24/02/2024
ধৃতরাষ্ট্র উবাচ
ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ।
মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।১/১।।
ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করলেন- "হে সঞ্জয়! ধর্মক্ষেত্রে, কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধার্থে সমবেত হয়ে আমার এবং পাণ্ডুপুত্রগণ কি করল?"
অজ্ঞানরূপ ধৃতরাষ্ট্র এবং সংযমরূপ সঞ্জয়। অজ্ঞান মনের অন্তরালে থাকে। অজ্ঞানাবৃত মন ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ; কিন্তু সংযমরূপ সঞ্জয়ের মাধ্যমে তিনি দেখেন ও শোনেন। ধৃতরাষ্ট্র জানেন যে পরমাত্মাই একমাত্র সত্য, পুনশ্চ যতক্ষণ এর থেকে উৎপন্ন মোহরূপ দুর্যোধন জীবিত থাকে, ততক্ষণ এর দৃষ্টি সর্বদা কৌরবগণের উপরেই থাকে অর্থাৎ বিকারের উপরেই থাকে।
শরীর একটি ক্ষেত্র। যখন হৃদয়-দেশে দৈবী সম্পত্তির বাহুল্য ঘটে, তখন এই শরীর ধর্মক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং যখন এতে আসুরিক সম্পত্তির বাহুল্য ঘটে, তখন এই শরীর কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়। 'কুরু' অর্থাৎ কর– এই শব্দ আদেশাত্মক। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন- "প্রকৃতিজাত তিনটি গুণের বশীভূত হয়েই মানুষ কর্ম করে।" সে ক্ষণমাত্রও কর্ম না করে থাকতে পারে না, গুণত্রয় তাকে দিয়ে করিয়ে নেয়। ঘুমন্ত অবস্থাতেও কর্ম বন্ধ হয় না, সেটিও সুস্থ দেহের আবশ্যক খোরাক মাত্র। এই তিনগুণ মানুষকে দেবতা থেকে শুরু করে কীটপর্যন্ত দেহের বন্ধনেই আবদ্ধ করে। যতক্ষণ প্রকৃতি ও প্রকৃতিজাত গুণ জীবিত, ততক্ষণ 'কুরু' সক্রিয় থাকবে। অতএব জন্ম-মৃত্যুময় এই ক্ষেত্র, বিকারযুক্ত এই ক্ষেত্রই 'কুরুক্ষেত্র' এবং পরমধর্ম পরমাত্মাতে প্রবেশ প্রদান করতে পারে যে পুণ্যময় প্রবৃত্তিসমূহ, সেই পুণ্যময় প্রবৃত্তি সমূহের (পাণ্ডবের) ক্ষেত্রই 'ধর্মক্ষেত্র'।
পুরাতত্ত্ববিদ্ পাঞ্জাবে, কাশী-প্রয়াগের মধ্যে এবং অন্যান্য বহু স্থানে কুরুক্ষেত্রের নির্দিষ্ট স্থান অনুসন্ধান কার্যে রত আছেন; কিন্তু গীতাকার স্বয়ং বলেছেন, যে ক্ষেত্রে এই যুদ্ধ হয়েছিল সেই ক্ষেত্রটি কোথায়। 'ইদং শরীরং কৌন্তেন ক্ষেত্রমিত্যভিধীয়তে।' (অ. ১৩/১)- "অর্জুন! এই দেহই ক্ষেত্র এবং যিনি একে জানেন এবং আয়ত্তের অধীনে আনতে পারেন তিনিই ক্ষেত্রজ্ঞ।" এরপর তিনি ক্ষেত্রের বিস্তার সম্বন্ধে বললেন, যাতে দশটি ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার পাঁচটি বিকার ও তিনটি গুণের বর্ণনা আছে। এই দেহই ক্ষেত্র, এক মল্লভূমি। এর মধে যুদ্ধাভিলাষী প্রবৃত্তি দুটি–'দৈবী সম্পদ্' ও 'আসুরী সম্পদ্', 'পাণ্ডুর সন্তানগণ' 'ধৃতরাষ্ট্রের সন্তানগণ', সজাতীয় ও বিজাতীয় প্রবৃত্তিসমূহ।
তত্ত্বদর্শী মহাপুরুষের শরণাগত হলে এই দুই প্রবৃত্তির মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়, একেই ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞের সংঘর্ষ ও প্রকৃত যুদ্ধ বলা হয়। ইতিহাসের পাতা বিশ্বযুদ্ধের কাহিনীতে পরিপূর্ণ; কিন্তু সেই সব যুদ্ধে যাঁরা বিজয়ী হয়েছেন, তাঁরা কেউই শাশ্বত বিজয়ী হননি, এর মধ্যে প্রতিহিংসা ছিল। প্রকৃতিকে শান্ত করে প্রকৃতির ঊর্ধ্বের সত্তার দিগ্দর্শন করা এবং তাতে প্রবেশ করাই প্রকৃত বিজয়। এই হল শাশ্বত বিজয় যার পশ্চাতে পরাজয় নেই। একেই বলে মুক্তি, যার পর জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন নেই।
এইভাবে অজ্ঞানে আবৃত্ত প্রত্যেক মন সংযমের দ্বারা জানতে পারে যে ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞের যুদ্ধের পরিণাম কি? যার যেমন সংযমবৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়, তেমনি তাঁর দৃষ্টি খুলতে থাকে।