09/05/2026
প্রশ্ন: অশৌচ পালনের বিধান কী? জ্ঞাতি কেউ মারা গেলে কেউ ৩০ দিন আবার কেউ ১৫ বা ১১ দিন আবার কেউ ১০ দিনে করে। এর মধ্যে কোনটি উত্তম?
উত্তর: সনাতন সমাজে “অশৌচ” বা “শৌচ” সংক্রান্ত নানা প্রথা প্রচলিত আছে। কারও মৃত্যু বা জন্মের পরে কতদিন অশৌচ পালন করতে হবে— এ নিয়ে বহু মতভেদ দেখা যায়। কেউ ১০ দিন, কেউ ১২ দিন, কেউ ১৫ দিন, আবার কেউ ৩০ দিন পর্যন্ত অশৌচ পালন করেন। এই ভিন্নতার মূল কারণ হলো— সমাজে প্রচলিত অধিকাংশ নিয়ম বৈদিক নয়, বরং স্মৃতি, পুরাণ ও তন্ত্রআদি-ভিত্তিক। তাই এই বিষয়ে সঠিক ধারণা লাভের জন্য আমাদেরকে দুই দিক থেকেই বিচার করতে হবে—
১। পৌরাণিক বা স্মৃতি-শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত।
২। বৈদিক (বেদ অনুকূল যে শাস্ত্র) সিদ্ধান্ত।
🌿 পৌরাণিক শাস্ত্র মতে অশৌচ: পৌরাণিক শাস্ত্র মতে, বর্ণ অনুযায়ী অশৌচের বিধান আছে। বর্তমানে যে অশৌচ পালন করে তা বিভিন্ন পুরাণ অনুযায়ী পালন করে থাকে। পৌরাণিক শাস্ত্র অনুযায়ী অশৌচ দুই প্রকার। যেমনঃ—
১৷ জননাশৌচ:— পরিবারে কেউ জন্মগ্রহণ করলে যে অশৌচ হয়৷
২। মরণাশৌচ:— পরিবারে আপন জন কেউ মৃত্যুতে যে অশৌচ পালন করতে হয়৷
এগুলো স্মৃতি অনুয়ায়ী পালন করা হয়। বিভিন্ন স্মৃতিতে এগুলো পালনের বিধান রয়েছে।
সমাজে যে নিয়মে করা হয় তা বর্ণ অনুযায়ী পালনের বিধান আছে। জন্মশৌচ ও মরণাশৌচ পালনের বিধিবিধান একই কিন্তু এগুলো বর্ণনুযায়ী পালন করতে হয়। চার বর্ণের জন্য চার বিধিবিধান। নিচে বিধিবিধান গুলো দেওয়া হলোঃ
ব্রাহ্মণন্য সপিণ্ডানাং জননমরণয়োর্দশাহমাশৌচম১॥ দ্বাদশাহং রাজন্যন্য।।২ মাসং শূদ্রন্য ৩॥ সাপগুতা চ পুরুষে সপ্তমে ৰানবস্তুতে। ৪। অশৌচে হোমদান প্রতিগ্রগস্বাধ্যায় নিবর্ত্তন্তে।।৫ নাশৌচে কন্যচিদন্নমশ্নীয়াৎ।।৬
[বিষ্ণু সংহিতা ২২/১-৬]
অনুবাদঃ সপিগুদিগের জন্মমরণে ব্রাহ্মণের অশৌচ দশদিন, ক্ষত্রিয়ের বারদিন; বৈশ্যের পনেরদিন; শূদ্রের একমাস। আর সপ্তম পুরুষে সপিণ্ডতা নিবৃত্ত হয়। অশৌচকালে কোন, দান, প্রতিগ্রহ এবং স্বাধ্যায়ের অধিকার থাকে না। অশৌচাবস্থাপন্ন কোন ব্যক্তির অন্ন ভোজন করিবে না।
অনুরুপ ভাবে এই রকম বিধান অনেক পুরাণেই পাওয়া যায় যেমন: [সংবৃত্ত সংহিতা ৩৭/৩৮ ] [ব্রহ্মপুরাণ ২২১/১৪৭-১৪৮] [মার্কেণ্ডেয় পুরাণ ৩৫/৪০-৪১] [গরুর পুরাণ পূর্বখণ্ড ১০৬/১৯-২০] [গরুড় পুরাণ পূর্বখণ্ড ৫০/৮১-৮৪] [পরাশর সংহিতা ৩/৪] [মৎস্য পুরাণ ১৮/২-৩] [অগ্নিপুরাণ ১৫৮/১৩] [সংবর্ত্ত সংহিতা ৩৮ শ্লোক] [ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান প্রকৃতখন্ড ১৬/৮৯-৯০]
অনেকেই জানতে চাই যে, জ্ঞাতিগুষ্টি কতদিন ধরে অশৌচ পালন করতে হবে? সেই বিধানও পাওয়া যায়। যথাঃ
সপিণ্ডতা তু পুরুষে সপ্তমে বিনিবর্ত্ততে।
জননে মরণে বিপ্রো দশাহেন বিশুধ্যতি ॥ ২ ক্ষত্রিয়ো দ্বাদশাহেন বৈশ্যঃ পক্ষেণ শুধ্যতি।
মাসেন তু তথা শূদ্রঃ শুদ্ধিমাপ্নোতি নান্তরা ॥ ৩
[শঙ্খ সংহিতা-১৫/২-৩]
অনুবাদঃ সপ্তম পুরুষ পর্য্যন্ত জ্ঞাতিবর্গের পরস্পরের সপিণ্ডতা থাকে ; সপিণ্ড জ্ঞাতির জননে অথবা মরণে ব্রাহ্মণ দশদিন অশৌচ ভোগ করিয়া শুদ্ধ হয়, ক্ষত্রিয় বারদিন, বৈশ্য পনেরদিন, শূদ্র একমাস অশৌচ ভোগ করিয়া শুদ্ধ হয়।
উপরোক্ত প্রমাণ থেকে জানতে পারলাম যে যারা পুরাণ অনুযায়ী করতে চান তারা বর্ণানুয়ায়ী করবেন। যদি আপনি ব্রাহ্মণ বর্ণের হন তবে ১০ দিন, ক্ষত্রিয় হলে ১২ দিন এবং বৈশ্য হলে ৩০ দিন পর শ্রাদ্ধ করে শূচিতা লাভ করবেন।
🔥এখন দেখবো বৈদিক শাস্ত্রে এই অশৌচ বিধিবিধান কি আছে। 🔥
বৈদিক শাস্ত্রে অশৌচ বলে কোনো কিছু নেই।
একজন মানুষ কীভাবে তাঁর জীবন সুন্দর করে পরিচালনা করবে তার জন্য পরমেশ্বর আমাদের ষোড়শ সংস্কার ব্যবস্থা করেছে। সংস্কার মূলত কী? জীবনের সাথে সংস্কারের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রয়েছে। সংস্কার সংস্কৃত শব্দ। মন, বচন, কর্ম এবং শরীর কে পবিত্র করাই হলো সংস্কার। আমাদের সকল প্রবৃতি এবং চিত্তবৃত্ত পালনের জন্য আমাদের মনে সংস্কার রয়েছে। সংস্কার শব্দ এর ব্যুৎপত্তি 'সম্' উপসর্গ পূর্বক 'কৃ' ধাতু তে 'ঘঞ' প্রত্যয় যুক্ত হয়ে "সংস্কার” শব্দ হয়। এর অর্থ শুদ্ধি, পরিষ্কার, সুধার। মন, রুচি, আচার-বিচার কে পরিশুদ্ধ তথা উন্নত করাই সংস্কার। বাস্তবে সংস্কৃতি শব্দ সংস্কার শব্দ এসেছে। এর অর্থ হলো পরিমার্জিত, পরিকৃত, সুধার। এই অর্থে মানবের মাঝে যা দোষ তার শোধন করার জন্য, সেগুলো কে সুসংস্কৃত করার জন্যই সংস্কারের প্রয়োজন করা হয়েছে! সংস্কার দ্বারা মানবীয় মন কে এক বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দ্বারা নির্মল, সন্তুলিত এবং সুসংস্কৃত করা
হয়। জীবনে কার্যকরী হয় এমন সত্যবৃত্তির বীজারোপণ করাই এই সংস্কারের কাজ। যদি কোন বালকের সকল সংস্কার সঠিক রীতি দ্বারা সমুচিত বাতাবরণে করা হয়, তাহলে তার ব্যক্তিত্ব সুবিকশিত হয়। সংস্কার পদ্ধতির দ্বারা তার মনোবিকারসমূহ নিরাকরণ হয় তার সৃজনাত্মক শক্তি কে বাড়িয়ে দেয়। অত:পর জীবনের বহুমূল্য বিশিষ্টতা, সম্পদ এবং চরিত্র নির্মাণের আধার হলো সংস্কার।
পাণিনির সূত্র অনুসার,
"সম্পর্যপেভ্যঃ করোতৌ ভূষণে" "যার দ্বারা শরীরাদি সুভূষিত হয়, সেগুলোকেই সংস্কার বলা হয়।"
"সংস্করণং গুণান্তরাধানম্ সংস্কারঃ" গুণের আধার কে সংস্কার বলা হয়।
ঋষি দয়ানন্দ সরস্বতী জীর মতানুসারে,
"সংস্কার পালন করে শরীর এবং আত্মা সুসংস্কৃত হলে ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ প্রাপ্ত হয়, এবং সন্তান অত্যন্ত যোগ্য হয়ে গড়ে উঠে।" এইজন্য সকলের উচিত সংস্কার পালন করা।
গর্ভধারণ থেকে অন্তেষ্টিক্রিয়া। এই ষোড়শ সংস্কার ত সবগুলো ঈশ্বর আমাদের জন্য করেছে এগুলো কি করে অশৌচ হয় আপনারাই বিচার করবেন। আরেকটা ঈশ্বরের নিয়ম কে আমরা অশৌচ বলি কেমন মূর্খ আমরা!
অন্ত্যেষ্টি শেষ সংস্কার। অন্ত্যেষ্টি শব্দে “অন্ত্য” অর্থ শেষ বা সর্বশেষ এবং “ইষ্টি” অর্থ যজ্ঞ, শুভকর্ম বা সংস্কার বোঝায়। তাই মৃত্যুর পর বিধি অনুযায়ী মৃতদেহের সৎকার বা দাহ করাকেই অন্ত্যেষ্টি বলা হয়। এটিই মানবদেহের শেষ সংস্কার।
কিন্তু অন্ত্যেষ্টি শেষ সংস্কার বলেই মৃত ব্যক্তির জন্য আর কোনো কর্তব্যই অবশিষ্ট থাকে— এমন কথা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা যায় না। যেমন পুত্রেষ্টি যজ্ঞে কোনো পাপ বা অশৌচ হয় না, তেমনি অন্ত্যেষ্টি কর্মেও কোনো পাপ বা অশৌচ হতে পারে না। বরং “ইষ্টি” শব্দের অর্থই যজ্ঞ বা শুভকর্ম; তাই অন্ত্যেষ্টি অবশ্যই একটি পুণ্যকর্ম। যদি এতে পাপ বা অশৌচ থাকত, তাহলে এর নাম কখনো “ইষ্টি” হতো না। “অন্ত্যেষ্টি” শব্দ নিজেই প্রমাণ করে যে মৃতদেহের সৎকার বা দাহ করা একটি শুভ ও পুণ্যময় কর্ম। এর নাম নরমেধ, পুরুষমেধ, নর যাগ ও পুরুষ যাগ। শ্মশান ভূমিতে জ্বলন্ত চিতায় সমিধা, সুগন্ধি, রোগনাশক ও বুদ্ধিবৰ্দ্ধক ওষধি এবং ঘৃত আহুতি দ্বারা মৃত শরীরকে ভস্মীভূত করাই অন্ত্যেষ্টি সংস্কার। জীব তার কৃত কর্ম্মের ফল নিজেই ভোগ করে। বংশধরদের কোন কার্যই তাকে সাহায্য করতে পারে না। পবিত্র বেদ বলছে-
বায়ুরনিলমমৃতমথেদং ভস্মান্তং শরীরম্।
ওম্ ক্রতো স্মর। ক্লিবে স্মর। কৃতং স্মর।।
[যজুর্বেদ ৪০/১৫]
পদার্থ:- (বায়ুরনিলমমৃতমথেদং) প্রানস্বরূপ বায়ু অবিনাশি কিন্তু (ভষ্মান্তং) ভষ্মেই অন্ত (শরীরম্) শরীরের
অর্থঃ---প্রাণস্বরূপ বায়ু তথা আত্মা অবিনাশী কিন্তু শরীর বিনাশী ভষ্ম তথা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মাধ্যমেই ইহার অন্ত হইয়া থাকে।
🍀 উপনিষদের বলছে-
এতদ্বৈ পরমং তপো যং প্রেতং অরন্যং হরন্তি পরমং হৈব লোকাং জয়তি য এবং বেদ। এতদ্বৈ পরমং তপো ষং প্রেতম্ অগ্নৌ অভ্যাদধতি পরমং হৈব লোকাং জয়তি য এবং বেদ।
[বৃহদারন্যক উপনিষদ ৫/১১/১]
অর্থঃ--মৃতদেহকে সৎকারের জন্য অরন্যে নিয়ে যাও ইহাকে জ্ঞানরুপ তপস্য বলে জানো। সৎকারের জন্য মৃতদেহকে অগ্নির হাতে তুলে দাও এবং এটাকে বোঝবার চেষ্টা করো এর জ্ঞান উপলব্ধি করো তাহলেই তুমি পরমলোক লাভ করবে।
মনুসংহিতা বলছে-
নিষেকাদিঃ শ্মশানান্তো মন্ত্রৈর্যস্যোদিতো বিধিঃ। [মনুস্মৃতি ২/১৬]
নিষেক থেকে আরম্ভ করে শ্মশানকৃত্য অর্থাৎ দাহকালীন অন্তেষ্টি পর্যন্ত সমস্ত বিধান বা কর্তব্যতা ... মন্ত্রের দ্বারা নির্বাহিত হয়।
উপরোক্ত প্রমাণ দ্বারা দেখি মৃতদেহকে দাহ করার মাধ্যমেই তার সমস্ত সংস্কারকাজ সমাপ্ত হয়ে যায়।
শ্রাদ্ধের প্রকৃত অর্থ কী?
পূজ্য ব্যক্তিদের শ্রদ্ধার সহিত সেবা করাকেই 'শ্রাদ্ধ' বলা হয় । এই তৰ্পণ, শ্রাদ্ধাদি কর্ম, প্রত্যক্ষরূপে বিদ্যমান অর্থাৎ জীবিত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে করা হয়, মৃতদের জন্যে নয় । কেননা মৃত ব্যক্তিদের পক্ষে কখনোই প্রত্যক্ষভাবে আবির্ভূত হয়ে স্ব-শরীরে এই সেবা প্রাপ্তি সম্ভব না। আমাদের প্রপিতামহ-প্রপিতামহী, পিতামহ-পিতামহী, মাতা-পিতা, স্বগোত্রীয় কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ, গুরু বা আচার্য তথা অন্য যেকোনো বিদ্বান্ বা শিক্ষিত ব্যক্তি যাঁরা অনুভবপ্রবীণ, জ্ঞানপ্রবীণ ও মান-সম্মান পাওয়ার যোগ্য তাদেরকে "পিতর" বলা হয়। তাদের যথাযথভাবে সন্মান প্রদর্শন, তাঁদের সাথে ভালো আচরণ ও তাঁদের শ্রদ্ধা করাই পিতৃযজ্ঞ।
‘যে সমানাঃ সমনসঃ পিতরো যমরাজ্যে’, [যজু০ ১৯। ৪৫ ] ‘পিতৃভ্যঃ স্বধায়িভ্যঃ স্বধা নমঃ', [যজু০ ১৯।৩৬] পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহাদির তথা ‘নমো বঃ পিতরো রসায়’ ইত্যাদি মন্ত্র [যজু০ ২। ৩২] পিতরদের সেবা ও সৎকার করার পক্ষে প্রমাণস্বরূপ ।
এ বিষয়ে মহর্ষি মনু বলেছেন— "কুর্য়াদহরহঃ শ্রাদ্ধমন্নাদ্যেনোদকেন বা। পয়োমূলফলৈর্বাঽপি পিতৃভ্যঃ প্ৰীতিমাবহন্।। (মনু০ ৩।৮২)" অর্থাৎ গৃহস্থ ব্যক্তি অন্নাদি ভোজ্য পদার্থ এবং জল, দুধ, কন্দমূল, ফল ইত্যাদি দ্বারা পিতরদের প্রসন্নতার জন্য প্রতিদিন শ্রাদ্ধ করবে অর্থাৎ শ্রদ্ধা সহকারে পিতামাতার সেবা-সৎকার করবে।এখানে ভগবান্ মনু স্পষ্টভাবে জীবিত পিতরদের সেবা করার জন্য বিধান দিয়েছেন এবং সেটি প্রতিদিন করতে বলেছেন।
জীবিত পিতরদের শ্রাদ্ধ
পিতৃভ্যঃ স্বধায়িভ্যঃ স্বধা নমঃ পিতামহেভ্যঃ স্বধায়িভ্যঃ স্বধা নমঃ প্রপিতামহেভ্যঃ স্বধায়িভ্যঃ স্বধা নমঃ।
অক্ষন্ পিতরো৩মীমদন্ত পিতরো৩তীতৃপন্ত পিতরঃ পিতরঃ শুন্ধধ্বম্।। [যজু০ ১৯।৩৬]
(স্বধায়িভ্যঃ পিতৃভ্যঃ) অন্ন-জলের ইচ্ছাপোষণকারী পিতাদের জন্যে (স্বধা) অন্ন-জল প্রস্তুত হোক, (নমঃ) তাদের নমস্কার প্রভৃতি দ্বারা আদর হোক। (স্বধায়িভ্যঃ পিতামহেভ্যঃ) অন্ন-জলের ইচ্ছাপোষণকারী ঠাকুরদাদাদের জন্য (স্বধা) অন্ন-জল প্রস্তুত হোক, (নমঃ) তাদের নমস্কার প্রভৃতি দ্বারা আদর হোক। (স্বধায়িভ্যঃ প্রপিতামহেভ্যঃ) অন্ন-জলের ইচ্ছাপোষণকারী ঠাকুরদাদাদের পিতাদের জন্য (স্বধা) অন্ন-জল প্রস্তুত হোক, (নমঃ) নমস্কার প্রভৃতি দ্বারা আদর হোক। (অক্ষন্) ভোজন করেছেন (পিতরঃ) পিতৃগণ, (অমীমদন্ত) আমাদেরকে আনন্দিত করেছেন। (পিতরঃ) পিতৃগণ, (অতীতৃপন্ত) আমাদেরকে তৃপ্ত করেছেন। (পিতরঃ) পিতৃগণ। হে (পিতরঃ) পিতৃগণ! আপনি আমাদেরকে (শুন্ধধ্বম্) উপদেশ দিয়ে শুদ্ধ করুন।
পরম্পরানুসারে মৃতক শ্রাদ্ধ কেবল পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহের জন্যই করা হয়, প্রপ্রপিতামহ প্রভৃতির জন্য নয়। বেদেও পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহ পর্যন্তই নাম আছে, কিন্তু তা মৃতক শ্রাদ্ধ নয়, জীবিতদের শ্রাদ্ধ। প্রতিবছর শ্রাদ্ধপক্ষে যেই তিথিতে যার দেহাবসান হয়েছে, ঐদিন ব্রাহ্মণদেরকে অন্নভোজন করানো হয়। তারপর তাঁদেরকে বস্ত্রাদি দান করা হয়। বোঝানো হয় যে এই ভোজন ও বস্ত্রাদি আমাদের পিতরদের কাছে পৌছে যায় এবং এর মাধ্যমে তাঁরা তৃপ্ত হয়ে যায়, অন্যথা তাঁরা ক্ষুদার্ত ও নির্বস্ত্র থেকে যায়।
'স্বধা' শব্দ নিঘণ্টু তে অন্নবাচক ও জলবাচক শব্দদ্বয়ে পঠিত। মন্ত্র বলে যে অন্ন-জলের ইচ্ছুক পিতাদেরকে অন্ন-জল দাও এবং নমস্কার প্রভৃতি দ্বারা আদর করো। অন্ন-জলের ইচ্ছুক পিতামহদেরকে অন্ন-জল দাও এবং নমস্কার প্রভৃতি দ্বারা তাদেরকে আদর করো। অন্ন-জলের ইচ্ছুক প্রপিতামহদেরকে অন্ন-জল দাও এবং নমস্কার প্রভৃতি দ্বারা তাদেরকে আদর করো। কোনো ব্যক্তির জীবদ্দশায় তার অধিক থেকে অধিক প্রপিতামহ জীবিত থাকতে পারে। কল্পনা করুন যে কোনো ব্যক্তির বিবাহ ২৫ বছর বয়সে হয়েছে। সাধারণত ২৬ বছর বয়সে তার সন্তান হবে। যখন ২৫ বছর বয়সে তার সন্তানের বিবাহ হবে এবং তার পৌত্র বা পৌত্রী জন্ম নেবে, তখন তার বয়স ৫২ বছর হবে, তিনি বানপ্রস্থে যাবে, পৌত্রের ২৫ বছর বয়সে বিবাহ হয়ে যখন তার সন্তান হবে, তখন ঠাকুরদাদা প্রায় ৭৮ বছর বয়সের হবেন। প্রপৌত্রেরও ২৫ বছর বয়সে বিবাহ হয়ে যখন তার সন্তান হবে, তখন ঠাকুরদাদার পিতার বয়স ১০৫ বছর হবে। যদি কারো বিবাহ ২৫ বছরেরও কম বয়সে হয়ে যায়, তখন প্রপৌত্রের পুত্র নিজ জীবদ্দশায় নিজের শতবর্ষীয় প্রপিতামহকে দেখতে পারবে। এর চেয়ে অধিক আয়ু সাধারণত হয় না। অতএব প্রপিতামহ পর্যন্তই অন্ন-জল দেয়া এবং নমস্কার প্রভৃতি দ্বারা আদর প্রদান করার জন্য বেদ নির্দেশ দিয়েছে। যদি মৃতক শ্রাদ্ধ বাঞ্ছনীয় হতো, তাহলে মৃতক কে অন্ন-জল দেয়া এবং নমস্কার প্রভৃতি দ্বারা আদর করা তো প্রপিতামহের পূর্বপ্রজন্মেও চলতে পারতো, তাহলে প্রপ্রপিতামহ প্রভৃতির নাম কেনো নেয়া হলো না? বস্তুতঃ পুত্র, পৌত্র বা প্রপৌত্র জীবিত পিতরদের অন্ন-জল, নমস্কার প্রভৃতি দ্বারা সৎকার করে, অতঃপর তারা বলে যে পিতৃগণ ভোজন করেছেন এবং আশীর্বাদ দিয়ে আমাদেরকে আনন্দিত তথা তৃপ্তও করেছেন। সবশেষে পুত্র, পৌত্র তথা প্রপৌত্র তাদের কাছে প্রার্থনা করে যে আপনারা আমাদেরকে উপদেশ দিয়ে শুদ্ধ-পবিত্র করুন। এইভাবে সেই জীবিতদের শ্রাদ্ধ চলতে থাকে।
এখানে এটাও দ্রষ্টব্য যে যদি পিতা-পিতামহ বানপ্রস্থে গমন করেন এবং প্রপিতামহও বানপ্রস্থ বা সন্ন্যাসী হয়ে যান, তখন তাদেরকেও কখনো কখনো ঘরে ডেকে এনে তাদের সৎকার করা বাঞ্ছনীয়। অতএব মহর্ষি দয়ানন্দ তার ভাষ্যে এই মন্ত্রের ভাবার্থে লিখেছেন- "হে পুত্র, শিষ্য, পুত্রবধূ প্রভৃতিগণ! তোমরা উত্তম অন্ন প্রভৃতি পদার্থসমূহ দিয়ে পিতা প্রভৃতি বৃদ্ধদের নিরন্তর সৎকার করো তথা পিতর লোকও তোমাদেরকে আনন্দিত করে। যেভাবে পিতাগণ বাল্যাবস্থায় তোমাদের সেবা করে, সেভাবেই তোমরা বৃদ্ধাবস্থায় তাদের সেবা যথাবৎ করো।" [রামনাথ বিদ্যালঙ্কার]
পাদ-টিপ্পণী
১. স্বধা= জল, নিঘ০ ১.১২, অন্ন ২.৭।
বৈদিক শাস্ত্রে জন্ম ও মৃত্যু প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। আত্মা অবিনাশী; দেহ নশ্বর। তাই মৃত্যুতে শোক থাকা স্বাভাবিক হলেও তাকে “অপবিত্রতা” হিসেবে গণ্য করা বেদের মূল শিক্ষার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং বেদ মানুষকে জ্ঞান, কর্ম ও সত্যের পথে চলতে শিক্ষা দেয়। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে বৈদিকভাবে করণীয় হলো- মৃতদেহের যথাযথ ভাবে অন্ত্যেষ্টি করা, পরিবারকে মানসিক সহায়তা দেওয়া, মৃত ব্যক্তির আদর্শ স্মরণ করা, জীবিত পিতা-মাতা ও গুরুজনদের সেবা করা ধর্মময় জীবন যাপন করা এগুলোই প্রকৃত ধর্মীয় কর্তব্য। জন্ম ও মৃত্যু উভয়ই সংস্কার। অন্ত্যেষ্টির মাধ্যমেই মৃতদেহ সম্পর্কিত কর্তব্য সমাপ্ত হয়। প্রকৃত শ্রাদ্ধ হলো জীবিত পিতা-মাতা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সেবা ও সম্মান করা।
অতএব, সমাজে প্রচলিত বহু আচার মূলত স্মৃতি ও পুরাণভিত্তিক। কিন্তু বেদের মূল শিক্ষা হলো— সত্য, জ্ঞান, সেবা ও ধর্মময় জীবনযাপন। তাই কুসংস্কার নয়, শাস্ত্রসম্মত জ্ঞান ও যুক্তির ভিত্তিতে ধর্মকে বুঝতে হবে।
ও৩ম্ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ