30/04/2026
💝💝 নৃসিংহ চতুর্দশী ব্রত মাহাত্ম্য 💞🌼🌼
🌼🌼 হিরণ্যকশিপু কঠোর তপস্যা করেন এবং ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দর্শন দেয় ও তখন সে ব্রহ্মার কাছে বর চাইলেন,অমরত্ব বর। কিন্তু ব্রহ্মা বললেন- হে হিরণ্যকশিপু! তুমি যে বর চেয়েছো, সেটা আমি দিতে পারবো না। কারণ আমি নিজেই অমর না, তাই তুমি এমন বর চাও যা আমি দিতে পারবো। তখন হিরণ্যকশিপু চিন্তা করলো আমি কি এমন বর চাইবো যাতে আমাকে কেউ হত্যা করতে পারবে না, তখন হিরণ্যকশিপু বর চাইতে লাগলেন যে, হে শ্রেষ্ঠ বরদাতা! আপনি যদি আমার অভীষ্ট বরই দান করতে চান, তবে এই বর দেন যাতে আপনার সৃষ্টির কোনো প্রাণী বা পথে, ঘাটে, দিনের বেলা, রাতের বেলা, ঘরে, বাইরে, জল, ভূমি, বা আকাশে, কোনও পশু বা কোনো অস্ত্রের দ্বারা, এসবের দ্বারা আমাকে বধ করতে না পারে বা ব্যাধিগ্রস্ত বা জরাগ্রস্ত না হই। ব্রহ্মা বললেন, তথাস্তু! তারপর শুরু হলো হিরণ্যকশিপুর অত্যাচার দেবতাদের ওপর। তখন ভগবানের লীলা শুরু হল তাঁর শুদ্ধ ভক্তের ম্যাধমে প্রহ্লাদ মহারাজ। তাই ভগবানের ভক্ত আবির্ভূত হয়ে প্রহ্লাদ মহারাজ ভগবানের আরাধনা করছিল, তখন তাঁর পিতা তাঁকে বলত লাগলো,"তোমার ভগবান, কে???" সে বলতেন,আমার ভগবান বিষ্ণু , তখন হিরণ্যকশিপু ক্ষিপ্ত হয়ে বলতে লাগলো যে, আমি তোমার জন্মদাতা পিতা তাই আমি তোমার ভগবান! কিন্তু প্রহ্লাদ মহারাজ বললো- না! তুমি আমার ভগবান না, আমার ভগবান বিষ্ণু।তিনি জগতপালক শ্রীহরি। তিনি জগতের পিতা ও বিধাতা। তুমি তো কেবল আমার এই জড় জগতের পিতা কিন্তু ভগবান আমার নিত্য পিতা। তখন হিরণ্যকশিপু তার ছেলেকে পাহাড় থেকে ফেলে দেয়, হাতির পায়ের নিচে দেয়, জলন্ত অগ্নিতে নিহ্মেপ করে, আর প্রহ্লাদ মহারাজ শুধু তার প্রভু ভগবান বিষ্ণুকে স্মরণ করতে থাকে। কথায় আছে না, "মারে কৃষ্ণ রাখে কে, রাখে কৃষ্ণ মারে কে" - ভগবান যদি চায় তাহলে পৃথিবীর কোন শক্তি তাকে হত্যা করতে পারবে না। তাই যখন কোন কিছুর দ্বারা সম্ভব হলোনা তখন প্রহ্লাদ মহারাজ কে কারাগারে নিহ্মেপ করল, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখলো আর মারতে লাগলো আর প্রহ্লাদ মহারাজ শুধু শ্রীহরিকে ডাকতে লাগলো। তখন হিরণ্যকশিপু এসে বললো- আজ তোকে কে বাঁচায় দেখি তোর ভগবান কোথায়? তখন বৈকুণ্ঠধামে মা লক্ষ্মীদেবী বললো- হে প্রভু! এখন কি হবে প্রহ্লাদ মহারাজকে কে রক্ষা করবে? হিরণ্যকশিপু তো অমরত্বের মতো বর লাভ করেছে, তাকে কে হত্যা করবে? তোমার ভক্তকে রক্ষা করবে কে? তখন ভগবান বলেন যে অমরত্বের মত বর পেয়েছে কিন্তু অমর না আর প্রহল্লাদকে রক্ষা করবে তাঁর ভক্তি। তাঁর ভক্তিই তাঁকে হিরণ্যকশিপুর হাত থেকে রক্ষা করবে। তখন হিরণ্যকশিপুর বললো- তোর ভগবান কি এখানে আছে?
প্রহ্লাদ বললো- হ্যাঁ! আমার প্রভু সর্বত্রই বিরাজমান এখানেও আছে, এই বলে হিরণ্যকশিপুর সে ঘরের চৌকাঠের স্তম্ভ আঘাত করতে লাগে। তখন হঠাৎ সে স্তম্ভ থেকে বের হয়ে আসে ভক্তের ভগবান নৃসিংহদেব । হিরণ্যকশিপুর বর অনুসারে, তাকে বধ করতে লাগলেন, সে ঘরেও না, বাইরেও না, ঘরের চৌকাঠেও না, কোন নর না, পশুও না, কোন অস্ত্রের দ্বারা না, সকালে না রাতেও না, জলেও না, মাটিতেও না, আকাশেও না, অর্ধেক পশু ও মানুষ নরসিংহ রূপে
গোধূলি লগ্নে (অর্ধেক দিন ও রাত মানে সন্ধ্যায়) নখের দ্বারা বধ করা হয়েছে। ভক্তের ডাকে ভগবান তাঁর ভক্তকে যেকোন উপায়ে রক্ষা করে। এমন কি ভগবানের এই রুপ দেখে দেবতারা ও ব্রহ্মাণ্ডও কেপে ওঠে। এ কি রুপ হঠাৎ এই রুপের আবির্ভাব কেউ বুঝতে পারেনি।
ভগবানের এই রুপকে দেবতারাও পর্যন্ত শান্ত করতে পারেনি। তখন দেবতারা বললো - একমাত্র একজন পারে সে হল,তাঁর ভক্ত প্রহ্লাদ তখন প্রহ্লাদ প্রভুর কাছে স্তব, প্রার্থনা করতে লাগে। তখন ভগবান ভক্তের প্রার্থনাই শান্ত হয় ও তাকে কোলে তুলে নেয় ও ভগবান বলে হে ভক্ত প্রহল্লাদ! আমি তোমাকে দর্শন দিয়েছি এখন তুমি কি বর চাও প্রার্থনা করো আমার কাছে। আমি তোমাকে বর দেবো। তখন ভক্তের কি আর কিছু চাওয়ার আছে, যে জগতের প্রভু তার সামনে তবুও ভগবান বললো তুমি একটা বর চাও যেহেতু আমি তোমার সামনে প্রকট হয়েছি। তখন ভক্ত প্রহ্লাদ বলতে লাগলো- প্রভু! তুমি আমার পিতাকে মুক্তি দাও যেহেতু তিনি আমার জড়জগতে পিতা। তখন ভগবান বললো- হে ভক্ত প্রহ্লাদ তথাস্তু! কিন্তু তোমার শুধু এই পিতাই
মুক্তি লাভ করবে না, যে গৃহে তোমার মত শুদ্ধ বৈষ্ণব ভক্ত আছে, তার ২১কূল উদ্ধার হবে, পিতৃকূলের ১০ কূল,মাতৃকূলের ১০কূল ও নিজের এক কূল মুক্তি লাভ করবে। এই নৃসিংহ ব্ৰত যে পালন করবে, তারা জন্ম-মৃত্যুময় সংসারে থেকে রক্ষা পাবে।
প্রহ্লাদ ভগবানের উদ্দেশ্যে গভীর ভক্তিভরে বললেন—
“হে পরমেশ্বর, হে নৃসিংহরূপধারী করুণাময় প্রভু, আপনি সকল দেবতার আরাধ্য। আমি আপনার চরণে প্রণাম নিবেদন করছি। আমার একান্ত জিজ্ঞাসা—আপনার প্রতি এই অটল ভক্তি আমার মধ্যে কীভাবে জাগ্রত হলো? কীভাবে আমি আপনার প্রিয় ভক্ত হয়ে উঠলাম?”
তখন শ্রীনৃসিংহদেব স্নিগ্ধ কণ্ঠে উত্তর দিলেন—
“হে প্রহ্লাদ, মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোনো। বহু পূর্বে, এক প্রাচীন কল্পে, তুমি এক ব্রাহ্মণকুলে জন্ম নিয়েছিলে। তোমার নাম ছিল বসুদেব। কিন্তু তুমি বেদ অধ্যয়ন করোনি, ধর্মাচরণে মন দাওনি। বরং তুমি ছিলে ভোগবিলাসে আসক্ত, বিশেষ করে এক গণিকার প্রতি প্রবল আসক্তি ছিল তোমার। তোমার জীবনে কোনও উল্লেখযোগ্য সৎকর্ম ছিল না—তবে একটি বিশেষ কাজ তুমি করেছিলে, যার ফলেই আজ তোমার এই বিশুদ্ধ ভক্তি জন্ম নিয়েছে। তুমি অজান্তেই আমার এক পবিত্র ব্রত পালন করেছিলে।”
🌼🌼 প্রহ্লাদ বিস্মিত হয়ে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন-
“হে প্রভু, আমি তখন কার পুত্র ছিলাম? কীভাবে সেই অধঃপতিত জীবনে থেকেও আপনার ব্রত পালন করলাম? অনুগ্রহ করে বিস্তারিত বলুন।”
🌼🌼 শ্রীনৃসিংহদেব তখন কাহিনি ব্যাখ্যা করলেন—
“অবন্তীপুরে এক মহান বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ বাস করতেন, তাঁর নাম ছিল বসুশর্মা। তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ ও বৈদিক আচরণে নিষ্ঠাবান। তাঁর পত্নী সুশীলা ছিলেন আদর্শ পতিব্রতা, সৎ ও গুণবতী নারী। তাঁদের পাঁচ পুত্র ছিল—চারজন ছিল জ্ঞানী, শিষ্ট, পিতৃভক্ত ও চরিত্রবান। কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্রটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের—সে ছিল অসংযমী, মদ্যপ ও বেশ্যাসক্ত। সেই কনিষ্ঠ পুত্রই ছিলে তুমি।
তুমি প্রায় সর্বক্ষণই সেই গণিকার গৃহে অবস্থান করতে। একদিন তোমরা দু’জনে এক বনে ভ্রমণে গিয়েছিলে। কিন্তু হঠাৎ তোমাদের মধ্যে তীব্র বিবাদ সৃষ্টি হয়। মনোমালিন্যের কারণে তোমরা আলাদা হয়ে নীরবভাবে বসে পড়লে। সেখানে তোমরা একটি প্রাচীন ভগ্ন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেলে—কিছু ইট-পাথরের চিহ্ন মাত্র।
সেই নির্জন স্থানে তোমরা দু’জনেই দুঃখে ভেঙে পড়ে কাঁদতে থাকলে। সারাদিন তোমরা কিছুই খাওনি, এমনকি জলও পান করোনি। রাতভর জেগে ছিলে, হৃদয়ে গভীর অনুশোচনা নিয়ে।
তখন তুমি ক্লান্ত ও ভগ্ন হৃদয়ে প্রার্থনা করতে লাগলে—
‘হে ভগবান, এই জগতে কত মানুষ সুন্দর ও পুণ্যবান! আমার পিতা-মাতা ধর্মপরায়ণ, আমার ভাইয়েরা সৎ ও চরিত্রবান। অথচ আমি অধঃপতিত, নীচ ও পাপাচারী। আমি পথভ্রষ্ট, অসহায়। হে প্রভু, আমাকে পবিত্র জীবনের পথ দেখান।’
অন্যদিকে তোমার সঙ্গিনীও কাঁদতে কাঁদতে বলছিল—
‘হে ঈশ্বর, আমি সমাজের কাছে ঘৃণিত, পাপজীবনে নিমজ্জিত। আমার জীবনে কোনও সম্মান নেই, কোনও আশ্রয় নেই। আমি শুধু পাপ সঞ্চয় করেছি। হে দয়াময়, যদি আপনার কৃপা থাকে, তবে আমার জীবন পরিবর্তন করে দিন।’
🌼🌼 শ্রীনৃসিংহদেব বললেন—
“হে প্রহ্লাদ, যে স্থানে তোমরা বসেছিলে, সেটিই ছিল আমার এক প্রাচীন মন্দির। আর যে দিনটি ছিল, সেটি ছিল বৈশাখ মাসের শুক্লা চতুর্দশী—আমার আবির্ভাব তিথি। তোমরা সেদিন উপবাসে ছিলে, সারারাত জেগেছিলে, এবং অন্তর থেকে কল্যাণ কামনা করেছিলে। অর্থাৎ অজান্তেই তোমরা আমার সেই পবিত্র ব্রত পালন করেছিলে।
এই ব্রতের ফলেই তুমি পরবর্তী জন্মে আমার পরম ভক্তরূপে জন্ম নিয়েছ। আর সেই গণিকাও তার পাপ থেকে মুক্তি পেয়ে স্বর্গলোকে অপ্সরা হিসেবে সুখভোগ করছে।
🌼 এই ব্রতের মাহাত্ম্য অপরিসীম। সৃষ্টিশক্তি অর্জনের জন্য ব্রহ্মাও এই ব্রত পালন করেছিলেন। প্রতি বছর এই তিথিতে আমার সন্তুষ্টির জন্য ব্রত পালন করা উচিত। যারা জন্ম-মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তি চায়, তাদের এই গোপন ও মহৎ ব্রত পালন করা আবশ্যক।
🌼 যে ব্যক্তি জেনেও এই ব্রত উপেক্ষা করে, সে দীর্ঘকাল দুঃখ ভোগ করে। তবে এই ব্রত সবার জন্য উন্মুক্ত—ভক্ত হোক বা সাধারণ মানুষ।
🌼 মহাদেব ত্রিপুরাসুর বধের পূর্বে এই ব্রত পালন করেছিলেন। দেবতারা স্বর্গসুখ লাভের জন্য পূর্বজন্মে এই ব্রত করেছিলেন। এমনকি সেই পতিত গণিকাও এই ব্রতের প্রভাবে উন্নত গতি লাভ করেছে।
🌼 যে ব্যক্তি নিষ্ঠাভরে এই ব্রত পালন করে, সে আর সংসারের বন্ধনে আবদ্ধ হয় না। এই ব্রতের ফলে—
অপুত্র ব্যক্তি পুত্রলাভ করে, দরিদ্র ধনী হয়, শক্তিহীন শক্তি পায়, রাজ্যপ্রার্থী রাজ্য লাভ করে, দীর্ঘায়ু কামনাকারী দীর্ঘ জীবন পায়। নারীরা এই ব্রত পালন করলে সৌভাগ্যবতী হয়, সৎ সন্তান লাভ করে এবং জীবনে সুখ ও শান্তি অর্জন করে।
🌼 স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে যারা এই ব্রত পালন করে, তাদের আমি ভোগ ও মোক্ষ—উভয়ই প্রদান করি। কিন্তু পাপাচারী ও অধার্মিক মানুষের মন কখনও এই ব্রতের প্রতি আকৃষ্ট হয় না।
এইভাবে নৃসিংহদেব প্রহ্লাদকে ব্রতের মাহাত্ম্য বোঝালেন।
সকলের জন্য নৃসিংহ চতুর্দশীর আন্তরিক শুভেচ্ছা।
🙏🪷🌹জয় শ্রী নৃসিংহ ভগবান কি জয়🌹🪷🙏
🙏 হরে কৃষ্ণ 🙏
#মহাকাল_ভৈরব #জয়_বাবা_লোখনাথ #রামনবমী #অক্ষয়_তৃতীয়া