12/06/2026
মুর্শিদের প্রেম ও আশেক-মাশুকের আত্মিক টান: কিছু অবিস্মরণীয় স্মৃতি।
বাবাজানের জাহেরিতে (প্রকাশ্যে) থাকার দিনগুলোর একটা বিশেষ ঘটনা আজ খুব মনে পড়ছে। যখন তিনি আমাদের মাঝে জাহেরিতে ছিলেন, প্রায় দিনই দেখা যেত সকালের ভোরে, সবার ঘুম থেকে ওঠার আগেই তিনি দরবার শরিফ থেকে বেরিয়ে পড়তেন। উদ্দেশ্য থাকত—দূর-দূরান্তের বিভিন্ন জাকের-জাকেরান এবং আশেক-আশেকানদের সাথে দেখা করা। অনেক জাকের ভাই-বোন ছিলেন যারা নানা সীমাবদ্ধতার কারণে চাইলেও সবসময় দরবারে আসতে পারতেন না, কিন্তু মনে মনে বাবাজানের দিদার পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকতেন। অন্তর্যামী বাবাজান তাদের মনের সেই আকুলতা ঠিকই বুঝতে পারতেন, আর তাই নিজেই দয়া করে তাদের দেখা দিতে চলে যেতেন।
এমন অসংখ্য অলৌকিক ও ভালোবাসার গল্প আজও জাকের ভাই-বোনেরা পরম শ্রদ্ধায় স্মৃতিচারণ করেন। যেমন রাজবাড়ীর পারুল আপার কথাই ধরা যাক। হঠাৎ একদিন বাবাজান রাজবাড়ী ও ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। দরবারের কেউ জানত না যে বাবাজান সেখানে যাচ্ছেন। কিন্তু পারুল আপা ঠিকই মনে মনে মুর্শিদের আগমন টের পেয়েছিলেন। তিনি বাবাজানের জন্য নিজ দায়িত্বে হরেক রকমের রান্না করতে শুরু করলেন। আশেপাশের সবাই তাকে এত রান্না করতে বারণ করছিল, কারণ বাবাজান যে আসছেন তার কোনো আনুষ্ঠানিক খবর ছিল না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঠিক রান্নার শেষ মুহূর্তেই বাবাজান সেখানে গিয়ে হাজির হলেন! আসলেই পীর-মুরিদের সম্পর্কটা এমনই—মুখে বলতে হয় না, হৃদয়ের টানেই মনের কথা বোঝা যায়। এমনকি ঝিনাইদহের অনেক আশেকের জন্য বাবাজানের মন ছটফট করত, তাদের ভালোবেসে তিনি নিজেই সেখানে ছুটে যেতেন।
তবে এর মধ্যে একটি বিশেষ ঘটনা আমার হৃদয়ে আজীবন গভীর দাগ কেটে রেখেছে। বাবাজানের এক পাগল আশেক ছিলেন। বাবাজান সবসময় পথ চেয়ে থাকতেন তার পথপানে, তাকে দেখার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে উঠত। সেই আশেকও বাবাজানের দিদারের জন্য ছটফট করতেন, কিন্তু জীবিকার তাগিদে বা নানান কাজের ব্যস্ততায় সময়মতো দরবারে আসতে পারতেন না। বাবাজান তাকে ফোন দিতেন, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তিনি ফোন থেকে দূরে থাকতেন এবং ফোন ধরতে পারতেন না।
তখন ছোটমানুষী অভিমান থেকে আমি (বাবার ছোট মেয়ে) বাবাজানকে বলতাম, "এবার সে দরবারে আসলে তুমি তার সাথে একদম কথা বলবে না, তার দিকে তাকাবেও না। তাকে অনেক বকা দেবে, কারণ সে তোমার ফোন ধরে না, সময়মতো আসেও না।" বাবাজানও আমার কথায় সায় দিয়ে একটু হেসে বলতেন, "এবার আসুক ও, ওর খবর আছে!"
এমনই একদিন সেই আশেক(বাবাজান নাম দিয়েছিলেন আমার বেলাল)হঠাৎ দরবারে এসে হাজির হলেন। আমি গেট থেকে তাকে দেখেই দৌড়ে বাবাজানের কাছে গিয়ে বললাম, "ঐ যে সে এসেছে! তুমি কিন্তু এবার তার সাথে একদম কথা বলবে না, তাকাবেও না কিন্তু!"
খানিক বাদে তিনি যখন ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন, আমি বাবাজানের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। দেখলাম, এতক্ষণের সব অভিমানী কথা ভুলে বাবাজান তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছেন, আর সেই আশেকও বাবাজানের বুকে মুখ লুকিয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছেন। সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে সেদিন প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম—একজন সত্যিকারের আশেকের জন্য তার মুর্শিদ তাকে দেখার জন্য কতটা ব্যাকুল, কতটা দেওয়ানা হয়ে থাকেন!
আজ যখন পেছনের এই অসংখ্য স্মৃতি মনে পড়ে, তখন বুক ফেটে কান্না আসে। মনে হয়, আমাদের মতো অধমেরা জীবনে কী করতে পারলাম? এত কাছ থেকে বাবাজানের মতো একজন মহান অলি ও মুর্শিদের সান্নিধ্য পেয়েও আমরা তাকে চিনতে পারলাম না, তার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারলাম না। আজ তাকে হারিয়ে সেই আফসোস আর চোখের জলই শুধু আমাদের সম্বল।