02/10/2025
১৯৬২ সালে ভারতের সাথে চীনের যুদ্ধ হয়েছে। পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান ভাবলেন এই সুযোগ। ভারতের ক্ষমতায় এমন একজন যিনি বোধহয় নেহেরুর মত অত প্রভাবশালী নন!কিন্তু আয়ুব খান লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে ( রিড) করতে ভয়ঙ্কর ভুলটা করে বসলেন। যা কল্পনা করেছেন বাস্তবে ঘটল ঠিক উল্টো।
ছোটখাটো চেহারার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধের ময়দানে রক্ষণাত্মক মনোভাব দেখালেন না বরং পাকিস্তানকে সবক শেখাতে যা যা প্রয়োজন সবটাই করলেন। একসময় ভারতের দখলে চলে আসে পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকা। ভারতীয় সেনার লাহোর দখল তখন শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা।
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
কাশ্মীর দখলে মরিয়া পাকিস্তান শুরু করে তাদের প্ল্যান বি,অপারেশন গ্ৰ্যান্ড স্লাম। সদ্য আমেরিকার থেকে শক্তিশালী প্যাটন ট্যাঙ্ক পেয়েছে। লক্ষ আখনুর ব্রিজ দখল করে কাশ্মীরের সাথে পাঞ্জাবের যোগসুত্র ছিন্ন করে দেওয়া । লালবাহাদুর শাস্ত্রী আদেশ দিলেন অবিলম্বে ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স অ্যাকশন শুরু করুক। ভারতীয় বায়ুসেনার ফাইটার জেটগুলো অবিশ্রান্ত বোমাবর্ষণ শুরু করল শত্রুপক্ষের উপর। না লালবাহাদুর শাস্ত্রী এখানেও থামলেন না। তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করে স্থির হল পাকিস্তান কে হতচকিত করে দিতে যুদ্ধের অন্য ফ্রন্ট খুলতে হবে। ততদিনে পাকিস্তানের দখলে থাকা হাজি পীর পাস ভারতের কব্জায়। আরও বড় চমক ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালবেলা ভারতীয় সেনার ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন আর ট্যাঙ্ক রেজিমেন্ট অমৃতসর সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তান আক্রমণ করল। ভারতীয় সেনার লাহোর দখল তখন শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। শুধু তাই নয় ততদিনে ভারত, পাকিস্তানের প্রায় ৭০০ বর্গমাইল নিজেদের দখলে এনেছে। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ হস্তক্ষেপ করে। ২২ সেপ্টেম্বর যুদ্ধ শেষ হলেও দাবি - দাওয়া নিয়ে বৈঠক হবে তাসখন্দ । সোভিয়েত ইউনিয়ন মধ্যস্থতা করতে রাজি হয়।
১৯৬৫- এর ইন্দো- পাক যুদ্ধের পরে জেনারেল আয়ুব খুব ভাল ভাবে বুঝলেন শাস্ত্রী লোকটি মোটেও নরম নয় দেখতে ওরকম। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর দেওয়া স্লোগান ভারতীয় রাজনীতিতে অমর " জয় জওয়ান জয় কিষান '। দরিদ্র পরিবারের ছেলে, সেখান থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। পারিবারিক চাপে একপ্রকার বাধ্য হয়ে ১২ হাজার টাকায় একটি ফিয়াট গাড়ি কিনেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী। ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক তাসখন্দ চুক্তি করতে গিয়ে তাঁর আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে ব্যাঙ্কের ঋণ তিনি পরিশোধ করে যেতে পারলেন না। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর প্রয়াণের পরে ব্যাঙ্কের লোক তাঁর বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে ।পেনশনের টাকায় ব্যাঙ্কের ঋণ মিটিয়েছিলেন সহধর্মিণী ললিতা শাস্ত্রী।লালবাহাদুর শাস্ত্রী মেমোরিয়ালে আজও সেই গাড়িটি রাখা আছে নম্বর DLE 6।
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে পরিবহণ মন্ত্রক সামলেছেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। গণপরিবহণে ভারতীয় মহিলাদের চালক এবং কন্ডাক্টর হওয়ায় ছাড়পত্র দেন তিনিই।
তখনকার দিনে পণপ্রথা চালু ছিল। নিজের বিয়েতে তিনি পণ হিসেবে শুধুমাত্র চরকায় বোনা একটি খাদির ধুতি নিয়েছিলেন ।জন্মসূত্রে পাওয়া পদবী শ্রীবাস্তব। ১৯২৫ সালে বারাণসীর কাশী বিদ্যাপীঠ থেকে স্নাতক হওয়ার পর ‘শাস্ত্রী’ উপাধি পান। আজীবন তা-ই ব্যবহার করেন।স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়ে পড়াশোনা আর এগিয়ে নিয়ে যাননি। অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। লালবাহাদুর শাস্ত্রী যখন রেলমন্ত্রী তখন অন্ধ্রপ্রদেশে মাহবুবনগরে এক রেল-দুর্ঘটনায় মারা যান ১১২ জন যাত্রী। দুর্ঘটনার দায় স্বীকার করে সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করলেন না । তিন মাস পরে তামিলনাড়ুতে আবার একটি রেল-দুর্ঘটনা। এ বার মারা গেলেন ১৪৪ জন যাত্রী। বিবেকের দংশন থেকে ঘটনার দায় মাথায় নিয়ে লালবাহাদুর শাস্ত্রী আবার পদত্যাগ করলেন। এ বার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী নেহরু। কিন্তু সংসদে বিবৃতি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “যদিও তিনি (লালবাহাদুর শাস্ত্রী) পদত্যাগ করেছেন, এবং আমরা তা গ্রহণ করেছি, এর মানে এই নয় যে মিস্টার শাস্ত্রী তাঁর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। পদত্যাগ পত্র এ কারণে গ্রহণ করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যৎপ্রজন্ম জানতে ও শিখতে পারে, তিনি সংবিধান, গণতন্ত্র ও দায়িত্বের প্রতি কতটা সৎ এবং নিবেদিত ছিলেন।”
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
কিন্তু কি অদ্ভুত আমাদের ইতিহাস রচয়িতারা! তাদের বেশিরভাগের কাছে লালবাহাদুর শাস্ত্রী একজন লো -প্রোফাইল রাজনীতিবিদ। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল প্রশ্নাতীত। ১৯৬৬ সালে রাশিয়ার তাসখন্দে ভারত-পাকিস্তান শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন শাস্ত্রী। সেখানেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর।
তাঁর মৃত্যুর পিছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে আজও অভিযোগ ওঠে।তাসখন্দে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনার সাক্ষী ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাঃ চুঘ। ততদিনে দেশে প্রথমবারের মত বিরোধীরা সরকার তৈরি করেছে। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সহধর্মিণী ললিতা দেবীর মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে তদন্ত দাবি করা হল, সরকার রাজি। সাক্ষী চাই,সবথেকে জোরালো সাক্ষী শাস্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাঃ আর এন চুঘ।তিনিও তখন যথেষ্ট প্রবীণ কিন্তু শরীর স্বাস্থ যথেষ্ট ভাল। তিনি যা যা দেখেছেন এবং বুঝেছেন সব বলবেন। কিন্তু সব কথা বলতে পারলেন কোথায়? একটা ট্রাক একদিন পিষে দুমড়ে দিল ডাঃ চুঘের গাড়ি। মৃত্যু হল ডাঃ চুঘ তাঁর সহধর্মিণী ও দুই ছেলের। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুকে কাছে থেকে দেখা ডাঃ চুঘ বলে যেতে পারলেন না ১৯৬৬ এর ১০জানুয়ারির মধ্যরাতে চিকিৎসক হিসেবে তিনি ঠিক কি দেখেছিলেন,কি বুঝেছিলেন। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল কিনা, তা নিয়ে সেই সময়ই কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন। এখনও সেই প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে কারও কারও মনে। আজ তাঁর জন্মদিবসে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
গ্রন্থঋণ ব্ল্যাক করিডর, সমৃদ্ধ দত্ত,প্রথম খণ্ড এবিপি আনন্দের প্রতিবেদন