19/03/2025
বদর | সত্য মিথ্যার ফয়সালার দিন
১.
বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয় হিজরী দ্বিতীয় বর্ষের রামাদান মাসে। চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয় রামাদানের ১৭ তারিখ। প্রতিপক্ষ ছিল মক্কার পৌত্তলিক কুরাইশ বাহিনী। ওরা ৯৫০ জন। সবাই সশস্ত্র। মুসলিমরা মাত্র ৩১৩ জন। প্রায় নিরস্ত্র।
২.
মদীনা শহর থেকে বদর প্রান্তরের দূরত্ব ৭০ মাইল। সড়কপথে সেখানে যেতে হলে পাড়ি দিতে হবে ১০০ মাইল। যানজটহীন পথে নিজস্ব গাড়ি নিয়ে গেলে সময় লাগে ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। এটা এখনকার হিসাব। ১৪৪১ বছর আগে আধুনিক যানহীন পথটা যে কতোটা বন্ধুর, কতোটা দুর্গম এবং কী পরিমাণ প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ ছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ৭০-৮০ মাইল দুর্গম পথ পায়ে হেঁটে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করা কোনোভাবেই সহজ কোনো কাজ নয়। আমাদের কাছে যেটা অসম্ভব সেটাই তাঁরা সম্ভবে পরিণত করেছিলেন অবলীলায়। তাঁদের প্রশ্নাতীত আত্মত্যাগ, অক্লান্ত শ্রম এবং নিখাঁদ সাধনায় পাওয়া সেই দ্বীনকে আজ খণ্ডবিখণ্ড করে চলেছি আমরা। তাই তো আজ আমরা বিতাড়িত, নির্যাতিত, নিগৃহীত এবং উপেক্ষিত।
৩.
বদর যুদ্ধে কাফিরদের পক্ষে অভিশপ্ত শয়তান সুরাকা বিন মালিকের আকৃতি ধারণ করে বিশাল বাহিনী নিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। বাহিনীর অন্যান্য সদস্যরা বনি মুদলিজ গোত্রের পুরুষদের বেশ ধারণ করেছিল।
বিপরীতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা হযরত জিবরীল, হযরত মিকাইল এবং হযরত ইসরাফিল আ.-এর নেতৃত্বে ফেরেশতাদের একটি বাহিনী মুসলিম সেনাদলে যুক্ত করেন। যুদ্ধের মজা এবার বুঝে নিক।
৪.
ফেরেশতাদেরকে যুদ্ধনীতি আল্লাহ নিজেই শিখিয়ে দিয়েছিলেন। শত্রুকে কোথায় আঘাত করতে হবে তাও বলে দিয়েছিলেন। "তোমরা তাদের ঘাড়ে এবং আঙুলের অগ্রভাগে আঘাত করো।" (আনফাল-১২)
যদ্দরুন লাশ দেখে চেনা যেতো, কে সাহাবীদের হাতে নিহত, আর কে ফেরেশতাদের হাতে নিহত। যারা ফেরেশতাদের হাতে নিহত হয়েছিল তাদের ঘাড় এবং আঙুলের অগ্রভাগে পোড়া দাগ ছিল। পুড়ে ছাই। আহ কী যন্ত্রণা!
৫.
উবায়দা রা.-এর প্রতিপক্ষ উতবা।
হামজা রা.-এর প্রতিপক্ষ শায়বা।
আলি রা.-এর প্রতিপক্ষ ওলীদ।
যুদ্ধ শুরু। শুরু আক্রমণ। প্রথম আক্রমণেই হামজা এবং আলি রা. তাঁদের প্রতিপক্ষকে খতম করে দিলেন। কিন্তু উবায়দা রা. নিজে আহত হলেন। উতবার তরবারির আঘাতে পায়ের রগ কেটে যায়। রক্তাক্ত হন। ঐদিকে উতবাও আহত হল। হযরত হামজা এবং আলি রা. কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজেদের কাজ সেরে উবায়দা রা.-এর শিকারিকে খতম করতে এগিয়ে এলেন। দুজনের উপর্যুপরি আঘাতে নরাধম উতবা নিহত হয়। কোথায় গেল তাদের মাস্তানি?
৬.
বদর যুদ্ধের অনেক আগে হযরত সা'দ বিন মু'আজ রা. উমাইয়া বিন খলফকে বলেছিলেন, "তুমি আমাদের হাতেই নিহত হবে। প্রস্তুত হও। বেশি বেড়ে গেছো।"
বদর যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হলে তার সেই কথা মনে পড়ে গেল। একটা ভয় কাজ করতে লাগল। বাতিল সমসময় কাপুরুষ হয়। তলেতলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, "না, বদরে অন্তত আমি অংশগ্রহণ করব না। ছলেবলে পিছনে থেকে যাব।"
এদিকে আবু জাহাল নাছোড়বান্দা। উমাইয়াকে না নিয়ে যুদ্ধে যাবে না। আল্লাহর পরিকল্পনা এমনই হয়। নিখুঁত এবং সাজানো গোছানো। শেষমেশ যেতেই হল। বদর প্রান্তে তাকে প্রথম দেখেন তার হাতে নির্মমভাবে নির্যাতিত হযরত বেলাল রা.। তিনি দেখেই চিৎকার দিয়ে উঠেন, "ঐ যে উমাইয়া। ভাইয়েরা! তোমরা তাকে হত্যা করো।" একথা শুনে সবাই একযোগে আক্রমণ করে উমাইয়াকে হত্যা করলেন। যেই বিলাল রা.-কে তপ্ত রোদে ফেলে চামড়া খসিয়ে দিয়েছিল সেই দাসের হুকুমেই তাকে এভাবে মরতে হবে তা কি সে বিশ্বাস করেছিল? দূর, তার বিশ্বাস অবিশ্বাসে কী আসে যায়? প্ল্যান তো আসমানে হয়।
৭.
আব্দুর রাহমান বিন আউফ রা.-এর ডানেবামে দুই আনসার কিশোর দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের একজন চুপিচুপি বললেন,
চাচা! আবু জাহেল কোনটা?
বৎস! তাকে চিনে তুমি কী করবে?
আমি তাকে পেলে হত্যা করব এবং আমি নিজেও শহীদ হব। আল্লাহর কাছে আমার ওয়াদা এটি। কারণ আমি শুনেছি, সে নাকি আল্লাহর রাসূল সা.-কে গালিগালাজ করেছে। তাকে না মেরে আমার নিস্তার নেই।
এবার আব্দুর রাহমান বিন আউফ রা.-আঙুলের ইশারা দিয়ে বললেন, "ঐযে, ঐটাই আবু জাহল।"
শনাক্ত করতে দেরি, বাজপাখির মতো শিকারির ওপর দুই খুদে যোদ্ধার ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরি হয়নি। অসীম সাহসিকতায় আবু জাহলকে হত্যা করে দুই কিশোর অনন্য নজির স্থাপন করলেন। তাঁরা ছিলেন হযরত আমর ইবনে জামুহ রা.-এর পুত্র মু'আয এবং হযরত আফরাহ রা.-এর পুত্র মু'আউয়ায রা.। তাঁরা ছিলেন একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
৮.
সুতরাং বদরের যুদ্ধের ঘটনা পড়লেই হবে না, তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। নিজের সন্তানদেরকে মু'আয এবং মু'আউয়াযের রা.-এর রঙে রাঙাতে হবে। নিজেদেরকে হতে হবে অকুতোভয়। বাতিলের বিরুদ্ধে সোচ্চার। ন্যায়ের পক্ষে আপোষহীন। তবেই নিজেদের ঔরসে জন্ম নিবে মু'আয এবং মু'আউয়াযের মতো হিরকতুল্য সন্তান। আর যদি নিজেরা হই 'মিউমিউ' ঘরানার তাহলে সেই ঘরে সিংহের গর্জন দেওয়ার মতো সন্তান তৈরি হবে কী করে?
কার্টেসি - Nazrul Islam | ১৯ এপ্রিল, ২০২২