03/06/2025
আজ ত্রিকালদর্শী বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ১৩৬তম তিরোধান দিবস। বাংলা ১২৯৭ সালের ১৯শে জ্যৈষ্ঠ (ইং- ১লা জুন, ১৮৯০) রবিবার শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে তিনি বেলা ১১-৪০ মিনিটে যোগবলে দেহত্যাগের মাধ্যমে তিনি তাঁর স্থূল দেহ ত্যাগ করে সুক্ষ্ম দেহ ধারণ করে, ত্রিলোকে বিরাজিত রইলেন। ১৬০ বছরের পুরাতন মানবদেহ পরিত্যাগ করার আগে বাবা লোকনাথ সবাইকে বলে যান — আমি নেই এ কথা তোমরা কখনো মনে করবে না - আমি ছিলাম, আমি আছি, আমি থাকবো।
বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী একজন ত্রিকালদর্শী, জাতিস্মর ও মুক্তপুরুষ ছিলেন। আজ থেকে প্রায় ২৯৬ বৎসর পূর্বে বাংলা ১১৩৭ সালের ১৮ই ভাদ্র (ইং- ১৭৩০ সালের ৩১শে আগষ্ট) জন্মাষ্টমী তিথিতে কলকাতা থেকে কিছু দূরে তৎকালীন যশোহর জেলা আর বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রামনারায়ণ ঘোষাল এবং মায়ের নাম কমলাদেবী। তিনি ছিলেন বাবা মায়ের চতুর্থ সন্তান। পিতা রামনারায়ণ তাঁর শিবপ্রসাদ নাম রাখেন এবং মা কমলা আমার যাদুমণি নাম দিলেন।
লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জন্মস্থান নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। তবে জন্মস্থান উত্তর ২৪ পরগনা তা নিয়ে দ্বিমত নেই। কারও মতে উত্তর ২৪ পরগণার জেলার চৌরাশি চাকলা গ্রাম যা এখন চাকলাধাম নামে পরিচিত। কারও মতে কচুয়া গ্রাম। এ নিয়ে মামলাও হয়েছে বেশ কয়েকটি। লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জন্মস্থান নিয়ে নিত্যগোপাল সাহা হাইকোর্টে মামলা করেন ও তার মামলা করা আদালতের রায় অনুযায়ী লোকনাথ বাবার জন্মস্থান কচুয়া বলে চিহ্নিত হয়। তবে বহু মানুষের আজও বিশ্বাস উত্তর ২৪ পরগণারই চাকলায় তাঁর আবির্ভাব ঘটে। পার্শ্ববর্তী গ্রাম কাঁকড়া যা বর্তমানে কচুয়া গ্রাম সেখানে পরবর্তী সময়ে লোকনাথ বাবা বাস করতেন।
১৯৭৮ সালে তৈরি লোকনাথ মিশনের দাবি, উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট থানার অধীনে (এখন মাটিয়া থানা) কচুয়াই লোকনাথের প্রকৃত জন্মস্থান। এই মিশন কচুয়া মন্দির পরিচালনা করে। ১৯৮০ সালে গঠিত লোকনাথ সেবাশ্রম সঙ্ঘের পাল্টা দাবি, দেগঙ্গা থানার চাকলাই সেই পুণ্যস্থান, যেখানে ১৯৮১ সালে লোকনাথ মন্দির তৈরি হয়। সঙ্ঘের দাবি, ১৮৮৫ থেকে এই বিবাদ চলে আসছে। কারণ, ওই বছরের ৮ই এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট এন টেলরের সামনে লোকনাথ বলেছিলেন, ‘আমার বাড়ি মৌজা চাকলা, জেলা বারাসত।’
লোকনাথ মিশনের বক্তব্য, বেশ কয়েকটি গ্রাম নিয়ে তখন এক-একটি মৌজা তৈরি হত। লোকনাথ বাবা কোথাও বলেননি, চাকলা গ্রামে তাঁর বাড়ি। লোকনাথ সেবাশ্রম সঙ্ঘের দাবি, বাবা বলেছিলেন, তাঁর বাস মৌজা বারদিতে (অধুনা বাংলাদেশের ঢাকায়)। ‘থানা এবং জেলা বারাসত’ কথাটিই বুঝিয়ে দেয়, বাবার জন্ম চাকলা গ্রামে। কারণ, কচুয়া বারাসতেই ছিল না।
কাঁকড়া গ্রাম যা বর্তমানে কচুয়া গ্রাম সেখানে বাস করতেন ভগবান গাঙ্গুলী নামে ভারতবর্ষের নামকরা এক পণ্ডিত। বাংলা ১১৪৮ সালে মাত্র এগারো বছর বয়সেই উপনয়ন শেষে গুরু ভগবান গাঙ্গুলীর কাছে একমাত্র বন্ধু বেণীমাধব বন্দ্যোপাধ্যায় সহ তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। গুরু ভগবান গাঙ্গুলীই তাঁর নাম রাখেন লোকনাথ।
এরপর গৃহত্যাগ করেন লোকনাথ। লোকনাথ, বেণীমাধব ও ভগবান গাঙ্গুলী পদযাত্রা শুরু করেন। বিভিন্ন গ্রাম শহর নদ-নদী জঙ্গল অতিক্রম করে প্রথমে কালীঘাটে এসে যোগ সাধনা শুরু করেন। কালীঘাটে মায়ের মন্দিরে কিছুদিন অবস্থান করলেন। ব্রহ্মচার্য পালনের মধ্য দিয়ে ত্যাগের সাধনায় ব্রতী হয়ে সিদ্ধির জগতে পা বাড়ালেন লোকনাথ ও বেণীমাধব। এরপর কঠিন সাধনায় অতিবাহিত করেন প্রায় ৪০ বছর। এই রূপে গুরুর আদেশে বিভিন্ন স্থানে যোগ সাধনা ও ব্রত করে শেষ পর্যন্ত লোকনাথ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন।
গুরুদেব ভগবান গাঙ্গুলী জ্ঞান, ভক্তি, কর্ম ও অষ্টাঙ্গ যোগের কিছু শিক্ষা দেন। এরপর লোকনাথ ও বেণীমাধবকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের গুরুদেব ভগবান গাঙ্গুলী কাশীতে আসেন। লোকনাথ ও বেণীমাধবের বয়স তখন ৯০ আর গুরুর বয়স ১৫০। গুরু ভগবান গাঙ্গুলীর দেহত্যাগের সময় চলে আসায় তিনি তার দুই শিষ্যকে নিয়ে আসেন ভারতের শ্রেষ্ঠ মহাযোগী ত্রৈলঙ্গ স্বামীর কাছে। তখনও দুই শিষ্যের যোগশিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি। গুরুদেব ভগবান গাঙ্গুলী তাঁর দুই প্রিয় শিষ্য লােকনাথ ও বেণীমাধবকে ত্রৈলঙ্গ স্বামীর হাতে সমর্পণ করে ভগবান গাঙ্গুলী মণিকর্ণিকা মহাশ্মশানে যােগাসনে দেহত্যাগ করেন। তাঁদের পরবর্তী শিক্ষা দেন কাশীর সচল শিব ত্রৈলঙ্গ স্বামী।
লোকনাথ ও বেণীমাধব প্রায় ২০ বছর কাটান ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে তাঁর আশ্রমে। তাঁদের শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর দুই সাধক একদিন বাবা ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সাথে পরিব্রাজক রূপে বেরিয়ে পড়েন। তারপর শুরু হয় দেশ ভ্রমণ। পশ্চিম দিকে দিয়ে আফগানিস্তান, মক্কা, মদিনা ইত্যাদি স্থান অতিক্রম করে আটলান্টিক মহাসাগর উপকূল পর্যন্ত গমন করেছিলেন। সম্পূর্ণ অনাবৃত্ত দেহে হিমালয়ের দুর্গম পথ ভ্রমণ করেছেন তিন সাধক। প্রথমে হিমালয় থেকে কাবুল দেশে আসেন। সেখানে মোল্লা সাদী নামে এক মুসলমানের সঙ্গে কোরান, বেদ-সহ বিভিন্ন শাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করে ইসলামধর্মের তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেন। মক্কাদেশীয় মুসলিম জনগোষ্ঠী তাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। সেখানে আবদুল গফুর নামে এক মহাপুরুষের সাথে পরিচিত হন। যোগ-সিদ্ধ পুরুষ আব্দুল গফুরের বয়স ছিল ৪০০ বৎসর।
পরে উত্তরের পথে গমন করেন। তারা সুমেরু এলাকা গমনের ইচ্ছায় প্রাক-প্রস্তুতি উপলক্ষে শৈত্যপ্রধান এলাকা হিসেবে বদরিকা আশ্রমে অবস্থান করে সেখান থেকে আধুনিক পরিজ্ঞাত সীমা অতিক্রম করে উত্তরে বহুদূরে চলে যান। সেখানে সূর্যোদয় না হওয়ায় সময় নির্ণয় করা যায় নাই; তবে তারা সে পথে ২০ বার বরফ পড়তে ও গলতে দেখেছিলেন। শেষে হিমালয় শৃঙ্গে বাধা পেয়ে তারা পূর্ব দিকে গমন করে চীন দেশে উপস্থিত হন।
ত্রৈলঙ্গ স্বামী, লোকনাথ এবং বেণীমাধব বহু সহস্র মাইল পদব্রজে অতিক্রম করে পৌঁছান চীন দেশের সীমানায়। সেখানে সীমানা রক্ষার প্রহরীরা অদ্ভুত দর্শন মানুষ দেখে বিস্মিত হন। কারণ তিন যোগীই সম্পূর্ণ উলঙ্গ, এবং বিশাল জটাজুট মণ্ডিত দীর্ঘ দেহে বরফের এক শ্বেত আবরণ তাদের করে তুলেছিল সত্যিই অসাধারণ মানুষ। খবর পৌঁছায় রাজার কাছে। বন্দী করে কারাগৃহে নিক্ষেপ করার আদেশ পান প্রহরীরা। শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় কারাগারে আনয়ন করা হয় তিন বন্দীকে, কেউই বাধা দেন না, বা প্রতিবাদ করেন না।
কিন্তু সশস্ত্র প্রহরীরা যা দেখেন তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তিন উলঙ্গ আশ্চর্য্য দর্শন মানুষগুলি একবার কারাগৃহের মধ্যে আবার পরক্ষণেই শৃঙ্খলমুক্ত অবস্থায় কারাগারের বাইরে মুক্ত অঙ্গনে অবাধে বিচরণ করছেন। অবিলম্বে রাজার কাছে খবর পাঠানো হয়, বিচক্ষণ রাজার বুঝতে অসুবিধা হয় না, নিশ্চয়ই তিব্বত কিংবা ভারতের উচ্চকোটী যোগীপুরুষকে ভুল করে কারারুদ্ধ করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আদেশ করেন ক্ষমা প্রার্থনা করে যেন যোগী মহাপুরুষদের শৃঙ্খলমুক্ত করে সসন্মানে কারাগারের বাইরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
দীর্ঘকাল পরিব্রাজন শেষে ত্রৈলঙ্গ স্বামীজি লোকনাথ ও তাঁর বেণীমাধবকে বললেন, 'আমি উদয়াচল দর্শন করার জন্য পূর্বদিকে যাব।' লোকনাথ ও বেণীমাধব তাঁর অনুগমন করতে চাইলে ত্রৈলঙ্গ স্বামীজি তাঁদেরকে বলেন, 'নিম্নভূমিতে তোমাদের কর্ম রয়েছে। অতএব আমার সঙ্গে তোমাদের যাওয়া উচিত হবে না। তোমরা ফিরে যাও।' এই বলে স্বামীজী উদয়াচলের উদ্দেশ্যে পূর্বাভিমূখে চলতে লাগলেন।
ত্রৈলঙ্গ স্বামী বলেছেন, 'লোকনাথ হল আমার হৃদয়ের অংশ, সে তো ক্ষেপা শিব'। ত্রৈলঙ্গ স্বামীর নির্দেশে লোকনাথ ও বেণীমাধব সমতলভূমিতে অবতরণ করার উদ্দেশ্যে এরপর হিমালয়ের শৃঙ্গগুলো অতিক্রমকালে তিব্বত থেকে বদ্রীনাথ পাহাড়ে এসে কয়েকদিন অবস্থান করেন। সেখানে বাঘিনীর বাচ্চাদের দেখাশোনা করেছিলেন লোকনাথ। তারপর চন্দ্রনাথ পাহাড়ের শিখরদেশে গিয়ে কিছুদিনের জন্য অবস্থান করে কামাখ্যাতীর্থের পথে যাত্রা করলেন। লোকনাথ ও তার গুরুভাই বেণীমাধবের সঙ্গে চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে প্রায় ১৩০ বছর বয়সে নেমে আসেন। এখান থেকেই লোকনাথ ও তাঁর বাল্যবন্ধু বেণীমাধব বিভক্ত হয়ে যান এবং এতবছরের বন্ধুত্বের চিরবিদায় হয়। বেণীমাধব চলে যান কামাখ্যায়। এরপর তার বেণীমাধব থেকে মাধবানন্দে রূপান্তর ঘটে। মাধবানন্দ গিরি উত্তরাখণ্ডে ও কামাখ্যায় তার লীলা শুরু করেন।
লোকনাথ কামাখ্যা তীর্থ কিছুদিন কাটিয়ে সমতলভূমির পথে নামতে শুরু করলেন। লোকনাথ ব্রহ্মচারী কামাখ্যা হয়ে চলে আসেন তৎকালীন ত্রিপুরা জেলা বর্তমানে কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত দাউদকান্দি গ্রামে। সেখানেই পরিচয় হয় বারদী নিবাসী ডেঙ্গু কর্মকারের সাথে। এই ডেঙ্গুর সাথেই লোকনাথ ব্রহ্মচারী আসেন নারায়ণগঞ্জ এর বারদীতে। লােকনাথ ব্রহ্মচারী বারদীতে তার মহান মর্ত্যলীলা শুরু করেন। বারদীর বিখ্যাত জমিদার পরিবার বাবার কৃপা লাভ করে ধন্য হয়েছিল।
চন্দ্রনাথ পাহাড়ে অবস্থান কালে দাবানলের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে থেকে মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীকে উদ্ধার করে রক্ষা করেন লোকনাথ ব্রহ্মচারী। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী নিজে ঐ ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেছেন — "আমি ও বারদীর ব্রহ্মচারী মহাশয় এক সময়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে কিছুকাল একসঙ্গে সাধন - ভজন করছিলাম। সেই স্থানে একদিন হঠাৎ চারিদিকে দাবানল জ্বলে উঠল। পশু পাখি, কীটপতঙ্গ আগুনে দগ্ধ হতে লাগল। উত্তাপ আর সহ্য করা যায় না। আমাদের কুটিরের প্রায় দু'শো (২০০) হাত নীচে সমতলভৃমি ছিল। প্রথমে দেখি একটা প্রকান্ড সাপ। সাপটি লাফ দেওয়ার পরই অদৃশ্য হল। পরে একটা বাঘও ঐরূপ করল। তারপর ব্রহ্মচারী মহাশয় 'বম্ বম্' শব্দ উচ্চারণ করতে করতে আমাকে পিঠে করে দুইশত হাত নীচে লাফিয়ে পড়লেন। আমরা একটু আঘাত পাইনি।"
পরবর্তীকালে মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী যখন নারায়ণগঞ্জ এর বারদী আসেন, তখন বাবা লোকনাথকে দেখে চিনতে পারেন। বুঝতে পারেন, ইনিই তার জীবন বাঁচিয়েছিলেন। এরপর সারা ভারত এবং বাংলাদেশে বাবা লোকনাথের অসামান্য যোগশক্তির কথা প্রচার করে বেড়ান মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। তখন থেকেই মানুষ বাবা লোকনাথ সম্পর্কে জানতে পারেন।
বারদী মেঘনা নদীর তীরে শ্মশান ভূমিতেই বাবার আশ্রম কুটির। এখানে থেকে দিব্য কৃপা বর্ষিত হচ্ছে। কায়মনে বাবার কাছে যে যা প্রার্থনা করেন, তাই পান। বাবা কাউকে কৃপা থেকে বঞ্চিত করেন না। এভাবে একটু সময়ের ব্যাবধানেই বাবার আশ্রম তীর্থভূমিতে পরিণত হয়। কোন এক সময় ভাওয়ালের মহারাজ বাবার অনুমতি নিয়ে বাবার ফটো তুলে রাখেন। যে ফটো বর্তমান ঘরে ঘরে পূজিত হয়।
বারদীর আশ্রমের কাছেই এক বৃদ্ধা, নাম কমলা। সম্বল বলতে এক গরু ছাড়া কিছুই ছিল না। দুধ বিক্রি করে দিন চালাতেন। লোকমুখে বাবা লোকনাথের প্রশংসা শুনে এক বাটি দুধ নিয়ে বাবাকে দেখার জন্য চলে আসেন। বাবা লোকনাথ তাঁকে মা বলে ডাকে কাছে টেনে নেন। লোকনাথ বাবা তাঁকে “মা” ডাকতেন বলে পরবর্তীতে তিনি ‘গোয়ালিনী মা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি লোকনাথ বাবার আশ্রমেই কাটান।
এই ভাবে দিব্য লীলা করবার পর — একদা বাবা ঠিক করলেন তিনি এই দেহ রাখবেন। ইতিমধ্যে কাশীতে ইং ১৮৮৯ সালে ২৮০ বৎসর বয়স অতিক্রম করার পর পৌষ মাসের শুক্লা-একাদশীর দিন ত্রৈলঙ্গ স্বামী নিজ ইচ্ছায় মহাসমাধি যোগে ইহলীলা সংবরণ করেছেন। মহাপ্রয়াণের কয়েকদিন আগে বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী ভক্তদের কাছে প্রশ্ন করে বসেন 'বল দেখি, দেহ পতন হলে কিরূপ সৎকার হওয়া ভাল ?' এবং ভক্তদের অগ্নি দ্বারা দগ্ধ করার নির্দেশ দান করেন। বাবা লোকনাথ তাঁর ভক্তদেরকে মহা-সমাধির দিন ও সময় ধার্য করে দেন। বাবা লোকনাথ ১৯শে জ্যৈষ্ঠে দেহ ত্যাগ করবেন বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী বলেন '১৯শে জ্যৈষ্ঠ রবিবার সকাল ১০ ঘটিকার মধ্যে সবাই যেন আহার সেরে নেয়, কেউ যেন অভূক্ত না থাকে'। তিনি আরো বলেন 'যদি আমি উত্তরায়ণের দিবাভাগে দেহত্যাগ করি, আকাশ নির্মল থাকে এবং সূর্যকিরণে চারিদিক উদ্ভাসিত থাকে, তা হলে আমি সূর্যরশ্মি অবলম্বন করে সূর্য-মণ্ডলের পাড়ে চলে যাব। আর ফিরে আসবো না। তখন পুনর্জন্ম সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে।'
দেহরক্ষার দিন সকালে আকাশ মেঘলা ছিল কিন্তু আস্তে আস্তে মেঘ কেটে যায় এবং সূর্য্য কিরণ চারিদিক উদ্ভাসিত করে। সেবার ১৯শে জ্যৈষ্ঠ ছিল রবিবার। বাবাকে শেষ দর্শন করার জন্য বাংলা ১২৯৭ সালের ১৯শে জ্যৈষ্ঠ (ইং- ১লা জুন, ১৮৯০) শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে সকাল হতে হাজার হাজার ভক্তের সমাগম হয় বারদীর আশ্রমে। আশ্রমের পক্ষ থেকে মহাপ্রয়াণের সংবাদ ভক্তদেরকে না দেওয়া সত্ত্বেও ভাওয়ালের রাজা-রাণী, বারদীর জমিদার সহ অসংখ্য ভক্ত উপস্থিত ছিলেন।
ভক্তদের কান্না শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে বাবা বলেন — 'ওরে তোরা চিন্তায় এত কাতর হচ্ছিস কেন ? আমি কি মরে যাব ? কেবল আমার জীর্ণ দেহটা পাত হবে। আমি যেমন আছি, ছিলাম তোদের কাছে ঠিক তেমনই থাকব। আমার মৃত্যু নেই। ভক্তি আর বিশ্বাস নিয়ে আমাকে একটু আদর করে ডাকলেই দেখবি তোদের কত কাছটিতেই আছি। এখন তোদের কথা শুনছি, কৃপা করছি তখনও শুনব, দেখিস ডাকলেই কৃপা পাবি। একথা মিথ্যা হবে না। আরে আমি যাবই বা কোথায় ? সর্বভূতের অস্তিত্বে যে আমিই বিরাজ করছি। তোরা আত্মনিষ্ঠ হয়ে ভক্তিকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চল। তোদের বাধা দেবে কে ? তোরা যে আমারই সন্তান। আমার সন্তানের উপর কারো শাসন চলবে না। আমি উপদেশ করছি না এ আমার আদেশের স্থল। তোরা আমায় ছাড়া নস, এই ভাবটি ভূলিস না। আমি তোদের মধ্যেই আছি, তোদের মধ্যেই থাকব। আমি নিত্য, আমি অবিনাশী।'
দুঃখভারাক্রান্ত মনে গোয়ালিনী মা বাল্যভোগ তৈরি করে নিজ হাতে শেষ বাল্যভোগ খাইয়ে দেন লোকনাথ বাবাকে। বাল্যভোগ প্রসাদে পরিণত হওয়ার পর ভক্তগন মহাআনন্দের সথে তা ভক্ষণ করিল। বাবার আদেশে সেদিন আশ্রমের সবাই সকাল ৯ টার মধ্যেই ভোজন সারলেন।
প্রসাদ ভক্ষণ হওয়ার পর বাবা কাষ্ঠাসনে হেলান দিয়ে মহাযোগে বসেন। তিনি বেলা ১১-৪০ মিনিটে মহাযোগে উপবেশন করেন। সবাই নির্বাক অবাক হয়ে অশ্রু সজল চোখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন বাবার দিকে কখন বাবার মহাযোগ ভাঙ্গবে। কিন্তু বাবার ঐ মহাযোগ আর কখনও ভাঙ্গেনি। শেষ পর্যন্ত ১১-৪৫ মিনিটে দেহ স্পর্শ করা হলে দেহ মাটিতে পড়ে যায়। ভক্তগণ কাঁদতে থাকে উচ্চস্বরে এবং বাবার শরীর মন্দির থেকে তুলে এনে বিল্বতলে রাখা হয়। শোকের ছায়া নেমে আসে বারদী আশ্রমে। সমবেত কন্ঠে তখন উচ্চারিত হয় — "জয় বাবা লোকনাথ — জয় বারদীর ব্রহ্মচারী"।
বারদী আশ্রম প্রাঙ্গণে দেহ সৎকারের জন্য আনা হয় থরে থরে ঘৃত ও চন্দন। সাজানো হয় চন্দন কাঠের চিতা-শয্যা। তাঁর প্রিয় শিষ্য রামকুমার মুখাগ্নি করেন। বাবার ইচ্ছানুসারে বাবার দেহ আশ্রমের পাশে চিতায় রেখে দাহকৃত সমাপ্ত হয়। সমাপ্ত হয় স্থূল শরীরে তাঁর জীবনের শেষ ২৬-২৭ বৎসরের বারদী লীলা।
এই ধরাধাম থেকে চলে গেলেন লোকনাথ বাবা। কিন্তু রেখে গেলেন বাবার পূর্ণ স্মৃতি। আর রেখে গেলেন বাবার অমর বাণী — 'রণে বনে জলে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে আমাকে স্মরণ করিও আমিই রক্ষা করিব'।
বাংলা ১২৯৭ সালের ১৯শে জ্যৈষ্ঠ (ইং- ১লা জুন, ১৮৯০) রবিবার শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে তিনি বেলা ১১-৪০ মিনিটে যোগবলে ১৬০ বছরের পুরাতন মানবদেহ পরিত্যাগের মাধ্যমে তিনি তাঁর স্থূল দেহ ত্যাগ করে সুক্ষ্ম দেহ ধারণ করে, ত্রিলোকে বিরাজিত রইলেন।
বাবা লোকনাথের অষ্টোত্তর শতনাম (১০৮ নাম) —
১. লোকনাথ নাম রাখে গুরু ভগবান ।
২. শিবপ্রসাদ নাম রাখে পিতা রামনারায়ণ ॥
৩. মা কমলা বলে, আমার যাদুমনি ।
৪. সর্বেশ্বর নামে ডাকে যত গুণী ॥
৫. মহাযোগীশ্বর নামে ডাকে যত যোগীগন ।
৬. গোপাল নামে ডাকিত প্রতিবেশীগন ॥
৭. রামকৃষ্ণ পরমহংস ডাকে পূর্ণব্রহ্ম বলে ।
৮. গৌরাঙ্গশশি নাম তব দানিল ভ্রাতার দলে ॥
৯. মুকুন্দ মুরারী তুমি সকলের কাছে ।
১০. ভাওয়ালের রাজা, সর্বজ্ঞ তোমায় যাচে ॥
১১. দূর্বৃত্তেরা তব নাম মহাতেজা দিলা ।
১২. রোগনাশকারী নামে ডাকে মার্কিন মহিলা ॥
১৩. অনাথের নিকট তুমি অনাথ শরণ ।
১৪. আরেক নাম তব ভূভার হরণ ॥
১৫. পরম তান্ত্রিক নাম তান্ত্রিক এর ঠাই ।
১৬. হরেকৃষ্ণ নামে ডাকে বৈষ্ণব সবাই ॥
১৭. সিদ্ধ শ্রেষ্ঠ মহাযোগী তুমি গীতার বয়ান ।
১৮. সর্ব ঘটের ঘটি জানে সর্ব জন ॥
১৯. বিশ্বনাথ রূপে থাক তীর্থ বারানসী ।
২০. জগন্নাথ রূপে দেখা পেল জনৈক বারদীনিবাসী ॥
২১. আশ্রিত এর রক্ষক প্রতি ঘরে ঘরে ।
২২. মঙ্গলকারক নাম জগৎ ভিতরে ॥
২৩. দুষ্টের দমন কর্তা ক্ষত্রিয়েরা বলে ।
২৪. মহাপরীক্ষক তুমি প্রমান করিলে ॥
২৫. গুরুর গুরু হয়ে পরম গুরু হলে ।
২৬. বারদীর গোসাই নাম জানিল সকলে ॥
২৭. গোয়ালিনী মা বলে ভক্তি মুক্তি দাতা ।
২৮. সকল আর্তের কাছে তুমিই ত্রাতা ॥
২৯. নররূপে শিব, বলে ত্রৈলঙ্গস্বামী ।
৩০. সকল দেবদেবী ধারক বলে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ॥
৩১. কুণ্ডলিনী শক্তি রূপ থাক গূহ্য দ্বারে ।
৩২. সদগুরু তুমিই এই জগৎ মাঝারে ॥
৩৩. কলুশহারি নাম সকলেই জানে ।
৩৪. সমদর্শী এক নাম দানিল ভক্ত জনে ॥
৩৫. রক্ষাকর্তা তব নাম প্রমান করিলা ।
৩৬. বিপত্তারন নাম ডেঙ্গু যে দিলা ॥
৩৭. পাপ বিনাশক নাম নরিশা রাখিল ।
৩৮. দর্পহারি নাম কালীচরন দিল ॥
৩৯. অন্তর্যামী নাম তোমার কামিনী প্রচারিল ।
৪০. দয়াময় নাম তব শ্রীধর দানিল ॥
৪১. পাপিতাপি উদ্ধারিয়া পতিতোদ্ধারন হলে ।
৪২. প্রানদাতা নামে বনমালী বলে ॥
৪৩. মনোবাঞ্চাপূর্ণকারী বলে সর্ব জন ।
৪৪. ভবরোগের বৈদ্য নাম রাখে রোগীগন ॥
৪৫. সর্পদ্রষ্টা ব্যাক্তি বলে বিষ বিনাশক ।
৪৬. আরেক নাম তব মন ভয় নাশক ॥
৪৭. বিহারি বলে তোমায় জীবন রক্ষাকারি ।
৪৮. তুমি রহিয়াছ প্রভু সূক্ষ্মদেহে ধরি ॥
৪৯. অনাদি, অনন্ত নাম তোমার হে প্রভু ।
৫০. হরিহরব্রহ্ম তব রূপ ভুলিব না কভু ॥
৫১. রজনীকান্ত বলে তুমিই সর্ব ময় ।
৫২. বিঘ্নেশ নামে ডাকে ভক্ত অভয় ॥
৫৩. মনোহর রূপ তব মনহরন নাম ।
৫৪. আজানুলম্বিত বাহু রামের মতন ॥
৫৫. প্রকৃতির কর্তা হয়ে থামালে যে বান ।
৫৬. ভক্তবৎসল সদা তব প্রান ॥
৫৭. পলকহীন চক্ষে ধর জ্যাতি তপন ।
৫৮. মৃন্ময়েতে চিন্ময় হয়ে থাক সর্বক্ষন ॥
৫৯. মূর্তিমান গীতা তুমি বলল যামিনী ।
৬০. সুরথ বলিল তোমায় স্পর্শ মনি ॥
৬১. গুনের অতিত তুমি ত্রিগুন নিধান ।
৬২. বিহিতের বিধাতা তাই দাও বিধান ॥
৬৩. অচিন্তের চিন্তামনি জগৎ চিন্তাময় ।
৬৪. শোকনাশিয়া অশোক নাম হয় ॥
৬৫. ॐ রুপে বিরাজিছ এই ধরাধামে ।
৬৬. ভীতজন ডাকে তোমায় বরাভয় নামে ॥
৬৭. তুমিই হে প্রভু ত্রিতাপ হারি ।
৬৮. বৈষ্ণব বলে তুমিই গোলকবিহারী ॥
৬৯. বৈদিক ভাবেতে দেখি তুমি যে কবি ।
৭০. আলোকজ্যতি স্বরূপ উদ্ভাসিত রবি ॥
৭১. পরব্রহ্ম সাক্ষাৎ তুমি প্রমান করিলে ।
৭২. মৃত্যুঞ্জয় নাম তব সবারে দেখালে ॥
৭৩. জলেশ্বর নাম মেঘনা নদীতে দেখালে ।
৭৪. রক্ষাকর্তা হয়ে সবার প্রান বাঁচালে ॥
৭৫. গৌরাঙ্গ এক রূপ করিয়া ধারন ।
৭৬. কুলীনের কাছে তুমিই সাধন ॥
৭৭. স্বজন পালক নাম তব হে ব্রহ্মচারী ।
৭৮. দুষ্টকে দেখা দিলে, হইয়া চক্রধারী ॥
৭৯. চিরসুন্দর তুমি বিশ্ব চরাচরে ।
৮০. জ্ঞানমূর্তি নামে সকলেই স্মরে ॥
৮১. শান্তিশক্তি নাম রাখে শিবানন্দ ।
৮২. মোহ তিমিরহারী বলে যে ব্রহ্মানন্দ ॥
৮৩. জীবের প্রভু জীবের জীবন ।
৮৪. সর্ব দ্রষ্টা তুমি সকল হের সর্ব ক্ষন ॥
৮৫. শাক্তগন পূজে শক্তি রূপে তোমায় বিলক্ষন ।
৮৬. সকল মার্গ বলে তুমিই ভগবান ॥
৮৭. বেণীমাধব, সকলের প্রানের বন্ধু তোমায় বলে ।
৮৮. শক্তিধর রূপে সবারে রক্ষ অবহেলে ॥
৮৯. অন্নদাসুন্দরী তোমায় জ্যান্ত শিব বলে ।
৯০. দন্ডধারী নাম উপনয়ন কালে ॥
৯১. ব্রহ্ম পরাৎপর তব এক নাম হয় ।
৯২. জগৎপিতা বলি কেহবা ডাকয় ॥
৯৩. মাতা হইলে তুমি কালী রূপ ধরিয়ে ।
৯৪. সকলেই বাবা ডাকে বিপদে পরিয়ে ॥
৯৫. সকলেই জানে তুমি অবিদ্যা নাশন ।
৯৬. বহুরূপে একনাম সবে জানে মনে মন ॥
৯৭. স্নিগ্ধ জ্যোতি নাম তাই শ্যাম শশধর ।
৯৮. কৃপার আধার নাম জগৎ চরাচর ॥
৯৯. মহাপণ্ডিত তুমি জানে পণ্ডিত সমাজ ।
১০০. সর্বশাস্ত্রবেত্তা নাম তব বিদ্বানেরা কয় ॥
১০১. স্থান দাতা নামে দাও হে আশ্রয় ।
১০২. নির্গুন ব্রহ্মময় তুমি সকলে জানয় ॥
১০৩. অসীম তোমার নাম কিবা সীমা আছে ।
১০৪. সৎচিৎ আনন্দ নাম সকলের কাছে ॥
১০৫. মহেশ্বর রূপে বিরাজিছ ভুবনে ।
১০৬. সিদ্ধযোগী নাম তব সকলেই জানে ॥
১০৭. ছলাময় নাম তব ক্ষিতিশ রাখিল ।
১০৮. ষড়ৈশ্বর্য় ময় তুমি সিদ্ধ সাধু কহিল ॥
অষ্টোত্তর শতনাম হৈল সমাপন।
লোকনাথ বাবার নাম করি স্মরন ॥
বিপদের সময়ও তারে করিও স্মরন ।
অবশ্যি বাবার কৃপায় হইবে রক্ষন ॥
১০৮ নাম যেবা দৈনিক পড়িবে ।
অবশ্যি বাবার কৃপা সেইজন পাবে ॥
যেবা শোনে, যেবা পড়ে যেবা রাখে ঘরে ।
সমস্ত সমস্যা পলায় দূরে ॥
আজ বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ১৩৬তম তিরোধান দিবসে বাবার চরণে বারংবার প্রণাম জানাই।
জয় বাবা লোকনাথ🙏