16/11/2025
আগামীকাল শ্রীশ্রী কার্তিক পূজা।
কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে কার্তিক পূজার আয়োজন করা হয়। কার্তিক পরমপুরুষ শিব ও আদি পরাশক্তি পার্বতীর সন্তান। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, অত্যাচারী তারকাসুরকে বধ করার জন্য তার জন্ম হয়েছিল। ছয়জন কৃত্তিকার দ্বারা তিনি পালিত হয়েছিলেন বলে তার নাম কার্তিক। তিনি হলেন ছয় মুখ বিশিষ্ট, তাই তার অপর নাম ষড়ানন, স্কন্দ। দক্ষিণ ভারতে কার্তিককে মুরগান বলে ডাকা হয়। কার্তিককে চিরকুমার বলা হলেও তাঁর দুই পত্নী — দেবসেনা ও বল্লী। কার্তিক হলেন সৌন্দর্য, শক্তির প্রতীক। তিনি তীর, ধনুক, শক্তি অস্ত্র ধারণ করে থাকেন। ময়ূর তার বাহন।
প্রাচীন ভারতে সর্বত্র কার্তিক পূজা প্রচলিত ছিল। লোকাচার অনুসারে, নিঃসন্তান দম্পতিরা সন্তান প্রাপ্তির জন্য কার্তিক পূজা করে থাকেন। কার্তিক পূজার মাধ্যমে দম্পতিরা সন্তান-সন্তুতি প্রার্থনা করে থাকেন। তিনি বাচ্চা বড় না হওয়া অব্দি তাদের বিপদ থেকে রক্ষা করেন৷ তার কৃপা পেলে পুত্রলাভ, ধনলাভ হয়৷ সেকারণে বিয়ে হয়েছে কিন্তুু এখনও সন্তান হয়নি এমন দম্পতির বাড়ির সামনে কার্তিক ঠাকুরের মূর্তি ফেলা হয়।
শিব তখন সংসারত্যাগী ঘোরতর সন্ন্যাসী। সদ্য মৃত্যু হয়েছে তার প্রথমা স্ত্রী সতীর। শোকগ্ৰস্ত শিব তপস্যানিরত।
মহর্ষি কশ্যপ ও দিতির পুত্র দানব বজ্রাঙ্গ। বজ্রাঙ্গের পত্নী বরাঙ্গী। বজ্রাঙ্গ ও বরাঙ্গীর পুত্রের নাম তারক বা তারকাসুর। ব্রহ্মার বরে বলীয়ান তারকাসুর। ব্রহ্মা তাকে বর দিয়েছিলেন — একমাত্র শিবের ঔরসজাত পুত্র ছাড়া আর কেউ তাকে বধ করতে পারবে না। বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে তারকাসুর দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে। দেবতাদের পরাজিত করে সে স্বর্গলোক অধিকার করে এবং দেবতাদের ক্রীতদাসে পরিণত করে। তার অত্যাচারে উৎপীড়িত দেবগণ পরিত্রাণের জন্য পিতামহ ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন।
ব্রহ্মা দেবতাদের অভয় দিয়ে বলেন, শিব ও পার্বতীর যে অপরাজেয় পুত্র জন্মগ্রহণ করবেন তিনি সুরাসুরের অবধ্য তারকাসুরকে নিধন করবেন এবং স্বর্গরাজ্য পুনরায় দেবতাদের হবে। যথাকালে তপস্যানিরত শিবকে স্বামীরূপে পাওয়ার জন্য কঠোর পঞ্চাগ্নি তপস্যানিরতা পার্বতীর বিবাহ হয় এবং শিবতেজে পার্বতীর পুত্র কার্তিকেয়র জন্ম হয়।
তারকাসুরকে বধের জন্য কার্তিকেয়র জন্ম হয়েছিল। পরমেশ্বর শিব ও পরমেশ্বরী পার্বতীর যোগের মাধ্যমে আত্ম মিলন হয়। ফলে এক অগ্নিপিণ্ডের সৃষ্টি হয়। রতির অভিশাপের সম্মান রক্ষার্থে গর্ভে সন্তান ধারণ করেননি মা পার্বতী। তাছাড়া ঈশ্বর কখনও মনুষ্যের ন্যায় সন্তান জন্ম দেন না। অগ্নিদেব সেই উৎপন্ন হওয়া নব্য তেজময় জ্যোতিপিন্ড নিয়ে পালিয়ে যান। ফলে মা পার্বতী যোগ ধ্যান সমাপ্তি হতেই ক্রুদ্ধ হন। অগ্নিদেব ঐ অগ্নিপিণ্ডের তাপ সহ্য করতে না পেরে গঙ্গায় তা নিক্ষেপ করে। সেই তেজ গঙ্গা দ্বারা বাহিত হয় ও শরবনে গিয়ে এক রূপবান গোলকের মধ্যেই জন্ম হয়। গোলকের বাহিরে বেরিয়ে আসার বা জন্মের পর ছয়জন কৃত্তিকা-মাতৃকা তাঁকে লালন-পালন করেন। কৃত্তিকার পালিত সন্তান বলেই নামও হল কার্তিক। কার্তিকের ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার সেই শুরু। জানতেও পারলেন না তিনি, কারা তার বাবা-মা ! আসল বাবা-মার ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েই বড় হলেন তিনি। অতুলনীয় হলেন শস্ত্রে এবং শাস্ত্রে।
শিব ও পার্বতীর অমিততেজা এই পুত্র ছয়মুখে ছয় কৃত্তিকার স্তনদুগ্ধ পান করেছিলেন। ছয় মুখের জন্য তাঁর নাম ‘ষড়ানন’ বা ‘ষন্মুখ’। ছয়জন কৃত্তিকা-ধাত্রীজননীর স্তন্যপান করে বর্ধিত হন বলে তাঁর নাম হয় ‘কার্তিকেয়’ বা ‘কার্তিক’। পরে কার্তিক মাসের অন্তিম দিনে দেবী স্কন্দমাতা বা পার্বতী শিশু স্কন্দ কে কৈলাসে নিয়ে আসেন। এবং তাকে কার্তিক মাসের অন্তিম দিনে দেবীর কর্তৃক পূজার্ঘ্য করা হয়, যা কার্তিক পূজা নামে অভিহিত করা হয়।
কার্তিকের জন্ম অমাবস্যা তিথিতে। পরবর্তী পাঁচদিনে তাঁর প্রাপ্তবয়স্কতা লাভ। জন্মের ষষ্ঠ দিন দেবসেনাপতিরূপে তাঁর অভিষেক হয় এবং দেবসেনার সঙ্গে বিবাহ হয়। শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতেই দেবসেনার সঙ্গে কার্তিকের বিবাহ। কার্তিকের স্ত্রী দেবসেনার অপর নাম দেবী ষষ্ঠী। সুরাপদ্মনকে বধ করার পর দেবরাজ ইন্দ্র নিজ কন্যা দেবসেনা বা ষষ্ঠীর সঙ্গে কার্তিকের বিবাহ দেন। এখানেই দ্বিতীয় ধাপে ভালবাসার পথ থেকে সরে এলেন কার্তিক। প্রেম কী, তা বোঝার আগেই শুরু হল তাঁর দাম্পত্য। সেই জন্যই তাঁকে আমরা বলি দেবসেনাপতি ! অর্থাৎ দেবসেনার পতি।
ষষ্ঠীদেবী সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী এক পৌরাণিক দেবী। দেবীভাগবত পুরাণে নবম স্কন্ধের একটি শ্লোকে বলা হয়েছে — “ষষ্ঠাংশা প্রকৃতের্যে চ সা চ ষষ্ঠী প্রকীর্তিতা / বালকানামধিষ্ঠাত্রী বিষ্ণুমায়া চ বালদা।” অর্থাৎ — বালকগণের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, বালকদায়িনী বিষ্ণুমায়া প্রকৃতির ষষ্ঠকলা, এই জন্য ষষ্ঠী নামে কীর্তিত হয়েছেন। মা ষষ্ঠী ভগবতীর একটি রূপ। ষষ্ঠী দেবীর বাহন বিড়াল। এবং তাঁর হস্তে বর মুদ্রা ও ক্রোড়ে শিশু থাকে।
মা ষষ্ঠী মূলতঃ সন্তানদাত্রী ও তাহার রক্ষাকর্ত্রী দেবী; তার কৃপায় নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তান লাভ হয় এবং তিনিই সন্তানের রক্ষাকর্ত্রী, পুরাণ মতে যেহেতু তিনি আদিপ্রকৃতির ষষ্ঠাঙ্গ অংশভুতা তাই তাহার নাম ষষ্ঠী দেবী। শিশু জন্মের ষষ্ঠ দিনে ষষ্ঠী দেবীর পূজা করা হয়। যাতে শিশুর কখনও কোনও প্রকার দুঃখ-কষ্ট না হয়। সব ধরনের বিপদ আপদ থেকে মুক্ত হবার জন্যই ষষ্ঠী দেবীর পূজা। প্রার্থনা করা হয় - আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। মা তোমার সকল সন্তানের মঙ্গল করো। জয় দেবি জগন্মাতঃ জগদানন্দকারিণি। প্রসীদ মম কল্যাণি নমস্তে ষষ্ঠী দেবিকে।
স্ত্রী ষষ্ঠীর সাথে কার্তিকের মিল থাকায় কার্তিক পূজার মাধ্যমে দম্পতিরা সন্তান-সন্তুতি প্রার্থনা করে থাকেন। তিনি বাচ্চা বড় না হওয়া অব্দি তাদের বিপদ থেকে রক্ষা করেন৷ তার কৃপা পেলে পুত্রলাভ, ধনলাভ হয়৷
কার্তিকের স্ত্রীর নাম দেবসেনা হওয়ায় সেকারণেও তিনি ‘দেবসেনাপতি’ আবার দেবসেনাবাহিনীর নায়কত্বের জন্য তিনি ‘দেবসেনাপতি’। এরপর সপ্তম দিন তিনি তারকাসুরকে বধ করেন।
তারকাসুরকে বধ করার পর কার্তিক লোকজনকে বেদ শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন। চতুর্বেদ সম্বন্ধে তার অপরিসীম জ্ঞান। অতি শীঘ্রই তার নাম হল সুব্রহ্মণ্যম। তার এই জ্ঞান দেখে ঋষি অগস্ত্যমুনি তাকে ভারতবর্ষের দাক্ষিণাত্যে নিয়ে যান বেদ চর্চার জন্য।
কার্তিক স্ত্রী দেবসেনাকে নিয়ে চলে এলেন দক্ষিনভারতে। বসতি করলেন পাহাড়ে, উপজাতি তাঁকে বরণ করে নিল সাদরে। ময়ূরবাহন বা মুরুগন বলে জানাল শ্রদ্ধাও ! কিন্তু, ভালবাসা পাওয়ার আকাঙ্খা কার্তিকের মন থেকে দূর হল না। তখনও যদিও তিনি জানতেন না, প্রেম এসে ধরা দিতে চলেছে তাঁর বাহুবন্ধনে। দক্ষিণ ভারতের এই পাহাড়েই সার্থক হবে তাঁর প্রেমের কামনা।
কার্তিক তাই কিছুটা মনমরা হয়েই থাকেন, ঘুরে বেড়ান ইতিউতি। এমন সময়ে একদিন তিনি দেখলেন, এক পাহাড়ি ক্ষেতে শস্য পাহাড়া দিচ্ছে একটি কালো পরমাসুন্দরী মেয়ে ! যতই কালো হোক, কার্তিক তুমুল ভাবে তার প্রেমে পড়লেন। এক বৃদ্ধের ছদ্মবেশে গিয়ে নাম জানতে চাইলেন, জানতে চাইলেন পরিচয়। শুনলেন, সে সেখানকার রাজার মেয়ে, তার নাম বল্লী। নম্বিরাজের কন্যা।
এবার কার্তিক চাইলেন বল্লীকে বিয়ে করতে। সে কথা বলতেই বল্লী রেগে আগুন হলেন। তিনি সদ্য যুবতী, তার কেন এক বৃদ্ধকে মনে ধরবে। বিপদ দেখে কার্তিক তখন স্মরণ করলেন গণেশকে। গণেশও ভাইয়ের মনের কথা ভেবে এক মত্ত হস্তীর রূপ ধরে আটকে দাড়ালেন বল্লীর রাস্তা। বল্লীর আর উপায় নেই ! মত্ত হাতির ভয়ে তিনি জড়িয়ে ধরলেন সেই বৃদ্ধকে। ভয়ে তাঁর দু'চোখ বোজা ! তিনি আদায় করে নিলেন প্রতিশ্রুতি — হাতিটাকে তাড়াতে পারলে বল্লী তাঁকে বিয়ে করবেন। নয় তো দুজনেই মরবেন ! রাজী হতে তাই বাধ্য হলেন বল্লী।
যখন তিনি চোখ খুললেন, দেখলেন সেই বৃদ্ধের জায়গায় দাড়িয়ে রয়েছে এক সুপুরুষ যুবক। এরপর আর বিয়েতে আপত্তি থাকার কথা নয়। বিয়ে হলও ধুমধাম করে। এবং, বল্লীর সঙ্গে দাম্পত্য আর প্রেম পূর্ণ ভাবে উপভোগ করার জন্য দক্ষিণ ভারতের ছয়টি স্থানে ছয়টি শস্ত্রাগার নির্মাণ করলেন কার্তিক ! যেখানে, তৃপ্ত হবে তাঁর অস্ত্রচর্চা আর প্রেমচর্চা — দুই ! সেই ছয়টি শস্ত্রাগার আজ ভারতের সবচেয়ে পবিত্র কার্তিক মন্দিরে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ ভারতে তিনি খুব জনপ্রিয়। সেখানে তার অসংখ্য মন্দির আছে। তবে তামিলনাড়ুর এই ৬টি মন্দির খুব পবিত্র —
(১) স্বামীমালাই মুরুগান মন্দির।
(২) পালানী মুরুগান মন্দির।
(৩) থিরুচেন্দুর মুরুগান মন্দির।
(৪) থিরুপ্পারামকুমারাম মুরুগান মন্দির।
(৫) থিরুথানি মুরুগান মন্দির।
(৬) পাঝামুদিরচোলাই মুরুগান মন্দির।
কার্তিক একইরূপে তিনি পরম সাত্ত্বিক ব্রহ্মচারী রূপে দন্ডধারণ করে কঠিন তপস্যায় রত আবার অন্য রূপে তিনিই পরম রাজসিক রূপে বল্লী ও দেবসেনার হৃদয়বল্লভ। ইন্দ্রপুত্রী গৌরবর্ণা দেবসেনা এবং প্রাকৃতবংশীয় শ্যামলবরণা বল্লী উভয়েই তার সমান প্ৰিয়। দেবলোক থেকে নরলোকে তার সমান বিচরণ। দুই লোকের দুহিতার ই তিনি প্রাণপ্ৰিয়। সর্পনিধনে কৌমেয় নামক ময়ূরের উর্দ্ধে , ষড়ানন বা মুরুগান বা কার্তিকেয় মধ্যে, বামদিকে দেবী ষষ্ঠী বা দেবসেনা ও ডানদিকে বল্লী।
চিরকুমার নন, দুই স্ত্রী নিয়ে সুখেই থাকেন কার্তিক ! চেন্নাই থেকে তিরুপতির পথে প্রায় ৭০ কিঃমিঃ দূরে থিরুথানি তে একটি ছোট্ট পাহাড়ের উপরে অবস্থিত মন্দিরটিতে কুমার দুই স্ত্রী নিয়েই বিরাজ করছেন। কালো পাথরের বিগ্রহ। সোনা রূপার কবচ পরানো। প্রায় দু ফুট মাপের উৎসব মূর্তি রয়েছে।
কৌমারাম একটি সম্প্রদায়। যাদের বিশেষ করে দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় তামিল, কন্নড়, বেদ্দাদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। তাদের কাছে কার্তিকেয় হলেন পরমেশ্বর। তারা ভগবান কার্তিকেয়কে ত্রিমূর্তিরও চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে এবং শুধুমাত্র তাঁর সেবা করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করে। কৌমার উৎসবে তারা প্রমত্ত নাচ করে।
অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীর মতো কার্তিকও একাধিক নামে অভিহিত হন। যথা — কৃত্তিকাসুত, আম্বিকেয়, নমুচি, স্কন্দ, শিখিধ্বজ, অগ্নিজ, বাহুলেয়, ক্রৌঞ্চারতি, শরজ, তারকারি, শক্তিপাণি, বিশাখ, ষড়ানন, গুহ, ষান্মাতুর, কুমার, সৌরসেন, দেবসেনাপতি গৌরী সুত, আগ্নিক ইত্যাদি।
জন্মসূত্রে পিতা শিবের বীর্য ও গুণাবলীর যেমন তিনি উত্তরাধিকারী হন, তেমনি মাতা পার্বতীর শৌর্য ও বীর্যের উত্তরাধিকারও তিনি লাভ করেন। তাঁর অপ্রতিরোধ্য পরাক্রম ও দুর্জয় সাহস তাঁকে এনে দেয় দেব-সেনাপতির স্বীকৃতি। রামায়ণ, মহাভারত এবং প্রধান পুরাণগুলিতে কার্তিকের জন্মকথা ও কীর্তিকাহিনী সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। পুরাণগুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান স্কন্দপুরাণ প্রত্যক্ষত তাঁরই নাম বহন করছে। স্কন্দপুরাণ ভিন্ন অন্যান্য প্রধান যে পুরাণগুলিতে কার্তিকের উপাখ্যান বর্ণিত। সেগুলি হলো : মৎস্যপুরাণ, শিবপুরাণ, বামনপুরাণ, লিঙ্গপুরাণ, বায়ুপুরাণ, পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ, অগ্নিপুরাণ, ব্রহ্মপুরাণ, কূর্মপুরাণ, বরাহপুরাণ, ভবিষ্যপুরাণ, ভাগবতপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ। দেখা যায় উল্লিখিত প্রত্যেক পুরাণেই দেবতা ও অসুরদের প্রচণ্ড সংগ্রাম এবং দেবতাদের পরাজয়ের পটভূমিকায় শিব-পার্বতীর পুত্ররূপে কার্তিকের জন্ম। আবার কার্তিকের জন্ম-উপাখ্যানটি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কার্তিকের জন্মের পশ্চাতে ছিল শিব-পার্বতীর কঠোর তপস্যা। সন্তান আসবে পিতা-মাতার সংযম ও তপস্যার সেতুপথে — এটাই প্রাচীন ভারতীয় দাম্পত্য জীবনের মূল দর্শন।
ক্ষাত্রশক্তির সঙ্গে যখন ব্রহ্মতেজ সমন্বিত হয়, তখনি বিজয়াদি সর্বাভীষ্ট মানুষের করতলগত হয়। তখনি মানুষের মধ্যে শিবশক্তি অর্থাৎ শুভশক্তির উদ্বোধন ঘটে। সেই উদ্বুদ্ধ দেবাত্মশক্তির কাছে অসুরের পরাজয় অনিবার্য। কারণ, সমস্ত দেবাত্মশক্তির ওপর যাঁর আধ্যিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত, ত্রিভুবনের সমস্ত প্রতিরোধই তাঁর সম্মুখে চূর্ণবিচূর্ণ হতে বাধ্য। সেই আধ্যাত্মিক অর্থে যিনি দেবসেনাপতি, তাঁর কণ্ঠে দেবরাজকন্যার জয়মাল্য দোলে-তিনিই দেবরাজকন্যাকে লাভ করেন। দেবরাজ কন্যার নাম ‘দেবসেনা’।
‘দেবসেনা’র অর্থ দেবশক্তি। অর্থাৎ দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি কার্তিকের অধীন। সেজন্য তিনি দেবসেনাপতিরূপে স্বীকৃত। সম্মিলিত দেবাত্মশক্তিকে যথার্থভাবে ব্যবহার ও পরিচালনা করে সভ্যতাকে সুরক্ষিত রাখার গুরুদায়িত্ব তাঁর স্কন্ধে অর্পিত। দেবী দুর্গার পরিবার সমগ্র বিশ্বচরাচর। তাঁর স্নেহাঞ্চলে পশু, পাখি, সরীসৃপ, উদ্ভিদ, মানুষ-সকলেই আচ্ছাদিত। সেই বিশ্ব-পরিবার রক্ষার দায়িত্বে দেবীর পুত্র কার্তিকেয় নিযুক্ত। এই দায়িত্ব তিনি লাভ করেছেন দেবীর পুত্রের অধিকারে নয়, তাঁর আপন যোগ্যতায়।
তেজস্বী, ক্ষিপ্রকর্মা, সদা উদ্যমী, অকুতোভয়, অপরাজেয় ও সুদর্শন কার্তিকেয় শুধু স্বর্গ বা দেবলোকের সেনাপতি নন, সমগ্র মানবলোকেরও ঊর্ধ্বায়ত বীর্য ও শক্তির তিনি প্রতীক-বিগ্রহ। বস্তুত, কার্তিকের পরিচয় একজন বিশেষ দেবতারূপে নির্দিষ্ট হলেও তাঁর মধ্যে অন্তত রুদ্র, অগ্নি, বায়ু, ইন্দ্র ও বিষ্ণু-এই প্রধান বৈদিক পঞ্চদেবতার সংমিশ্রণ ঘটেছে। বৈদিক দেবভাবনা ভিন্ন পৌরাণিক, তান্ত্রিক ও লৌকিক নানা দেবভাবনা এবং দেবতার মানবিকীকরণ-অভীপ্সার সংমিশ্রণে কার্তিকের উপাসনা ও রূপভাবনা সমৃদ্ধ হয়েছে। সম্ভবত এই প্রক্রিয়া পূর্ণ পরিণতি প্রাপ্ত হয় গুপ্ত যুগে-খ্রিস্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতকে। তবে তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ, নারায়ণ উপনিষদ্, বৌধায়ন ধর্মসূত্র, মহাভারত, পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র প্রভৃতি সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে, পৃথক দেবতা হিসাবে কার্তিক পূজিত হতে শুরু করেছেন খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর বহু আগে থেকেই।
কার্তিকের বাহন ময়ূর। আবার কিছু মতে কুক্কুট বা মোরগও কার্তিকের বাহন। বামনপুরাণের মতে দেবসেনাপত্যে অভিষিক্ত হওয়ার পর গরুড় কার্তিককে বাহন হিসাবে ময়ূরকে প্রদান করেছিলেন। বরাহপুরাণের মতে ঐ সময় পিতা শিব কার্তিকেয়কে ক্রীড়ার জন্য কুক্কুট উপহার দিয়েছিলেন। মহাভারতের মতে অগ্নিদেব এবং মৎস্যপুরাণের মতে বিশ্বকর্মা কার্তিকেয়কে কুক্কুট উপহার দিয়েছিলেন। তবে মহাভারত ও পুরাণের বর্ণনায়, পুরাণের প্রতিমালক্ষণ-বিবৃতিতে, তন্ত্রের ধ্যানমন্ত্রে এবং প্রাচীন মুদ্রায় প্রধানত কার্তিককে ময়ূরবাহনরূপেই দেখানো হয়েছে। এমনকি পূর্বোক্ত অথর্ববেদের পরিশিষ্ট স্কন্দযাগেও কার্তিকের ময়ূরবাহনত্ব উল্লিখিত হয়েছে। কুক্কুট অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্তিকের হস্তধৃতরূপেই বর্ণিত, যাতে বোঝা যায় কুক্কুট তরুন শিবপুত্রের একটি প্রিয় ক্রীড়নক। প্রাণিতত্ত্ববিদগণের মতে, ময়ূর ও কুক্কুট উভয়েই সমবর্গীয় পক্ষী। যাহোক, পরিবার-সমন্বিতা মহিষাসুরমর্দিনীর সঙ্গে কার্তিককে আমরা ময়ূরবাহনরূপে দেখতে অভ্যস্ত। এমনকি মালয়েশিয়া এবং জাপানে কার্তিকের যে মূর্তি ও মন্দির দেখা যায় সেখানেও তিনি ময়ূরবাহন।
কেন কার্তিকের ময়ূরবাহন ? ময়ূরের পাঁচটি প্রধান বৈশিষ্ট্য - সৌন্দর্য, যৌবনদৃপ্ততা, বীর্য, যোদ্ধৃত্ব এবং প্রাতরুত্থান। সৌন্দর্য, যৌবনদৃপ্ততা, বীর্য, যোদ্ধৃত্ব জন্য ময়ূর পক্ষীকুলে নৃপতিতুল্য। ভারতের জাতীয় পক্ষীও ময়ূর। দেবীর চার সন্তানের মধ্যে কার্তিকের সঙ্গে সর্বাংশেই তার সর্বাপেক্ষা বেশি সাদৃশ্য। দেবীর বাহন যেমন পশুরাজ, তাঁর পুত্রের বাহন তেমনি পক্ষীরাজ। বিষধর সর্প ময়ূরের আক্রমণ-নৈপুণ্য এবং পরাক্রমে শুধু যে পর্যুদস্ত হয় তাই নয়, একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ময়ূরের কেকাধ্বনি নিশাবসানের সঙ্কেত ঘোষণা করে। তার প্রাতরুত্থান-অভ্যাস তার অনলসতা, অতন্দ্র সতর্কতা এবং জাড্যহীন তৎপরতার পরিচায়ক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ময়ূরের উল্লিখিত পাঁচটি বৈশিষ্ট্য কুক্কুটের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য।
সমগ্র ত্রিভুবনের সুরক্ষার দায়িত্ব যাঁর স্কন্ধে অর্পিত সেই স্কন্দ-কার্তিকেয়ের বাহনের নিকট তো এই গুণগুলিই সর্বাগ্রে প্রকাশিত। আলস্য, তন্দ্রা, নিদ্রা, জড়তা, দীর্ঘসূত্রতা, অসতর্কতা ও অসাবধানতাকে নির্মমভাবে পদানত করতে না পারলে এবং যৌবনোচিত উদ্যম, যোদ্ধৃত্ব, বীর্য ও শক্তি প্রকাশ না করলে কি স্কন্দ-কার্তিকেয় দেবসেনাপতির মর্যাদা লাভ করতে পারতেন, না ত্রিলোকজয়ী তারকাসুরকে পরাভূত ও বিনাশ করতে পারতেন ? কী সংসারজীবনে, কী সাধন-জীবনে, কী কর্মজীবনে সার্থকতা নিহিত ঐ দুর্বলতাসমূহের দমনের এবং ঐ শক্তি প্রকাশের ওপর।
ঐ দমনের পরাকাষ্ঠা, ঐ শক্তি প্রকাশ তাঁর জীবন ও কর্মে দেখিয়েছিলেন বলেই দেবাসুর সংগ্রামে স্কন্দ-কার্তিকেয় চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করেছিলেন। ময়ূর বিষধর সর্পকুলকে ধ্বংস করে আমাদের জীবনকে নিরুদ্বেগ করে। কার্তিকও সভ্যতার শত্রু অসুরকুলকে ধ্বংস করে সভ্যতার পরিত্রাতার ভূমিকায় একদা অবতীর্ণ হয়েছিলেন। জগতের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে কার্তিকেয় ও তাঁর বাহন ময়ূরের গুণাবলীর তাৎপর্য আমাদের বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।
সর্পের মতো ক্রূর ও খল মানুষেরা সভ্যতার শত্রু। এই সুন্দর পৃথিবীকে তারা প্রতিমুহূর্তে তাদের বিষাক্ত উপস্থিতিতে কলুষিত করছে। তাদের অবস্থান পৃথিবীর বাসযোগ্যতাকে বিনষ্ট করছে। পৃথিবীকে এই সর্পস্বভাব মানুষের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হলে প্রয়োজন সর্পহন্তা ময়ূরের মতো বীর্য ও যোদ্ধৃত্ব। বস্তুত, সর্পস্বভাব যেমন প্রায় সকল মানুষের মধ্যেই কম-বেশি নিহিত, তেমনি নিহিত ময়ূরস্বভাবও। আমাদের অন্তরস্থিত সর্পস্বভাবকে খর্ব ও ধ্বংস করতে হবে আমাদের অন্তরস্থিত ময়ূরস্বভাবের উদ্বোধনের মাধ্যমে।
ময়ূরের মধ্যে যেমন বীর্য ও যোদ্ধৃত্ব প্রকট, তেমনি প্রকট তার যৌবনদৃপ্ততা এবং সৌন্দর্য। যৌবনের ধর্মই হলো দুরতিক্রম্যকে অতিক্রমের উচ্চাভিলাষ, প্রতিবন্ধকের সম্মুখে নতিস্বীকারের প্রবল অনীহা। যৌবনের বৈশিষ্ট্য গতি-অধরাকে ধরার, দুর্লঙ্ঘ্যকে লঙ্ঘন করার দুর্নিবার আকাক্সক্ষা। আর তার মধ্যেই নিহিত যৌবনের প্রকৃত সৌন্দর্য। জড়তা, তন্দ্রা, আলস্য, নিদ্রা প্রৌঢ়ত্বের লক্ষণ এবং বার্ধক্যের ধর্ম।
যৌবনে যদি ঐগুলি দেখা যায় তাহলে বুঝতে হবে যৌবন রাহুগ্রস্ত হয়েছে, যৌবন তার সৌন্দর্য হারিয়েছে, কুশ্রীতা যৌবনকে গ্রাস করেছে। যৌবন এবং সৌন্দর্য যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পৃথিবীকে সর্পমুক্ত করা যেমন দুঃসাধ্য, তেমনি দুসাধ্য পৃথিবী থেকে স্বর্পস্বভাব মানুষকে বা মানুষের অন্তরস্থিত স্বর্পস্বভাবকে নির্মূল করা। কিন্তু যৌবনদৃপ্ত ময়ূর যেমন সর্প দেখলেই তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তীক্ষ্ণ চঞ্চু ও শাণিত নখরের আঘাতে তাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে, মানুষের মধ্যে যারা ময়ূরস্বভাব অথবা মানুষের মধ্যস্থিত ময়ূরস্বভাব তেমনি জগতের সর্পস্বভাব মানুষের অথবা মানুষের অন্তরস্থিত সর্পস্বভাবের সঙ্গে চিরন্তন সংগ্রামে লিপ্ত। এই সংগ্রামের মনোবৃত্তিই ময়ূরস্বভাব মানুষের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য।
ময়ূরের পঞ্চম বৈশিষ্ট্য প্রাতরুত্থান। এটি তার স্বভাব। প্রাতরুত্থান স্বভাববিশিষ্ট ময়ূর নিদ্রালসতার কাছে আত্মসমর্পণ করে না। সভ্যতার স্থায়িত্ব, স্বাধীনতার স্থায়িত্ব নির্ভর করে মানুষের অনলস তৎপরতার ওপর। পৃথিবীকে সুন্দর রাখতে হলে, পৃথিবীর বাসযোগ্যতা অটুট রাখতে হলে প্রয়োজন ঐ অনলস তৎপরতার-ঐ অতন্দ্র সতর্কতার। দেবসেনাপতি কার্তিক ও তাঁর বাহন ময়ূরের কল্পনায় আমাদের পূর্বপুরুষগণ সেকথাই বোঝাতে চেয়েছিলেন।
আমাদের হুগলী জেলার চুঁচুড়া-বাঁশবেড়িয়া কাটোয়া অঞ্চলের কার্তিক পূজা বিশেষ প্রসিদ্ধ।
শ্রীশ্রী কার্তিক দেবের ধ্যান মন্ত্র —
ॐ কার্তিকেয়ং মহাভাগং ময়ুরোপরিসংস্থিতম্।
তপ্তকাঞ্চনবর্ণাভং শক্তিহস্তং বরপ্রদম্॥
দ্বিভুজং শক্রহন্তারং নানালঙ্কারভূষিতম্।
প্রসন্নবদনং দেবং কুমারং পুত্রদায়কম্॥
অনুবাদ —
কার্তিকদেব মহাভাগ, ময়ূরের উপর তিনি উপবিষ্ট। তপ্ত স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল তাঁর বর্ণ। তাঁর দুটি হাতে শক্তি নামক অস্ত্র। তিনি নানা অংলকারে ভূষিত। তিনি শত্রু হত্যাকারী। প্রসন্ন হাস্যোজ্জ্বল তাঁর মুখ।
শ্রীশ্রী কার্তিক দেবের প্রণাম মন্ত্র —
ॐ কার্তিকের মহাভাগ দৈত্যদর্পনিসূদন।
প্রণোতোহং মহাবাহো নমস্তে শিখিবাহন॥
রুদ্রপুত্র নমস্ত্তভ্যং শক্তিহস্ত বরপ্রদ॥
ষান্মাতুর মহাভাগ তারকান্তকর প্রভো।
মহাতপস্বী ভগবান্ পিতুর্মাতুঃ প্রিয় সদা॥
দেবানাং যজ্ঞরক্ষার্থং জাতস্ত্বং গিরিশিখরে।
শৈলাত্মজায়াং ভবতে তুভ্যং নিত্যং নমো নমঃ॥
অনুবাদ —
হে মহাভাগ, দৈত্যদলনকারী কার্তিকদেব তোমায় প্রণাম করি। হে মহাবাহু, ময়ূর বাহন, তোমাকে নমস্কার। হে রুদ্রের (শিব) পুত্র, শক্তি নামক অস্ত্র তোমার হাতে। তুমি বর প্রদান কর। ছয়। কৃত্তিকা তোমার ধাত্রীমাতা। জনক-জননী প্রিয় হে মহাভাগ, হে ভগবান, তারকাসুর বিনাশক, হে মহাতপস্বী প্রভু তোমাকে প্রণাম। দেবতাদের যজ্ঞ রক্ষার জন্য পর্তবতের চূড়ায় তুমি জন্মগ্রহণ করেছ। হে পর্বতী দেবীর পুত্র তোমাকে সতত প্রণাম করি।
সকলকে শুভ কার্তিক পূজার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
(সংগৃহীত)