13/08/2025
জান্নাতের বর্ণনা
—শায়েখ ইয়াসির কাদি
(একটু বড় লেকচার, যখন সময় পাবেন সম্পূর্ণটা পড়ুন। ইনশাআল্লাহ, যে জান্নাতে একদিন অবস্থান করবেন সেটা কেমন হবে তা জানার জন্য কি কিছু সময় ব্যয় করতে পারবেন না? আমাদের কাজ আমরা করেছি, এখন আপনাদের কাজ হল পড়া। )
আলহামদু লিল্লাহ, আমরা মহান আল্লাহর প্রশংসা করি, যিনি জানেন — অন্তর যা গোপন রাখে এবং জিহ্বা যা উচ্চারণ করে না। যাঁর সামনে ইমানদারগণ সিজদাবনত হন। এবং যাঁর কাছে সকলেই আর্জি পেশ করে। ইনশা আল্লাহ, আজকে আমরা জান্নাত সম্পর্কিত ধারাবাহিক আলোচনাটি অব্যাহত রাখবো। আল্লাহ আমাদেরকে জান্নাতবাসীদের মধ্যে শামিল করুন।
আমি গত পর্বে উল্লেখ করেছিলাম যে, মানুষ দলেদলে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং বিচার দিবস চলমান থাকা অবস্থাতেই মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করতে শুরু করবে । অবশ্য অধিকাংশ মানুষ বিচার শেষ হওয়ার ঠিক পরেই জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ বলেছেন, [وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا] - যারা সৎকর্মশীল, তাদেরকে জান্নাতের দিকে দলে দলে সমবেতভাবে নিয়ে যাওয়া হবে। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে তেমনটাই ঘটবে। তারপর, বিচার দিবস শেষ হওয়ার পরেও লোকেরা জান্নাতে প্রবেশ করতে থাকবে, আল্লাহই জানেন কতকাল, কত সহস্রাব্দ, কত যুগ-যুগান্তর ধরে; এমন সময়কাল যা আমরা অনুধাবন করতেও পারি না। এরা হবে সেই লোকেরা যাদেরকে নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য শাস্তি দেয়া হবে। এরপর তাদেরকে অল্প অল্প করে, একজন একজন করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। অবশেষে, যেমনটি আমি আগের পর্বে উল্লেখিত হাদিসে বলেছিলাম, জান্নাতে প্রবেশকারী সর্বশেষ ব্যক্তি, জাহান্নাম থেকে বের করে আনা সর্বশেষ ব্যক্তি, আল্লাহই ভালো জানেন কতকাল পর সেই ব্যক্তিটি জান্নাতে প্রবেশ করবে।
আর তখন আল্লাহ বলবেন, এই দুনিয়া যা কিছু ধারণ করতে পারে, তুমি তা পাবে এবং এর সমান আরও দশটি দুনিয়া, তুমি এই সমস্ত কিছু পাবে। লোকটি তখন হতবাক হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলবেন, এটাই আমি তোমার জন্য ইচ্ছা করেছি এবং নির্ধারণ করেছি। তাহলে কল্পনা করুন, যে ব্যক্তি জান্নাতের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে, তাকে এই সমগ্র দুনিয়া এবং তার বহুগুণ দেওয়া হবে; তাই না ? আর আমরা উল্লেখ করেছিলাম যে, কে এমনটা পেতে চাইবে না ? কিন্তু, জান্নাতে এমন জিনিস রয়েছে যা এই দুনিয়ায় ঊর্ধে। সেই লোকটি, এই দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং এই দুনিয়ায় তার আকাঙ্ক্ষিত সবকিছুই পাবে। আর সেটা অসাধারণ।
কিন্তু কেনো সর্বোচ্চ লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করবো না ? আর আমরা সেই মানুষদের অন্তর্ভুক্ত হতে চাই না যারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে, নাউযুবিল্লাহ। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে চাই, ইনশা আল্লাহ [بِغَيْرِ حِسَابْ], অথবা অন্ততপক্ষে, [حِسَابََا يَسِيْرََا] সহকারে। কমপক্ষে এই দুই অবস্থায় আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে চাই। আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে চাই জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করা ছাড়াই। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।
এখন, কয়েকটি বিষয়; আজকে আমরা জান্নাত সম্পর্কিত কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। কিন্তু সেই আলোচনার আগে একটি কথা, আমি এই বিষয়টি উল্লেখ করেছি যে, মানুষ কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তারা দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে প্রবেশ করতে থাকবে। ওকে। এখন প্রশ্ন হোলো, কিয়ামতের আগে কি কেউ জান্নাতে প্রবেশ করেছে ? আর, রসূল (স) এবং তারপর তাঁর উম্মত কি মানবজাতির মধ্যে সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবেন ?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হোলে, আমাদেরকে উপলব্ধি করতে হবে, প্রথমত ও সর্বাগ্রে, যেমনটি আমি কয়েক পর্ব আগে উল্লেখ করেছিলাম যে, আমাদের পিতা আদম এবং আমাদের মাতা হাওয়ার জান্নাতে অবস্থান সম্পর্কে একটি বিতর্ক রয়েছে। তাঁরা কি সেই জান্নাতে ছিলেন, নাকি একটি উদ্যানে ছিলেন যাকে আল্লাহ “জান্নাত” বলে উল্লেখ করেছেন ? তবে ইনশাআল্লাহ, সম্ভবত তাঁরা সেই জান্নাতেই ছিলেন। তাই, এটা বলা যায় যে, আদম ও হাওয়া (আ) জান্নাতের একটি অংশে ছিলেন। তাঁরা জান্নাতের একটি অংশে ছিলেন। কিন্তু জেনে রাখুন যে, জান্নাতের অনেক অনেক অনেক বিভাগ রয়েছে। তার একটি অংশ বা একটি বিভাগে, আমাদের পিতা ও মাতাকে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু বাকি অংশে এবং জান্নাতের অধিকাংশ অংশেই, বাস্তবে কোন মানুষ কখনো প্রবেশ করেনি। আদম (আঃ)-এর সময় থেকে অন্য কেউই জান্নাতের দরজা দিয়ে প্রবেশ করেনি। এবং আদম (আঃ)-এর সময় থেকে অন্য কেউই জান্নাতে বসবাস করেনি।
তবে, এমন কিছু মানুষ থাকতে পারেন, যারা জান্নাতে বাস না করেও জান্নাতের কিছু নিয়ামত পর্যবেক্ষণ করবেন। আর এক্ষেত্রে সুপরিচিত উদাহরণটি হোলো আমাদের রসূল (স)। তিনি জান্নাত দেখেছেন এবং কিছু হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী, ইসরা ও মিরাজে, এমনকি তিনি জান্নাতের মধ্য দিয়ে হেঁটেছেন। তো, তিনি সেখানে বসবাস না করেও এর ভিতরে গিয়েছেন। তিনি এর ভিতরে না থেকেও তা প্রত্যক্ষ করেছেন। সেটা কিভাবে সম্ভব ? আল্লাহই ভালো জানেন। আর স্বপ্নের মাধ্যমেও; এমন অনেক হাদিসে এসেছে, তিনি স্বপ্নেও জান্নাত দেখেছিলেন। স্বপ্নে তিনি জান্নাতের বিভিন্ন জিনিস দেখেছিলেন। তো তাঁর আত্মাকে জান্নাত দেখানো হোয়েছিলো। আর সেজন্যই, রসূল (স)-এর সাথে জান্নাতের কিছুটা সংযুক্তি ছিলো, যদিও তিনি প্রকৃতপক্ষে সেখানে বসবাস করছিলেন না।
শুহাদা বা শহীদদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমরা জানতে পারি যে, তাঁরা উড়ে বেড়াবেন একটি পাখির দেহে, আর চমৎকার সুন্দর একটি সবুজ পাখির দেহে তাঁরা জান্নাতের ঝাড়বাতিতে বিশ্রাম নিবেন। তাঁদের মরদেহ এই পৃথিবীতে রয়েছে। তাঁদের মরদেহ এখানে দাফন করা আছে, কিন্তু আত্মাকে উঠিয়ে নেওয়া হবে। এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, তাঁরা বিকল্প একটি দেহে উড়ে বেড়াবেন। তাঁরা প্রকৃতপক্ষে সেখানে বাস না করেও সেখানকার পরিবেশ উপভোগ করতে থাকবেন। তাই জান্নাতের সুগন্ধি, ফুল ও পানি তাঁরা দেখতে পারবেন এবং উপভোগ করতে পারবেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাঁরা জান্নাতে বসবাস করছেন না।
এছাড়াও, নেককার ব্যক্তিদের সম্পর্কে বলা হোয়েছে যে, যখন তারা তাদের কবরে থাকে, বারযাখের জীবনে, আর আমি বারযাখের পর্বগুলোতে এই বিষয়ে আলোচনা করেছিলাম যে, যখন তারা কবরে থাকবেন, আল্লাহ একটি জানালা উন্মুক্ত করে দেবেন। আর কবরের অধিবাসীগণ জান্নাতে তাঁদের ঘর এবং তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ভূমিটি দেখতে পাবে। তাঁরা তা কল্পনা করতে এবং দেখতে সক্ষম হবেন। এবং শুধু তা-ই না, জান্নাতের সুগন্ধির একটি রেশ পাওয়া যাবে এবং তাঁরা জান্নাতে নিজেদের ভূমি ও এলাকার গুঞ্জন শুনতে পাবেন। প্রতিদিন সকালে তাঁদেরকে জান্নাতে তাঁদের ভূমিটি দেখানো হবে। তো তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন ? তাঁরা বলবেন, “হে আল্লাহ, কিয়ামতের দিনকে ত্বরান্বিত করুন, দ্রুত করুন। যাতে আমরা সেই ভূমিতে প্রবেশ করতে পারি। এটাকে ত্বরান্বিত করুন হে আল্লাহ, যাতে আমরা সেই ভূমিতে প্রবেশ করতে পারি”। সুতরাং, আবারও, জান্নাতে তাঁদের ভূমির সাথে তাঁদের একটি সংযোগ দেখা যাচ্ছে, যদিও তখন তাঁরা সেখানে থাকবেন না। আর এটা একটা সুসংবাদ। ইনশাআল্লাহ এটা আমাদের জন্য সুসংবাদ এবং আমরা চেষ্টা করবো সেইসব লোকদের মধ্যে শামিল হওয়ার জন্য।
বারযাখের জীবনটি কল্পনা করুন। এটি অত্যন্ত শীতল, অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং নির্জন স্থান। এটি অত্যন্ত কঠিন একটি স্থান, [إِلَّا مَا شَاءَ رَبُّكْ] - আল্লাহ যাদের জন্য ভালো ইচ্ছা করেন তারা ব্যতীত। আর তাই, কল্পনা করুন সেই অবস্থায়, প্রতিদিন তাঁদেরকে এমন কিছু দেখানো হবে, যার আকাঙ্ক্ষা তাঁরা করেন। তাঁদেরকে এমন কিছু দেখানো হবে যা তাঁদের সম্পত্তি। একটি জানালা খুলে দেওয়া হবে। তাঁরা জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবেন। তাঁরা বাতাসের শব্দ এবং গুঞ্জন শুনতে পাবেন। কল্পনা করুন তখন তাঁদের উৎসাহ-উদ্দীপনা কেমন হবে ? আর সেজন্যই তাঁরা মহান আল্লাহর কাছে বিচার দিবসকে ত্বরান্বিত করার দোয়া করবেন।
সুতরাং, যদিও আদম (আ.)-এর সময় থেকে বাস্তবে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করেনি এবং সেখানে বসবাস করেনি, এমন কিছু মানুষ রয়েছেন জান্নাতের সাথে যাঁদের এমন সম্পর্ক সৃষ্টি হবে যা বাস্তবে সেখানে বসবাস করার চেয়ে ভিন্ন। যেমন, কয়েকজন নবী এবং বিশেষত আমাদের নবীজী (স)। একইভাবে, শহীদগণ এবং একইভাবে, সমস্ত নেককার ব্যক্তি, তাঁরা বারযাখের জীবনে জান্নাতে তাদের স্থানটি দেখতে পাবেন।
আমরা এখন পরবর্তী বিষয়বস্তুতে অগ্রসর হোচ্ছি এবং আমাদের পরবর্তী পর্বেও এটি অব্যাহত থাকবে। কারণ, বলার মতো অনেক কিছুই রয়েছে। সুতরাং, জান্নাতের কিছু নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার মাধ্যমে আমরা পরবর্তী বিষয়বস্তু শুরু করবো। আজ আমরা সাধারণ ও বর্ণনামূলক আলোচনা করবো কিছু আয়াত ও হাদীস নিয়ে যা সামগ্রিকভাবে জান্নাতের পরিবেশ বর্ণনা করে। আর তারপর আমরা কিছুটা বিস্তারিতভাবে জান্নাতের প্রাসাদ, জান্নাতের ধন-ভাণ্ডার, জান্নাতের ফল-মূল এবং জান্নাতের রেশমি বস্ত্র সম্পর্কে আলোচনা করবো, এরকম সমস্ত বিষয় আমরা ধীরে ধীরে আলোচনা করবো, ইনশা আল্লাহু তা’আলা। আবারও বলছি, এটি বহু-পর্বের একটি সিরিজ। সুতরাং, আমরা কুরআনের কিছু আয়াত দিয়ে শুরু করবো যা সামগ্রিকভাবে জান্নাতকে বর্ণনা করে।
আর, চমৎকার এই অনুসন্ধান শুরু করার আগেই, আসুন আমরা বুঝে নিই যে, আল্লাহ যখন আমাদের জন্য জান্নাতের সৌন্দর্য ও সুখ-স্বাচ্ছন্দের বর্ণনা দিচ্ছেন, এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে যা আমরা বুঝি। কথাগুলো আমাদের বোধগম্য। আর, এটাই তো ভাষার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু আল্লাহ যা বর্ণনা করছেন তার বাস্তবতা মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। এজন্যই এটা মানুষের ভাষায় প্রকাশযোগ্য বাস্তবতার ঊর্ধে। অন্য কথায়, ভাষা এই বাস্তবতাগুলো বর্ণনা করতে অক্ষম। আর এটা কুরআনেই স্পষ্টভাবে প্রদর্শিত হয়েছে।
সূরা বাকারায় আল্লাহ বলেছেন, [وَبَشِّرِ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ أَنَّ لَهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا الْأَنْهٰرُ ۖ كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِن ثَمَرَةٍ رِّزْقًا ۙ قَالُوا هٰذَا الَّذِى رُزِقْنَا مِن قَبْلُ ۖ وَأُتُوا بِهِۦ مُتَشٰبِهًا] - যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান করো যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হয় এবং যখনই তাদেরকে সেখান থেকে কোন ফল রিযিক হিসেবে দেয়া হবে, তারা বলবে, “ও, এর মত কিছু তো আগেও আমাদেরকে দেয়া হয়েছিলো”। আল্লাহ বলছেন, তাদেরকে এমন ফল পরিবেশন করা হবে যা দেখতে একই রকম — [وَأُتُوا بِهِۦ مُتَشٰبِهًا]। তো আল্লাহ বলছেন, সেগুলো দেখতে একই রকম হবে। আর যেহেতু আল্লাহ বলছেন যে, সেগুলো দেখতে একই রকম হবে, এটা ইঙ্গিত করে যে, বাস্তব অবস্থা হবে ভিন্ন। বাহ্যিকভাবে সেগুলো দেখতে আপেলের মতো হবে, নাশপাতির মতো হবে, ডালিমের মত হবে। বাইরে থেকে আমরা তা দেখে চিনতে পারবো। কিন্তু ভিতরগত অবস্থা এবং সেই ফলগুলোর বাস্তবতা মানুষের বোধগম্যতার বাইরে।
সুতরাং, আল্লাহ কুরআনে এই দিকে ইঙ্গিত করেছেন — [وَأُتُوا بِهِۦ مُتَشٰبِهًا] - তাদেরকে এমন জিনিস দেয়া হবে যা সদৃশ্যপূর্ণ। এটাই এর অনুবাদ; তাই না ? এমন কিছু, যা দেখতে সাদৃশ্যপূর্ণ। এটা ইঙ্গিত করে যে, শুধুমাত্র বাহ্যিক অবয়বটাই এক হবে। অন্যথায়, বাস্তবতা হোলো জান্নাতের আপেলের সাথে এই পৃথিবীর আপেলের কোনো সম্পর্ক নেই; অবয়বটা ছাড়া। জান্নাতের ফল, জান্নাতের নাশপাতি, জান্নাতের আঙ্গুর, জান্নাতের প্রাসাদ, জান্নাতের ইট, জান্নাতের স্বামী বা স্ত্রী, বর্ণনা চলতেই থাকবে — বাস্তবে এগুলো কেবলই শব্দমাত্র। প্রসিদ্ধ একটি মন্তব্যে ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন যে, জান্নাতে এমন কোনো জিনিস নেই যা পৃথিবীর কোনো কিছুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, শুধুমাত্র নামটি ছাড়া। জান্নাতে এমন কোন জিনিস নেই যা পৃথিবীর কোন কিছুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, শুধুমাত্র নাম ছাড়া।
সুতরাং, আল্লাহ বলেছেন, তাদের জন্য থাকবে [عِنَبْ], তাদের জন্য থাকবে আঙ্গুর। ঠিক আছে। আমরা বুঝি আঙ্গুর কেমন দেখতে। আমরা যখন জান্নাতে সেটা দেখবো, আল্লাহ আমাদেরকে সেই লোকদের মধ্যে শামিল করুন, আমরা তা চিনতে পারবো, “ও, এটা তো আঙ্গুর”। আমরা “আঙ্গুর” শব্দটি উচ্চারণ করবো, কিন্তু সেখানেই সকল সাদৃশ্যের সমাপ্তি ঘটবে। যখন আমরা সেই আঙ্গুরের স্বাদ আস্বাদন করবো, তা অনুভব করবো, এর থেকে যে ফ্লেভার আসবে, যে সুঘ্রাণ আসবে, সেটা মানুষের বর্ণনার বাইরে এবং শব্দের কার্যকারিতার বাইরে।
উল্লেখ্য যে, এই সবকিছুই প্রযোজ্য জান্নাতের নিম্ন স্তরগুলোর জন্য। আর কুরআনের বর্ণনাগুলো এই স্তরগুলো সম্পর্কে। কিন্তু উচ্চতর ও সর্বোচ্চ স্তরগুলোর ক্ষেত্রে, আমাদের রসূল (সা) স্পষ্টভাবে বলেছেন যে সেগুলো এমন বিষয় যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোন মন কল্পনাও করেনি। আমি চাই আপনারা এই বিষয়টি বুঝুন; যত উপরে যাবেন, ভাষার কার্যকারিতা তত কমবে। লক্ষ করুন, এজন্যই জান্নাতের সর্বনিম্ন ব্যক্তিকে আল্লাহ কি বলবেন ? আপনি জানেন এই দুনিয়ায় রাজা-বাদশারা কেমন সুখ-সম্ভোগ লাভ করে। এরকম দশটি রাজত্ব আপনার থাকবে। এটাই আমাদের বোধগম্যতা। এটাই সর্বনিম্ন স্তর। এখন আপনি যদি আরও উপরে যেতে চান, শব্দের কার্যকারিতা বিলুপ্ত হতে থাকবে। এর বর্ণনা সম্ভব না। কোনো চোখ দেখেনি, কোনও কান শোনেনি, এমনকি মনও কল্পনা করেনি।
অতএব, আমরা যখন এইসব আয়াত ও হাদীসগুলো পর্যালোচনা করবো, আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, একটি বিবেচনায় আমরা উপলব্ধি করছি আয়াতটি কি বলছে। কিন্তু এর বাস্তবতা মানুষের বোধগম্যতার সম্পূর্ণ বাইরে।
এখন, এখানে আরেকটি বিষয় যা আমাদের বুঝতে হবে তা হোলো, যখন আমরা এই দাবি করছি, যখন আমি আপনাকে বলছি যে এক্ষেত্রে ভাষা অক্ষম, আমি এটা ইঙ্গিত করছি না যে, নাউযুবিল্লাহ, এই ভাষাগুলো প্রতীকী এবং জান্নাত বা জাহান্নাম বলে কিছু নেই। এর দ্বারা তো কুরআনকে এক ধরণের প্রত্যাখ্যান করা হয়। এটা বলা এক কথা যে, তাদেরকে আপেল দেয়া হবে। আর তারপর আমি আপনাকে বললাম যে, সেই আপেলের বাস্তবতা এই দুনিয়ার বাস্তবতার ঊর্ধে। এভাবে বলাতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ তাদেরকে আপেল নামক কিছু একটা দেয়া হবে। কিন্তু দাবি করা যে, “জান্নাত বলতে কিছু নেই, কোনও আপেল নেই, আর নাউযুবিল্লাহ, আল্লাহ শুধু রূপকথা হিসেবে, প্রণোদিত এবং প্রলুব্ধ করার জন্য এমনটা বলেছেন”, তাহলে আপনি কুরআনের বিরুদ্ধে অসততা এবং মিথ্যা বলার অভিযোগ করছেন। আর আল্লাহ মিথ্যা বলেন না। [وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا . وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا] - আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী আর কেউ নেই।
সুতরাং, এই বিষয়টি সংক্ষেপে বলতে গেলে, কারণ এখানে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে প্রায়শই আমাদের ধর্মের বাইরের লোকেরা, তারা কখনো কখনো জান্নাতের বর্ণনার কারণে আমাদের ধর্ম নিয়ে উপহাস করে। আমরা এই বিষয়ে আবারো ফিরে আসব, বিশেষত যখন হুরদের প্রসঙ্গ আসব, যা অনেকের বিরক্তির কারণ এবং যা প্রচুর সমালোচনা সৃষ্টি করে। আমরা আবারো একই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত কথা বলবো। কিন্তু এমনকি আজকের বিষয়ে যাওয়ার আগেও এই বিষয়টি কিছুটা উল্লেখ করা প্রয়োজন। আর আজকের বিষয়টি হোলো, জান্নাতের সাধারণ বর্ণনা।
ইসলাম প্রত্যাখ্যানকারী কিছু গোষ্ঠীর দাবি হোলো যে, “এই দেখো, কুরআনে থাকা জান্নাতের এই বর্ণনাগুলো সপ্তম শতাব্দীর আরব মরুচারীদের জন্য উপযোগী। আর সেগুলো আমার বুদ্ধিমত্তার প্রতি অপমানজনক। আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে, পুরস্কারটি এরকম হবে। এবং তারা উদাহরণ হিসেবে অনেক আয়াত উদ্ধৃত করবে, যেমন [جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ] [কমা][لَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ] - তাদের জন্য থাকবে উদ্যান যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে, তাদের জন্য সেখানে থাকবে পবিত্র স্ত্রীরা, তাদের জন্য থাকবে বিশাল ছায়া ইত্যাদি ইত্যাদি। আর তারা বলে যে, তোমাদের এই কিতাব, এই কুরআন এমন একটি জান্নাতের বর্ণনা দিচ্ছে যা আরবের মরুচারীদের জন্য উপযোগী। তারা বিদ্রূপের সুরে এমনটা বলে। “এটা এমন কিছু নয় যার আকাঙ্ক্ষা আমি করি, সমগ্র মানবজাতির জন্য আদর্শ জান্নাতের বর্ণনা এরকম হতে পারে না”।
এর জবাব অত্যন্ত সোজা-সাপ্টা। জবাবটি হোলো, প্রথমত, হ্যাঁ অবশ্যই; কুরআন একটি নির্দিষ্ট শ্রোতাগোষ্ঠীকে সম্বোধন করেছে। এতে সমস্যা কোথায় ? এটা যদি এই যুগের সংস্কৃতি ও সময়ের প্রেক্ষাপটে, এই যুগের শ্রোতাদেরকে সম্বোধন করতো, তাহলৈ যাদের উপর এটি আসলে অবতীর্ণ হয়েছিলো তারাও বলতো, “এটা কি ? আমরা এরকম আশা করি না”। সুতরাং কুরআন এমন ভাষা ব্যবহার করছে যা তার প্রত্যক্ষ শ্রোতাদের জন্য সরাসরি বোধগম্য, আর এটা মোটেও সমস্যাজনক কিছু না।
এবং দ্বিতীয়ত, আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হোলো, কুরআন এটাও অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলে যে, হ্যাঁ, এই বর্ণনাগুলোর সবই যুক্তিযুক্ত এবং এটা [جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ]। কিন্তু জান্নাত এই বাগান, নদ-নদী, সঙ্গী এবং প্রাসাদের চেয়েও বেশী কিছু। জান্নাত এর চেয়েও বেশি। এগুলো সহজ উপায়ে বোঝার পন্থা, আমরা যা কামনা করি। কিন্তু বাস্তবতা এর চেয়ে অনেক বেশী। এবং এখানে মূল কথা, জান্নাত হোলো — যা আপনি আকাঙ্ক্ষা করেন। [لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا] - সেখানে তারা যা ইচ্ছা করবে তাই পাবে। তাই, কিছু মানুষ তাদের প্রশান্তি এবং আনন্দের জন্য অন্য জিনিসও কামনা করতে পারে এবং তারা সেসব জিনিস পাবে। [لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا]। সুতরাং হ্যাঁ, এটা সত্য যে কুরআন এমন একটি জান্নাতের বর্ণনা দিচ্ছে যা নির্দিষ্ট কিছু মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এতে সমস্যার কোনো কারণ নেই। এটি অবশ্যই তা করবে। এটি সরাসরি সেইসব মানুষকে সম্বোধন করবে যারা এর প্রত্যক্ষ শ্রোতা এবং যাদের নিকট এটি অবতীর্ণ হোয়েছে। কিন্তু মূল বিষয় হোলো, জান্নাতে আপনি তা-ই পাবেন যা আপনি চান, যা আপনি কামনা করেন এবং যা আপনি আকাঙ্ক্ষা করেন। এবং এটাই মূল বিষয়। আমরা এর উপরই বারবার জোর দিতে থাকবো।
প্রসঙ্গক্রমে, আরও একটি বিষয় এখানে যোগ করতে হবে। এবং তা হোলো, এই লোকেরা যারা আমাদের বিশ্বাস নিয়ে উপহাস করে এবং বলে, “ও, আমরা এমন জান্নাত চাই না যেখানে মরুদ্যান, বাগান, নদ-নদী, রক্ষিতা ইত্যাদি থাকবে”। বাস্তবে, এই কামনাগুলো প্রতিটি মানুষের মাঝে গভীরভাবে প্রোথিত। এটাই বাস্তবতা, মানবজাতির স্বাভাবিক অবস্থা, ডিফল্ট সেটিং। ভালো খাবার, সুস্বাদু মাংস এবং ডেজার্ট, মনোরম পরিবেশ, জল ও সবুজের সমারোহ, এগুলো আমাদের মাঝে গেঁথে দেওয়া হোয়েছে।
সুতরাং আরবের জন্য মরূদ্যানই হোলো — [جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ]। উদাহরণস্বরূপ ক্যালিফোর্নিয়ায়, তাদেরও [جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ]-এর নিজস্ব রূপ থাকবে। টেক্সাসে, যেখানে আমি বাস করি, সেখানে আপনি যদি কোনো ধন্যাঢ্য ব্যক্তির প্রাসাদে যান, বাড়ির আঙিনায় গেলে আপনি কি দেখবেন ? জল এবং ফোয়ারা দেখবেন, সবুজ গাছপালা দেখবেন। এখানকার জন্য এটাই সৌন্দর্য। প্রত্যেক সমাজে এটিই মানবপ্রকৃতি; জল, ফল-মূল এবং সবুজের সমারোহ এমন কিছু যা আত্মাকে তৃপ্ত করে, হৃদয়কে উদ্বেলিত করে, আমাদেরকে প্রশান্ত এবং প্রসন্ন করে তোলে। এবং এটি এমন কিছু যা আমরা পছন্দ করি। আর আমাদের যদি সামর্থ্য থাকে, আমরা পৃথিবীতে এমন বাসস্থান চাই যেখানে এর সব কিছুই বিদ্যমান। এবং সেজন্যই এটি প্রকৃতিগত একটি বিষয়।
অনুরূপভাবে, আল্লাহ যখন জান্নাতকে মনমাতানো খাবারের স্থান এবং আকর্ষণীয় সঙ্গীর স্থান হিসেবে বর্ণনা করেন; এবং হ্যাঁ, ইন্দ্রিয়সুখের স্থান হিসেবেও বর্ণনা করেন, যা আমরা ভবিষ্যতের একটি পর্বে আলোচনা করবো; কিছু লোক এটাকে উপহাস করে এবং বলে, “এটা কেমন জান্নাত ? কামনা-বাসনায় ভরপুর জান্নাত” ! এর জবাব হোলো, অবশ্যই এটা কামনা-বাসনায় পরিপূর্ণ থাকবে। কেন এমনটা হবে না ? আমরা আরো বলেছি, জান্নাত কামনা-বাসনার চেয়েও বেশি কিছু। সুতরাং, প্রাথমিকভাবে দুটি উত্তর রয়েছে। আমরা কেনো এমন জান্নাত নিয়ে বিব্রতবোধ করবো যা প্রতিটি মানুষের মৌলিক প্রবৃত্তির কাছে আকর্ষণীয় ?
কারণ খেয়াল করুন, স্পষ্ট ভাষায় কথাগুলো বলার জন্য দুঃখিত। এই লোকগুলো, যারা জান্নাতের এই বর্ণনাগুলোকে সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করে, আপনি আশা করবেন যে তারা সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করবে, মরুভূমির গুহায় বন্দী থেকে সন্ন্যাসী হয়ে যাবে, চব্বিশ ঘন্টা ইবাদত করবে। সেক্ষেত্রে তারা বলতে পারতো যে, এটা এমন একটি জান্নাত যা আমাদের মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং উল্টো, এই লোকেরাই সবচেয়ে বেশি ভোগবাদী, তারাই সবচেয়ে বেশী ইন্দ্রিয়পরায়ণ। তাদের জীবনযাপনই তাদের উপহাসের জবাব। তারাই সর্বদা, সবচেয়ে উন্মুখ — সুস্বাদু খাবারের জন্য, সর্বোচ্চ রেটিংয়ের জন্য, ভোগবিলাসে মত্ত জীবন যাপনের জন্য এবং আকর্ষনীয় শয্যাসঙ্গির জন্য।
তো আপনি নিজেই বিবেচনা করুন। আপনি এমন জিনিসকে উপহাস করছেন, আপনার নিজের জীবনধারাই প্রমান করছে যে আপনি তা কামনা করেন। আপনি দ্বিচারীতার নীতি অবলম্বন করতে পারেন না।
আর তাই, আমাদের মুসলিমদের, কুরআনে বর্ণিত জান্নাত নিয়ে লজ্জিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই। কারণ যেসব মানুষ এটাকে তাদের মানবিক মর্যাদার নীচে ভেবে উপহাস করে, তাদের জীবনযাপনই প্রমাণ করে যে তারা তাদের মানবিক সত্ত্বা থেকে পালাতে পারে না। এটাই মূল বিষয়। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন ইন্দ্রিয়সুখ কামনা করার জন্য, ভালো খাদ্যের আকাঙ্ক্ষা করার জন্য, চমৎকার বাসস্থান ও পরিবেশের আকাঙ্ক্ষা করার জন্য। এভাবেই আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই আল্লাহ বলছেন, “সৎ জীবন যাপন করো, আমার আনুগত্য করো, আমার ইবাদত করো, মানবজাতির প্রতি সদয় হও। আর যখন তুমি জান্নাতে পৌঁছাবে, এই সমস্ত আকাঙ্ক্ষা এবং আরও অনেক কিছুই তুমি পাবে”। এতে সমস্যা কোথায় ? আমরা সকলেই এই কামনা-বাসনা লালন করি। আর আমরা সকলেই এই কামনা-বাসনার চেয়েও বেশি চাই।
তো দীর্ঘ এই ভূমিকার মাধ্যমে আলোচনা শুরু করলাম, কারণ এটি গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের এ ব্যাপারে ভুল ধারণা আছে, আমাদের ধর্মের বাইরের মানুষদের মধ্য থেকে এবং মুসলিমদের মধ্য থেকেও, কখনও কখনও আমরা এমনকি লজ্জিত বোধ করি যে, “আহ্, কুরআন কেনো জান্নাতকে এভাবে বর্ণনা করেছে” ? কুরআন নিয়ে লজ্জিত হওয়ার কিছুই নেই। কুরআন যা কিছু উল্লেখ করেছে, এর মধ্যে আরেকটি অত্যন্ত বিব্রতকর বিষয় হোলো হুরদের বর্ণনা। আমরা দেখবো যে, এটা আসলে খুবই সোজা-সাপ্টা বিষয়। এটা তেমন কিছুই না; কুরআনে এমন একটি আয়াতও নেই যা নিয়ে আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। এটি আল্লাহর বাণী যা সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রজোয্য।
তো, আসুন শুরু করা যাক, যদিও আমি শুরু করার কথাই বারবার বলছি, আলহামদুলিল্লাহ, আমরা প্রায় বিশ মিনিট যাবৎ আলোচনা করছি। যেহেতু এটি একটি দীর্ঘ সিরিজ যা চলমান রয়েছে, আজকে এবং পরবর্তী পর্বে আমরা আলোচনা করবো, কুরআনে জান্নাতের কিছু সাধারণ বর্ণনা সম্পর্কে। এর মাঝে থাকবে এই বিষয়ে কুরআন এবং হাদিসে উল্লেখিত চমৎকার কিছু বর্ণনা।
আর উল্লিখিত এই বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, যা অত্যান্ত চমৎকার সুবহানাল্লাহ, তা হোলো এই যে, সেখানে মানুষের অন্তর হবে পবিত্র। জান্নাতে কোন অনিষ্ট, বিদ্বেষপরায়ণতা, ঘৃণা অথবা অসার কথাবার্তা থাকবে না। সুবহানাল্লাহ! কি চমৎকার একটি বিষয় ! এই পৃথিবীতে, অন্যরা আমাদের সম্পর্কে যা বলে তা নিয়ে আমরা সবসময় বিব্রতবোধ করি। আর এটাই মানব প্রকৃতি। আমরা পারিবারিক পলিটিক্স, বন্ধুদের মধ্যকার পলিটিক্স, কর্মস্থলের পলিটিক্সের শিকার হয়ে সমস্যায় পড়ি। কখনো কখনো আমাদের নিকটতম বন্ধু ও মিত্ররাও এমনভাবে পিছনে ছুরি মারে যা আসলেই যন্ত্রনাদায়ক। আমরা বিশ্বাসঘাতকতা অনুভব করি; তাই না ? কিছু বিবেচনায় তারা হয়তো ভালো মানুষও হতে পারে। কিন্তু একটি ব্যাপারে গড়বড় করে ফেলে, আর তা আমাদের কষ্ট দেয়। যখন সমাজে আমাদের নিয়ে কথা হয়, বিশেষত যখন তা কেলেঙ্কারি জাতীয় কোনো বিষয় হয় যা সত্য নয়, যেমন রসূল (সা) এর ক্ষেত্রেও অসত্য বিষয়ে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো। তাঁরা বলেছিলো, তিনি মিথ্যাবাদী, তারা বলেছিলো তিনি এটা, তিনি সেটা। আর স্পষ্টতই তা আমাদের রসূল (সা) কে কষ্ট দিয়েছিলো। এর মোকাবেলা করাটা এই পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি। আর আল্লাহ কুরআনে বলেছেন যে, সেখানে এজাতীয় কোনো পলিটিক্স থাকবে না।
সূরা হিজরের ৪৫ থেকে ৪৮ নাম্বার আয়াতে, [إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِى جَنّٰتٍ وَعُيُونٍ] - মুত্তাকীরা থাকবে এমন উদ্যানে যার মাঝে ঝর্ণাধারা বহমান থাকবে। আবারও, জল ও শ্যামলীমার সমন্বয়, যেমনটা আমি বলেছি, এটাই আমাদের প্রকৃতি। আল্লাহর শপথ, আপনি পৃথিবীতে এমন একটি সমাজও পাবেন না যেখানে এর ধনী, অভিজাত এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের বাসস্থান গাছপালা ও জলাধারের সমারোহে সজ্জিত না। সেই সমারোহ, তা আমাদের প্রকৃতিতে গেঁথে আছে। তাই, কুরআন যে সুনির্দিষ্ট চিত্রকল্প ব্যবহার করেছে, যেখানে থাকবে মরুদ্যান বা এজাতীয় জিনিস, যা হয়তো মরুভূমির মানুষের কাছে বেশী আকর্ষনীয় হতে পারে, তবুও তা গাছপালা এবং জলাধারের সমন্বিত ধারণা। তো, মুত্তাকীগণ থাকবেন জান্নাত এবং ঝর্ণার ধারে। [ادْخُلُوهَا بِسَلٰمٍ ءَامِنِين] - প্রশান্তি সহকারে এতে প্রবেশ করো, সালামের সহকারে এতে প্রবেশ করো। তোমরা নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে থাকবে। আমিন (ئَامِنْ) — এটা জান্নাতের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য, সালাম এবং আমিন (ئَامِنْ)। সকলেই বলবে — সালাম এবং প্রকৃতপক্ষেই তা বলবে। এর অর্থ হোলো, যখন আপনি বলবেন সালাম, যখন আপনি সালাম দিবেন, কেউ আপনার ক্ষতি করবে না। আপনি থাকবেন নিরাপদ। কোন যুদ্ধ, কোন ভয়, কোন যন্ত্রণা, কোন দুর্ভোগ, কোন দুঃখ থাকবে না। আপনি আমিন (ئَامِنْ)। আর আমিন অর্থ সম্পর্ণরূপে নিরাপদ।
অতঃপর আল্লাহ বলেছেন, [وَنَزَعْنَا مَا فِى صُدُورِهِم مِّنْ غِلٍّ] - আমরা জান্নাতবাসীদের অন্তরে বিদ্যমান যাবতীয় বিদ্বেষ অপসারণ করবো। কারণ, জানেন তো, এটা আমাদের পক্ষে বোঝা খুবই কঠিন। আপনি সৎকর্মশীল হওয়া সত্ত্বেও অন্তরে ভুল পোষণ করতে পারেন। কেউই নিখুঁত না। আপনি এবং আমি, আমরা সকলেই।
আমরা সবাই এমন মানুষদের চিনি। কিন্তু ভেবে দেখুন, আরেকজন মানুষ রয়েছে। সেই ব্যক্তিটিকে চিনতে হলে আপনাকে আয়নার দিকে তাকাতে হবে, সেই ব্যক্তিটিও নিখুঁত নয়। সেই ব্যক্তিটিরও অন্তরের ব্যাধি থাকতে পারে। কেউই নিখুঁত নয়। তো আল্লাহ বলছেন, যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের অন্তরে যে বিদ্বেষ ছিলো তা আমি অপসারণ করবো। আর তারা হবে ইখওয়ান, তারা হবে ভ্রাতৃসুলভ। তাদের একে অপরের জন্য পূর্ণ ভালোবাসা থাকবে। তাদের একে অপরের জন্য ভালোবাসা ছাড়া কিছুই থাকবে না। [إِخْوٰنًا عَلٰى سُرُرٍ مُّتَقٰبِلِينَ] - তারা পরস্পরের মুখোমুখি আসনে আসীন হবে।
ওকে। আয়াতগুলো আসলেই চমৎকার। আপনারা জানেন আলী (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে বিখ্যাত যে যুদ্ধ ঘটেছিলো, কিছু ভুল বোঝাবুঝি, সেটা বরং বড় ধরণের ভুল বোঝাবুঝিই ছিলো। তাঁরা এর কারণে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। তখন কেউ একজন আলী (রা.)-কে বললো, “আপনি মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে খারাপ কিছু বলছেন না কেনো ? আপনি তাঁকে অভিশাপ দিচ্ছেন না কেনো ? কেনো আপনি এমনটা করছেন না” ? তখন তিনি বললেন, “না, মোটেই না। আমি আল্লাহর কাছে দুয়া করি যাতে এই আয়াতটি আমার ও তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় — [وَنَزَعْنَا مَا فِى صُدُورِهِم مِّنْ غِلٍّ إِخْوٰنًا عَلٰى سُرُرٍ مُّتَقٰبِلِينَ]। তিনি সূরা হিজরের এই আয়াতটি উদ্ধৃত করলেন যে, আমি তাদের অন্তর থেকে তাদের মধ্যে যা ভুল বোঝাবুঝি ছিলো তা অপসারণ করবো এবং তারা পরস্পর মুখোমুখি আসনে ভাই ভাই হয়ে অবস্থান করবে।
তাঁরা হেলান দিয়ে বসবেন। আপনি যখন কারো বাড়িতে যান এবং তার সাথে আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব থাকে, আপনি স্বাচ্ছন্দ্যে বসেন। সে-ও সেখানে বসে। আপনারা শুধু কথা বলেন এবং উপভোগ করেন। আর আল্লাহ বলছেন যে, দুনিয়াতে হয়তো সমস্যা ছিলো, কিন্তু আখিরাতে সকল মুসলিম একত্রিত হবে এবং যাদের মধ্যে বিরূপ সম্পর্ক ছিলো, পরকালে তাদের মধ্যে পবিত্রতা ছাড়া কিছুই থাকবে না। তারা আসনে হেলান দিয়ে বসে গল্প করতে থাকবে — [عَلٰى سُرُرٍ مُّتَقٰبِلِينَ]। [لَا يَمَسُّهُمْ فِيهَا نَصَبٌ] - জান্নাতে তারা কখনও ক্লান্ত হবে না। [وَمَا هُم مِّنْهَا بِمُخْرَجِين] - এবং তাদেরকে কখনোই জান্নাত থেকে বহিষ্কার করা হবে না।
সুতরাং, জান্নাত হলো প্রশান্তির স্থান, এটি নিরাপত্তার স্থান। সেখানে পেছন থেকে কোনো আঘাত হবে না, কোন গীবত নেই, কোন হিংসা নেই, কেউ আপনাকে কোন কষ্ট দেবে না। আমাদের রসূল (স) যেমনটা বলেছেন, জান্নাতবাসীদের সকলের হৃদয় যেন হবে এক-অভিন্ন হৃদয়। তারা যেনো সম্প্রীতিপূর্ণভাবে একই সুরে গাঁথা । এবং তারা কখনও ক্লান্ত হবে না। কেউ জান্নাতে ক্লান্ত হবে না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, বিকেল বেলা অথবা সন্ধ্যা সময়, আমরা প্রায়ই ক্লান্তি বোধ করি, মাথাব্যথা অনুভব হয়। এরকম কিছুই হবে না। জান্নাতে কোন ক্লান্তি থাকবে না।
সূরা ফাতিরের আরেকটি আয়াতে, ৩৪ থেকে ৩৫ আয়াতে, আরেকটি চমৎকার বর্ণনা। [وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِىٓ أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ]। জান্নাতবাসীরা মহান আল্লাহর প্রশংসা করবে। তারা আল্লাহর প্রশংসা করবে। এবং তারা বলবে, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাদের থেকে সকল দুশ্চিন্তা, সকল দুঃখ দূর করেছেন”। কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই, আমাদের প্রত্যেকেই, কোনো বিষয়ে চিন্তিত। এমনকি যখন চিন্তার কিছুই থাকে না, আমাদের হৃদয় ও মন নতুন চিন্তা সৃষ্টি করে — “যদি কিছু ঘটে”। আর আমরা সে বিষয়ে চিন্তা করতে শুরু করি। আমাদের সম্পদ থাকলে, আমরা চিন্তিত — যদি সম্পদ হারাই। আমাদের সম্পদ না থাকলে, তা কিভাবে অর্জন করবো তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। আমাদের আছে বা নাই, যা-ই হোক না কেনো, আমাদের মনে কিছু একটা থাকে যা আমাদেরকে দুঃখিত করে, যা আমাদের চিন্তিত করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, জান্নাতবাসীদের প্রশংসা কি হবে ? আলহামদুলিল্লাহ, দুশ্চিন্তার আর কিছুই নেই। জান্নাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। স্নায়ুবিক চাপের কোন সম্ভাবনা নেই। জান্নাতে কেনো তা হবে না ? [إِنَّ رَبَّنَا لَغَفُورٌ شَكُورٌ]। [الَّذِىٓ أَحَلَّنَا دَارَ الْمُقَامَةِ مِن فَضْلِهِ] - তিনিই আমাদেরকে তার নিজ অনুগ্রহে এই স্থায়ী আবাসে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেখানে আমাদেরকে কোনও কষ্ট, ক্লেষ বা ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং কোন অনর্থক আলাপও আমাদেরকে পীড়া দেবে না।
সুতরাং আবারও, কোনো যন্ত্রণা, কোনো ভোগান্তি, কোনো ক্লান্তি নেই এবং কোনো অনর্থক আলাপ নেই, কোনো ফালতু কথা নেই — এই সবগুলোই জান্নাতের বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত। সূরা দুখানেও আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। সূরা দুখানের শেষ পৃষ্ঠাতেও জান্নাতের চমৎকার একটি বর্ণনা রয়েছে। মহান আল্লাহ সূরা দুখানে উল্লেখ করেছেন, [إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِى مَقَامٍ أَمِينٍ] - নিশ্চই মুত্তাকীরা থাকবে একটি নিরাপদ স্থানে। সুবহানাল্লাহ, জান্নাতের কতো চমৎকার বর্ণনা ! নিরাপদ স্থানে অবস্থান করবে। সেখানে বহবরাগত শত্রু অথবা অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে কোন ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে না, কোন বিপদ নেই, কোন ক্ষতিই নেই।
[إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِى مَقَامٍ أَمِينٍ][দাড়ি][فِى جَنّٰتٍ وَعُيُونٍ] - উদ্যান ও ঝর্ণাসমূহে। [يَلْبَسُونَ مِن سُندُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُّتَقٰبِلِينَ] - তারা সবচেয়ে উন্নত রেশম ও মহামূল্যবান কারুকার্যখোচিত বস্ত্র পরিধান করে, একে অপরের মুখামুখি হোয়ে আসনগুলো অলঙ্কৃত করবে । আর, [كَذٰلِكَ] - এমনটাই ঘটবে। [وَزَوَّجْنٰهُم بِحُورٍ عِينٍ] - এবং আমরা তাদেরকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করবো — হুরদের সাথে। পরবর্তী একটি পর্বে আমরা ইনশা আল্লাহ হুরদের সম্পর্কে আলোচনা করবো।
মহান আল্লাহ বলেছেন, [يَدْعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فٰكِهَةٍ ءَامِنِينَ] - তারা সেখানে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে তাদের কাঙ্ক্ষিত যে কোন ফ