05/02/2025
১.
একটা মেয়ের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড়। দেশের নাগরিক সমাজ চিন্তিত, প্রশাসন ব্যতিব্যস্ত, তার পরিবার মর্মাহত। পরিশেষে জানা গেল, মেয়েটা হারায়নি, যে ছেলের সাথে তার সম্পর্ক ছিল, তার সাথে ঢাকার বাইরে চলে গিয়েছিল।
এই ক’দিন যারা মেয়েটার হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় হাপিত্যেশ করেছে, যারা দুঃখ প্রকাশ করেছে, মর্মাহতে হয়েছে—সকলে এই ঘটনায় হতভম্ব এবং বিস্মিত। সবচেয়ে বেশি লজ্জায় পড়েছে মেয়েটার পরিবার—বিশেষ করে মিডিয়ার সামনে আসা তার বাবা।
নিখোঁজের আসল ঘটনা সামনে আসার পর শুরু হয়েছে আরেকটা ট্রেণ্ড। অনেকে বলছেন, অল্পবয়সে বিয়ে দিতে চাইবে না, কিন্তু দেদারসে প্রেম ভালোবাসা করতে দিবে। যে সমাজে বিয়ে কঠিন কিন্তু এসব প্রেম-ভালোবাসা সুলভ, সেই সমাজে মেয়ে আর ছেলেরা এভাবে নিখোঁজ হবে না তো কোথায় হবে?
আলোচনার পারস্পেকটিভটা একদিক থেকে যৌক্তিক। আমাদের সমাজে বিয়ে জিনিসটা সত্যিই কঠিন করে রাখা হয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বিবাহ বহির্ভূত প্রেম ভালোবাসা যেন মুড়ি মুড়কি কেনার মতোই সহজ আজকাল—রাস্তাঘাটে, পার্কে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, রেস্টুরেন্ট আর শপিং মলগুলোতে ঢুঁ মারলেই সেসব চোখে পড়ে।
কিন্তু, এই যে একটা ছেলের হাত ধরে একটা মেয়ের তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন রেখে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া, শুধুমাত্র তাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যবস্থা করলেই কি এসব ঘটনা আটকানো যাবে? আমার কাছে মনে হয়, কিছু ক্ষেত্রে এটা হয়তো ফল দিতে পারে, কিন্তু আমাদের মূল আলোচনাটা তাড়াতাড়ি বিয়ের বিষয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাবা-মায়েদের প্যারেন্টিং বিষয়টাতে জোর দিতে পারি।
আমি খুব ভালোভাবে বিশ্বাস করি—যেকোনো সময়ের চাইতে অধুনা যুগে প্যারেন্টিং জিনিসটা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং অন্য যেকোনো যুগ, অন্য যেকোনো কালের তুলনায় বর্তমানে সঠিক প্যারেন্টিং, সঠিক তারবিয়াহটা অত্যন্ত অত্যন্ত জরুরি। কারণ, আজকালকার সময়ের মতো ফিতনা এতো দ্রুতবেগে, বানের স্রোতের মতো আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ আর পরিবারগুলোতে উপচে পড়েনি।
এখন অশ্লীলতার সাথে আমাদের দূরত্ব কয়েক সেকেন্ড মাত্র। আমাদের সন্তানেরা বিকৃত উপাদান থেকে মাত্র কয়েকটা ক্লিক দূরে। আমাদের রক্ষণশীল সমাজে একটা রীতি ছিল আগে। অপরিচিত কারও সাথে কোথাও না যাওয়া, অপরিচিত কেউ কিছু দিলে না খাওয়া ইত্যাদি। অথচ দেখুন, যুগের পরম্পরা আমাদেরকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে যে, আজকাল আমাদের সন্তানেরা এমন সকল মানুষের সাথে বন্ধুত্ব পাতাচ্ছে, ঘুরতে আর আউটিংয়ে যাচ্ছে, রাত জেগে কথা বলছে, আড্ডা দিচ্ছে যাদেরকে সে মোটেও চেনে না। তার ভরসার উৎস শুধু একটাই—একটা বায়বীয় প্রোফাইল।
আমাদের রক্ষণশীল সমাজে এমন অনেকগুলো সেইফটি নেট ছিল যেগুলোকে আপাত অবিচেক বা বাড়াবাড়ি মনে হলেও, মোটাদাগে সেগুলো ছিল আমাদের নিজেদের এবং আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বিপদ থেকে বাঁচানোর অন্যতম উপায়। কিন্তু প্রযুক্তির অবাধ বিপ্লব আর যুগের চাহিদার মোড়কে সেসকল সেইফটি নেটগুলো একে একে ভেঙে পড়েছে। ফলে, অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় সন্তানদের প্রতি বাবা-মায়েদের বাড়তি খেয়াল, বাড়তি সময়, বাড়তি যত্ন আর সতর্কতা অবলম্বন করাটা সময়ের দাবি শুধু নয়, আক্ষরিক অর্থেই ফরয।
কিন্তু, মূল কথা হলো, কতোজন বাবা-মা বিষয়টার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল?
২.
কয়েক বছর আগে বাসে একটা ঘটনা আমার মনে বেশ দাগ কেটেছিল। ঢাকার কল্যাণপুর থেকে উত্তরবঙ্গের বাসে উঠেছি। আমাদের সামনের সিটে একজন বয়স্ক মহিলা বসে আছেন এবং তার পাশে সাড়ে তিন বা চার বছরের একটা বাচ্চা। বাচ্চাটাকে এবং বয়স্ক মহিলাকে বিদায় জানাচ্ছেন দুজন নারী-পুরুষ। হাত-পা ছুঁড়ে বাচ্চার সে কী কান্না! বুঝতে পারলাম বিদায় দেওয়া ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা হলেন বাচ্চাটার বাবা-মা। আর বয়স্কজন হয়তো দাদী অথবা নানী।
বাস চলতে শুরু করার কিছু পরে বাসেরই একজন যাত্রী বয়স্ক মহিলাকে জিগ্যেস করলেন, ‘বাচ্চাটা বাবা-মা’র সাথে থাকে না?’
মহিলা উত্তরে বললেন, ‘ওরা তো দুজনেই চাকরি করে। তাই বাচ্চা আমার কাছে থাকে’।
বাচ্চাটার জন্য খুব মায়া লাগল। এতোখানি বাচ্চা, বাবা-মা’র আদর, যত্ন আর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত।
৩.
একটা গল্প প্রচলিত আছে। মেক্সিকোর কোনো এক প্রত্যন্ত জেলেপাড়ায় এক আমেরিকান ব্যবসায়ী এসে দেখল, এখানকার জেলেদের মাছ ধরার কৌশলটাই আলাদা। তারা এতো অভিনব পদ্ধতিতে সমুদ্রে জাল ফেলে যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারা প্রচুর মাছ ধরতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, এরা সারাদিন মাছ ধরে না। সকালের খুব অল্প একটা সময় তারা সমুদ্রে থাকে। বাকি পুরো দিন তারা ঘরে এসে কাটায়।
আমেরিকান ব্যবসায়ী খুব দুঃখবোধ করল তাদের বোকামি দেখে। তিনি ভাবলেন, যদি লোকগুলো আরও বেশি সময় ধরে মাছ ধরত, তাহলে সাঁই সাঁই করে তাদের উন্নতি হতো।
একদিন এই বুদ্ধি এক জেলেকে তিনি দিতে গেলেন। কাছে ডেকে জেলেকে বললেন, ‘শোন, তোমাদের মাছ ধরার কৌশলটা খুবই অভিনব। এমন কৌশল আমি দুনিয়ার আর কোথাও দেখিনি। কিন্তু সমস্যা হলো, তোমরা এতো অল্প সময় মাছ ধরো কেন? আরো বেশি সময় ধরে মাছ ধরতে পারো না?’
জেলে জিগ্যেস করল, ‘বেশি সময় মাছ ধরলে কী হবে?’
‘বেশি সময় মাছ ধরলে বেশি মাছ হবে। অধিক মাছ মানে অধিক টাকা’।
জেলে বিস্মিত হয়ে বলল, ‘তারপর?’
আমেরিকান ব্যবসায়ী ভাবলেন, জেলে তার উপদেশ আমলে নিচ্ছে। তিনি বললেন, ‘যখন তোমার বেশি টাকা হবে, তুমি তোমার মাছের আড়ত আরো বাড়াতে পারবে। একটার জায়গায় তোমার পাঁচটা আড়ত হবে’।
‘তারপর?’
‘এভাবে চলতে চলতে একদিন তুমি আস্ত মাছ বাজারের মালিক হয়ে যেতে পারবে। শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও তুমি মাছ রপ্তানি করতে পারবে’।
‘তারপর কী হবে?’
‘তারপর তোমার কাড়ি কাড়ি টাকা হবে। তোমার ছেলেমেয়েরা বিদেশে পড়তে পারবে। তুমি তোমার ব্যবসাটাকে বিদেশেও নিয়ে যেতে পারবে। দেশ বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে তোমার ব্যবসা?’
‘আচ্ছা, তারপর কী ঘটবে?’
‘তারপর? জীবনের পড়ন্ত বেলায় তুমি গ্রামে ফিরে আসবে। সবুজ, শ্যামল গ্রামে এসে তুমি অবসরের দিনগুলো কাটাবে। ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন—এদের সাথে মিলেমিশে জীবনের শেষ সময়গুলো খুব ভালোভাবে উপভোগ করতে পারবে তুমি’।
জেলে হেসে বললো, ‘যে জীবন কাটানোর জন্য আপনি আমাকে দেশ বিদেশ ঘুরে, এতো ব্যবসাপাতি করে এতোগুলো সময় অপচয় করার কথা বলছেন, সেই জীবন তো আমি এখনই কাটাচ্ছি। সকালে মাছ ধরে গিয়ে পুরো সময়টা আমি আমার পরিবারের সাথে কাটাই। জীবনের পড়ন্ত বেলায় যে সময়টা উপভোগ করার জন্য এতোগুলো ধাপ আমি পার হবো, সেই সময় তো আমি এখনই উপভোগ করছি। তাহলে কী দরকার আপনার কথা শুনে পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এতোগুলো সময় নষ্ট করার?’
৪.
আমাদের অনেকের মাথায় এই ভূতটা আছে। জীবনের শেষ সময়টাকে উপভোগ করার জন্য, অঢেল বিত্ত আর বৈভবের মালিক হওয়ার জন্য আমরা পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিই না। আমরা ভাবি, যখন আমাদের অনেক অনেক টাকা পয়সা হবে, আমাদের চূড়ান্ত ক্যারিয়ার হবে, যখন আমাদের সবকিছু গোছানো হবে, তারপর পরিবারে যথেষ্ট সময় দেওয়া যাবে। ঠিক বাসের সেই বাবা-মা’র মতোন। তারা হয়তো ভেবেছেন, স্বামী স্ত্রী দুজনে চাকরিবাকরি করে বেশ টাকা পয়সা উপার্জন করতে পারলে সন্তানাদিরই তো লাভ। তাদের ভালো পড়াশুনা করানো যাবে, তাদের শখ, আহ্লাদ পূরণ করা যাবে।
কিন্তু, আমরা একবারও ভাবি না যে—অঢেল বিত্ত আর চূড়ান্ত ক্যারিয়ার নিশ্চিত হওয়ার পরে এসে আমরা দেখব—আমাদের সন্তানদের শৈশব আর কৈশোর থেমে নেই। আমাদের অনুপস্থিতি, আমাদের শূন্যতা তাদের মাঝে যে ক্ষতি বা অপূর্ণতা তৈরি করে দিয়ে গেছে, দুনিয়ার কোনো ধন সম্পদ দিয়েও তা ফিরে পাওয়া যাবে না।