21/04/2026
সত্তরের দশকের শেষের দিকে যখন মধ্যপ্রাচ্যে বৈপ্লবিক ইসলামের উত্থান ঘটছিল, তখন রাজতন্ত্রগুলো তাদের সিংহাসন রক্ষার জন্য এমন এক আদর্শের প্রয়োজন বোধ করেছিল যা তরুণদের রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেবে।
এই প্রকল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে মদিনা ইউনিভার্সিটি। নব্বইয়ের দশকে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় যখন সৌদি আরবে মার্কিন মিলিটারি বেইজ করা হয়, তখন মূলধারার ওলামারা এর প্রতিবাদ করেছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে রাবি বিন হাদি আল মাদখালিকে সামনে আনা হয়, যিনি শাসকের প্রতিটি পদক্ষেপকে 'শরয়ি' বৈধতা দেওয়ার মিশন শুরু করেন।
মদিনা ইউনিভার্সিটির বিশাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে হাজার হাজার বিদেশি ছাত্রকে এই বিশেষ ঘরানার দীক্ষা দেওয়া হয়, যাদের কাজ ছিল নিজ দেশে ফিরে গিয়ে রাজতন্ত্র ও পশ্চিমা স্বার্থের বিরুদ্ধে যেকোনো কণ্ঠস্বরকে 'খারেজি' বা 'বিদাতি' তকমা দিয়ে স্তব্ধ করে দেওয়া।
এই ফেরকাটি মূলত 'পেট্রো-ডলারের' ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। বিশাল বাজেট, বিলাসবহুল প্রকাশনা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার হাজার পেইড অ্যাক্টিভিস্টের মাধ্যমে তারা প্রচার করে যে—শাসক যদি জনসমক্ষে ব্যভিচারও করে, তবুও তার প্রতিবাদ করা হারাম। তাদের এই ডলার-নির্ভর মানহাজ মূলত আমেরিকা ও ইসরাইলের আঞ্চলিক স্বার্থের সাথে একই সুতোয় গাঁথা।
ইরাক আক্রমণ থেকে শুরু করে আজকের গাজা পরিস্থিতি—সবখানেই মাদখালিদের ভূমিকা অভিন্ন। তারা এমন সব ফতোয়া তৈরি করে যা পরোক্ষভাবে ইসরাইলি আগ্রাসনকে সহজ করে দেয়। যেমন, তারা প্রচার করে যে শক্তি না থাকলে প্রতিরোধ করা 'আত্মহত্যা', অথচ একই যুক্তি তারা দখলদারদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে না। মূলত, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যখন কোনো মুসলিম জনপদে আঘাত হানে, তখন এই মাদখালিরাই ধর্মীয় নথিপত্র ঘেঁটে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, মার খাওয়াটাই হলো প্রকৃত 'সুন্নাহ'।
মাদখালিজম এবং বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার পতন মূলত সমান্তরাল। কেন এরা আমেরিকা-ইসরাইলের পতনের সাথে সাথেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তার ব্যাখ্যা অত্যন্ত সহজ। কারণ, এই আদর্শের কোনো শিকড় জনগণের হৃদয়ে নেই; এর শিকড় হলো ক্ষমতার মসনদ আর বিদেশি ডলারে। যখনই কোনো সমাজে ইনসাফ ও বিপ্লবের জোয়ার আসে, এই পরজীবী গোষ্ঠীটি সেখানে টিকতে পারে না।
আজ ২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বলছে, পশ্চিমা আধিপত্যের যে সূর্য অস্তমিত হচ্ছে, তার সাথে সাথে এই দরবারি আলেমদের প্রাসঙ্গিকতাও শেষ হয়ে আসছে। তারা মূলত একটি রাজনৈতিক 'বাফার জোন' হিসেবে কাজ করে; যখন মূল শক্তি (আমেরিকা) মাঠ ছেড়ে যাবে, তখন এই পাহারাদারদের ভুয়া ফতোয়াগুলো বালির বাঁধের মতো ধসে পড়বে। কারণ, যে সত্য কেবল ডলারে কেনা হয়, সেই সত্যের কোনো প্রাণ থাকে না।
পরিশেষে এটি পরিষ্কার যে, মাদখালিজম হলো সাম্রাজ্যবাদের একটি 'রিলিজিয়াস উইং'। তারা সালাফি সাজে মূলত এক প্রকার রাজনৈতিক দাসত্ব ফেরি করে। কিন্তু ইতিহাসের নিয়ম হলো, যখনই বড় কোনো সভ্যতা বা জালেম শক্তির পতন ঘটে, তাদের পদলেহী বুদ্ধিজীবী ও ওলামাদেরও একই পরিণতি হয়।
বায়তুল মাকদিস যেদিন প্রকৃত অর্থে মুক্ত হবে, সেদিন কেবল যায়নবাদীদের পতন হবে না, বরং তাদের পক্ষে ফতোয়া দেওয়া এই 'ডলার-মানহাজ' এর ধারক-বাহকরাও চিরতরে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। কারণ হকের আলো যখন উদ্ভাসিত হয়, তখন বাতিলের এই কৃত্রিম মোমবাতিগুলো নিভতে বাধ্য। এরা একই সুতোয় গাঁথা এক পতনোন্মুখ অস্তিত্ব, যাদের টিকে থাকা কেবল জালেমের আয়ুষ্কালের ওপর নির্ভরশীল।
"তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতা দান করবেনই; যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।"