23/01/2026
আমরা পুজা শেষে মায়ের কাছে কি আশির্বাদ চাইবো:-
শুদ্ধভক্তগণও সরস্বতী পূজা করেন। কিন্তু মায়াবদ্ধ ও মায়ামুক্ত জীবের মধ্যে পার্থক্য আছে বলে তাদের পূজায়ও পার্থক্য আছে। মায়াগ্রস্ত জীবের মায়িক বস্তুতে আসক্তি থাকে। যখন জীব মায়ার সেবায় প্রবৃত্ত হন, তখন তিনি কর্মী; আবার যখন মায়ার বিদ্যাবৃত্তির সেবায় রত হন, তখন তিনি জ্ঞানী। ঈশোপনিষদে ( শ্লোক-৯) বলা হয়েছে—
❝ অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যেহবিদ্যামুপাসতে।
ততো ভূয় ইব তে তমো য উ বিদ্যায়াং রতাঃ॥ ❞
অর্থাৎ, “যারা অবিদ্যা অনুশীলন করে, তারা অজ্ঞানের ঘোর অন্ধকারময় লোকে প্রবেশ করে, যারা তথাকথিত বিদ্যা অনুশীলনে রত, তারা আরো ঘোরতর অন্ধকারময় স্থানে গতি লাভ করে।”
অর্থাৎ অবিদ্যা বা অজ্ঞানতা নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক, তবে বিপথচালিত বা ভ্রান্ত বিদ্যা তার চেয়ে আরো ভয়ংকর। গণশিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমান সভ্যতা যথেষ্ট অগ্রগতি লাভ করেছে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পারমার্থিক বিদ্যা বা পরা বিদ্যা। সেখান থেকে বিমুখ হয়ে জড়-জাগতিক উন্নতিতে অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করায়, মানুষ পূর্বাপেক্ষা আরো অধিক অসুখী হয়ে পড়ছে।
বিদ্যাবৃত্তি জড় আসক্তিকে বিনাশ করে, আর অবিদ্যাবৃত্তি জড় বিষয়ে আসক্তি বৃদ্ধি করে। জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ জীবগণ অবিদ্যায় অবস্থিত। অবিদ্যার আবরণে তাদের প্রকৃত স্বরূপ আচ্ছাদিত। যারা মায়ামুক্ত, তাঁরা বিদ্যা ও অবিদ্যা উভয়ের স্বরূপ সম্যক প্রকারে অবগত আছেন। তারা নিজেদের ভগবানের দাস জ্ঞান করে ভগবানের সেবায় প্রবৃত্ত হন। মায়াবশীভূত জীবগণ সত্ত্ব, রজ ও তমো গুণে আবদ্ধ হয়ে দেবতাদের ভজনা করেন। অর্থাৎ, মায়ার ব্রহ্মাণ্ডের আবরণে স্থিত দেবতাদের উপাসনা করেন। বিভিন্ন গুণসম্পন্ন জীবগণ তাদের নিজ নিজ রুচি অনুসারে শাক্ত, শৈব, সৌর, গাণপত্য বা বৈষ্ণব নামে অভিহিত হন। তারা ভোগবাসনা চরিতার্থ করার জন্য ধন কামনায় দেবী লক্ষ্মী এবং বিদ্যালাভ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য লৌকিক প্রথা অনুসারে দেবী সরস্বতীর পূজা করেন।
তারা যে বিষয় কামনায় পূজা করেন তা সবই নশ্বর। আমি ধনী হবো, পণ্ডিত হবো, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবো, সমগ্র জগতে আমার যশ কীর্তিত হবে। এসমস্ত বাসনা সবই নশ্বর।
🌸 চারবেদ ষড় দর্শন অধ্যয়ন করেও যদি ভগবানের প্রতি অহৈতুকী ভক্তির উদয় না হয় তবে সবই বৃথা। শাস্ত্রে বর্ণনা করা হচ্ছে—
“আচারহীনং ন পুনন্তি বেদা..”। যে বস্তু দেহত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ত্যাগ করে সেসমস্ত বিষয় নিয়ে নিত্য আত্মার কতটুকু স্বার্থসিদ্ধি হতে পারে? তাই যারা উন্নত বিচারবোধসম্পন্ন, তারা কখনো নশ্বর বিষয়ে মুগ্ধ হয়ে দুর্লভ মনুষ্য জীবনের সুযোগটুকু হেলায় হারাতে ইচ্ছা করেন না। ঐকান্তিকী ভক্তগণ সরস্বতী দেবীকে চিৎ-শক্তিরূপে পূজা করেন।
🌸 ভাগবত কীর্তনের প্রারম্ভে শ্রীল সূত গোস্বামী মঙ্গলাচরণের মধ্যে পরাবিদ্যাস্বরূপিনী সরস্বতীর প্রণাম করছেন যে, “দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ ”। আদিগুরু শ্রীব্রহ্মার হৃদয়ে জড় জাগতিক সৃষ্টি বিষয়ক স্মৃতি প্রকাশের জন্য যে সরস্বতী দেবী ভগবানের প্রেরণায় প্রকটিতা হন, তিনি শ্রীকৃষ্ণকেই উপাস্য মনে করেন।
❝ পূর্বে জন্মিলেন নাভিপদ্ম হৈতে।
তথাপিও শক্তি নাই কিছুই দেখিতে॥
তবে যবে সর্বভাবে লইলা শরণ।
তবে প্রভু কৃপায় দিলেন দরশন॥
তবে কৃষ্ণকৃপায় স্ফুরিল সরস্বতী। ❞
এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, যারা শ্রীকৃষ্ণের চরণে নিজেদের সমর্পণ করেন, কৃষ্ণের কৃপায়ই তাদের সরস্বতীদেবীর কৃপা লাভ হয়। সরস্বতী নামরূপে তাদের জিহ্বায় নৃত্য করে থাকেন। বিদ্যা দুই প্রকার— পরা বিদ্যা (নশ্বর জড় বিদ্যা) এবং অপরা বিদ্যা (ভগবদ্ সম্বন্ধীয় বিদ্যা)। দুই প্রকার বিদ্যা লাভের তারতম্য হেতু সরস্বতী দেবীর আরাধনা দুই প্রকার। একটি পরাবিদ্যা লাভ করার জন্য, আরেকটি অপরা বিদ্যা লাভের জন্য। এক স্বরূপে দেবী অপরা সরস্বতী, অন্য স্বরূপে দেবী পরা সরস্বতী বা শুদ্ধা-সরস্বতী।
🌸 অপরা সরস্বতী আমাদের কৃষ্ণ ভিন্ন অন্য বিষয় অর্থাৎ মায়িক বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট করেন। আর শুদ্ধা-সরস্বতী কৃষ্ণভজনের অনুকূল পথ প্রদর্শনপূর্বক শরণাগত ভক্তের জিহ্বায় নৃত্য-কীর্তন করেন। দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত কেশব কাশ্মিরী, কবি কালিদাস অপরা সরস্বতীর কপট কৃপা লাভ করেছিলেন। সরস্বতীর কপট কৃপায় মহাপ্রভুর প্রকটকালীন নবদ্বীপের সকলেই যথেষ্ট পাণ্ডিত্য প্রতিভা লাভ করেছিলেন। শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর বলেন— “সরস্বতী প্রসাদে সবাই মহাদক্ষ।” কিন্তু পরাবিদ্যাস্বরূপিনী শ্রীসরস্বতীর প্রভু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নিকট সকলেরই প্রতিভা পরাভূত হয়েছিল। শ্রীমন্মহাপ্রভুর দিগ্বিজয়ীর দর্প-দমন-লীলায় দেখতে পাওয়া যায়, মহাপ্রভুর কাছে পরাভূত হওয়ার পর সরস্বতী দেবী স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে কেশব কাশ্মিরীকে বললেন—
❝ সরস্বতী বলেন, শুনহ বিপ্রবর।
যাঁর ঠাঞি তোমার হইল পরাজয়॥
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড-নাথ সেই সুনিশ্চয়॥
আমি যাঁর পাদপদ্মে নিরন্তর দাসী।
সম্মুখ হইতে আপনারে লজ্জা বাসী॥ ❞
অনুবাদ: “সরস্বতী বললেন, তুমি এতদিন আমার যে মন্ত্ৰ উচ্চারণ করেছ, দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত হওয়া তার ফল নয়। তুমি যে সাক্ষাৎ পরমেশ্বরের দর্শন লাভ করলে, এটাই তার চরম ফল। তুমি শীঘ্র গিয়ে তাঁর চরণে আত্মসমর্পণ করো।” এরপর দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত সরস্বতীর নির্দেশে মহাপ্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন।
এখন নির্ণয় আমাদের হাতে, আমরা সরস্বতীর কপট কৃপা লাভ করব, নাকি অকপট কৃপা লাভ করে কৃষ্ণভক্তিবিজ্ঞান লাভে প্রয়াসী হবো। যদি কৃষ্ণভক্তি লাভ হয়, তবে সরস্বতী দেবীর কৃপা আমাদের এমনিতেই লাভ হবে। — হরেকৃষ্ণ