25/03/2021
পছন্দের কাউকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন?
আপনার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা।
জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতে গিয়ে আমরা অনেকেই একটি বড় ভুল করি। সেটি হলো, কারো বাহ্যিক দ্বিনদারি/ভালোমানুষী দেখে তার ব্যাপারে প্রচণ্ড মুগ্ধ হয়ে যাওয়া। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা:
এক.
যে ছেলেকে বাহ্যিকভাবে দেখে আপনি দুর্বল হয়ে গেছেন, তার অভ্যন্তরীণ দ্বিনদারির অবস্থা তেমন ভালো না-ও হতে পারে। হতে পারে, সে নামাজের ব্যাপারে উদাসীন। বিশেষত ফরজের বাইরে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা নামাজের ব্যাপারে তার মধ্যে হয়ত তেমন সিরিয়াসনেস নেই। হতে পারে, সে দৃষ্টির হেফাজত করে না। এমনও হতে পারে, সে আসলে প্রচণ্ড অহংকারী—স্ত্রীর মতামতকে ভবিষ্যতে পাত্তাও দেবে না। অপরদিকে এমনও হতে পারে: আপনার বাছাইকৃত মেয়েটি গায়রে মাহরাম মেন্টেইন করে না। হয়ত সে গিবত করাকে নিজের অভ্যাসে পরিণত করেছে। হতে পারে, সে বিভিন্ন সিরিয়াল দেখায় আসক্ত। এমনও হতে পারে, সে বাবা-মারই আনুগত্য করে না; ভবিষ্যতে আপনার কথা শুনবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। এমন অনেক অজানা সমস্যা থাকতে পারে, যেগুলো জানতে পারলে তার প্রতি আপনার মুগ্ধতা হাওয়া হয়ে যাবে।
দুই.
এ-তো গেলো, তার অভ্যন্তরীণ দ্বীনদারির অবস্থা। তার দুনিয়ার জীবনেও হয়তো বড় কোনো দুর্বলতা আছে, যা আপনি বাহ্যিকভাবে বুঝতে পারছেন না। হতে পারে, তার চোখ দুটো দুনিয়াবি কামনা-বাসনায় পরিপূর্ণ, যা সে অন্যকে বুঝতে দেয় না। তার মধ্যে থাকতে পারে বিরক্তিকর কোন বদ-অভ্যাস, যা তার সাথে গভীরভাবে না মেশা পর্যন্ত কেউ বুঝতে পারবে না।
তিন.
শুরুর কথাগুলোতে ফিরে যাই। যার বাহ্যিক দ্বীনদারি দেখে আপনি মুগ্ধ, তার অজানা অনেক সমস্যা আপনি জানেন না। ফলে আপনার মুগ্ধতা দিনে দিনে এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে, আপনি ভাবতেও পারছেন না—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তার চেয়েও দ্বিনদার এবং বেটার কাউকে আপনার জন্য মিলিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিবিশেষের প্রতি মুগ্ধতার কারণে আপনি নিজেকে এক পর্যায়ে খুবই সস্তা ভাবতে শুরু করবেন। এমনকি আপনার ভেতর থেকে আত্মমর্যাদাবোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ গুণটি নিঃশেষ হতে থাকবে।
চার.
তাহলে সমাধান কী?
ইসলামই সমাধান। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, ব্যক্তিবিশেষের জন্য পাগলপারা হওয়া যাবে না; বরং চক্ষুশীতলকারী (قُرَّةُ أَعْيُنْ) কাউকে জীবনসঙ্গী করার জন্য আল্লাহর কাছে চাইতে হবে।
চক্ষুশীতলকারী মানে কি? এর মানে, যাকে দেখলে আপনার চোখ শীতল হয়ে যাবে! আপনি তাকে দেখলে তৃপ্তি পাবেন। তার সাহচর্যকে নিয়ামত মনে করবেন। ‘চক্ষুশীতলকারী’ এমন একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ, যা ব্যক্তির মধ্যে দ্বিনি ও দুনিয়াবি কল্যাণসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে। এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিবিশেষকে নয়, সাধারণভাবে এই গুণবিশিষ্ট কাউকে আল্লাহর নিকট চাইতে হবে বেশি করে। মাথা থেকে এই ধারণা সরাতে হবে যে, ‘অমুকের চেয়ে ভালো কীভাবে পাব? অমুক তো আমার পরীক্ষিত’ ইত্যাদি। আল্লাহর কাছে বলুন, ‘আল্লাহ! আমার জন্য যে উত্তম হবে, তাকেই মিলিয়ে দাও।’ আরো বলবেন, ‘এমন কাউকে মিলিয়ে দাও, যার উপর তুমি সন্তুষ্ট এবং আমরা পরস্পরের উপর সন্তুষ্ট থাকবো।’ এভাবে কাউকে নির্দিষ্ট না করে ব্যাপকভাবে আল্লাহর কাছে চান। নিজে চেয়ে নিজেই পরে আফসোস করার দরকার নেই।
প্রশ্ন আসতে পারে : তাহলে কি ‘নির্দিষ্ট’ কাউকে আল্লাহর কাছে চাওয়া জায়েয নেই? উত্তরে আলিমগণ বলেন, হ্যাঁ জায়েয। বিশেষত, কারও ব্যাপারে খুব ভালো জানাশোনা থাকলে, তাকে আল্লাহর কাছে চাওয়াতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা অনেকেই এক্ষেত্রে আবেগের কাছে হেরে যাই। বাহ্যিক কিছু বৈশিষ্ট দেখে ফিদা হয়ে যাই। তাই, নিরাপদ হলো, আল্লাহর কাছেই নিজের পছন্দকে সোপর্দ করে দেওয়া। তার মানে কিন্তু এই না যে, আমরা খোঁজখবর নেবো না। নেবো।
পাঁচ.
আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরকে কেউ অতিক্রম করতে পারবে না। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে যতই সম্ভাবনাময় মনে হোক-না কেনো, তাকদিরের ফয়সালা না থাকলে নির্দিষ্ট কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়া সম্ভব নয়। এমতাবস্থায়, আমরা যখন কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি, আর সেই স্বপ্নটা ভাগ্যের বাস্তবতায় এসে ভেঙে যায়, তখন হতাশ হয়ে পড়ি। এজন্য আমাদের কখনই উচিত নয়, নির্দিষ্ট কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা বা তার জন্য মালিকের দরবারে দু‘আ করা; বরং আমরা সাধারণভাবে ‘চক্ষুশীতলকারী’ কাউকে কামনা করবো এবং সেই অদেখা-অচেনা চক্ষুশীতলকারীর জন্য আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ জানাবো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা বান্দাকে পরিতৃপ্ত করেন। এটুকু বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহর জন্য এটা কোনো ব্যাপারই না যে, তিনি উত্তম কাউকে মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে দিতে পারেন। অতএব, আল্লাহ্ ‘আযযা ওয়া জাল্লার উপর পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে।
হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, ‘‘আমার ব্যাপারে বান্দা যেমন ধারণা রাখে, আমি তার সাথে তেমনই (আচরণ করি)। আর সে যখন আমার নিকট দু‘আ করে, তখন আমি তার সাথেই থাকি।’’ [মুসলিম, আস-সহিহ: ২৬৭৫; তিরমিযি, আস-সুনান: ২৩৮৮; আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৯৭৪৯]
অতএব, আল্লাহর সক্ষমতার সামনে নিজের মুগ্ধতা, বাস্তবতা—সবকিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করতে হবে এবং তাঁর (আল্লাহর) ব্যাপারে সর্বোত্তম ধারণা রেখে উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য অবিরত দু‘আ করে যেতে হবে। পাশাপাশি, নিজেকেও সেভাবে প্রস্তুত করতে হবে। নেককার জীবনসঙ্গী চাওয়ার বিভিন্ন দু‘আ কুরআন-হাদিসে আছে। সেগুলো আমল করতে হবে। পাশাপাশি সকল গুনাহ, অবৈধ চ্যাটিং, কথা-বার্তা, কুদৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আল্লাহ্ আমাদের নেক মনোবাসনা পূর্ণ করুন। আমিন।