07/02/2026
ঔঁ তৎ সৎ
শিবতত্ত্ব পর্বঃ ০২
।।৩।। 'শিব' নামের অর্থ:-
শিবপুরাণে উক্ত হয়েছে “শং নিত্যসুখম্ আনন্দম্ ইকারঃ পুরুষঃ স্মৃতঃ।। বকারঃ শক্তিরমৃতং মেলনং শিব উচ্যতে। তস্মাদেবং স্বমাত্মানং শিবং কৃত্বার্চযেচ্ছিবম্।।” অর্থাৎ, 'শিব' শব্দে 'শ'-কার নিত্য সুখ ও আনন্দস্বরূপ, 'ই'-কার পরমপুরুষ, 'ব'-কার অমৃতশক্তি। সুতরাং শিব শব্দে 'শ'-কার সুখস্বরূপ সমাধিবাচক হওয়ায় আধ্যাত্মিক তাপনিবারক, 'ই'-কার অভিষ্টপূরক হওয়ায় আধিভৌতিক তাপনিবারক, 'ব'-কার অমৃতবীজ ও বরুণ-অধিদৈবহেতু আধিদৈবিক তাপনিবারক। এইভাবে 'শিব'-নাম ত্রিতাপনাশক।
অন্যমতে 'শব' শব্দের 'শ'-এ 'ই'কার যুক্ত হয়ে 'শিব' হয়েছে, 'ই'কার প্রকৃতি বা আদ্যাশক্তি, প্রকৃতিবিহীন শিব শবমাত্র। শিব মানে মঙ্গল, যিনি মঙ্গলবিধায়ক তিনিই শিব। শিবের কত নাম! তিনি সর্ববৃহৎ বলে ব্রহ্ম, সনাতন বা স্থির বলে স্থাণু, ষড়ৈশ্বর্য্যশালী বলে ভগবান, সর্বভূতকে কলন বা সংহার করেন বলে মহাকাল, স্বয়ংজাত বলে স্বয়ম্ভূ, পশু বা জীবের বন্ধন ও মোচনকর্তা বলে পশুপতি, মহৈশ্বর্য্যবান বলে মহেশ্বর, দাক্ষিণ্য বা কৃপাহেতু দক্ষিণামূর্তি ইত্যাদি।
।।৪।। সন্ন্যাসী ও গৃহীর আদর্শ শিব :-
"সদাশিব শঙ্করাচার্য্য সমারম্ভাং মধ্যমাম্। অস্মদাচার্য্যপর্যন্তাং বন্দে গুরুপরম্পরাম্।।" -এই পরম্পরা বন্দনার মন্ত্র থেকে আমরা বুঝি স্বয়ং সদাশিবই সন্ন্যাসীর আদিগুরু। সন্ন্যাসীর সকল আদর্শই শিবের মধ্যে পরিস্ফুট - তাঁর বৈরাগ্য, সর্বদা যোগে স্থিতি, জ্ঞানশক্তি, শুচি-অশুচিতার মতো সকল বিপরীত অবস্থার মধ্যেও স্থির থাকা ইত্যাদি। অন্যদিকে গৃহস্থের আদর্শও তিনি। শিবের সংসার বিদ্যার সংসার, কৈলাস একাধারে গৃহ ও তপোবন উভয়ই। সংসারী মানুষের মধ্যে যত শ্রেষ্ঠতম গুণাবলী দেখা যায়, তার গুরু তিনিই। তিনি নৃত্য-গীত-বাদ্যের দেবতা, তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণের জনক, চিকিৎসাশাস্ত্র, অস্ত্রবিদ্যার, তন্ত্র-মন্ত্র-হঠযোগের গুরু। তিনি নিজেই প্রেমাভক্তির পরাকাষ্ঠা ও শরণাগতের আশ্রয়দাতা, তাঁর এই দুই গুণ গৃহস্থের সর্বোচ্চ আদর্শ। সন্ন্যাসীর জ্ঞান ও গৃহীর ভক্তি শিবচরিত্রে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সনাতন ভারতবর্ষের সকল আদর্শ, সকল জ্ঞান ও সকল বিদ্যার তিনিই স্বয়ং সাকার বিগ্রহ।
।।৫।। শিবলিঙ্গ কি? :-
জ্ঞানীর দৃষ্টিতে শিবলিঙ্গ নিরাকার ব্রহ্মের প্রতীক, বৈদিকের দৃষ্টিতে যূপস্তম্ভ, যাজ্ঞিকের দৃষ্টিতে সপীঠশিবলিঙ্গ বেদীর উপর হোমশিখা, পিতৃ উপাসকের দৃষ্টিতে পিতৃমাতৃচিহ্ন, কৃষকের দৃষ্টিতে উর্বরতার প্রতীক, পশুপালকের দৃষ্টিতে প্রজননশক্তি, আসুর জনজাতির দৃষ্টিতে শিশুদেব, বৌদ্ধের দৃষ্টিতে স্তূপ... আরও কত কি!
'লিঙ্গ'-এর 'লী' শব্দে লয় পাওয়া ও 'গম' শব্দ বহির্গত হওয়া। তাই কৌলজ্ঞাননির্ণয়ে (৩/১০) বলা হয়েছে
"যস্যেচ্ছয়া ভবেৎ সৃষ্টির্লয়স্তত্রৈব গচ্ছতি। তেন লিঙ্গন্ত বিখ্যাতং যত্র লীনং চরাচরম্।।” অর্থাৎ, 'যে পরম কারণের ইচ্ছায় এ জগতের উৎপত্তি ও যাতে এ জগতের লয়, সেই লিঙ্গমধ্যেই চরাচর জগত ওতপ্রোত হয়ে আছে।।' স্থূলদৃষ্টিতে শিবলিঙ্গের দুটি অংশ - লিঙ্গ ও বেদী। লিঙ্গভাগ শিবস্বরূপ এবং বেদী আদ্যাশক্তির প্রতীক। বেদীভাগ- গৌরীপট্ট, গৌরীপীঠ, যোনিপীঠ ইত্যাদি নামে সুপরিচিত। স্কন্দপুরাণমতে - "আকাশং লিঙ্গমিত্যাহুঃ পৃথিবী তস্য পীঠিকা। আলয়ঃ সর্বদেবানাং লয়নাল্লিঙ্গমুচ্যতে।।” অর্থাৎ, 'আকাশরূপ লিঙ্গের বেদী পৃথিবী, যেখানে সকল দেবতার নিবাস, সেখানে সব কিছু লয় হয় বলে তাঁকে লিঙ্গ বলে।।' রুদ্রাধ্যায়ের ধ্যানমন্ত্রে সর্বব্যাপী বিরাট দিব্যলিঙ্গের লক্ষণ অপূর্ব ভঙ্গীতে প্রকাশিত হয়েছে - "পীঠং যস্য ধরিত্রী জলধরকলসং লিঙ্গমাকাশমূর্তিং, নক্ষত্রং পুষ্পমাল্যং গ্রহগণকুসুমং চন্দ্রব্যকনেত্রম্। কুক্ষিঃ সপ্তসমুদ্রং ভুজগিরিশিখরং সপ্তপাতালপাদং, বেদং বজ্রং ষড়ঙ্গং দশদিশ বসনং দিব্যলিঙ্গং নমামি।।” অর্থাৎ, 'আমি সেই দিব্যশিবলিঙ্গকে প্রণাম করি, স্বয়ং ধরিত্রী যাঁর গৌরীপীঠ, মেঘমালা যাঁর জলাভিষেকের কলস, মহাকাশ যাঁর বিরাট লিঙ্গরূপ, তারকাবলী মাল্য, গ্রহগণ পূজাকুসুম, চন্দ্র সূর্য্য ও অগ্নি যাঁর ত্রিনয়ন, সপ্তসমুদ্র উদরদেশ, পর্বতশিখর যাঁর বাহু, সপ্তপাতাল চরণ, ষড়ঙ্গবেদ যাঁর মুখ, তিনি দিগ্বসন।।' এই ধ্যানমন্ত্রে শিবলিঙ্গের মহিমা শিবলিঙ্গের সকল অর্বাচীন যৌনব্যাখ্যাকে অতিক্রম করে অদ্বৈত বেদান্তের শিখরচূড়া স্পর্শ করেছে। লিঙ্গপুরাণ মতে (১৭ অধ্যায়) - "প্রধানং লিঙ্গমাখ্যাতং লিঙ্গী চ পরমেশ্বরঃ।” অর্থাৎ, প্রকৃতিই লিঙ্গ এবং মহেশ্বরই লিঙ্গী।। এইভাবে পরমপুরুষ ও পরাপ্রকৃতি কখনই বিচ্ছিন্ন থাকেন না। “পীঠাকৃতিরুমাদেবী লিঙ্গরূপশ্চ শঙ্করঃ।” - অর্থাৎ, উমাদেবী লিঙ্গপীঠ এবং শঙ্কর লিঙ্গরূপ। (লি. পু. উত্তর ১১/৩১)৷৷ অনুরূপ বচন নারদপাঞ্চরাত্রেও পাওয়া যায় "যত্র লিঙ্গস্তত্র যোনিঃ যত্র যোনিস্ততঃ শিবঃ।” অর্থাৎ, যেখানেই লিঙ্গ (শিব) সেখানেই যোনি (শক্তি), উভয় অবিচ্ছেদ্য।। শিবলিঙ্গের এই যে সর্বগ্রাসী, সর্বলয়কারী, সর্বাশ্রয়দাতা বিরাট বিপুল রূপ, তা আমাদের ক্ষণে ক্ষণে বিস্মিত ও মুগ্ধ করে। “সর্বলিঙ্গময়ো লোকঃ সর্বং লিঙ্গে প্রতিষ্ঠিতম্।।” অর্থাৎ, 'সর্ব জগৎ লিঙ্গময়, লিঙ্গেই সব অধিষ্ঠিত' (লি. পু. ১/৭৩/৬)।। 'দেব, দৈত্য, দানব, যক্ষ, বিদ্যাধর, সিদ্ধ, রাক্ষস, পিতৃগণ, মুনি, ঋষি, কিন্নর সকলেই যে শিবলিঙ্গের পূজায় সিদ্ধিলাভ করেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই' (ঐ ১/৭৩/৭-৯)।। প্রস্তর, রত্ন, ধাতু, কাষ্ঠ, মৃত্তিকা ইত্যাদি বিভিন্ন উপাদানে শিবলিঙ্গ গঠিত হয়। রত্নলিঙ্গ পূজায় শ্রীলাভ, প্রস্তরলিঙ্গে সর্বসিদ্ধি, ধাতবলিঙ্গে ধনলাভ, কাষ্ঠলিঙ্গে ভোগ ও সিদ্ধি, মৃন্ময়লিঙ্গ সর্বসিদ্ধিদায়ক ও শুভা শিবলিঙ্গের নিম্নভাগে ব্রহ্মা, মধ্যভাগে বিষ্ণু ও ঊর্ধ্বভাগে রুদ্র বিরাজিত। লিঙ্গবেদী বা গৌরীপীঠে আদ্যাশক্তি ও সর্বাঙ্গে সর্বদেবদেবীর নিবাস। যিনি গৌরীপীঠে শিবলিঙ্গ পূজা করেন, তাঁর সর্ব দেবদেবী পূজার ফললাভ হয়।