25/05/2026
পথ
মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম মোল্লা
পথ বলতে এখানে চলাচলের রাস্তার কথা বলছি ।যেদিন থেকে মানুষের নির্দিষ্ট গন্তব্য নির্ধারিত হয়েছে আর সেই গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছার প্রয়োজন অবসম্ভাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন থেকেই পথের সৃষ্টি । প্রথম পথ তৈরি হয়েছে -পায়েচলা পথ । তারপর প্রয়োজন অনুসারে পথের বহুমুখী উত্তরণ ঘটেছে ।
পথ হলো ফিরে আসার একটি সূত্র ।যেখানেই যাওয়া হোক -যেখান থেকেই যাওয়া হোক-–পূর্বের স্থানে যাতে সঠিকভাবে ফিরে আসা যায়-এই চিহ্নিতকরণ পদ্ধতির নামই পথ । এই একটি বিষয়ই মানবগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নতি বয়ে এনেছে ।মানুষ নিজের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পেরেছে -আবার ফিরে আসতে পেরেছে ।
মানুষকে সভ্য হয়ে ওঠতে- সভ্যতা তৈরি করতে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে পথ।
মানুষ যেদিন তার পথটি নির্ধারণ করতে পেরেছে –সেদিনই তার গন্তব্যে পৌঁছার অভিলাষ পূর্ণ হয়েছে ।সেই বিন্দু থেকেই নতুন অনুসন্ধানের দুয়ার খুলে গেছে । গন্তব্যে পৌঁছা যায় আবার সেখান থেকে ফিরে আসা যায় ; বাহ !কী চমৎকার বিষয় । এই আসা যাওয়ার আনন্দ থেকেই মানুষ নতুন নতুন স্থানে গমন করেছে আর জনপদ গড়ে তুলেছে ।
আদিম মানুষ তার ঠিকানা চিহ্নিত করতে পেরেছে পথ তৈরির মাধ্যমে । পথই বন্য জন্তু জানোয়ারের স্তর থেকে মানুষকে আলাদা উন্নত প্রাণি হতে সাহায্য করেছে ।
সভ্য হতে হতে মানুষেরা সৃষ্টি জুড়ে তাদের প্রয়োজন মতো পথ তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছে । স্থলপথ- জলপথ -আকাশপথ; সবখানে তারা পথ তৈরি করে পরিভ্রমণ করছে ।
চিন্তা চেতনাতেও তারা পথ নির্ধারণ করে নিতে পেরেছে । সু-পথ ,কু-পথ, ভুল পথ এসব বিশেষণে মানুষেরা নিজেদের জ্ঞান-বিবেক মননকে ব্যবহার করতে পেরেছে । পার্থিব -অপার্থিব পথেরও সন্ধান তারা করেছে এবং এক ধরনের সমাধানও করে নিয়েছে ।
কিন্তু এই পথ থেকেই পথ আর মতের ভিন্নতা তৈরি হয়েছে ।এই চলাচলের পথই একটিু একটু করে চিন্তা চেতনা বিশ্বাস অবিশ্বাস আর মতামতের যায়গায় ছায়া ফেলেছে ।পথ হয়ে ওঠেছে পন্থা -উপায় -কৌশল এরকমের আরো অনেক কিছূ ।
ভুল পথ-–সঠিক পথ-সু পথ -কু পথ এসব বিতর্ক আর ঝামেলাও তৈরি হয়েছে।এই ঝামেলার মধ্যেই নানা পথের নানা মতের মহাপুরুষ আর শুদ্ধ মানুষদের আগমন ঘটেছে । তাদের মতবাদ নানা ধরনের সুপথের নির্দেশনা দিয়েছে । তবে কোন মানুষই পথের কাঁটা বা পথের বাঁধাকে সমর্থন করেননি । বরং সুগম পথের সৃষ্টি একটি পূণ্যকাজ বলেই স্বীকৃত হয়ে আছে ।
দুঃজনকভাবে এটাই সত্যি এই কথায় মানুষেরা কান দেয় না । তারা বুঝে শুনেই ধর্মের কথা পূণ্যের কথা মানবতার কথাকে অস্বীকার করে । নিজেরা দুষ্ট চরিত্র ধারণ করে সব ধরনের ঝামেলা তৈরি করে এই পথের উপরেই । পথ দখল করে -পথ ধ্বংস করে—প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে পথে বোধা বিপত্তি সৃষ্টি করে ।
বিরোধ-–অবরোধ-মারামারি খুনোখুনি সব পথের উপর । যে পথের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে –সে’ই বিজয়ী ।যুদ্ধকালীন সময়ে শত্রপক্ষ পরস্পরে পরস্পরের পথকে ধ্বংস করে ।
মানুষ পথকে যতটা মুক্ত রাখতে চায় প্রতিব্ন্ধকতা সৃষ্টি করে তার চেয়ে অনেক বেশি ।
নগর বানাতে পারলেই সভ্যতা প্রমাণ করা যায় না । ভাল পোশাক পরলে বা ভাল খাবার দাবার খেলেই তাকে সভ্য বলা ঠিক না । সভ্য বলা যাবে তখনি- যখন লোকেরা তার চলাচলের রাস্তা অবাধ দখলমুক্ত এবং সর্বসাধারণের জন্য সুগম করে তুলতে পারবে ।
মানবসভ্যতার সংজ্ঞা -পথ বা রাস্তার উন্নতি তথা চলাচলের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিকেই বোঝায় ।
আমাদের দেশে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার ইঞ্জিনিয়ার এবং জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই পথ ঘাট রাস্তা নির্মাণের বাজেটের টাকা চুরি করে । রডের বদলে বাঁশ দেয় -ইঁট বালি বা ঢালাইয়ের কাজে করে মহা দুর্নীতি । তারা আবার তীর্থে গমন করে পূণ্য কামাতে চায় ।
রাস্তার দুর্নীতির চেয়ে বড় আরো পাপ কী আছে ?সব ধর্মেই তো পথমুক্তির কথা মহান ভাষায় লেখা আছে । আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষই মুসলিম । আমাদের নবীজীও তো পথকে কাঁটা মুক্ত রাখতে বলেছেন । এটা সাদকায়ে জারিয়া । ইসলামী মতে মুসলিমের মৃত্যুর পর সকল আমল নামা বন্ধ হয়ে যায় । শুধু কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকে সাদকায়ে জারিয়ার পূণ্য । সাদকায়ে জারিয়ার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপর্ণ হচ্ছে পথ ।
অথচ আমাদের মধ্যে পথ নিয়েই বেশি বিরোদ। নবীজীর নির্দেশ মানে কয়জনে ?
পথ বা রাস্তা নির্মাণ করা -সুগম করা-–জঞ্জালমুক্ত করা -আর তার দু’ধারে ফুল -ফলের বৃক্ষ রোপন করে সুশোভন - ছায়াসুশীতল পরিবেশ ধরে রাখার মতো পূণ্য অথবা মানবতার এতবড় কাজ কী আর কিছু হয় ? অথচ আমরা কী করি ? পথের উপরে ময়লা আবর্জনা ফেলে রাখি । রাস্তার পাশে নর্দমা ভাগাড় বানাই । ময়লা ফেলতে ফেলতে স্তূপ করে রাখি । দুর্গন্ধে নাক চেপে ধরে হাঁটতে হয় পথচারীকে এটা নিঃসন্দেহে ঘৃণ্য এবং লজ্জাজনক কাজ ।
প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই স্থল জল আকাশ পথের এক একটি মন্ত্রণালয় থাকে ।সেই মন্ত্রলয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমকর্তা কমচারী তথা পুরো সরকারেরই দায়বদ্ধতা আছে রাষ্ট্রের সব ধরনের পথকে সঠিকভাবে উপযোগী রাখা । এর যে কোন ব্যত্যয়ের জবাব সংশ্লিষ্ট কর্ত্রপক্ষকে দিতে হবে । সেটা ইহজাগাতিকভাবেও -পরজাগতিক ভাবেও সত্য ।
পৃথিবীতে সভ্যতা যত বিস্তৃত হচ্ছে মানবতা তত ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে । মানুষেরা যত পথ তৈরি করতে পারছে -তত অমানবিক কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে পারছে ।
স্থলপথে আর্টিলারী-জলপথে রণতরী –আকাশ পথে যুদ্ধ বিমান ; আহ কী মহড়া –কী দাপট হুমকি ধামকি -এই হলো মানুষের অসভ্যতা প্রদর্শন ।যুদ্ধ সরঞ্জাম পাঠাতে পথে কোন সমস্যা হয় না –কিন্তু গরীব ক্ষুধার্ত কোন দেশে খাদ্য বস্ত্র অষুধ –ত্রাণ পাঠাতে কত শত বাঁধা!
পথের বাঁধা’ই সত্যিকারের বাঁধা । পথের মুক্তিই সত্যিকারের মুক্তি ।
যে জাতি পথের মর্যাদা বুঝে –সে জাতি গন্তব্যে পৌঁছে যায় ।অন্যরা পড়ে থাকে পথের ধারে।