13/12/2025
ধম্মের সংজ্ঞা কি?
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
ধম্মের সংজ্ঞা হল ‘ধারেতী’তি ধম্ম’ অর্থাৎ চিত্ত যা ধারণ করে তাহাই হল ধম্ম। বস্তুত: ধম্ম শব্দ হল এক নৈসর্গিক শব্দ, যার প্রতিধ্বনিতেই ধারণ করার অর্থ-ভাব প্রকট হয়ে থাকে। কালান্তরে মানবীয় চৈতন্যের বিকাশের অনুক্রমে ধম্ম শব্দ নৈসর্গিক সীমা হতে বের করে মানবীয় আধ্যাত্মিক অর্থে প্রযুক্ত হওয়া শুরু করেছে। ধম্ম শব্দ যখন সাম্প্রদায়িকীকরণ হয়ে গিয়েছে, তখন অর্থেও সাম্প্রদায়িকতা এসেছে। তাতে মানুষ্যত্বের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হতে গিয়েছে। এখানে ধম্মের বিচার-বিশ্লেষণ নৈসর্গিক তথ্যেই করার প্রয়াস করছি।
ধম্মের পরিভাষা
————————
চিত্ত যখন যা যেভাবে ধারণ করে, তখন সেখানে তা তার ধম্ম হয়ে যায়। এ তথ্য সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে স্বঘটিত হয়ে থাকে। এরূপ তথ্যকে নিম্নোল্লিখিতভাবে বুঝা উচিত। ধম্মের তিন সোপান বা তিন প্রকৃতি হয়ে থাকে। যেমন-
১) ধম্ম হল সার্বজনীন।
২) ধম্ম হল সার্বদেশিক এবং
৩) ধম্ম হল সার্বকালিক।
এ তিন তথ্য যেখানে বিদ্যমান থাকবে সেখানে ধম্ম নিহিত রয়েছে। যেমন আজও বলা হয়, পূর্বেও বলা হত যে, আগুনের ধম্ম হল জ্বলা এবং জ্বালানো। বরফের ধম্ম হল শীতল থাকা এবং শীতল করা। এভাবে স্বভাবকে, প্রকৃতিকে, নিসর্গকে, ঋতুকে, বিধানকে ধম্ম বলা হয়। অনুরূপভাবে রাগ, দ্বেষ, মোহ অথবা অরাগ, অদ্বেষ, অমোহ চিত্তের নৈসর্গিক স্বভাব হল ধম্ম।
১) ধম্মকে নৈসর্গিক অর্থে সার্বজনীন বলা হয়, যেমন-আগুন ভারতীয়দেরকেও জ্বালাবে, আমেরিকান কিংবা বাংলাদেশী বা অন্যান্য যেকোনো দেশীকেও সমভাবে জ্বালাবে। জল ভারতীয়দের যেমন ভেজাবে, তেমনি আমেরিকান, বাংলাদেশী বা যেকোনো দেশের লোকদেরকেই ভেদাভেদ না করে সমভাবেই ভেজাবে। অনুরূপভাবে হাওয়া-বাতাসের চাল-চলন সর্বত্র একই রকম। দেশ-ভেদে তারতম্য হয়না। এভাবে চিত্তে উৎপন্ন দ্বেষাদি মল সমূহ ভেদাভেদহীন ভাবেই সকল মানুষ্যকেই দূষিত করে থাকে।
২) ) ধম্মকে নৈসর্গিক অর্থে সার্বদেশিক বলা হয়, যেমন-আগুন ভারতেও জ্বলে, আমেরিকাতেও জ্বলে এবং বাংলাদেশ বা অন্যান্য যেকোনো দেশেও সমভাবে জ্বলবে। জল ভারতে যেমন ভেজাবে, তেমনি আমেরিকা, বাংলাদেশ বা অন্য যেকোনো দেশেই কোনো রকমের ভেদাভেদ না করে সমভাবেই ভেজাবে। অনুরূপভাবে হাওয়া-বাতাসের চাল-চলন সর্বত্র একই রকম। দেশ-ভেদে তারতম্য হয়না। এভাবে চিত্তে উৎপন্ন দ্বেষাদি মল সমূহ ভেদাভেদহীন ভাবেই সকল দেশ, সমাজের লোকদের দূষিত করে থাকে।
৩) ধম্মকে নৈসর্গিক অর্থে সার্বকালির বলা হয়, যেমন-আগুন আজ হতে দশ হাজার কোটি বছর আগেও জ্বলত, আজও জ্বলছে এবং দশ হাজার কোটি বছর পরেও জ্বলবে। এভাবেই রাগ, দ্বেষ, মোহ, বৃদ্ধি হলে চিত্তের দূষণ অতীতে যেমন বৃদ্ধি হয়েছে, এখনও হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। তেমনি অরাগ, অদ্বেষ ও অমোহ হ্রাস প্রাপ্ত হলে অতীতে যেমন শান্তি লাভ করেছে, তেমনি এখনও শান্তি লাভ করছে এবং ভবিষ্যতেও একই ভাবে শান্তি লাভ করতে থাকবে। এ অর্থে তা সার্বকালিক ধম্ম।
এ সমস্ত হল প্রকৃতির অটুট নিয়ম ও কানুন বা বিশ্বের বিধান। এগুলিকে ধম্ম বলা হয়। আবার সেগুলি প্রকৃতিগত হোক বা চিত্তগত হোক সমস্তই হল ধম্ম।
‘ধর্ম সংস্থাপনার্থায়’ এরকম যে বলা হযেছে, তা কেবল হিন্দু ধর্মের বর্ণধর্ম সংস্থাপনের কথাই। এখানে সার্বজনীন, সার্বদেশিক বা সার্বকালিক ধম্মের কথা নয়। এখানে ধর্ম হল সাম্প্রদায়িক ও বিসমতাপূর্ণ। ধর্মকে এখানে সসীম বানানো হয়েছে। অপরদিকে ধম্ম হল অসীম এবং সার্বভৌমিক।
বিগত ২০০০ বছর অন্ধকারে থাকার কারণে আমাদের দেশে দুর্ভাগ্য হয়েছে যে, ধম্ম শব্দকে সম্প্রদায়ের পর্যায়বাচক বানিয়ে দিয়েছে। ধর্ম সম্প্রদায় বাচক বা সাম্প্রদায়িক হলেও ধম্ম কিন্তু কখনও সাম্প্রদায়িক নয়। ধম্ম সকলের জন্য সর্বত্র সর্বকালে সমান পরিণাম প্রদান করে থাকে। আমাদেরকে ধর্ম এবং ধম্মের পার্থক্য বুঝা অতীব জরুরী।
ভগবান তথাগত বুদ্ধ বৌদ্ধ বা বুদ্ধ ধম্ম নামে কিছু প্রচার করেননি। তিনি সারাজীবন প্রচার করেছেন বিভিন্ন প্রকৃতির ধম্ম। যেমন-লোভ-দ্বেষ-মোহ এগুলিকে তিনি অকুশল ধম্ম বলেছেন। এগুলি সর্বত্র, সকলকে এবং সবসময় দুঃখ প্রদান করে থাকে। সেজন্য অকুশল ধম্মকে পরিত্যাগ করতে উপদেশ দিয়েছেন। তেমনি অলোভ-অদ্বেষ-অমোহকে কুশল ধম্ম বলেছেন। সেগুলি হল সবসময়, সবার এবং সর্বত্র সুখ-শান্তি প্রদায়ক। তাই কুশল ধম্মকে ভাবিত ও বহুলীকৃত করতে উপদেশ দিয়েছেন। কুশল ধম্মকে পূণ্য ধম্ম, শুক্ল ধম্ম বলেও আখ্যায়িত করেছেন, আবার অকুশল ধম্মকে পাপ ধম্ম, কৃষ্ণ ধম্ম নামেও নামকরণ করেছেন। কোথাও কোনো কিছুকে তিনি বুদ্ধধম্ম বলেননি। সুতরাং ধম্ম অর্থ অতীব ব্যাপক।
অনিত্য ধম্ম, দুঃখ ধম্ম এবং অনাত্ত ধম্মের কথা বুদ্ধ বলেছেন। পরিবর্তনশীলতা সর্বত্র, সব কিছুতে এবং সর্বকালে বিদ্যমান রয়েছে। পরিবর্তনশীলতা যে দুঃখ, তাও সর্বকালে, সর্বদেশে এবং সকলের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে যা অনিত্য, যা দুঃখ, তা হল অনাত্ত। অর্থাৎ -অনিত্য-নিত্যও আমার নয়, দুঃখও আমার নয়। সুতরাং সবই হল অনাত্ত। এ অনিত্য, দুঃখ, অনাত্ত ধম্মকে বুদ্ধ জানতে, বুঝতে ও দেখতে বলেছেন।
বুদ্ধ তথাগত বলেছেন-‘অত্তনো স্বভাব ধারেতি ইতি ধম্মো’ অর্থাৎ বর্তমান সময়ে আমার চিত্ত বিচার ধারায় যে স্বভাব ধারণ করা হয়েছে, তাহাই হল আমার ধম্ম বা স্বধম্ম।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় স্বধর্ম নিধনং শ্রেযম্, পর ধর্ম ভয়াবহ’ অর্থাৎ স্বধর্মে মরা ভাল এবং পরধর্মে যাওয়ার পরিণাম হল ভয়াবহ। এরূপ যে বলা হয়েছে, এখানে স্বধর্ম বলতে চারি বর্ণ ব্যবস্থার কথাই বলা হয়েছে। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্রভেদে যারা যে বর্ণে জন্ম গ্রহণ করেছে সে বর্ণের জন্য নির্ধারিত কর্ম করাই হল ধর্ম পালন। সে বর্ণে থেকে মৃত্যুকে শ্রেয় বলা হয়েছে। কিন্তু অন্য বর্ণের কর্ম করতে যাওয়াকে ঘোর অধর্ম বা পরধর্ম বলা হয়েছে। তাঁর পরিণাম হবে ভয়াবহ। সুতরাং ধর্ম এবং ধম্ম এক নয়। বরং একে অপরের কাছ হতে যোজন যোজন দূরত্বে অবস্থান করছে।