12/03/2026
ফিতরার বিধান
ইসলামে সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরা) একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং আর্থিক দান, যা রমজানের শেষে ঈদুল ফিতরের আগে সামর্থ্যবান মুসলিমদের জন্য আদায় করা ওয়াজিব (আবশ্যকীয়)। এটি ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর নির্দেশ মানা এবং সমাজের দরিদ্রদের সহায়তার জন্য একটি বিশেষ বিধান।
ফিতরার বিধান (হুকুম):
ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। এটি প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য আবশ্যক, যিনি নিজে ও তার পরিবারকে ঈদের দিন মৌলিক প্রয়োজনীয়তা মেটানোর পর ফিতরার সম্পদ রাখেন। এটি কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত।
কুরআনের আলোকে ফিতরার বিধান:
যদিও ফিতরার কথা সরাসরি কুরআনে উল্লেখ নেই, তবে কুরআনে দান-সদকা এবং আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব বারবার এসেছে। ফিতরা এই দানের একটি প্রকার। আল্লাহ বলেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ وَذَكَرَ ٱسْمَ رَبِّهِۦ فَصَلَّىٰ
অর্থ:
সফল হয়েছে সেই ব্যক্তি, যে পবিত্রতা অর্জন করেছে এবং তার রবের নাম স্মরণ করে সালাত আদায় করেছে।
[সূরা আল-আ'লা: ১৪-১৫]
ইবনে আব্বাস রা. এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, "تَزَكَّىٰ" শব্দটি ফিতরা আদায় করার প্রতি ইঙ্গিত করে।
হাদিসের আলোকে ফিতরার বিধান:
রাসুলুল্লাহ ﷺ ফিতরার বিধানকে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন এবং এর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
হাদিসে এসেছে,
فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ، وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ.
অর্থ:
রাসুলুল্লাহ ﷺ ফিতরা প্রদানকে ফরজ করেছেন, যা রোজাদারের জন্য অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজ থেকে পবিত্রতা এবং দরিদ্রদের খাদ্যের সংস্থান হিসেবে কাজ করে।
[সহিহ আবু দাউদ: ১৬০৯, সহিহ ইবনে মাজাহ: ১৮২৭]
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ফিতরা রোজার পবিত্রতা রক্ষা করে এবং সমাজের অভাবীদের সাহায্য করে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
صاعًا من تمر أو صاعًا من شعير على العبد والحر والذكر والأنثى والصغير والكبير من المسلمين.
অর্থ:
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, খেজুর বা যবের এক সা’ পরিমাণ ফিতরা আদায় করতে হবে, তা স্বাধীন বা দাস, পুরুষ বা নারী, ছোট বা বড় প্রত্যেক মুসলিমের জন্য।
[সহিহ বুখারি: ১৫০৩, সহিহ মুসলিম: ৯৮৪]
ফিতরা যারা আদায় করবে:
প্রত্যেক মুসলিমের জন্য:
যিনি নিজের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর ফিতরার পরিমাণ পরিমাণ সম্পদ রাখেন।
সামর্থ্য অনুযায়ী:
পুরুষ, নারী, শিশু এমনকি নবজাতকের জন্যও ফিতরা প্রদান করতে হবে।
গৃহকর্তা দায়িত্বশীল:
পরিবারের গৃহকর্তা তার পরিবারের সব সদস্যের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করবেন।
ফিতরার নির্ধারিত পরিমাণ:
ফিতরার পরিমাণ রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সময় নির্ধারিত ছিল খাদ্যশস্যের ভিত্তিতে।
১ সা’ পরিমাণ খাদ্য:
রাসুলুল্লাহ ﷺ খেজুর, যব, কিশমিশ বা গমের এক সা’ পরিমাণ ফিতরা নির্ধারণ করেছেন।
১ সা’ = প্রায় ৩ কেজি:
বর্তমানে এটি খাদ্যদ্রব্যের মূল্যের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়। বিভিন্ন দেশে ইসলামিক স্কলাররা প্রতিটি পণ্যের জন্য ফিতরার মান নির্ধারণ করেন।
ফিতরা আদায়ের সময়:
সর্বোত্তম সময়:
ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে ফিতরা প্রদান করা।
আগ্রিম প্রদান:
রমজানের শেষের দিনগুলোতে বা আগেই ফিতরা প্রদান করা যেতে পারে।
বিলম্ব না করা:
ঈদের নামাজের পরে ফিতরা প্রদান করা হলে এটি সাধারণ সদকা হিসেবে গণ্য হবে, তবে ফিতরার মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন,
أَغْنُوهُمْ عَنِ الطَّوَافِ فِي هَذَا الْيَوْمِ.
অর্থ:
ঈদের দিনে দরিদ্রদের ভিক্ষার প্রয়োজন থেকে মুক্ত রাখো।
[সহিহ ইবনে খুজাইমা: ২৪১৭]
ফিতরার অর্থ কোথায় ব্যয় করা উচিত:
ফিতরার অর্থ নিম্নলিখিত শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিতরণ করা যায়:
• দরিদ্র (ফকির)।
• অভাবগ্রস্ত (মিসকিন)।
• এতিম।
• ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।
• যারা নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণে অক্ষম।
উল্লেখযোগ্য বিষয়:
ফিতরা দানের জন্য আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং নিকটবর্তী দরিদ্রদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।