহাসগত চরিত্র বিচারের মানদণ্ডঃ
ইতিহাস রচনায় বা ঐতিহাসিক তথ্য উদ্ধারে প্রবাদ, কিংবদন্তী, সমসাময়িক বিবরণী, দলীল-দস্তাবীজ, কাতাবা প্রভৃতি ঘাঁটাঘাঁটি করিতে হয়, এইভাবেই ঘটনা-পরম্পরা ও প্রত্যেক ঘটনার রহস্য ও তাৎপর্য উদঘাটন করিতে হয়। সে সব আমরা জানিয়াছি। কিন্তু ইতিহাসগত চরিত্রাবলীর বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কোন্ মানদণ্ডের বিচারে আলোচনা করিতে হয়, সে বিষয়ে আমাদের সম্যক ধারণা দেওয়া নাই। যে ঐতিহাসিক যেরূপ ধারণা পোষণ করিবেন, সেই তুলাদণ্ডেই কি তিনি ইতিহাসগত চরিত্র তৌল করিবেন?
আমরা দেখিয়াছি, ব্রিটিশ দ্বীপের ও ইউরোপীয় অন্যান্য রাষ্ট্রের ঐতিহাসিকেরা বীরকেশরী নেপোলিয়ন বোনাপার্টের চরিত্র-বিশ্লেষণের যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করিয়াছেন, ফরাসি ঐতিহাসিকেরা তাঁহার বিচারে ঠিক সেরূপ দৃষ্টভঙ্গি পোষণ করেন নাই। ইহা আমরা বাহিরের লোকেরা কিছুটা অনুধাবন করিতে পারি। ফরাসি দেশের জন্য নেপোলিয়ন যে মর্যাদা অর্জন করেন, তাহা হয়তো অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রের মর্যাদাহানির বিনিময়েই। এই জন্যই বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক বিভিন্ন দৃষ্টিতে তাঁহার কার্যকলাপ লক্ষ্য করিয়াছেন।
মধ্যযুগে বহুদিন যাবৎ 'বয়তুল মুকাদ্দস' এলাকা লইয়া খ্রিস্টান ইউরোপের সঙ্গে মুসলিম এশিয়ার যে জিহাদ বা ক্রুসেড হইয়া গিয়াছে, তাহার ভূমিকায় যাহারা নিযুক্ত-হইয়াছিলেন, তাহাদের কার্যকলাপ ও চরিত্রবিচারে খ্রিস্টান লেখকেরা একরূপ অভিমত ও মুসলিম লেখকেরা অন্যরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। অ-মুসলিম ও অ-খ্রিস্টান লেখকেরা হয়তো আরো ভিন্নমত পোষণ করেন।
কোনো কোনো জাতীয় চরিত্র ও সম্প্রদায়গত চরিত্রের বিচারেও নানা সমস্যা দেখা দেয়। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক আবু রায়হান আল-বীরুনী তাঁহার 'ভারত তত্ত্বে' ভারতীয়দের যে সব কুপমন্ডুকতা ও সংকীর্ণতাকে তাহাদের মিথ্যা অহমিকার কারণ-স্বরূপ বিশ্লেষণ করিয়াছেন, তাহা হয়তো হালের হিন্দু ইতিহাসবিদদের ভালো লাগে না; তাহারা সে কুপমন্ডুকতা ও সংকীর্ণতার অন্য ব্যাখ্যা দাঁড় করাইয়া তাহার তারিফ করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন।
আমাদের এই উপমহাদেশের সুলতানী আমলীয় আলাউদ্দীন খিলজী, মুহম্মদ বিন তুঘলক প্রমুখ সুলতানদের চরিত্র-বিচারে ঐতিহাসিকেরা যে এক এক জনে এক একরূপ অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, তাহাও আমরা দেখিয়াছি।
মরক্কোদেশীয় আরব মুসলিম ইবনে বতুতার সফরনামায় দেখা যায়, সফীর স্বচক্ষে হিন্দুদের সহমরণ বা সতীদাহ প্রথা লক্ষ্য করিয়া মর্মাহত হইয়াছেন। তিনি তাহাতে যে মন্তব্য করিয়াছেন, তাঁহার প্রায় সমসাময়িক ভারতের একমাত্র সুর-'নায়েক' এখানকার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম সুবিখ্যাত কবি, Leonardo Da-Vinci of India, আমীর খসরু স্বামী-স্ত্রীর প্রণয়-প্রসঙ্গ উল্লেখে সহমরণগামিনীদিগকে বাহবা দিয়াছেন। হিন্দুদের মধ্যে এই সহমরণ বা সতীদাহ প্রথার সমর্থকগণ এই প্রথার প্রতি কটূক্তিকারীর জন্য আক্রোশ পোষণ করিয়াছে, আর হিন্দু নারীর সতীত্ব-মহিমা কীর্তন করিয়াছে। পক্ষান্তরে হিন্দুদের মধ্যেই যাহারা সহমরণকে বর্বরতা ও জাতীয় মর্যাদাহানিকর প্রথা মনে করিয়া লজ্জাবোধ করেন, তাঁহারা এই প্রথার বিরুদ্ধবাদীদের কথায় স্বস্তি পান।
এই উপমহাদেশে বাদশাহী আমলের জালালুদ্দীন মুহম্মদ আকবর বাদশাহর বিষয়ে- বাদশার বন্ধু ও শিষ্য আবুল ফজল আল্লামীর ইতিহাস গ্রন্থে সমুচ্চ তারিফ দেখা যায়, আর সমসাময়িক মুল্লা আবদুল কাদির বদাউনীর ইতিহাস গ্রন্থে হয়তো সেই সব স্থলেই কোথাও নিন্দা, আবার কোথাও বিদ্রূপ পর্যন্ত অভিব্যক্ত হইয়াছে। শতবর্ষ-যাবৎ হিন্দু লেখকগণ ইতিহাস-চর্চা শুরু করিয়াছেন। সুলতান-বাদশাহ আমীর-রইসদের সম্পর্কে তাঁহাদেরও অভিব্যক্তি বিভিন্ন। কোনো কোনো হিন্দু লেখক মিথ্যা ঘটনা দ্বারা বাদশাহ আওরঙ্গজীবকে হেয় প্রতিপন্ন করিতে চাহিয়াছেন। পক্ষান্তরে যাহাদের ধর্মীয় শরিয়তী গ্রন্থে-পিতাকে অস্বীকারকারী কাফিররূপে ফতোয়াপ্রাপ্ত- সেই লোকেরা কেউ কেউ আওরঙ্গজীবের মতো কঠিন পিতৃদ্রোহীকে জিন্দাপীর রূপে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যেমন নাকি নামাজের মধ্যে হযরত মুহম্মদের আল্-আউলাদের বংশ বৃদ্ধি ও বরকত-ময় কল্যাণ-কামনা আল্লাহর দরগায় পেশ করিয়া আসিয়াই হযরত মুহম্মদের বংশ যাহারা নিপাত করিয়াছে, আজ পর্যন্ত ঠিক তাহাদের সমর্থনের যুক্তিতেই যত ধর্মীয় ব্যাখ্যা-গ্রন্থ প্রণয়ন হইতেছে। দেখা যায়, অযৌক্তিক যুক্তিও দুনিয়ায় প্রচলন হইয়া রহিয়াছে, নির্বিচারে গৃহীতও হইতেছে।
বাংলাদেশী ইতিহাসের অনেক বিষয়েও মতের বিভিন্নতা দেখা যায়। ১৯৭৭ সনের বাংলাদেশী ইতিহাস পরিষদের ঢাকাস্থ সম্মেলনের এক বিশেষ অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগীয় দুই ডক্টর নতুন কিছু বলার ঝোঁকে পড়িয়া বলিয়া বসিলেন:
"সুলতান হুসায়ন শাহকে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক বলিয়া যে প্রশংসা করা হয়, তিনি সে প্রশংসার যোগ্য নন; কারণ আসলে তিনি তাঁহার দরবারে বাংলা ভাষার কোনো কবিকেই পরিপোষণ করেন নাই। তবে যে বাংলা-ভাষার কবিরা তাঁহার প্রশংসা-সূচক উক্তি করিয়াছেন, তাহা দেশের বাদশাহ-হিসাবে উল্লেখ রাখিবার পদ্ধতি অনুসরণ মাত্র।"
কাহারো বিষয়ে সমালোচনা করিতে চাহিলে সমালোচ্যের মৌলিক কর্তব্য সম্পর্কে সামান্য ধারণাও রাখা দরকার। সেই দিকে লক্ষ্য রাখিয়া আমি জওয়াব দিয়াছিলাম:
"দেশের কোনো ভাষার কবিকে দরবারে পোষণ করা সেই দেশের সুলতান বাদশা-র কর্তব্য নয়। তাঁহার সর্বপ্রথম কর্তব্য- দেশের সকল মানুষের জীবনের সর্বমুখী নিরাপত্তা বিধান করা। দ্বিতীয়তঃ কর্তব্য হইতেছে- নিজ আয়ত্তে সম্ভবপর দেশের সকল রকম সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য (শুধু খাদ্য নয়) মোটামুটি সকলের দ্বারে সমপরিমাণে পৌঁছাইবার তদারক করা। সুলতান হুসায়ন শাহ-র প্রতি কবিদের স্বতঃস্ফূর্ত তারিফ শুনিয়া বুঝা যায়, এই উভয় সুলতানী কর্তব্যই তিনি সুষ্ঠুভাবে সমাধান করিতে পারিয়াছিলেন- যে জন্য কবিরা তাঁহার তারিফে বাক্য ব্যয় না করিয়া পারেন নাই। অনেক কবিই তাহাদের সময়ের সুলতানের উল্লেখ এড়াইয়া গিয়াছেন।"
আসলে প্রশ্ন হইতেছে, ইতিহাসগত চরিত্রবিচারের মানদণ্ড কি? কোন্ মানদণ্ডে তাহাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করিতে হইবে? যে ঐতিহাসিক যেরূপ ধারণা পোষণ করেন, সেইরূপ তুলাদণ্ডেই কি তিনি ইতিহাসগত চরিত্র তৌল করিবেন? নাকি এইজন্য কোনো সর্বসম্মত অভিমত আছে?
নাকি যে চরিত্রটির বিচার-বিশ্লেষণ করিতে হইবে- যে কোন্ নীতি বা ধর্ম স্বীকার করিয়াছেন, সেই নীতি বা ধর্মের বিচারে লোকটির কার্যকলাপ বিচার করিতে হইবে? কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন আছে। বাদশাহ্ আকবর কোন ধর্মাবলম্বী ছিলেন সমসাময়িক খ্রিস্টান পাদরীরা কি তাঁহার কোনো হদিস পাইয়াছিলেন? হিন্দুদের জন্য যে বাদশাহ ঝরোকা-ই-দর্শনে দর্শন দান করিতেন, তখন হিন্দুরা যে তাঁহাকে 'দিল্লীশ্বরো বা জগদীশ্বরো বলিয়া তাঁহার জয় ঘোষণা করিত, তাহাতে কি বাদশাহকে হিন্দুরা 'যবন' ম্লেচ্ছ' মনে করিতে পারিত? মানসিংহ তাঁহাকে কি মনে করিতেন? প্রতাপসিংহই বা তাঁহাকে কি মনে করিতেন? এই সব বিবেচনা করিবার দরকারকে কি উড়াইয়া দেওয়া যায়?
আফ্রিকার জঙ্গলবাসী এক জাতির মধ্যে- বাপ-মা সন্তানকে অনেকদিন পেটে-পিঠে রাখে বলিয়া বৃদ্ধ হইলে বাপ-মাকেও লোকে জবাই করিয়া খাইয়া অন্তত একদিনের জন্যেও বাপ-মাকে পেটে-পিঠে রাখিয়া পিতৃমাতৃ-ঋণ কিছুটা পরিশোধ করে। উহাদের কার্যকলাপের বিচার কেমনভাবে করিতে হইবে?
আরব মরুতে মানব জাতির উদ্ধারসাধনের আশাতেই হযরত মুহম্মদ মুস্ত ফা (দ.) অল্প সময়ের ভিতরে যে বিপ্লব সমাধা করেন, তাঁহার ওফাতের পরপরই কৌশলী প্রতিবিপ্লবীরা তাঁহার সাহাবা-খিতাবে ভূষিত থাকিয়াই এমন প্রবল হইয়া উঠে যে ধীরগতি সংগীন কূটকৌশলের সাহায্যে গোত্রীয় আক্রোশভরে নবীর বংশই নিপাত করিয়া ফেলিয়াছে এবং এমন সব যুক্তি আবিষ্কার করিয়া ফেলিয়াছে, যে ঐ লোকের বংশ যে নিপাত করাই উচিত, সেদিকেই এখন সকলের অভিমত গঠিত হইতেছে। অথচ প্রতিবিপ্লবীদের কার্যকলাপের সামান্য সমালোচনাও করিতে দেওয়া হয় না। সেই জন্য মুসলিম ঐতিহাসিকেরা অনেকেই শুধু ঘটনাবলী উল্লেখ করিয়াছেন, কোনো চরিত্রেরই বিচার-বিশ্লেষণ তাঁহাদের স্বীকৃত ধর্ম-মতানুযায়ীও করিতে যান নাই।
প্রতিবিপ্লবীদের গোঁজামিল ব্যাখ্যানুযায়ীই আজো 'ইসলাম' নামক ধর্ম প্রচলিত রহিয়াছে। ইহার সত্যাসত্য-বিচারকারী কাহাকেও টিকিতে দেওয়া হয় নাই।
খলিফা উমর বিন আবদুল আজীজ ও হযরত ইমাম আবু হানিফা আসল ইসলামের কথা তুলিতে গিয়া কেমন নির্মমভাবে নিহত হন ঐতিহাসিকেরা তাহা জানেন। এই সেদিন নরমভাবে শাহ ওলীউল্লাহ দিহলভী একটু বলিতে গিয়াছিলেন, তাহাতে জামে মসজিদের চত্বরেই তাঁহাকে হত্যার জন্য কায়েমী স্বার্থবাদীরা ঘিরিয়া ধরিয়া হাত ভাঙিয়া দিয়াছিল।
কাজেই, ইতিহাসগত চরিত্রের বিশ্লেষণ ছাড়া যদি মানবজাতির ভবিষ্যৎ উদ্ধার না হয়, তাহা হইলে তাহার বিচারের একটি মানদণ্ড নির্ণয় প্রয়োজন।
বিচার-সমস্যা:
হিন্দুশাস্ত্রে বেশ জন্মান্তরবাদ থাকায় সেই সুযোগে রাক্ষসরাজ রাবণ নিজের সর্বনাশ দেখিয়া আক্ষেপ করে, 'পূর্বজন্ম-দোষে হায় ঘটিছে এরূপ!' ইহজন্মে যে এক নির্বাসিত অসহায় রাজপুত্রের আস্ত স্ত্রীটিকে চুরি করিয়া আনিয়া রাখিয়া দিয়াছে, চিত্রাঙ্গদা মনে করাইয়া দিলেও সে-কথা সে আমল দেয় না, তখন আর এক ফতোয়া বাহির করে 'গ্রহদোষে দোষীজনে কে ভর্ৎসে, সুন্দরী?' জ্যোতিষশাস্ত্রে চলিয়া যায়। মরণকে ও দারিদ্র্যকে যে ভয় করে না, তাহাকে ন্যায়পথ হইতে কেউ সরাইতে পারে না।
তবে কোন উপায়ে ইবলিস বড়ো বড়ো মানুষকে নিজ খপ্পরে ঘেরাও করেই।'
[সূরাহ সাবা: ৩৪: আমরা যখনই কোনো জনপদে পথপ্রদর্শক পাঠাইয়াছি, তখন উহার ধনী বাসিন্দারা বলিয়াছে, "তোমাদিগকে যেসব (নির্দেশ বা হিদায়াত) সহ পাঠান হইয়াছে সেইসব বিষয়ে আমরা বিশ্বাস করি না।"
সূরাহ যুখরুফ: ২২-২৪: আর এইরূপেই-তোমার পূর্বেও যখনই আমরা কোন জনপদে সতর্ককারী পথপ্রদর্শক পাঠাইয়াছি, তখনই ধনবান লোকেরা বলিত, 'নিশ্চয় আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদিগকে এই পথে পাইয়াছি এবং আমরা অবশ্য তাহাদেরই পদচিহ্ন অনুসরণ করিয়া চলিব।'-তাহাদের পথপ্রদর্শক বলিত, 'আমি তোমাদের কাছে তোমাদের পিতৃপুরুষের অনুসরণীয় যাহা পাইয়াছ তাহা হইতে উত্তম হিদায়াত যদি উপস্থিত করিয়া থাকি, তবুও তোমরা মানিবে না?' তখন তাহারা বলিয়াছে, 'তোমাদিগকে যে নির্দেশ দিয়া পাঠান হইয়াছে নিশ্চয় আমরা তাহা মানি না।'
(খিলাফতের ইতিহাস ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ। দ্বিতীয় সংস্করণ: ৬৪ পৃষ্ঠা।)]
মুসলিম জাহানেও বিভ্রান্তি ছড়াইবার বহু রকম কলকাঠি আবিষ্কৃত ও বিস্তৃত হইয়া আছে যাহার দৌলতে মুসলিমেরাও এক অভয় পাইয়া গিয়াছে, নিশ্চয়ই ইবলিস হইতে পাইয়াছে, (তখনও মক্কায় আল্লাহর হজ্জের প্রতিদ্বন্দ্বী- টুঙ্গিতে ইবলিস স্বতন্ত্র হজ্জের বন্দোবস্ত করিয়াছিল কি?) অন্যান্য নবীদের আমলদারিতে তাঁহাদের উম্মতের জঘন্য অন্যায়ের জন্য যে দুনিয়াতেই গজব নামিয়া আসিয়া দুনিয়ার চোখে তাহাদের হেয় প্রতিপন্ন করিয়াছে, আখেরী নবীর উম্মতকে খাতির করিয়া তেমন যিল্লতিতে ফেলিবে না। এতটুকু ভাবিবার জ্ঞান তাহাদের আজো হইল না, যে যদি যিল্লতিতে তাহাদিগকে না-ই ফেলা হইবে, তবে অমন করিয়া বার বার আগেকার উম্মতের যিল্লতির ঘটনা স্মরণ করানো হইবে কেন?
আল্লাহ-রসূলের নির্দেশিত আদর্শ চরিত্রের অনুসরণ ও অনুশীলন বিসমিল্লাহতেই ত্যাগ করায় এবং তৎস্থলে ত্রুটিপূর্ণ নিম্নতর চরিত্রকে আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠায় যাওয়াতে এমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হইয়াছে যে ইবলিসই ঐ ভাবে তাহাদের চোখ ও হৃদয়-মন মোহরবদ্ধ করিতে সমর্থ হইয়াছে, যেমন জন্মান্তরবাদের ধূয়ায় হিন্দুদের চোখ নিজ নিজ অন্যায়ের প্রতি অন্ধ হইয়া আছে। কাকে কি ভাবে বদ্ কাজে মুতায়িন রাখা যায়, ইবলিস সে-বিষয়ে উস্তাদ।
ইবলিস এমনভাবে চিন্তাকে আটকাইয়া রাখে এবং এমনভাবে অভয় দেয়, যে মুসলমান বড়রা ঘোর জঘণ্য অন্যায় করিতেও পরওয়া করে না।' কিসের পরওয়া? আখিরাতের বিচার-আচার আছে কিনা তাহা কে জানে! ঐসব আমাদিগকে ভালো রাখিবার কৌশল-মাত্রও তো হইতে পারে? তাহা হইলে ভালো থাকুক ঐ গরিবগুলি! আমরা তাহাদের উপর ফাঁকি মারিয়া বাহাদুরী উড়াইয়া যাই। এই তো সুযোগ। কেউ তো আর বিচার-আচার দেখিয়া আসিয়া বলে নাই? এই সাহসে কঠোরভাবে আল্লাহ-রসূলের মানা করা বহু জঘণ্য অন্যায় বিনা-ওজরে বড়রা প্রথম হইতেই করিয়া আসিতেছে।' বড়দের চাপে অতীষ্ঠ হইয়া ছোটরা তো করিবেই! তাহাদেরও যে রেহাই আছে, তাহা দেখা যায় না। তবে তাহারা বড়দের চাপ কুলাইতে না পারিয়া হয়তো অন্যায় পথে চলিয়াছে। ছোটরা বড়দের অন্ধ অনুসরণ করিয়া থাকে। অবশ্য অন্ধত্বরও রেহাই নাই।
এই সেদিন বিশ্বাসী লোকেরা ইসলামকে সমাজে রূপায়িত করিবার একটি স্থানরূপে পাকিস্তান আশা করিয়াছিলেন। ওরে বাপরে! সুবহান আল্লাহ! আল্লাহর মর্জিতে তাহা এমন এক তারিখে হইয়াছিল, যাহাকে লোকে শবে কদর বলিয়া আসিতেছে। এই ফাঁকে বড়দের মধ্যে ইবলিস ঢুকিয়া পড়িল। মুনাফিকেরা এই সুযোগ হেলায় হারাইল না। তাহারা ইবলিসের সঙ্গে গলা মিলাইয়া প্রচার করিল, 'শবে কদরে পাকিস্তান দিয়া আল্লাহ আটকিয়া গিয়াছে, (নাউজুবিল্লাহ!) এই সুযোগ আর কাড়িয়া লইতে পারিতেছে না।' ইহার পরবর্তী অংশ পরহেজগার মুনাফিকেরাই ঠিক করিয়া ফেলিল, "এই সুযোগ আর হেলায় হারান চলে না। যথাসম্ভব জঘন্যতম অন্যায় অনাচার করিয়া ইহার সদ্ব্যবহার করিয়া লওয়া যাক।"
এখন আল্লাহ কোনো সুযোগ দিয়া যে আর উঠাইয়া লইতে পারে না। তাহা দেখাইয়া দিয়াছে কি?
আল্লাহ-রসূল নবীবংশকে মুসলমানের কাছে আমানত রাখিয়াছেন। শুধু আমানত নয়, তাহাদিগকে ভালোবাসিতেও সনির্বন্ধ হুকুমজারি করিয়াছেন।
[সূরা শুরা:২৩- (আল্লাহ্ রাসূলুল্লাহকে তাকিদ দিতেছেন) লোকদের বলিয়া দাও, ইহার (আল্লাহর হিদায়েত ও নেয়ামত আনিয়া দওয়ার) জন্য আমি আমার আজুরা (বদলা) ঘনিষ্টতম প্রতি তোমাদের অকুন্ঠ অনুরক্তি ছাড়া আর কিছুই চাই না]
নবীবংশ ও আল-কুরআন কখনো একে অপরকে ছাড়িবে না (তিরমিজি শরীফ)।
অতএব ইহারা ব্যতীত আর কেউ কাহারো অনুসরণীয় নয়, ইহাদেরই হুকুমের মুখাপেক্ষী থাকিতে হইবে, ইহাদের প্রতি সালাতের চূড়ান্ত অংশে দরূদ ভেজিতেও হয়, তৎ সত্ত্বেও মুসলমানেরা যে ইহাদিগকে একে একে নিঃশেষ করিয়া আসিতেছে, তাহাতে আল্লাহ-রসূল (দ.) তো মুসলমানের কিছুই করিতে পারিতেছে না। কারবালায় নবীবংশনাশের জন্য যাহারা দায়ী, ইয়াজিদ, উবায়দুল্লাহ হইতে শুরু করিয়া নিম্নতম সিপাহী পর্যন্ত যাহারা নবীবংশের উপর আঘাত করিতে কসুর করে নাই, এই দুনিয়াতেই জঘন্য অবস্থার ভিতর দিয়া গিয়া তাহাদের মৃত্যুবরণ কেহ রোধ করিতে পারে নাই, সে খবরে মুসলমানের প্রয়োজন কি?
সওয়ায়িক-ই-মুহরিকা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে হজরত হুসায়ন ও তাঁহার পরিজন-হত্যায় যাহারা সহযোগিতা করিয়াছে, তাহারা আখিরাতের শাস্তির আগেই দুনিয়ায় যথেষ্ট ভোগ করিয়াছে। এই কথা এক মজলিসে আলাপ হইবার সময় একজন দাঁড়াইয়া মুসলমানের মতোই বলিল, 'আমি ইমাম হত্যায় সহযোগী ছিলাম, কিন্তু কৈ, আমার তো কিছুই হইল না।' হইয়াছে। কিন্তু গণ্ডারের চামড়ায় কি বোধশক্তি আছে? একটু পরেই সে রাতের আলো দিবার মশালের পাশে দাঁড়াইতে গেলে তাহার গায়ে আগুন ধরে। 'আগুন-আগুন' বলিয়া চিৎকার করিয়া সে দরিয়ায় ঝাঁপ দেয়। কিন্তু কোথাও আগুন তাহাকে ছাড়ে না। ধীরে ধীরে আগুনের তাড়নায় ও যন্ত্রণায় সে মৃত্যুর দিকে আগাইয়া যায়।
আবুশ্ শায়খ এই ঘটনা বয়ান করিয়াছেন।
তবে মুসলমানেরা পণ্ডিত হইয়া আসিতেছে, ইদানীং বুদ্ধিজীবীও হইতেছে। তাহারা ভাবিবে, ও-সব নৈবাৎ ঘটিয়াছে। বুদ্ধিজীবীরা বলিবে, আল্লাহ, যদি এতোই পারে তবে আর সেই কারবালা ময়দানে সেই ১০ই মুহররমে তাহার দাদ লইল না কেন? আসলে মুসলমানকে অযথা ভয় ধরাইয়া তাহাদিগকে মজাদার অন্যায়-অনাচার হইতে ফিরাইয়া রাখিবার এইসব কৌশল মাত্র। কতো লোক অন্যায় কাজ করিয়া কতো বড় হইয়া যাইতেছে, শুধু মুসলমানেরই যতো বাধা। এ কথা কী ভাবে, যে কতো জানোয়ার খাইয়া নাদাইয়া পয়মাল করিয়া যাইতেছে তাহাদের কিছু হয় নাই? এইরূপ বুদ্ধিমত্তা আদি হইতেই দেখাইয়া জঘণ্য অন্যায় করিয়া আসিতে কখনো মুসলমানেরা দ্বিধাবোধ করে নাই। তাই তাহারা বড় হইতে হইতে আজ একদিকে ইহুদির আর অন্যদিকে মুশরিকের বিনামার তলদেশে মাথা ঠেকাইয়া মাত্র ঠেলিতেছে, (কারণ এই দুই জাতিকেই আল্লাহ্ মুসলমানের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দুশমন-রূপে শনাক্ত করিয়া দিয়াছিল) এদিকে অন্যজাতির বেয়নেটের আশ্রয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া
আল্লাহ-রসূল নবীবংশকে মুসলমানের কাছে আমানত রাখিয়াছেন। শুধু আমানত নয়, তাহাদিগকে ভালোবাসিতেও সনির্বন্ধ হুকুমজারি করিয়াছেন। নবীবংশ ও আল-কুরআন কখনো একে অপরকে ছাড়িবে না (তিরমিজি শরীফ)।
অতএব ইহারা ব্যতীত আর কেউ কাহারো অনুসরণীয় নয়, ইহাদেরই হুকুমের মুখাপেক্ষী থাকিতে হইবে, ইহাদের প্রতি সালাতের চূড়ান্ত অংশে দরূদ ভেজিতেও হয়, তৎ সত্ত্বেও মুসলমানেরা যে ইহাদিগকে একে একে নিঃশেষ করিয়া আসিতেছে, তাহাতে আল্লাহ-রসূল (দ.) তো মুসলমানের কিছুই করিতে পারিতেছে না। কারবালায় নবীবংশনাশের জন্য যাহারা দায়ী, ইয়াজিদ, উবায়দুল্লাহ হইতে শুরু করিয়া নিম্নতম সিপাহী পর্যন্ত যাহারা নবীবংশের উপর আঘাত করিতে কসুর করে নাই, এই দুনিয়াতেই জঘন্য অবস্থার ভিতর দিয়া গিয়া তাহাদের মৃত্যুবরণ কেহ রোধ করিতে পারে নাই, সে খবরে মুসলমানের প্রয়োজন কি?
সওয়ায়িক-ই-মুহরিকা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে হজরত হুসায়ন ও তাঁহার পরিজন-হত্যায় যাহারা সহযোগিতা করিয়াছে, তাহারা আখিরাতের শাস্তির আগেই দুনিয়ায় যথেষ্ট ভোগ করিয়াছে। এই কথা এক মজলিসে আলাপ হইবার সময় একজন দাঁড়াইয়া মুসলমানের মতোই বলিল, 'আমি ইমাম হত্যায় সহযোগী ছিলাম, কিন্তু কৈ, আমার তো কিছুই হইল না।' হইয়াছে। কিন্তু গণ্ডারের চামড়ায় কি বোধশক্তি আছে? একটু পরেই সে রাতের আলো দিবার মশালের পাশে দাঁড়াইতে গেলে তাহার গায়ে আগুন ধরে। 'আগুন-আগুন' বলিয়া চিৎকার করিয়া সে দরিয়ায় ঝাঁপ দেয়। কিন্তু কোথাও আগুন তাহাকে ছাড়ে না। ধীরে ধীরে আগুনের তাড়নায় ও যন্ত্রণায় সে মৃত্যুর দিকে আগাইয়া যায়।
আবুশ্ শায়খ এই ঘটনা বয়ান করিয়াছেন।
তবে মুসলমানেরা পণ্ডিত হইয়া আসিতেছে, ইদানীং বৃদ্ধিজীবীও হইতেছে। তাহারা ভাবিবে, ও-সব নৈবাৎ ঘটিয়াছে। বুদ্ধিজীবীরা বলিবে, আল্লাহ, যদি এতোই পারে তবে আর সেই কারবালা ময়দানে সেই ১০ই মুহররমে তাহার দাদ লইল না কেন? আসলে মুসলমানকে অযথা ভয় ধরাইয়া তাহাদিগকে মজাদার অন্যায়-অনাচার হইতে ফিরাইয়া রাখিবার এইসব কৌশল মাত্র। কতো লোক অন্যায় কাজ করিয়া কতো বড় হইয়া যাইতেছে, শুধু মুসলমানেরই যতো বাধা। এ কথা কী ভাবে, যে কতো জানোয়ার খাইয়া নাদাইয়া পয়মাল করিয়া যাইতেছে তাহাদের কিছু হয় নাই? এইরূপ বুদ্ধিমত্তা আদি হইতেই দেখাইয়া জঘণ্য অন্যায় করিয়া আসিতে কখনো মুসলমানেরা দ্বিধাবোধ করে নাই। তাই তাহারা বড় হইতে হইতে আজ একদিকে ইহুদির আর অন্যদিকে মুশরিকের বিনামার তলদেশে মাথা ঠেকাইয়া মাত্র ঠেলিতেছে, (কারণ এই দুই জাতিকেই আল্লাহ্ মুসলমানের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দুশমন-রূপে শনাক্ত করিয়া দিয়াছিল) এদিকে অন্যজাতির বেয়নেটের আশ্রয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া হজ্জ করিবার সুবিধাও তেল দিয়া কিনিয়া ফেলিয়াছে। খারিজী ধর্মে কি সহজ সুবিধা! যাহারা সামনে আছে, 'লা হুকমা ইল্লালিল্লাহ' বলিয়া তো তাঁহাদিগকে অগ্রাহ্য করিয়াছে। আল্লাহকে হাজির নাজির ভাবার দরকার রাখে নাই; তবে আর যাহা-খুশি-তাহাকে ধর্ম বলিয়া প্রকাশ করায় অসুবিধা কি?
প্রথম হইতেই আল্লাহ্-রসূলের উপরে অধিকতর চালাকীর সঙ্গে গলত করিয়া আসিতে আসিতে মুসলমানেরা অন্যের নজরে ইসলামের চেহারা গ্রহণের অযোগ্য দেখাইয়া আসিয়াছে, (মুসলমানেরা আঘাতের ডরে তাহাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ বলে নাই) ঐভাবে আল্লাহ্-রসূলকে অবজ্ঞা করার কৌশল তাহারা শিখাইয়া তুলিয়াছে। এখন তাহাদের ছেলেরা জীবন বাঁচাইবার জন্য সে-'ইসলাম' ছাড়িয়া পালাইতেছে। তাই নানা কূটকৌশলে সেই গলত ঢাকিবার জন্য মুসলমানরা সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করিবার প্রাণপণ প্রচেষ্টায় পুস্তকের উপর পুস্তক লিখিয়া ইসলামী সাহিত্য (?) স্তুপীকৃত করিতেছে। কিন্তু আল্লাহ্-রসূল যাঁহাদিগকে আদর্শ চরিত্র বলিয়া অনুসরণীয়রূপে ধরিতে নির্দেশ করিয়াছেন, তাঁহাদিগকে এখনো ধরিতে না গেলে মুসলমানের দলে উপদলে ফসাদ মিটিবে কি? কাজেই, শান্তিপ্রিয় লোকেরা জঘণ্যদের 'ইসলাম' ছাড়িয়া না দিয়া আর কোথায় পথ পাইবে?
সম্পূর্ণ বইটির ধারাবাহিক পোস্ট
চলবে