আল্লাহ্ সুবহানু তায়ালা মানুষকে সর্বোত্তম আদলে (গঠনে) সৃষ্টি করেছেন এবং সর্বোত্তম জীবনের জন্য সৃষ্টি করেছেন। দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন পরীক্ষার জন্য, পরীক্ষার জায়গায় মানুষ সর্বোত্তম জীবন যাপন করতে চেয়ে, মানুষের সামনে এমন তিনটি আকাঙ্খা দেখা দেয়, যা প্রমান করে পৃথিবীতে মানুষের জীবন অপূর্ণাঙ্গ, ((১)) মানুষ এমন জীবনের আকাঙ্খা করে, যে জীবনের শেষে মৃত্যু থাকবে না। ((২)) মানুষ এমন যৌবনের প্রত্যাশী, যে যৌবনের পি
ছনে বার্ধক্য থাকবে না। ((৩)) মানুষ চায় তার ইচ্ছা-আকাঙ্খা, মনোবাসনা পূর্ণ হোক সর্বাবস্থায় মানুষ সম্মানী থাকুক। আলোচ্য তিনটি আকাঙ্খার প্রেক্ষিতে দুইটি প্রশ্ন আমাদের সামনে দেখা দেয়, (১) আমরা কেনই বা এমন জীবনের আশা করি, যা পৃথিবীতে কোন দিন পূরণ হবে না? (২) যদি এমন জীবন থাকে, তাহলে তা কোথায় পূরণ হবে?
পৃথিবীতে মানুষ এমন জীবনযাপন করছে, যে জীবনের শেষে মৃত্যু নামক সমাপ্তি আছে, যেখানে যৌবনের শেষে বার্ধক্য আছে, ইচ্ছা-আকাঙ্খার পিছনে ব্যর্থতা আছে, মনোবাসনা অপূর্ণ থাকে, সম্মানের পিছনে অসম্মান আছে, অথচ মানুষ এমন জীবনের আকাঙ্ক্ষী নয়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ সুবহানু তায়ালা মানুষকে এমন জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন, যেখানে জীবনের পিছনে মৃত্যু থাকবে না, যৌবনের পিছনে বার্ধক্য থাকবে না, ইচ্ছা আকাঙ্খার পিছনে ব্যর্থতা থাকবে না, মনোবাসনা অপূর্ণ থাকবে না, সম্মানের পিছনে অসম্মান থাকবে না, সেই জন্যই এমন জীবনের আকাঙ্খা মানুষের অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন।
মানুষ যখন আল্লাহ্র সন্তুষ্টি প্রাপ্ত হয়ে জান্নাতী হবে, সাথে সাথে ফেরেস্তা ঘোষণা করবে, এমন জান্নাতে প্রবেশ করো যেখানে জীবনের শেষে মৃত্যু আসবে না। মানুষ অনন্তকাল জান্নাতে অবস্থান করবে, আখেরাতের হায়াত কত হবে? সেই সম্পর্কে ইমাম গাজ্জালী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "বিশ্বভ্রমান্ড অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী খালি জায়গা সরিষার দানা দ্বারা ভর্তি করে দেওয়া হয় এবং একটি পাখি এক হাজার বছর পর পর একটি করে দানা নিয়ে যায়, তাহলে একদিন সরিষার দানা শেষ হতে পারে কিন্তু আখেরাতের হায়াত শেষ হবে না।" চিন্তার বিষয় আখেরাতের জীবন কত বিশাল । "সাগরের পানিতে যদি আঙুল চুবিয়ে আবার তোলা হয় তবে আঙুলের মাথায় যে দুই-এক ফোটা পানি উঠবে, এটা দুনিয়ার হায়াত, আর সাগরের যে এত পানি এটা আখেরাতের হায়াত।"
আল্লাহ্ সুবহানু তায়ালা জান্নাতে মানুষকে এমন যৌবন দান করবেন, যার পিছনে বার্ধক্য থাকবে না, যেখানে বয়স হবে ৩০~৩৩ বছর, কারণ এই বয়সে একজন পুরুষের মেধার প্রখরতা, মানসিক ও শাররীক সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। সৌন্দর্য হবে হযরত ইউসুফ আলাইহি ওয়াসাল্লামের মত যাকে সৃষ্টির পঞ্চাশ শতাংশ সৌন্দর্য দান করা হয়েছিল। আর যখন আল্লাহ্র সাথে বান্দার দিদার হবে আল্লাহ্ আপন নুরের তাজ্জালী বান্দার উপর ফেলবেন ফলে চেহারা এমন সৌন্দর্য হবে যে, তার চেহারার সামনে সূর্য আলোহীন মনে হবে। যেমনিভাবে দিনে সূর্যের আলোর সামনে নক্ষত্র আলোহীন যায়ে যায়, কারণ উজ্জ্বল বস্তুর সামনে অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল বস্তু ম্লান হয়ে যায়। আর কণ্ঠ হবে হযরত দাউদ আলাইহি ওয়াসাল্লামের মত যার সুললিত কণ্ঠে সাথে পাহাড় আন্দোলিত হতো, পক্ষীকুল এবং মৎস্যকুল বিহলিত হতো।
আর মানুষের ইচ্ছা আকাঙ্খা মনোবাসনা পূরণ হবে জান্নাতে, আল্লাহ্ তায়ালা বলেন," আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য (জান্নাতে) এমন সমস্ত নেয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোন চোখ অবলোকন করে নি, কোন কান শোনে নি এবং কোন মানুষ কল্পনাও করে নি।" যেখানে সম্মানের পিছনে অসম্মান থাকবে না, জান্নাতের গেলমান অর্থাৎ খেদমতকারী সর্বদা বলতে থাকবে "সালামুন আলাইকুম।" আজকের দিনে সম্মানী লোকদের যেভাবে লাল গালিচা সম্বর্ধনা দেয় এবং গার্ড অফ অনার প্রদান করা হয়, ঠিক তেমনিভাবে সত্তর হাজার ফেরেস্তা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে থাকবে, "সালামুন আলাইকুম"। মানুষ হয়রান হয়ে জিজ্ঞাসা করবে, আমরা মাটির তৈরি মানুষ, গোনাহগার। তোমরা নুরের তৈরি, নিষ্পাপ ফেরেস্তা। তোমরা কেন আমাদের সালাম দিচ্ছ? তারা বলবে, তোমরা আল্লাহ্ সুবহানু তায়ালাকে দেখনি কিন্তু আল্লাহ্র হুকুম আহকাম মেনে জীবন যাপন করেছ, জান্নাত দেখনি কিন্তু জান্নাতের আশা করেছ, জাহান্নাম দেখনি জাহান্নাম থেকে বাঁচার চেষ্টা করেছ এবং দুনিয়ার লোভ লালসার বস্তু থেকে নিজেদের সংবরণ করেছ। সালাম তোমাদের ধৈর্য ধারণ করার জন্য। এমন সময় আসবে যখন আল্লাহ্ তায়ালা বলবেন, "সালামুন কাওলাম্মির রাব্বির রাহীম" সালাম পরম দয়ালু পালনকর্তার পক্ষ থেকে। মানুষের চিন্তার ঊর্ধ্বে সেই সম্মান কি ধরণের হবে, যখন সম্মান দাতা আল্লাহ্।
আল্লাহ্ সুবহানু তায়ালা জান্নাত সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য, সর্বোত্তম জীবনযাপনের জন্য, তার পছন্দমত জীবনযাপনের জন্য আর তার আকাঙ্খা মানুষের অন্তরের ঢেলে দিয়েছেন, এইজন্য যে নবী আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মানুষকে সেই জান্নাতের দিকে ডাকেন, মানুষ যেন সেই ডাকে সাড়া দেয় এবং সেই জান্নাতের প্রবেশের কালেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" অর্থাৎ "আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন মাবূদ নাই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্র রাসূল।" জিন্দিগীতে মেনে নেয়। হাকীকতে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" হলো আমরা যা কিছু দেখি বা না দেখি আল্লাহ্ ব্যতীত সব কিছু মাখলুক, মাখলুক কিছুই করতে পারে না আল্লাহ্র হুকুম ছাড়া, আল্লাহ্ সকল কিছু করেন মাখলুক ছাড়া। যা গাইরুল্লাহমুখী দিলকে আল্লাহ্মুখী এবং দুনিয়ামুখী দিলকে আখেরাতমুখী করে। আর আল্লাহ্ সুবহানু তায়ালাকে মাবূদ হিসাবে মেনে নেওয়ার মাঝেই মানুষের কামিয়াবী কারণ আল্লাহ্ নিজের রবুবিয়াত, উলুহিয়াত, এবং যাত ও সিফাতের সাথে অংশীদারিত্ব মেনে নেন না।
বাস্তব উদাহরণের সাহায্যে বুঝার চেষ্টা করি, হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর কাছে এক মহিলা এসে বললো, হযরত! আল্লাহ্ তায়ালা যদি পর্দার বিধান না দিতেন, পরপুরুষের সামনে নারীর চেহারা উন্মোচনে নিষেধ না করতেন, তাহলে আমি আমার নেকাব সরিয়ে দেখাতাম, আল্লাহ্ আমাকে কি রূপ দিয়েছেন। অথচ তারপরও আমার স্বামী আরেকটি বিয়ে করতে চায়। একথা শুনার পর, হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) আবেগে মূর্ছিত হলেন এবং পড়ে গেলেন। চিন্তার বিষয়, হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) একজন নারীর কথায় কেন হুশ হারিয়ে ফেললেন? যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন, উপস্থিত লোকজন তাহাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তিনি মূর্ছা গেলেন? তিনি বললেন, একজন সাধারণ মাখলুক! একজন সাধারণ নারী! সেও তার ভালোবাসায় অংশীদারিত্ব মেনে নিতে পারছে না। একবার চিন্তা করুন, সমগ্র জাহানের বাদশাহ, সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আল্লাহ্ তায়ালা তিনি কীভাবে নিজের অংশীদারিত্ব মানে নিবেন? "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" কালেমার সাথে জুড়ে আল্লাহ্ মানুষকে পয়গাম দিয়েছেন, যে আল্লাহর হাবীব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর মত হয়ে, আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে, সে আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়ে যাবে কারণ আল্লাহ্ তায়ালা আদম সন্তানকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রূপে দেখতে পছন্দ করে এবং দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি ও সাফল্যের জন্য, উম্মতে মুহাম্মদীকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রূপে সাঁজতে নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত গুলোকে মেহনত করে জীবনে তিন ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতে হবে।
((১)) সীরাতে রাসূলঃ- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ অনুসরণ করে জীবন যাপন করা। (রাসূলের চলার মত করে চলা, রাসূলের খাবার খাওয়া মত করে খাবার খাওয়া, রাসূলের কথা বলার মত করে কথা বলা, ইত্যাদি) ((২)) সুরতে রাসূলঃ- শরীরের প্রত্যেক অংশে প্রত্যেক অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাররিক সুন্নাত মত সাজানো। (রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মত মুখে দাঁড়ি রাখা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মত ঢিলে-ঢালা জামা পড়া, ইত্যাদি) ((৩)) সারীরতে রাসূলঃ- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা, উম্মতের জন্য দিলের ব্যথা, প্রত্যেকের দিলে জিন্দা করা। (কীভাবে আল্লাহর দ্বীন পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়, মানুষের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়, মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলে, জান্নাতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, জাহান্নাম থেকে নাজাত পায়, ইত্যাদি)