03/06/2026
ঘট কিসের প্রতীক? যে কোন পূজায় ঘট কেন অপরিহার্য? ঘট আমাদের দেহের প্রতিরূপ।
পূজার সময় পঞ্চগুড়ি দিয়ে পিঠ তৈরী করা হয়। এই পঞ্চগুড়ি, পঞ্চমহাভূত অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম এর প্রতীক। এই পঞ্চমহাভূতের উপর মৃত্তিকা দিয়ে পিঠ করা হয়। মৃত্তিকা বেদীর উপর পঞ্চশষ্য দেওয়া হয়। পঞ্চশষ্য আমাদের কাম ক্রোধ, লোভ, মোহ ও মাৎসর্য্য এই পঞ্চবৃত্তির প্রতীক। এর উপর ঘটস্থাপন করা হয়।
ঘট আমাদের দেহের প্রতীক।আধ্যাত্মিক ভাষায় দেহকে দেহ ঘট বলা হয়। ঘটের ভেতর পঞ্চরত্ন দেওয়া হয়।আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়, যথা-চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা,ত্বক ও জিহ্বা হলো পঞ্চরত্ন।এরপর ঘটে জল ঢেলে পূর্ণ করা হয়। জল হলো দেহরস অর্থাৎ রক্ত। ঘটে এবার পঞ্চ পল্লব দেওয়া হলো, যা আমাদের গ্রীবা বা গলার রূপ।আমাদের গ্রীবায় পঞ্চবায়ু অর্থাৎ পান, অপান, উদান, সমান ও ব্যান থাকে। এই পঞ্চবায়ুই পঞ্চ পল্লবের প্রতীক। এর উপরে ডাব বা নারিকেল দেওয়া হলো, আমাদের মুখের মতোই নারিকেলেরও চোখ মুখ, নাক দেখা যায়। সেই কারণেই নারিকেল আমাদের মুখ- মন্ডলের প্রতিরূপ। মস্তক থাকলে তাতে আচ্ছাদন দিতে হয়, আর সেই কারণে নারিকেলের উপর গামছা বা বস্ত্র দেওয়া হয়। এই হলো আমাদের দেহের প্রতিরুপ। আর কান্ডকাঠী চার বেদের প্রতীক।
সংস্কৃতে এক মন্ত্র আছে তার অনুযায়ী ঘট হোল মহাতীর্থক্ষেত্র। সেই কলশ স্থাপনা মন্ত্র উধৃত করলাম —
১।
সরিতঃ সাগরাঃ শৈলাস্তীর্থানি জলদা নদাঃ।
আয়ান্তু মম ভক্তস্য দুরিতক্ষয়কারকাঃ॥
অর্থ:
সমস্ত নদী, সাগর, পর্বত, তীর্থস্থান, মেঘ ও জলধারা এখানে আগমন করুন এবং আমার সকল পাপ ও অমঙ্গল দূর করুন।
২।
কলশস্য মুখে বিষ্ণুঃ কণ্ঠে রুদ্রঃ সমাশ্রিতঃ।
মূলে তস্য স্থিতো ব্রহ্মা মধ্যে মাতৃগণাঃ স্মৃতাঃ॥
অর্থ:
এই কলশের মুখে ভগবান বিষ্ণু, কণ্ঠদেশে রুদ্র (শিব), মূলদেশে ব্রহ্মা এবং মধ্যভাগে দেবীশক্তিস্বরূপ মাতৃগণ অধিষ্ঠান করেন।
৩।
কুক্ষৌ তু সাগরাঃ সপ্ত সপ্তদ্বীপা বসুন্ধরা।
ঋগ্বেদোऽথ যজুর্বেদঃ সামবেদোऽপ্যথর্বণঃ॥
অর্থ:
কলশের উদরভাগে সাতটি সমুদ্র, সাতটি দ্বীপসহ পৃথিবী এবং ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদ অবস্থান করেন।
৪।
অঙ্গৈশ্চ সহিতাঃ সর্বে কলশং তু সমাশ্রিতাঃ।
দেবদানবসংবাদে মথ্যমানে মহোদধৌ॥
অর্থ:
বেদের সমস্ত অঙ্গসহ সব পবিত্র শক্তি এই কলশে অবস্থান করেন। সমুদ্র মন্থনের সময় এই কুম্ভ (কলশ) উৎপন্ন হয়েছিল।
৫।
উৎপন্নোऽসি তদা কুম্ভ! বিধৃতো বিষ্ণুনা স্বয়ম্।
ত্বত্তঃ সর্বাণি তীর্থানি দেবাঃ সর্বে ত্বয়ি স্থিতাঃ॥
অর্থ:
হে কুম্ভ! তুমি সমুদ্র মন্থনকালে আবির্ভূত হয়েছিলে এবং স্বয়ং বিষ্ণু তোমাকে ধারণ করেছিলেন। সকল তীর্থ ও দেবতারা তোমার মধ্যেই অবস্থান করেন।
৬।
ত্বয়ি তিষ্ঠন্তি ভূতানি ত্বয়ি প্রাণাঃ প্রতিষ্ঠিতাঃ।
শিবঃ স্বয়ং ত্বমেবাসি বিষ্ণুস্ত্বং চ প্রজাপতিঃ॥
অর্থ:
সকল জীব ও প্রাণশক্তি তোমার মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। তুমি স্বয়ং শিব, তুমি বিষ্ণু এবং তুমি প্রজাপতি (ব্রহ্মা)-রূপেও বিরাজমান।
৭।
আদিত্যা বসবো রুদ্রা বিশ্বেদেবাঃ সপৈতৃকাঃ।
ত্বয়ি তিষ্ঠন্তি সর্বেऽপি যতঃ কামফলপ্রদাঃ॥
অর্থ:
আদিত্যগণ, বসুগণ, রুদ্রগণ, বিশ্বদেবগণ এবং পিতৃগণ সকলেই তোমার মধ্যে অবস্থান করেন; কারণ তুমি সকল কামনা ও শুভফল প্রদানকারী।
৮।
ত্বত্প্রসাদাদিমং কর্ম কর্তুমীহে জলোদ্ভব!
সান্নিধ্যং কুরু মে দেব! প্রসন্নো ভব সর্বদা॥
অর্থ:
হে জলোদ্ভব (জলজাত পবিত্র কলশ)! তোমার কৃপায় আমি এই পূজাকর্ম সম্পন্ন করতে চাই। হে দেব, তুমি এখানে উপস্থিত হও এবং সর্বদা আমার প্রতি প্রসন্ন থাকো।