AhAhmed ali

AhAhmed ali ধর্মিয় প্রতিষ্ঠান

26/07/2023

দাওয়াতের ক্ষেত্র ও আধুনিক মাধ্যম সমূহ
ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন |
ধারাবাহিক পর্ব ৫

(মার্চ’২০ সংখ্যার পর)

৫. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দাওয়াত :

কোন জাতি বা গোষ্ঠীকে সুষ্ঠু-সুন্দর ও ন্যায়নিষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ার (Voltaire)-এর ভাষায় Education is the backbone of a nation ‘শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড’। শিক্ষা ব্যতীত কোন জাতি অগ্রগতি লাভ করতে পারে না। আমরা বলব, শুধু শিক্ষা নয় বরং সুশিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। নিঃসন্দেহে নাস্তিক্যবাদী শিক্ষা সুশিক্ষা নয়। কেননা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হ’ল মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করা, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং তাঁর বিধান অনুযায়ী ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলা। মহান আল্লাহ বলেন,

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ، خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ، اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ، الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ، عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ-

‘পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিন্ড হ’তে। পড়! আর তোমার পালনকর্তা বড়ই দয়ালু। যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দান করেছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না’ (‘আলাক্ব ৯৬/১-৫)।

জ্ঞানার্জনের জন্য আবশ্যিক অনুষঙ্গ হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যদিও বর্তমানের ন্যায় বিগত শতাব্দীগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদান ব্যবস্থা ছিল না। সে সময়ে ওসতায বা শিক্ষক নির্ভর পাঠদান হ’ত। অর্থাৎ ছাত্ররা শিক্ষকগণের বাড়ীতে গিয়ে তাদের দরস-তাদরীসে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইলমের মণি-মাণিক্য আহরণ করতেন। সভ্যতার উৎকর্ষতার সাথে সাথে শিক্ষা ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে।

পর্যায়ক্রমে আধুনিক থেকে আধুনিকতর হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা। ওসতায নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা রূপ লাভ করেছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানে। আর প্রতিষ্ঠান নির্ভর এ শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানই দাওয়াতের এক একটি বড় এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কেননা শিক্ষার্থীদের মন-মগজে দ্বীনী শিক্ষা গেঁথে দিতে পারলে তাতে ফল হবে দৃঢ় ও স্থায়ী। শিক্ষার্থীদের কোমল হৃদয়ে তা অতি সহজেই বদ্ধমূল হয়ে যাবে। এজন্য প্রত্যেক ক্লাসের সিলেবাসে ইসলামী শিক্ষার কোর্স থাকা আবশ্যক। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে ইসলামী শিক্ষার কোন বালাই নেই। ফলে আমাদের সন্তানরা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে চূড়ান্ত ডিগ্রী অর্জন করেও ইসলাম সম্পর্কে থেকে যায় অজ্ঞ। অথচ স্বভাবগত কারণেই প্রত্যেক মুসলিমের ইসলামের প্রতি আন্তরিক টান থাকে।

তাদের নিকটে সঠিকভাবে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানো সম্ভব হ’লে এরাই আগামী দিনে ইসলামের পুনর্জাগরণে অগ্রণী ভুমিকা পালন করবে ইনশাআল্লাহ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দাওয়াতের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে।-

প্রথমত: শিক্ষকগণ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরকে দিতে পারেন প্রয়োজনীয় ধর্মীয় শিক্ষা। ইসলামের মৌলিক বিষয় যেমন তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাত সম্পর্কে জ্ঞান দান এবং সেই সাথে ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, হালাল-হারাম, আদব-আখলাক, বিশুদ্ধ আক্বীদা ও অশুদ্ধ আক্বীদা, আমলে ছালেহ বা সৎকর্ম এবং জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় জ্ঞান দান করতে পারেন। মিথ্যা ও অসততার ভয়াবহতা ও মাতা-পিতার অবাধ্যতার পরিণতিও তুলে ধরতে পারেন তাদের নিকটে। জানাতে পারেন শিরক-বিদ‘আতের পরিণাম সম্পর্কে।

প্রত্যেক সন্তান যেহেতু পিতা-মাতার পর উসতায বা শিক্ষকের কথা মেনে নেয় অকপটে, সেকারণ এটিকে মোক্ষম সুযোগ মনে করে কাজে লাগালে আগামী দিনে এরাই সুসন্তান ও আদর্শ নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠবে এবং অবদান রাখবে দেশ ও জাতির কল্যাণে। তবে এক্ষেত্রে শিক্ষককে অবশ্যই আদর্শবান ও ধর্মীয় বিষয়ে সম্যক জ্ঞানের অধিকারী হ’তে হবে।

দ্বিতীয়ত: শিক্ষকদের পাশাপাশি ছাত্রদের মধ্য থেকেও একাধিক দাওয়াতী টীম শিক্ষাঙ্গনে দাওয়াতী কাজ আঞ্জাম দিতে পারে। ছাত্রবন্ধুদের মাঝে পৌঁছে দিতে পারে ইসলামের নির্মল ও নিষ্কলুষ আদর্শ। টিফিনের সময়, ক্লাসের ফাঁকে, বাড়ি ফেরার সময়গুলো হ’তে পারে দাওয়াতের সুযোগ। তাছাড়া এক্ষেত্রে বড় ছুটিগুলো কাজে লাগানো যায়। ছুটিতে পড়াশুনার চাপ কিছুটা কম থাকে। সেকারণ এই সময়টা বন্ধুদের সামনে ইসলামের স্বচ্ছ বিধান তুলে ধরার কাজে ব্যয় করতে পারে। পর্নোগ্রাফি, মাদক ও নেশার মরণছোবলের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে প্রচারণা চালানো যায়। শিরক-বিদ‘আত ও প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার এবং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে করা যায় সেমিনার-সিম্পোজিয়াম।

ইসলামিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রচনা বা বক্তৃতা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। বিজয়ীদের জন্য থাকতে পারে আকর্ষণীয় পুরস্কার। এছাড়াও বিভিন্ন দাওয়াতী লিফলেট, বই-পুস্তক, ইসলামী ম্যাগাজিন বিতরণ করা যায় বিভিন্ন উপলক্ষে। ঈমানী জাযবাসূচক বিভিন্ন অনুষ্ঠানও করা যেতে পারে ক্যাম্পাসে। যেখানে অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করবেন। আর শিক্ষার্থীরা উন্মুক্ত প্রশ্ন করার সুযোগ পাবে। এছাড়া বিভিন্ন দাওয়াতী সংগঠনের পক্ষ থেকেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দাওয়াতী কর্মসূচী গ্রহণ করা যেতে পারে এবং ছাত্র সংগঠনগুলোও হ’তে পারে একেকটি দাওয়াতী প্লাটফর্ম।
চলবে ইনশা আল্লাহ।
©tahreek
বিদ্রঃ বিস্তারিত জানতে #দাওয়াত অন্য #পর্ব দেখুন।

কবর পূজাইসলাম কবরের পবিত্রতা রক্ষা ও মৃত্যুকে স্মরণ ও মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত কামনা বৈধ মনে করে। তবে কবরে সিজদাহ, মান...
14/09/2022

কবর পূজা

ইসলাম কবরের পবিত্রতা রক্ষা ও মৃত্যুকে স্মরণ ও মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত কামনা বৈধ মনে করে। তবে কবরে সিজদাহ, মানত, স্পর্শ করে বরকত হাছিল, চুমুদান, প্রদীপ জ্বালান, প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন প্রভৃতিকে ইসলাম শির্কের অংশ মনে করে। কবর সম্পর্কে ইসলামের বাণী অত্যন্ত পরিস্কার। বর্ণিত হয়েছে:
عن جابر قال نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يجصص القبر وأن يقعذ عليه وأن يبنى عليه
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর পাকা করতে, তার উপর বসতে এবং তার উপর ঘর বানাতে নিষেধ করেছেন।[1]
অন্য বর্ণনায় এসেছে:
عن جابر رضي الله عنه قال نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن تجصيص القبور
হযরত জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরসমূহ চুনকাম করে বাঁধাই করতে নিষেধ করেছেন।[2] এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
মূলত: এর কারণ হচ্ছে, যিনি কবরের মধ্যে রয়েছেন, তাকে যেন কেউ ইবাদত না করে, সে পথ বন্ধকরণ। যেমন কুরতুবী (রহ.) বলেছেন:
وكل ذلك لقطع الذر يعة المؤدية إلى عبادة من فيها
এ সবকিছু এ জন্য যে, কবরে যিনি রয়েছেন, যাতে তিনি ইবাদতের মাধ্যমে না হন তার দরজা বন্ধ করা।[3] কবরবাসীর কাছেও কোনো কিছু চাওয়া যেন আজ অনেকটা আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ হিসাবে পরিণত হতে যাচ্ছে। এটিও পরিষ্কার শির্ক, এ থেকে মুসলিমদের মুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কবর গাঁথা, কবরবাসীকে সম্মান দেখানোর লক্ষ্যে কবরে বাতি দান, পুষ্পমাল্য অর্পণ পার্থিব বিচারেও পাগলামী ছাড়া কিছু নয়। এর সামান্য কিছুও কি অস্থি মজ্জা বিলুপ্ত এই মৃতব্যক্তি উপভোগ করতে পারে? কক্ষণো নয়। এইসব কর্মকাণ্ড মূলত মৃতব্যক্তির প্রতি এমন অতিরঞ্জিত সম্মান প্রদর্শনের জন্য হয়ে থাকে, যা ইসলাম কক্ষণো অনুমোদন করে না। এ ধরনের অকুণ্ঠ ভালবাসা মিশ্রিত সম্মান শুধু মহান আল্লাহই পেতে পারেন, যা মূলত তাকে ছাড়া অন্য কাউকে নিবেদন করা শির্কেরই নামান্তর। খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ, শাহাজালাল, খান জাহান আলী, বায়েজীদ বোস্তামী প্রমুখ আল্লাহর অলীদের কবরকে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে পূজার বস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। এ সমস্ত জায়গায় যাওয়াকে মানুষ পুণ্যের কাজ মনে করে। এদেশের কবরস্থানে পাকা কবরের সংখ্য বেশি। এ দেশের পথে ঘাটে পীর, সুফী ও অলীদের অদ্ভুত অদ্ভুত নাম যেমন: বদনা শাহ, ডাল চাল শাহ, শেয়াল শাহ, মিসকিন শাহ প্রভৃতি নামে গজিয়ে উঠেছে হাজার হাজার মাজার। এগুলো মূলত: এ দেশের মানুষদের শির্কে নিমজ্জিত হওয়ার পথকে আরো উন্মুক্ত করেছে।
>

[1] . আবু-দাউদ, প্রাগুক্ত, ৩ খ, পৃ. ২১৩।

[2] . ইমাম মুসলিম, প্রাগুক্ত,১ম খ, পৃ. ৬৬৭।

[3] . শাঈখ, সুলাইমান ইবন আব্দিল্লাহ ইবন আব্দিল ওয়াহহাব, তায়সীবুল আযীযিল হাদীস ফি শারহি কিতাবিত তাওহীদ, আল-মাকতাবুল ইসলামী, বায়রূপত ও দামিশক, ৩য় মুদ্রণ, ১৩৯৭ হি।

নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম। সহীহ হাদিস ও কুরআনের আলোকে নামাজ। নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম (ইংশা আল্লাহ)। সহীহ হাদিস ও কুরআনের আলো...
08/09/2022

নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম। সহীহ হাদিস ও কুরআনের আলোকে নামাজ।

নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম (ইংশা আল্লাহ)। সহীহ হাদিস ও কুরআনের আলোকে নামাজ।

নামাজ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ ইবাদত সকল ইবাদতের মাঝে। যার নামাজের হিসাব সহজ হবে তার সকল হিসেবে সহজ হয়ে যাবে। আর যার নামাজের হিসেব কঠিন হবে তার সকল হিসেব কঠিন হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ্ বলেন যে আল্লাহ বলেন,

وَأَقِمِ الصَّلاَةَ لِذِكْرِىْ

‘আর তুমি সলাত (নামাজ) কায়েম কর আমাকে স্মরণ করার জন্য’ (ত্বোয়া-হা আয়াত নং ১৪)।

নামাজ পড়ার নিয়মঃ-(শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত

রসূল (সঃ) বলেন যে "তোমরা সলাত আদায় কর সেভাবে, যেভাবে আমাকে সলাত আদায় করতে দেখছ....)

শাহিহ বুখারী হা/৬৩১, ৬০০৮, ৭২৪৬; মিশকাত হা/৬৮৩, ‘সলাত’ অধ্যায়-৪, অনুচ্ছেদ-৬।

নামাযে দাঁড়িয়ে নবী (সাঃ) ‘আল্লা-হু আকবার’ বলে নামায শুরু করতেন। (এর পূর্বে ‘বিসমিল্লাহ্‌’ বা অন্য কিছু বলতেন না।) রসূল (সঃ) বলেন “ততক্ষণ পর্যন্ত কোন মানুষেরই নামায পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ঠিক যথার্থরুপে ওযু করেছে। অতঃপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলেছে।” (ত্বাবারানী, মু’জাম, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ৮৬পৃ:)

নামাজে হাত বাধার নিয়ম সালাতে হাত বাধার নিয়ম

এরপর নবী (সাঃ) তাঁর ডানহাতকে বামহাতের উপর রাখতেন। (মুসলিম, আবূদাঊদ, সুনান ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩৫২নং)

কখনো বা ডান হাত দ্বারা বাম হাতকে ধারণ করতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৭২৬নং, নাসাঈ, সুনান, তিরমিযী, সুনান ২৫২, দারাক্বুত্বনী, সুনান)

নামাজে হাত কোথায় বাঁধতে হবে

এরপর মহানবী (সাঃ) উভয় হাতকে বুকের উপর রাখতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৭৫৯ নং, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৪৭৯ নং, আহমাদ, মুসনাদ, আবুশ শায়খ প্রমুখ)

সাজদার স্থানে দৃষ্টি রাখা ও একাগ্ৰতা।

নাবী (সাঃ) সলাত অবস্থায় মাথা নীচু করে যমীনের দিকে দৃষ্টি রাখতেন। তিনি যখন কা'বা ঘরে প্রবেশ করেন তখন থেকে বেরিয়ে আসা পর্যন্ত তাঁর দৃষ্টি সাজদার স্থানচ্যুত হয়নি। অর্থাৎ নামাজ অবস্থায় সিজদার স্থানে দৃষ্টি রাখতে হবে।

নামাজ অবস্থায় এদিক ওদিক তাকানো নিষেধ।

যারা সলাতাবস্থায় আকাশের দিকে তাকায় তারা যেন এথেকে বিরত হয়। অন্যথায় তাদের চক্ষু ফিরে পাবে না। অপর বর্ণনানুযায়ী তাদের চক্ষু কেড়ে নেয়া হবে।

তোমরা যখন ছলাত পড়বে তখন এদিক সেদিক তাকাবে না, কেননা বান্দাহ যতক্ষণ পর্যন্ত এদিক সেদিক না তাকায় ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তার চেহারাকে বান্দার চেহারার প্রতি নিবদ্ধ রাখেন।

তিরমিযী, হাকিম, তারা উভয়ই একে সহীহ বলেছেন। “সহীহ আত-তারগীব” (৩৫৩)।

এর পর সানা পড়তে হবে। হাদিস থেকে আমরা চারটি সানা দেখতে পাই। যে কোন একটি পড়তে হবে।

(আবূদাঊদ, সুনান ৮৫৭ নং,হাকেম, মুস্তাদরাক)

আবূ সাঈদ ও আয়েশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রসূল (সাঃ) নামাযের শুরুতে এই দুআ পাঠ করতেন,

سُبْحَانَكَ اللّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَ تَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالى جَدُّكَ وَلاَ إِلهَ غَيْرُكَ

উচ্চারণ:- সুবহা-নাকাল্লা-হুম্মা অবিহামদিকা অতাবা-রাকাসমুকা অতাআ’-লা জাদ্দুকা অ লা ইলা-হা গায়রুক।

অর্থ:- তোমার প্রশংসার সাথে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি হে আল্লাহ! তোমার নাম অতি বর্কতময়, তোমার মাহাত্ম অতি উচ্চ এবং তুমি ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই।

(আবূদাঊদ, সুনান ৭৭৬, তিরমিযী, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৮০৬, ত্বাহাবী ১/১১৭, দারাক্বুত্বনী, সুনান ১১৩, বায়হাকী ২/৩৪,হাকেম, মুস্তাদরাক ১/২৩৫, নাসাঈ, সুনান, দারেমী, সুনান, ইআশা:)

ক্বীরাআত শুরু করার পূর্বে ইস্তিআযাহ্‌।

‘আয়ে ইস্‌তেফতা-হ বা ‘সানা’ পড়ে "আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তনির রজিম-বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম"

أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيم

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

বলে ফাতিহা পাঠ করবে এবং অন্যান্য রাক‘আতে কেবল "বিসমিল্লাহির রহ্‌মানির রহীম" বলবে।

এই সূরা তিনি থেমে থেমে পড়তেন; ‘বিসমিল্লাহির রহ্‌মানির রহীম’ পড়ে থামতেন। অতঃপর ‘আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আ’-লামীন’ বলে থামতেন। আর অনুরুপ প্রত্যেক আয়াত শেষে থেমে থেমে পড়তেন।

(আবূদাঊদ, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩৪৩নং)

সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা পাঠ করা।

নবী (সাঃ) অন্য একটি সূরা পাঠ করতেন। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, ‘আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে যে, আমরা যেন সূরা ফাতিহা এবং সাধ্যমত অন্য সূরা পাঠ করি।’ (আবূদাঊদ, সুনান ৮১৮নং)। যে কোন সূরা পাঠ করতে পারবে। কোন সমস্যা নেই।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, ‘আল্লাহর রসূল (সাঃ) আমাকে এই ঘোষণা করতে আদেশ করলেন যে, “সূরা ফাতিহা এবং অতিরিক্ত অন্য সূরা পাঠ ছাড়া নামায হবে না।” (ঐ ৮২০নং)

প্রত্যেক সূরা পাঠ করার পূর্বে ‘বিসমিল্লা-হির রহ্‌মা-নির রহীম’ বলা সুন্নত। (আবূদাঊদ, সুনান ৭৮৪, ৭৮৮নং)

এখানে অতি জরুরী একটি কথা। যেনে রাখা দরকার

যদি ফরজ নামাজ তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট হয়। তাহলে প্রথম দুই রাকাতে সূরা ফাতিহার সাতে অন্য সূরা পড়বে। আর বাকি এক বা দুই রাকাতে শুরু সূরা ফাতিহা পড়বে। আর সুন্নত নামাজে প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা পড়তে হবে।

মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে কারো নামায ততক্ষণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে উত্তমরুপে ওযু করে---- অতঃপর তকবীর দিয়ে রুকূ করে এবং উভয় হাঁটুর উপর হাত রেখে তার হাড়ের জোড়গুলো স্থির ও শ্রান্ত হয়ে যায়।” (আবূদাঊদ, সুনান ৮৫৭, নাসাঈ, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক)

হাত দ্বারা হাঁটুকে শক্ত করে ধরতেন। (বুখারী, আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৭৯২ নং) হাতের আঙ্গুলগুলোকে খুলে (ফাঁক ফাঁক করে) রাখতেন। (হাকেম, মুস্তাদরাক, সআবূদাঊদ, সুনান ৮০৯ নং)

এই সময় তিনি তাঁর পিঠকে বিছিয়ে লম্বা ও সোজা রাখতেন। কোমর থেকে পিঠকে মচকে যাওয়া ডালের মত ঝুঁকিয়ে দিতেন। (বুখারী ৮২৮, বায়হাকী, মিশকাত ৭৯২নং) তাঁর পিঠ এমন সোজা ও সমতল থাকত যে, যদি তার উপর পানি ঢালা হত তাহলে তা কোন দিকে গড়িয়ে পড়ে যেত না। (ত্বাবা,কাবীরসাগীর,আহমাদ, মুসনাদ১/১২৪,ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৮৭২)

রুকূতে তিনি তাঁর মাথাকেও সোজা রাখতেন। পিঠ থেকে মাথা না নিচু হত, না উঁচু। (আবূদাঊদ, সুনান, বুখারী জুযউল ক্বিরাআহ্‌, মুসলিম, আহমাদ, মুসনাদ, মিশকাত ৮০১ নং) আর নামাযে তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হত সিজদার স্থানে। (বায়হাকী,হাকেম, মুস্তাদরাক, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩৫৪নং)

রুকুতে স্থিরতার গুরুত্ব।

তিনি এক নামাযীকে দেখলেন, সে পূর্ণরুপে রুকূ করে না, আর সিজদাহ করে ঠকঠক করে। বললেন, “যদি এই ব্যক্তি এই অবস্থায় মারা যায়, তাহলে সে মুহাম্মাদের মিল্লাত ছাড়া অন্য মিল্লাতে থাকা অবস্থায় মারা যাবে। ঠকঠক করে নামায পড়ছে; যেমন কাক ঠকঠক করে রক্ত ঠুকরে খায়! যে ব্যক্তি পূর্ণরুপে রুকূ করে না এবং ঠকঠক করে সিজদাহ করে, সে তো সেই ক্ষুধার্ত মানুষের মত, যে একটি অথবা দু’টি খেজুর খায়, যাতে তার ক্ষুধা মিটে না।” (আবু য়্যা’লা, আজুরী, বায়হাকী, ত্বাবারানী, মু’জাম, যিয়া, ইবনে আসাকির, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১৩১পৃ:)

আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, ‘আমার বন্ধু আমাকে নিষেধ করেছেন যে, আমি যেন মোরগের দানা খাওয়ার মত ঠকঠক করে নামায না পড়ি, শিয়ালের মত (নামাযে) চোরা দৃষ্টিতে (এদিক-ওদিক) না তাকাই, আর বানরের বসার মত (পায়ের রলা খাড়া করে) না বসি।’ (ত্বায়ালিসী, আহমাদ, মুসনাদ ২/২৬৫, ইবনে আবী শাইবা)

তিনি বলতেন, “সবচেয়ে নিকৃষ্ট চোর হল সেই ব্যক্তি, যে তার নামায চুরি করে।” লোকেরা বলল, ‘হে আল্লাহর রসূল! নামায কিভাবে চুরি করবে?’ বললেন, “পূর্ণরুপে রুকূ ও সিজদাহ না করে।”

(ইবনে আবী শাইবা ২৯৬০ নং, ত্বাবা,হাকেম, মুস্তাদরাক)।

سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيْم

উচ্চারণ:- সুবহা-না রাব্বিয়াল আযীম।

অর্থ:- আমি আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি।

এটি তিনি ৩ বার পাঠ করতেন। (আবূদাঊদ, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, দারাক্বুত্বনী, সুনান, ত্বাহা, বাযযার, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৬০৪নং, ত্বাবারানী, মু’জাম)।

কওমাহ্‌। বা ওঠে দাঁড়ানো।

অতঃপর আল্লাহর রসূল (সাঃ) রুকূ থেকে মাথা ও পিঠ তুলে সোজা খাড়া হতেন। এই সময় তিনি বলতেন,

سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَه

“সামিআল্লাহু লিমানহামিদাহ্‌-রাব্বানা অলাকালহাম্‌দ"।

। الْحَمْد (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৭৯৩, ৭৯৯নং) ।ربنا وَلَكَ الْحَمْد (বুখারী ৮০৩ নং, প্রমুখ)

।اَللّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْد (বুখারী ৭৯৬, মুসলিম, প্রভৃতি, মিশকাত ৮৭৪নং)

। اَللّهُمَّ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْد (বুখারী ৭৯৫নং, মুসলিম, প্রমুখ)।

(অর্থাৎ, আল্লাহর যে প্রশংসা করে তিনি তা শ্রবণ করেন। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৭৯৯ নং) এখানের তিনটিই টিক।

রসূল (সঃ) বলেছেন “কোন লোকেরই নামায ততক্ষণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তকবীর দিয়েছে ---- অতঃপর রুকূ করেছে --- অতঃপর ‘সামিআল্লাহু লিমানহামিদাহ্‌’ বলে সোজা খাড়া হয়েছে।” (আবূদাঊদ, সুনান ৮৫৭ নং, হাকেম, মুস্তাদরাক। এখানে আর দুআ আছে।

নারী ও পুরুষের সিজদার কোন পার্থক্য নেই। কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে।

কওমার পর নবী (সাঃ) তকবীর বলে সিজদায় যেতেন। নামায ভুলকারী সাহাবীকে সিজদাহ করতে আদেশ দিয়ে বলেছিলেন, “স্থিরতার সাথে সিজদাহ বিনা নামায সম্পূর্ণ হবে না।” (আবূদাঊদ, সুনান ৮৫৭ নং,হাকেম, মুস্তাদরাক)

সিজদায় যাওয়ার পূর্বে ‘রফ্‌য়ে ইয়াদাইন’ করার বর্ণনাও সহীহ হাদীসে পাওয়া যায়। (সহিহ,নাসাঈ, সুনান ১০৪০ নং, দারাক্বুত্বনী, সুনান)

সিজদায় যাওয়ার সময় আল্লাহর নবী (সাঃ) তাঁরহাত দু’টিকে নিজ পাঁজর থেকে দূরে রাখতেন। (আবূ য়্যা’লা, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৬২৫ নং)

এ সময় সর্বপ্রথম তিনি তাঁর হাত দু’টিকে মুসাল্লায় রাখতেন। তারপর রাখতেন হাঁটু। এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসগুলি অধিকতর সহীহ। (আবূদাঊদ, সুনান ৭৪৬, সহিহ,নাসাঈ, সুনান ১০৪৪, মিশকাত ৮৯৯, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩৫৭, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১৪০পৃ:, উদ্দাহ্‌ ৯৬পৃ:)

প্রথমে হাঁটু রাখার হাদীসও বহু উলামার নিকট শুদ্ধ। তাই তাঁদের নিকট উভয় আমলই বৈধ। সুবিধামত হাত অথবা হাঁটু আগে রাখতে পারে নামাযী। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ্‌ ২২/৪৪৯, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/২৯১, উদ্দাহ্‌ ৯৬পৃ:, ইবনে বায; কাইফিয়্যাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), মারাসা ১২৭পৃ:, ইবনে উসাইমীন; রিসালাতুন ফী সিফাতি স্বালাতিন নাবী (সাঃ) ৯পৃ:, আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/১৬৫-১৫৭, ফাতহুল মা’বূদ বিসিহ্‌হাতি তাক্বদীমির রুকবাতাইনি ক্বাবলাল য়্যাদাইনি ফিস সুজুদ)

তিনি বলতেন, “হাত দু’টিও সিজদাহ করে, যেমন চেহারা করে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে কেউ যখন (সিজদার জন্য) নিজের চেহারা (মুসাল্লায়) রাখবে, তখন যেন সে তার হাত দু’টিকেও রাখে এবং যখন চেহারা তুলবে, তখন যেন হাত দু’টিকেও তোলে।” (ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ,হাকেম, মুস্তাদরাক, আহমাদ, মুসনাদ, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩১৩ নং)

সিজদাহ করার সময় তিনি উভয় হাতের চেটোর উপর ভর দিতেন এবং চোটো দু’টিকে বিছিয়ে রাখতেন। (আবূদাঊদ, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১৪১পৃ:) হাতের আঙ্গুলগুলোকে মিলিয়ে রাখতেন। (ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ, বায়হাকী,হাকেম, মুস্তাদরাক ১/২২৭) এবং কেবলামুখে সোজা করে রাখতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৭৩২ নং, বায়হাকী, ইবনে আবী শাইবা)

হাতের চেটো দু’টিকে কাঁধের সোজাসুজি দুই পাশে রাখতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৭৩৪, তিরমিযী, সুনান, মিশকাত ৮০১নং) কখনো বা রাখতেন দুই কানের সোজাসুজি। (আবূদাঊদ, সুনান ৭২৩, ৭২৬, সহিহ,নাসাঈ, সুনান ৮৫৬নং)

কপালের সাথে নাকটিকেও মাটি বা মুসাল্লার সঙ্গে লাগিয়ে দিতেন। (আবূদাঊদ, সুনান, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩০৯ নং)

তিনি বলতেন, “সে ব্যক্তির নামাযই হয় না, যে তার কপালের মত নাককেও মাটিতে ঠেকায় না।” (দারাক্বুত্বনী, সুনান ১৩০৪ নং, ত্বাবারানী)

নামায ভুলকারী সাহাবীকে তিনি বলেছিলেন, “তুমি যখন সিজদাহ করবে, তখন তোমার মুখমন্ডল ও উভয়হাত (চেটো) কে মাটির উপর রেখো। পরিশেষে যেন তোমার প্রত্যেকটা হাড় স্বস্থানে স্থির হয়ে যায়।” (ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৬৩৮ নং)

এই সময় তাঁর উভয় হাঁটু এবং উভয় পায়ের পাতার শেষ প্রান্তও সিজদারত হত। পায়ের পাতা দু’টিকে তিনি (মাটির উপড়) খাড়া করে রাখতেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৮৭৯, সহিহ,নাসাঈ, সুনান ১০৫৩, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৩৮৪১নং, বায়হাকী) এবং খাড়া রাখতে আদেশও করেছেন। (তিরমিযী, সুনান ২২৮নং, হাকেম, মুস্তাদরাক) পায়ের আঙ্গুলগুলোকে কেবলার দিকে মুখ করে রাখতেন। (বুখারী ৮২৮নং, আবূদাঊদ, সুনান) গোড়ালি দু’টিকে একত্রে মিলিয়ে রাখতেন। ( ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ ৬৫৪ নং,হাকেম, মুস্তাদরাক ১/২২৮)

সুতরাং উক্ত ৭ অঙ্গ দ্বারা তিনি সিজদারত হতেন; মুখমন্ডল (নাক সহ্‌ কপাল) দুইহাতের চেটো, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের পাতা।

তিনি বলেন, “আমি সাত অঙ্গ দ্বারা সিজদাহ করতে আদিষ্ট হয়েছি; কপাল, -আর কপাল বলে তিনি নাকেওহাত ফিরান- দুই হাত (চেটো), দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের প্রান্তভাগ।” (বুখারী, মুসলিম, জামে ১৩৬৯ নং)

তিনি আরো বলেন, বান্দা যখন সিজদাহ করে, তখন তার সঙ্গে তার ৭ অঙ্গ সিজদাহ করে; তার চেহারা, দুইহাতের চেটো, দুই হাঁটু ও দুই পায়ের পাতা।” (মুসলিম, আহমাদ, মুসনাদ, ইবনে হিব্বান, সহীহ, সহিহ,নাসাঈ, সুনান ১০৪৭, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৮৮৫ নং)

তিনি বলেন, আমি (আমরা) আদিষ্ট হয়েছি যে, (রুকূ ও সিজদার সময়) যেন পরিহিত কাপড় ও চুল না গুটাই।” (বুখারী, মুসলিম, জামে ১৩৬৯ নং)

এক ব্যক্তি তার মাথার লম্বা চুল পিছন দিকে বেঁধে রাখা অবস্থায় নামায পড়লে তিনি বলেন, “এ তো সেই ব্যক্তির মত, যে তার উভয়হাত বাঁধা অবস্থায় নামায পড়ে।” (মুসলিম, সহীহ ৪৯২, আআহমাদ, মুসনাদ, ইবনে হিব্বান, সহীহ, আবূদাঊদ, সুনান, ৬৪৭ নং, নাসাঈ, সুনান, দারেমী, সুনান, আহমাদ, মুসনাদ ১/৩০৪) তিনি চুলের ঐ বাঁধনকে শয়তান বসার জায়গা বলে মন্তব্য করেছেন। (আবূদাঊদ, সুনান ৬৪৬ নং, তিরমিযী, সুনান, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ, ইবনে হিব্বান, সহীহ) এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা আসছে ‘নামাযে নিষিদ্ধ বা মাকরুহ কর্মাবলী’র অধ্যায়ে।

আল্লাহর নবী (সাঃ) সিজদায় নিজেরহাতের প্রকোষ্ঠ বা রলা দু’টিকে মাটিতে বিছিয়ে রাখতেন না। (বুখারী ৮২৮ নং, আবূদাঊদ, সুনান) বরং তা মাটি বা মুসাল্লা থেকে উঠিয়ে রাখতেন। অনুরুপ পাঁজর থেকেও দূরে রাখতেন। এতে পিছন থেকে তাঁর বগলের সাদা অংশ দেখা যেত। (বুখারী ৩৯০, মুসলিম, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩৫৯নং) তাঁর হাত ও পাঁজরের মাঝে এত ফাঁক হত যে, কোন ছাগলছানা সেই ফাঁকে পার হতে চাইলে পার হতে পারত। (মুসলিম, আআহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান ৮৯৮ নং,হাকেম, মুস্তাদরাক ১/২২৮, ইবনে হিব্বান, সহীহ)

সিজদার সময় তিনি কখনো কখনো হাত দুটিকে পাঁজর থেকে এত দূরে রাখতেন যে, তা দেখে কতক সাহাবী বলেন, ‘আমাদের মনে (তাঁর কষ্ট হ্‌চ্ছে এই ধারণা করে) ব্যথা অনুভব হত।’ (আবূদাঊদ, সুনান ৯০০নং, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান)

এ ব্যাপারে তিনি আদেশ করে বলতেন, “যখন তুমি সিজদাহ কর, তখন তোমার হাতের দুই চেটোকে (মাটির উপর) রাখ এবং দুই কনুইকে উপর দিকে তুলে রাখ।” (মুসলিম, সহীহ ৪৯৪নং, আআহমাদ, মুসনাদ) “তোমরা সোজা ভাবে সিজদাহ কর। তোমাদের মধ্যে কেউ যেন কুকুরের মত দুই প্রকোষ্ঠকে বিছিয়ে না দেয়।” (বুখারী ৮২২, মুসলিম, আবূদাঊদ, সুনান, আহমাদ, মুসনাদ) “তোমার দুই হাতের প্রকোষ্ঠকে হিংস্র জন্তুদের মত বিছিয়ে দিও না। দুই চেটোর উপর ভর কর ও পাঁজর থেকে (কনুই দু’টিকে) দূরে রাখ। এরুপ করলে তোমার সঙ্গে তোমার প্রত্যেক অঙ্গ সিজদাহ করবে।” (ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ,হাকেম, মুস্তাদরাক ১/২২৭)।

সিজদায় গিয়ে মহানবী (সাঃ) এক এক সময়ে এক এক রকম দুআ পাঠ করতেন। তাঁর বিভিন্ন দুআ নিম্নরুপ:-

سُبْحَانَ رَبِّىَ الأَعْلى। (সুবহা-না রাব্বিয়্যাল আ’লা)

অর্থ- আমি আমার মহান প্রভুর সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করি। ৩ বার বা ততোধিক বার। (আবূদাঊদ, সুনান ৮৮৫নং, দারাক্বুত্বনী, সুনান, ত্বাহা, বাযযার, ত্বাবারানী)। একটি দুআ দিলাম। আরো অনেক দুআ আছে।

মহানবী (সাঃ) এর সিজদা প্রায় রুকূর সমান লম্বা হত। অবশ্য কখনো কখনো কোন কারণে তাঁর সিজদাহ সাময়িক দীর্ঘও হত। শাদ্দাদ (রাঃ) বলেন, একদা যোহ্‌র অথবা আসরের নামায পড়ার উদ্দেশ্যে তিনি আমাদের মাঝে বের হলেন। তাঁর কোলে ছিল হাসান অথবা হুসাইন। তিনি সামনে গিয়ে তাকে নিজের ডান পায়ের কাছে রাখলেন। অতঃপর তিনি তকবীর দিয়ে নামায শুরু করলেন। নামায পড়তে পড়তে তিনি একটি সিজদাহ (অস্বাভাবিক) লম্বা করলেন। (ব্যাপার না বুঝে) আমি লোকের মাঝে মাথা তুলে ফেললাম। দেখলাম, তিনি সিজদাহ অবস্থায় আছেন, আর তাঁর পিঠে শিশুটি চড়ে বসে আছে! অতঃপর পুনরায় আমি সিজদায় ফিরে গেলাম। আল্লাহর রসূল (সাঃ) নামায শেষ করলে লোকেরা তাঁকে বলল, ‘হে আল্লাহর রসূল! আপনি নামায পড়তে পড়তে একটি সিজদাহ (অধিক) লম্বা করলেন। এর ফলে আমরা ধারণা করলাম যে, কিছু হয়তো ঘটল অথবা আপনার উপর ওহী অবতীর্ণ হ্‌চ্ছে।’

তুমি আল্লাহর জন্য অধিকাধিক সিজদা করাকে অভ্যাস বানিয়ে নাও; কারণ যখনই তুমি আল্লাহর জন্য একটি সিজদা করবে তখনই আল্লাহ তার বিনিময়ে তোমাকে এক মর্যাদায় উন্নীত করবেন এবং তার দরুন একটি গুনাহ মোচন করবেন।” (মুসলিম ৪৮৮নং তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ্‌)

অতঃপর (সিজদার পর) নবী (সাঃ) ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তকবীর দিয়ে সিজদাহ থেকে মাথা তুলতেন। আর দুআ বলতেন।

وَارْفَعْنِيْ) وَاهْدِنِيْ وَعَافِنِيْ وَارْزُقْنِيْ।

উচ্চারণ:- আল্লা-হুম্মাগফিরলী অরহামনী (অজবুরনী অরফা’নী) অহ্‌দিনী অ আ-ফিনী অরযুক্বনী।

অর্থ- হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা কর, দয়া কর, (আমার প্রয়োজন মিটাও, আমাকে উঁচু কর), পথ দেখাও, নিরাপত্তা দাও এবং জীবিকা দান কর। (আবূদাঊদ, সুনান ৮৫০, তিরমিযী, সুনান ২৮৪, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৮৯৮নং,হাকেম, মুস্তাদরাক)

কোন কোন বর্ণনায় উক্ত দুআর শুরুতে ‘আল্লাহুম্মা’র পরিবর্তে ‘রাব্বি ‘ ব্যবহার হয়েছে। (ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৮৯৮ নং)

সর্বনিম্ন এই দুয়া টি বলবেন।

رَبِّ اغْفِرْ لِيْ، رَبِّ اغْفِرْ لِيْ (রব্বিগফিরলী, রব্বিগফিরলী)

অর্থ- হে আমার প্রভু! আমাকে ক্ষমা কর, হে আমার প্রভু! আমাকে ক্ষমা কর। (আবূদাঊদ, সুনান ৮৭৪, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৮৯৭নং)

অতঃপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তকবীর দিয়ে তিনি দ্বিতীয় সিজদাহ করতেন।

অতঃপর নবী (সাঃ) মাটির উপর (দুই হাতের চেটোতে) ভর করে দ্বিতীয় রাকআতের জন্য উঠে খাড়া হতেন। (শাফেয়ী, বুখারী ৮২৪নং)। আর

-------এই নিয়মে বাকি রাকাত নামাজ আদায় করতে হবে।

নামাজে তাশাহুদ পড়ার নিয়ম

দ্বিতীয় রাকআতের সকল কর্ম (শেষ সিজদাহ) শেষ করে মহানবী (সাঃ) দুই সিজদার মাঝের বৈঠকের মত বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসে যেতেন এবং ডান পায়ের পাতাকে খাড়া করে রাখতেন। (বুখারী, আবূদাঊদ, সুনান ৭৩১নং)

তাশাহুদে আঙ্গুল নড়ানোর বিধান

তিনি বাম হাতের চেটোকে বাম হাঁটুর উপর বিছিয়ে দিতেন। কখনো বাম হাঁটুকে বামহাতের লোকমা বা গ্রাস বানাতেন। ডান হাতের (তর্জনী ছাড়া) সমস্ত আঙ্গুলগুলোকে বন্ধ করে নিতেন। আর তর্জনী (শাহাদতের) আঙ্গুল দ্বারা কেবলার দিকে ইশারা করতেন এবং তার উপরেই নিজ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতেন। (মুসলিম, সহীহ ৫৭৯, ৫৮০নং, আহমাদ, মুসনাদ, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ)।

নবী মুবাশ্‌শির (সাঃ) প্রত্যেক দুই রাকআতে ‘তাহিয়্যাহ্‌’ (তাশাহহুদ) পাঠ করতেন। (মুসলিম, সহীহ ৪৯৮, আহমাদ, মুসনাদ)

বৈঠকের শুরুতেই তিনি বলতেন, “আত্‌ তাহিয়্যা-তু লিল্লা-হি---।” (বায়হাকী, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১৬০পৃ:) দুই রাকআত পড়ে ‘তাশাহহুদ’ পাঠ করতে ভুলে গেলে তিনি তার জন্য ভুলের সিজদাহ করতেন। (বুখারী, মুসলিম, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৩৩৮ নং)।

তাশাহহুদ শেষ করে তিন বা চার রাকআত বিশিষ্ট নামাযের জন্য যখন মহানবী (সাঃ) উঠতেন, তখন ‘তকবীর’ (আল্লাহু আকবার) বলতেন। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৭৯৯নং)।

২য় রাক‘আত শেষে বৈঠকে বসবে। যদি তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজ হয় বৈঠক হয়, তবে কেবল ‘আত্তাহিইয়া-তু’ পড়ে ৩য় রাক‘আতের জন্য উঠে যাবে। আর যদি শেষ বৈঠক অর্থাৎ এক বা দুই রাকাত বিশিষ্ট নামাজ হয়, তবে ‘আত্তাহিইয়া-তু’ পড়ার পরে দরূদ, দো‘আয়ে মাছূরাহ ও সম্ভব হ’লে বেশী বেশী করে অন্য দো‘আ পড়বে। ১ম বৈঠকে বাম পায়ের পাতার উপরে বসবে এবং শেষ বৈঠকে ডান পায়ের তলা দিয়ে বাম পায়ের অগ্রভাগ বের করে বাম নিতম্বের উপরে বসবে ও ডান পা খাড়া রাখবে। এসময় ডান পায়ের আঙ্গুলগুলি ক্বিবলামুখী করবে। বৈঠকের সময় বাম হাতের আঙ্গুলগুলি বাম হাঁটুর প্রান্ত বরাবর ক্বিবলামুখী ও স্বাভাবিক অবস্থায় থাকবে এবং ডান হাত ৫৩-এর ন্যায় মুষ্টিবদ্ধ রেখে সালাম ফিরানোর আগ পর্যন্ত শাহাদাত অঙ্গুলি নাড়িয়ে ইশারা করতে থাকবে। মুছল্লীর নযর ইশারার বাইরে যাবে না।

আত্তাহিইয়া-তু’ পড়ার পরে দরূদ, দো‘আয়ে মাছূরাহ ও সম্ভব হ’লে বেশী বেশী করে অন্য দো‘আ পড়বে। আর প্রথমে ডাইনে ও পরে বামে ‘আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ (আল্লাহর পক্ষ হ’তে আপনার উপর শান্তি ও অনুগ্রহ বর্ষিত হৌক!) বলে সালাম ফিরাবে। আর নামাজ শেষ।

নারী ও পুরুষের নামাজের কোন পার্থক্য নেই। কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে।

পার্থক্য করেছে কিছু মানুষ। বিভিন্ন রকম যুক্তি দিয়ে। অথছ নামাজ সম্পর্কে এতো বেশি হাদিস আছে অথছ রসূল (সঃ) কখনোই বলেন নি যে নারী ও পুরুষের নামাজের পার্থক্য আছে। বা এই বিষয়ে কোন হাদিস ও নেই। যা কিছু আছে যুক্তি। আর কিছু হাদিসের নিজেস্য ব্যাখ্যা। যা শুরু নামাজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকেন। আর এই ধরনে যুক্তি যদি কুরআনের ক্ষেত্রে ব্যাবহার করা হয় তাহলে

অথছ রসূল (সঃ) বলেন যে "তোমরা ছালাত আদায় কর সেভাবে, যেভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখছ....)

বুখারী হা/৬৩১, ৬০০৮, ৭২৪৬; মিশকাত হা/৬৮৩, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, অনুচ্ছেদ-৬।"

--------সূরা আন আম আয়াত নং ১১৬

আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথামত চলেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহ্‌র পথ থেকে বিচ্যুত করবে । তারা তো শুধো ধারণার অনুসরণ করে; আর তারা শুধু অনুমান ভিত্তিক কথা বলে।

--------মহান আল্লাহ্ সবাইকে সঠিক বুঝে আমল করার তৌফিক দান করুন।

অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি পোস্ট! অনেক কিছু জানতে পারবেন।

বিদ‘আত ও তার পরিণতি (৮ম কিস্তি)মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম মাদানী | মীলাদপন্থীদের দলীলের জবাবপ্রচলিত প্রত্যেকটি বিদ‘আতের পিছন...
31/08/2022

বিদ‘আত ও তার পরিণতি (৮ম কিস্তি)

মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম মাদানী |

মীলাদপন্থীদের দলীলের জবাব

প্রচলিত প্রত্যেকটি বিদ‘আতের পিছনেই কিছু না কিছু দলীল লক্ষ্য করা যায়। অথচ যাচাই করলে সেগুলো যঈফ, জাল অথবা ছহীহ দলীলের অপব্যাখ্যা বলে প্রমাণিত হয়। দুষ্টমতি একশ্রেণীর আলেম এ সমস্ত দলীল অথবা যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ব্রেইন ওয়াশ (মগজ ধোলাই) করে। উদ্দেশ্য হ’ল তাদের দল ভারী করা এবং মানুষের পকেট ছাফ করে তাদের ব্যবসাকে মযবূত করা। ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ জায়েয করার জন্য অনুরূপই কিছু দলীল অথবা যুক্তি পেশ করা হয়ে থাকে। নিম্নে সেগুলি উল্লেখ করতঃ কুরআন ও ছহীহ হাদীছের মানদন্ডে তার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা হল।

প্রথম দলীল : হাদীছে এসেছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رضى الله عنهما قَالَ قَدِمَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم الْمَدِيْنَةَ، فَرَأَى الْيَهُوْدَ تَصُوْمُ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ، فَقَالَ مَا هَذَا؟ قَالُوْا هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ، هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللهُ بَنِيْ إِسْرَائِيْلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ، فَصَامَهُ مُوسَى، قَالَ فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ، فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ-
ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) মদীনায় আগমন করে দেখলেন যে, ইহুদীরা আশূরার দিন ছিয়াম পালন করছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কিসের ছিয়াম? তারা বলল, এটি একটি উত্তম দিন। এই দিনে আল্লাহ তা‘আলা বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর (ফেরাউন) কবল হ’তে মুক্তি দান করেন। ফলে এদিনে মূসা (আঃ) ছিয়াম পালন করেছেন। রাসূল (ছাঃ) বললেন, আমি তোমাদের অপেক্ষা মূসা (আঃ)-এর অধিক হক্বদার। অতঃপর তিনি এদিনে ছিয়াম পালন করেন এবং ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন।[1] অপর একটি হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِيْ مُوْسَى رضى الله عنه قَالَ كَانَ يَوْمُ عَاشُوْرَاءَ تَعُدُّهُ الْيَهُوْدُ عِيْدًا، قَالَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم فَصُوْمُوْهُ أَنْتُمْ-
আবু মূসা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইহুদীরা আশূরার দিনকে ঈদ (উৎসবের দিন) মনে করত। নবী (ছাঃ) বললেন, ‘তোমরাও এদিনে ছিয়াম পালন কর’।[2]

উল্লিখিত দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। বিধায় এদিনে রাসূল (ছাঃ) আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের জন্য নিজে ছিয়াম পালন করেছেন এবং ছাহাবায়ে কেরামকে পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। যদি মূসা (আঃ)-এর মুক্তির শুকরিয়া স্বরূপ ছিয়াম পালন করা বৈধ হয়, তাহ’লে মুহাম্মাদ (ছাঃ); যিনি বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপ দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছেন, তাঁর দুনিয়ায় আগমনের শুকরিয়া স্বরূপ ছালাত, ছিয়াম, কুরআন তেলাওয়াতের মত ভাল আমলের মাধ্যমে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ উদযাপন করাও শরী‘আত সম্মত।

জবাব :

প্রথমতঃ যেকোন ইবাদত করার প্রথমে দু’টি মৌলিক বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। (ক) এক আল্লাহর ইবাদত করতে হবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না। (খ) এমন ইবাদত করতে হবে, যা রাসূল (ছাঃ)-এর কথা, কর্ম ও মৌনসম্মতি দ্বারা স্বীকৃত এবং নিজেদের খেয়াল-খুশী মত ইবাদত নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَى شَرِيْعَةٍ مِنَ الْأَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ الَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ- إِنَّهُمْ لَنْ يُغْنُوْا عَنْكَ مِنَ اللهِ شَيْئًا وَإِنَّ الظَّالِمِيْنَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَاللهُ وَلِيُّ الْمُتَّقِيْنَ-
‘এরপর আমরা তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি দ্বীনের বিশেষ বিধানের উপর; সুতরাং তুমি তার অনুসরণ কর, অজ্ঞদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর না। আল্লাহর মুকাবিলায় তারা তোমার কোনই উপকার করতে পারবে না। যালিমরা একে অপরের বন্ধু, আর আল্লাহ তো মুত্তাক্বীদের বন্ধু’ (জাছিয়া ৪৫/১৮-১৯)।

সুতরাং রাসূল (ছাঃ)-এর আনীত বিধানের বাইরে কোন বিধানকে ওয়াজিব বা মুস্তাহাব মনে করা কোন মুসলিমের বৈশিষ্ট্য নয়; বরং কুরআন ও ছহীহ হাদীছের যথাযথ অনুসরণ করাই মুসলিমের বৈশিষ্ট্য ও কর্তব্য।
দ্বিতীয়তঃ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অত্যাচারী পাপিষ্ঠ ফেরাউনের কবল থেকে মূসা (আঃ)-এর নাজাতের শুকরিয়া স্বরূপ নিজে ছিয়াম পালন করেছেন এবং ছাহাবায়ে কেরামকে পালন করতে বলেছেন। কিন্তু তিনি কি কখনো ‘রহমাতুল্লিল আলামীন’ হিসাবে বিশ্ববাসীর নিকট প্রেরিত হওয়ার শুকরিয়া স্বরূপ জন্ম দিবস পালনের নামে কোন ইবাদত করেছেন? কিংবা ছাহাবায়ে কেরামকে করতে বলেছেন? যদি ইসলামী শরী‘আতে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’-এর সামান্যতম ফযীলত থাকত, তাহ’লে অবশ্যই তিনি উম্মতের সামনে তা সুস্পষ্ট ভাবে বলে যেতেন। খোলাফায়ে রাশেদীন, যারা দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন, দীর্ঘ ৩০টি বছর খেলাফতে অধিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও তাঁরা কখনো রাসূল (ছাঃ)-এর আগমনের শুকরিয়া স্বরূপ জন্ম দিবস পালন করেননি। তাহ’লে কি তাঁরা রাসূল (ছাঃ)-এর আগমনের গুরুত্ব ও মর্যাদা বুঝেননি? কিংবা জন্ম দিবস পালন না করে তারা তাঁর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছেন? নাঊযুবিল্লাহ! আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়াত দান করুন-আমীন!

দ্বিতীয় দলীল : হাদীছে এসেছে,
قال عروة : وثويبة مولاة أبي لهب. وكان أعتقها حين بَشَّرته بميلاد رسول الله صلى الله عليه وسلم فأرضَعَتْ رسوْلَ الله صلى الله عليه وسلم فلما مات أبو لهب كافرا، رآه العباس في المنام بعدما أسلمَ العباسُ بشرِّ حيبة، فقال له: ماذا لقيت؟ قال: لم ألق خيرا بعدكم، غير أني سُقيت كل ليلة اثنين بعتاقتي ثويبة قال : وقال أبو عيسى : وكانت ثويبة حاضنة رسول الله -صلى الله عليه وسلم-
উরওয়াহ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ)-এর জন্মের সুখবর দিলে তার দাসী ছুয়াইবাহকে আবু লাহাব মুক্ত করে দিয়েছিল। অতঃপর তিনিই (ছুয়াইবাহ) রাসূল (ছাঃ)-কে দুধপান করিয়েছিলেন। অতঃপর যখন আবু লাহাব কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল, তখন আববাস (রাঃ) তাঁর ইসলাম গ্রহণের পরে স্বপ্নে আবু লাহাবকে চরম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় দেখলেন। আববাস (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি কি দেখছ? সে বলল, তোমাদের পরে আমাকে কল্যাণকর কিছুই প্রদান করা হয়নি। তবে ছুয়াইবাহ্কে মুক্ত করার জন্য আমি প্রত্যেক সোমবার রাত্রে পান করছি। আবু ঈসা বলেন, ছুয়াইবাহ রাসূল (ছাঃ)-এর লালনকারীণী ছিলেন।[3]

কুফরীর চরম সীমায় উপনীত আবু লাহাব; যার বিরুদ্ধে আল্লাহ তা‘আলা ‘সূরা লাহাব’ নামক একটি সূরা নাযিল করেছেন। এমন কাফেরকে শুধুমাত্র রাসূল (ছাঃ)-এর জন্মের খবরে খুশি হয়ে তার দাসী মুক্ত করার কারণে যদি আল্লাহ জাহান্নামে পানি পান করিয়ে থাকেন, তাহ’লে একজন মুসলিম রাসূল (ছাঃ)-এর আগমনে খুশি হয়ে তাঁর জন্ম দিবস উপলক্ষে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ উদযাপন করলে আল্লাহ তার উপর অত্যধিক খুশি হবেন।
জবাব :

উল্লিখিত দলীলের জবাব কয়েকভাবে দেওয়া যেতে পারে। (১) উল্লিখিত খবরটি মুরসাল; যা উরওয়াহ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি কার নিকট থেকে শুনেছেন তা বলেননি। তাছাড়াও এটি সাধারণ মানুষের দেখা একটি স্বপ্নের ঘটনা, যা দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়।[4]
(২) রাসূল (ছাঃ)-এর জন্মের খবরে খুশি হয়ে আবু লাহাব তার দাসী ছুয়াইবাকে মুক্ত করেছিল মর্মে বর্ণনাটি সঠিক নয়। বরং আবু লাহাবের দাসত্বে থাকা অবস্থাতেই ছুয়াইবাহ রাসূল (ছাঃ)-কে লালন করেছিলেন। খাদীজা (রাঃ) তাকে বিক্রি করার জন্য আবু লাহাবকে অনুরোধ করলে তাতে সে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিল। পরবর্তীতে রাসূল (ছাঃ)-এর হিজরতের পরে আবু লাহাব ছুয়াইবাকে মুক্ত করে
দিয়েছিল।[5]

(৩) আবু লাহাব একজন প্রসিদ্ধ কাফের। আর কাফেরের কোন ভাল আমল আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُوْرًا-
‘আমরা তাদের (কাফেরদের) কৃতকর্মের প্রতি লক্ষ্য করব, অতঃপর সেগুলিকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব’ (ফুরক্বান ২৫/২৩)। তিনি অন্যত্র বলেন,
وَمَا مَنَعَهُمْ أَنْ تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوْا بِاللهِ وَبِرَسُوْلِهِ وَلَا يَأْتُوْنَ الصَّلَاةَ إِلَّا وَهُمْ كُسَالَى وَلَا يُنْفِقُوْنَ إِلَّا وَهُمْ كَارِهُوْنَ-
‘তাদের (কাফেরদের) দান গ্রহণ করা নিষেধ করা হয়েছে এজন্য যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করে, ছালাতে শৈথিল্যের সাথে উপস্থিত হয় এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে দান করে’ (তাওবা ৯/৫৪)। তিনি অন্যত্র বলেন,
مَثَلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادٍ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيْحُ فِيْ يَوْمٍ عَاصِفٍ لَا يَقْدِرُوْنَ مِمَّا كَسَبُوْا عَلَى شَيْءٍ ذَلِكَ هُوَ الضَّلَالُ الْبَعِيْدُ-
‘যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের আমল সমূহের উপমা ভস্মসদৃশ, যা ঝড়ের দিনের বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না। এটা তো ঘোর বিভ্রান্তি’ (ইব্রাহীম ১৪/১৮)। অতএব আবু লাহাব উল্লিখিত আয়াত সমূহের অন্তর্ভুক্ত। পার্থিব জীবনের ভাল কাজ পরকালে তার কোনই কাজে আসবে না।

(৪) আল্লাহ তা‘আলার স্পষ্ট বাণী হ’ল যে, কাফেরদের থেকে কখনোই আযাব হালকা করা হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لاَ يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوْتُوْا وَلاَ يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِنْ عَذَابِهَا-
‘যারা কুফরী করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদের প্রতি এমন কোন ফায়ছালা দেওয়া হবে না যে, তারা মারা যাবে এবং তাদের থেকে জাহান্নামের আযাবও লাঘব করা হবে না’ (ফাতির ৩৫/৩৬)। তিনি অন্যত্র বলেন,
إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا وَمَاتُوْا وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ- خَالِدِيْنَ فِيْهَا لاَ يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلاَ هُمْ يُنْظَرُوْنَ-
‘নিশ্চয়ই যারা কুফরী করেছে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের উপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও সকল মানুষের লা‘নত। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। তাদের থেকে আযাব হালকা করা হবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হবে না’ ( বাক্বারাহ ২/১৬১-১৬২)।

অতএব আবু লাহাবের আযাব কিভাবে হালকা হ’তে পারে যে রাসূল (ছাঃ) ও ইসলামের প্রকাশ্য শত্রু ছিল। যার বিরুদ্ধে আল্লাহ তা‘আলা একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেছেন,
تَبَّتْ يَدَا أَبِيْ لَهَبٍ وَتَبَّ- مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ- سَيَصْلَى نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ- وَامْرَأَتُهُ حَمَّالَةَ الْحَطَبِ- فِيْ جِيْدِهَا حَبْلٌ مِنْ مَسَدٍ-
‘ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোনই কাজে আসেনি। অচিরেই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও, যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে পাকানো রজ্জু’ (লাহাব ১১১/১-৫)।

তৃতীয় দলীল : রাসূল (ছাঃ)-কে সপ্তাহের প্রতি সোমবারে ছিয়াম পালনের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيْهِ وَيَوْمٌ بُعِثْتُ أَوْ أُنْزِلَ عَلَىَّ فِيْهِ ‘এই দিনে (সোমবারে) আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমি নবুওত প্রাপ্ত হয়েছি। অথবা আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ করা হয়েছে’।[6] বুঝা গেল, রাসূল (ছাঃ) নিজেই তাঁর দুনিয়ায় আগমনের শুকরিয়া স্বরূপ প্রত্যেক সোমবার ছিয়াম পালন করতেন। অতএব আমরাও বিভিন্ন প্রকার ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর জন্ম দিবস পালন করতে পারি।

জবাব :

উল্লিখিত দলীলের জবাব কয়েকভাবে দেওয়া যেতে পারে। (১) মীলাদপন্থীদের উদ্দেশ্য যদি রাসূল (ছাঃ)-এর জন্ম গ্রহণের শুকরিয়া আদায় করাই হয়, তাহ’লে রাসূল (ছাঃ)-এর ন্যায় প্রত্যেক সোমবার ছিয়াম পালন করতে হবে। কিন্তু তারা কি তা করে? কখনোই নয়। বরং তারা রাসূল (ছাঃ)-এর এই সুন্নাতকে উপেক্ষা করে বছরের একটি দিন ১২ই রবীউল আউয়ালকে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ উদযাপনের জন্য নির্দিষ্ট করেছে, চাই তা সোমবার অথবা অন্য কোন দিন হোক। অথচ রাসূল (ছাঃ) ১২ই রবীউল আউয়ালে জন্ম গ্রহণ করেছেন মর্মে কোন দলীল নেই। রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবায়ে কেরাম সোমবার দিন ছিয়াম পালন করেছেন। কিন্তু ১২ রবীউল আউয়ালে কোন কিছুই করেননি। অতএব রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতকে উপেক্ষা করার নাম তাঁকে ভালবাসা নয়; বরং তাঁর সুন্নাতের যথাযথ অনুসরণের নাম তাঁকে ভালবাসা।

(২) রাসূল (ছাঃ) শুধুমাত্র এই উদ্দেশ্যেই সোমবারের দিন ছিয়াম পালন করেননি। বরং অন্য একটি মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। তা হ’ল, সপ্তাহের দু’টি দিন সোমবার ও বৃহস্পতিবার আল্লাহর নিকট বান্দার সাপ্তাহিক রিপোর্ট পেশ করা হয়। আর রিপোর্ট পেশ করার দিনে রাসূল (ছাঃ) ছিয়াম অবস্থায় থাকাকে অধিক ভালবাসতেন। হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ تُعْرَضُ الأَعْمَالُ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَالْخَمِيْسِ فَأُحِبُّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِى وَأَنَا صَائِمٌ-
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহর নিকট সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমল পেশ করা হয়। অতএব আমার আমল (আল্লাহর নিকট) পেশ করার সময় ছিয়াম অবস্থায় থাকাকে আমি অধিক ভালবাসি’।[7]

(৩) রাসূল (ছাঃ) সোমবারে ছিয়াম পালন করেছেন। কিন্তু তিনি কি তাঁর জন্মদিবস উপলক্ষে কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন? তিনি কি ছাহাবায়ে কেরাম কে নিয়ে কোন জালসা মাহফিল এবং ভাল খাবারের আয়োজন করেছেন? তিনি কি কোন আনন্দ মিছিল করেছেন? কখনোই নয়। তাহ’লে কি জান্নাতের সার্টিফিকেট প্রাপ্ত ছাহাবায়ে কেরাম, উম্মাহাতুল মুমিনীন, রাসূল (ছাঃ)-এর কন্যা ফাতেমা (রাঃ), হাসান-হুসাইন (রাঃ) তাঁরা কি রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসতেন না? অথবা তাঁর আগমনে তাঁরা কি আনন্দিত ছিলেন না? মীলাদপন্থীরা কি তাঁদের চেয়ে রাসূল (ছাঃ)-কে বেশী ভালবাসেন? তাহ’লে মীলাদপন্থীদের এ কেমন ভালবাসা যার মাধ্যমে রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতকে উপেক্ষা করা হয়? অথচ রাসূল (ছাঃ)-এর প্রকৃত ভালবাসা অর্জিত হবে তাঁর সুন্নাতের যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَحِيْمٌ- قُلْ أَطِيعُوْا اللهَ وَالرَّسُوْلَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِيْنَ-
‘বল, যদি তোমরা আল্ল­াহ্কে ভালবাস তবে আমার অনুসরণ কর, আল্ল­াহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আল্ল­াহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। বল, তোমরা আল্ল­াহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে রাখ আল্ল­াহ্ তো কাফেরদেরকে পসন্দ করেন না’ (আলে ইমরান ৩/৩১-৩২)।

চতুর্থ দলীল : আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا صَلُّوْا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا-
‘আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও’ (আহযাব ৩৩/৫৬)।
অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা ও তাঁর প্রতি সালাম জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আর এই উদ্দেশ্যেই ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপিত হয়।

জবাব :

সম্মানিত পাঠক! রাসূল (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠের ফযীলত অনেক বেশী। যেমন তিনি বলেন, مَنْ صَلَّى عَلَىَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ عَشْرًا ‘যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করে, এর প্রতিদানে আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন’।[8]
অতএব মানুষ বেশী বেশী রাসূল (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করবে। ছাহাবায়ে কেরাম রাসূল (ছাঃ)-কে সবচেয়ে বেশী ভালবাসতেন। তাঁরা আমাদের চেয়ে অনেক গুণে বেশী দরূদ পাঠ করতেন। কিন্তু তাঁরা কি কখনো কোন দিনকে নির্দিষ্ট করে আনুষ্ঠানিকভাবে দরূদ পাঠ করেছেন? করেছেন কি কোন দরূদ পাঠের মিছিল? তাহ’লে আমাদের এ কেমন নবী প্রেম যে, প্রতিনিয়ত দরূদ পাঠের পরিবর্তে বছরের একটি দিনকে বেছে নিলাম দরূপ পাঠের জন্য? আনুষ্ঠানিকতার নাম নবী প্রেম নয়; বরং একান্ত আন্তরিকতার সাথে তাঁর সুন্নাতের যথাযথ অনুসরণের নাম নবী প্রেম। তাঁকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করার নাম নবী প্রেম নয়; বরং তাঁর মর্যাদার স্থানে তাঁকে রাখাই নবী প্রেম। নিজের মন মত দ্বীন পালনের নাম নবী প্রেম নয়; বরং তাঁর আনীত দ্বীনকে সামান্যতম পরিবর্তন ছাড়াই পালনের নাম নবী প্রেম।

পঞ্চম দলীল : সারা দুনিয়ার অধিকাংশ মুসলমানের নিকট ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ উত্তম বলে বিবেচিত। আর আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন,
مَا رَأَى الْمُسْلِمُوْنَ حَسَنًا فَهُوَ عِنْدَ اللهِ حَسَنٌ، وَمَا رَآهُ الْمُسْلِمُوْنَ سَيِّئًا فَهُوَ عِنْدَ اللهِ سَيِّءٌ-
‘মুসলমানদের দৃষ্টিতে যা উত্তম আল্লাহর দৃষ্টিতেও তা উত্তম। আর মুসলমানদের দৃষ্টিতে যা নিকৃষ্ট আল্লাহর দৃষ্টিতেও তা নিকৃষ্ট’।[9]

জবাব :

প্রথমতঃ উল্লিখিত আছারটি মারফূ‘ সূত্রে ছহীহ না হওয়ায় দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন,
تفرد به النخعي، قال أحمد بن حنبل كان يضع الحديث، وهذا الحديث إنما يعرف من كلام بن مسعود-
‘এই হাদীছটি নাখ‘ঈ এককভাবে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, তিনি (নাখঈ) হাদীছ জাল করতেন। আর এই হাদীছটি ইবনু মাসউদের বক্তব্য হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে’।[10] ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন,
إن هذا ليس من كلام رسول الله وإنما يضيفه إلى كلامه من لا علم له بالحديث وإنما هو ثابت عن ابن مسعود من قوله-
‘এটা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কথা নয়। হাদীছ সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিরাই এটাকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে সম্পৃক্ত করেছে। বরং এটা ইবনু মাসউদ (রাঃ)-এর উক্তি হিসাবে প্রমাণিত’।[11]

আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন,
لا أصل له مرفوعا، وإنما ورد موقوفا على ابن مسعود-
‘মারফূ‘ সূত্রে এর কোন ভিত্তি নেই। বরং এটা ইবনু মাসউদ (রাঃ) হ’তে ‘মাওকূফ’ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে’।[12]
দ্বিতীয়তঃ আছারটি কুরআন ও ছহীহ হাদীছ পরিপন্থী। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا-
‘রাসূল যা তোমাদের দেন তা তোমরা গ্রহণ কর আর যা হ’তে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা হ’তে বিরত থাক’ (হাশর ৫৯/৭)। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ- ‘যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করল যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই তা প্রত্যাখ্যাত’।[13] আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, كُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٍ وَإِنْ رَآهَا النَّاسُ حَسَنَةً ‘সকল প্রকার বিদ‘আত ভ্রষ্টতা, যদিও মানুষ তাকে উত্তম মনে করে’।[14]
অতএব মুসলামানরা যা উত্তম মনে করবে তা কখনোই উত্তম হ’তে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত তা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ স্বীকৃত না হবে। বরং সে ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। তা‘আলা বলেন,
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِيْنَ أَعْمَالاً، الَّذِيْنَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِيْ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُوْنَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُوْنَ صُنْعًا-
‘বল, আমরা কি তোমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের সম্পর্কে খবর দেব? দুনিয়ার জীবনে যাদের সমস্ত আমল বরবাদ হয়েছে। অথচ তারা ভাবে যে, তারা সুন্দর আমল করে যাচ্ছে’ (কাহফ ১৮/১০৩-১০৪)।

[চলবে]

মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

[1]. বুখারী হা/২০০৪; ইবনু মাজাহ হা/১৭৩৪।
[2]. বুখারী হা/২০০৫।
[3]. ইবনুল আছীর, জামেউল উছূল ফী আহাদীছির রাসূল হা/৯০৩৬।
[4]. ফাৎহুল বারী ৯/১৪৫।
[5]. ইবনুল আছীর, আল-কামেল ফিত তারিখ ১/১৫৭; ইমাম যাহাবী, তারীখুল ইসলাম ২/৪৪৫; ত্ববারী, যাখায়েরুল উকবা ১/২৫৯; ফাৎহুল বারী ৯/১৪৫।
[6]. মুসলিম হা/১১৬২, ‘প্রত্যেক মাসে তিনটি ছিয়াম পালন করা মুস্তাহাব’ অনুচ্ছেদ।

[7]. তিরমিযী হা/৭৪৭; নাসাঈ হা/২৩৫৮; মিশকাত হা/২০৫৬।
[8]. মুসলিম হা/৪০৮; মিশকাত হা/৯২১।
[9]. মুসনাদে আহমাদ হা/৩৬০০; সিলসিলা যঈফা হা/৫৩৩।
[10]. আবু উসামাহ্ সালীম বিন ঈদ আল-হিলালী আস-সালাফী, আল-বিদ‘আতু ওয়া আছারুহুস সায়্যি ফিল উম্মাহ্, পৃঃ ৬০।
[11]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-ফুরূসিয়্যাহ, পৃঃ ৬১।
[12]. সিলসিলা যঈফা হা/৫৩৩-এর আলোচনা দ্রঃ।
[13]. মুসলিম হা/১৭১৮।
[14]. সিলসিলাতুল আছারিছ ছহীহাহ্ হা/১২১; আলবানী, সনদ ছহীহ, তালখীছু আহকামিল জানায়েয ১/৮৩ পৃঃ।

Address

Hazipur

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when AhAhmed ali posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share