30/07/2015
আষাঢ়ী পূর্ণিমার তাৎপর্য !!!
১। তথাগতের মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ ♣
সিদ্ধার্থ গৌতম মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণের পূর্বে তূষিত স্বর্গে দেবপুত্ররূপে অবস্থান করছিলেন। পৃথিবীর মানুষ তখন মনুষ্যত্ব হারিয়ে বিভিন্ন যাগ যজ্ঞ নিয়ে ধর্ম কর্ম ভুলে পশুর মত জীবন যাপন করছিল। তখন দেবগণের প্রার্থনায় বহুজনের হিতের ও মঙ্গলের তথা জীবজগতের মুক্তির জন্য পবিত্র আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে তিনি কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধোধনের গৃহে তাঁর অগ্রমহিষী মায়াদেবীর গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।
২। গৃহত্যাগ ♣
মহামায়া দেবী দেবদহ নগরে পিত্রালয়ে যাবার পথে লুম্বিনী উদ্যানে সিদ্ধার্থের জন্ম হয়। জন্মের পর কুমারকে রাজপ্রাসাদে আনা হয়। সিদ্ধার্থের জন্মের এক সপ্তাহ পর মাতা মায়াদেবী মৃত্যুবরণ করেন। মায়াদেবীর মৃত্যুর পর বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমী
সিদ্ধার্থকে নিজ সন্তানের মত করে মানুষ করেন। অত্যন্ত সুখে রাজকীয় ভোগ বিলাসে লালিত পালিত হতে থাকেন। এইভাবে ১৬ বৎসর অতিক্রান্ত হলে
মামাতো বোন যশোধরার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। যথাসময়ে এক পুত্র সন্তানের জনক হন। পুত্রের নাম রাখা হয় রাহুল। কুমার সিদ্ধার্থ একদিন নগর ভ্রমণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন রাজার নিকট। রাজার অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে তিনি সারথী ছন্দককে নিয়ে নগর ভ্রমণে বের হয়ে প্রথম দিন লাঠিতে ভর করে চলমান এক বৃদ্ধ লোক, দ্বিতীয় দিন রোগ যন্ত্রণায় কাতর আর ও অধিকতর রুগ্ন বৃদ্ধ ব্যক্তি, তৃতীয় দিনে আত্মীয় পরিজন ক্রন্দনরত এক মৃত ব্যক্তিকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এবং চতুর্থ দিনে ধীরস্থির শান্ত, সৌম্য কাষায় বস্ত্রধারী এক সন্যাসীকে দেখতে পেয়ে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। এই চারি নিমিত্ত শুধু সিদ্ধার্থ ও সারথী ছন্দক দেখেছিল আর কেউ দেখেনি। কারণ রাজার কঠোর নির্দেশ ছিল এই ধরণের কোন দৃশ্য যেন কুমারের দৃষ্টি গোচর না হয়। দেবতারা বিভিন্ন রূপ ধারণ করে কুমারকে দেখা দিয়েছিল, তার ধর্ম সংবেগ সৃষ্ঠির জন্য।
৩। ঋষিপতন মৃগদাবে ধর্মচক্র প্রবর্তন ♣
কপিলাবস্তুর রাজ্যের স্বর্ণ সিংহাসন উপেক্ষা করে পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজনবর্গ সর্বস্ব ত্যাগ করে সত্যের সন্ধানে সন্যাসব্রত গ্রহণ করতঃ ছয় বৎসর কঠোর সাধনার পর মহান বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে তিনি সর্বজ্ঞতা জ্ঞান বুদ্ধত্ব লাভ করেন। ৩৫ বৎসর বয়সে
আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে বারাণসীর ঋষিপতন মৃগদাবে ধর্মচক্র সূত্র প্রবর্তন করেন। বুদ্ধত্ব লাভ করার পর তাঁর মনে এই চিন্তা উদিত হল যে, আমি সর্বপ্রথম কার নিকট এই ধর্ম উপদেশ করব? কে বা তা বুঝতে পারবে? হঠাৎ তাঁর মনে হল ঋষি আড়ার কালাম এবং রামপুত্র
রুদ্রক এর কথা। এঁরা দক্ষ, মেধাবী ও সুপন্ডিত দীর্ঘকাল ধরে সাধনারত। পরক্ষণেই তাঁর জ্ঞানদর্শন উৎপন্ন হল।
তাঁরা মহাজ্ঞানী ছিলেন বটে তবে এই ধর্ম সত্ত্বর বুঝতেও সক্ষম হতেন কিন্তু সপ্তাহখানেক আগে আড়ার
কালাম এবং গতরাত্রে রামপুত্র রুদ্রক কালগত হয়েছেন। অতঃপর তাঁর মনে পঞ্চবর্গীয় শিষ্য কৌন্ডিন্য, ভদ্রিয়ম
বপ্প, মহানাম ও অশ্বজিৎ এর কথা মনে পড়ল। তিনি চিন্তা করলেন, এরা আমার বহু উপকারী।
৪। যমক প্রতিহার্য ঋদ্ধি প্রদর্শন ♣
মহাকারুণিক বুদ্ধ যখন জগতের কল্যাণের জন্য তাঁর শিষ্যবর্গদের নিয়ে দিকে দিকে বিচরণ করে মানুষের মধ্যে ধর্মসুধা বিতরণ করছিলেন, তখন বৌদ্ধ শাসনের বাইরের তির্থীকদের লাভ সৎকার কমে গিয়েছিল।
তারা বুদ্ধ ও সংঘের প্রতি হিংসাপরায়ন ও
তাঁদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা জন্য ৮০ হাত লম্বা একটি বাঁশের মাথায় চন্দন কাষ্ঠ নির্মিত একটি অত্যন্ত মূল্যবান ভিক্ষাপাত্র স্থাপন করে নীচে লিখে দেয়া হল যে ব্যক্তি বাঁশের অবস্থান ঠিক রেখে ঐ ভিক্ষাপাত্র গ্রহণ করতে পারবে, পাত্রটি গ্রহণকারীর হয়ে যাবে। ইহা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ঋদ্ধিশক্তি পরীক্ষা করা। সে সময়ে ধর্মসেনাপতি অর্হৎ সারিপুত্র স্থবির তাঁর ৭ বছরের অর্হৎ শিষ্য পিন্ডোল ভারদ্বাজকে নিয়ে সে পথ দিয়ে ভিক্ষান্নে যাচ্ছিলেন। ব্যাপারটি দেখে তিনি একটু হেসে শিষ্যকে ঐ পাত্রটি গ্রহণ করতে পারবে কিনা জিজ্ঞেস করলে শিষ্য বললেন, আপনি অনুমতি প্রদান করলে পারব। গুরুর অনুমতি নিয়ে ৭ বছরের অর্হৎ শিষ্য পিন্ডোল ভারদ্বাজ লম্বা হতে হতে ৮০ হাত লম্বা হয়ে বাঁশের অগ্রে স্থাপিত পাত্রটি অলৌকিক শক্তি দ্বারা গ্রহণ করে ফেললেন। উপস্থিত জনতা বুদ্ধের শিষ্যদের ঋদ্ধিশক্তি দেখে বিষ্ময়ে হতবাক। অপরদিকে তির্থীকরা বুদ্ধের শিষ্যদের নামে কুৎসা রটাতে লাগল যে, তাঁরা লোভী ও মোহপরায়ন। একটি মূল্যবান ভিক্ষাপাত্রের লোভ সামলাতে না পেরে তারা অলৌকিক শক্তি ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ইহা ছিল তির্থীকদের একটি অপকৌশল। ঐ পাত্র গ্রহণ করতে না পারলেও তারা শ্রমণদের কোন ঋদ্ধিশক্তি নাই বলে নিন্দা করত। কথাটি ভগবানের কানে গেল তিনি সকল ভিক্ষুদের ডেকে ঋদ্ধিশক্তি প্রদর্শন না করার জন্য নির্দেশ দিলেন। তিনি নিজে আগামী আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে শ্রাবস্তীর গন্ডাম্র বৃক্ষমূলে ঋদ্ধি প্রদর্শন করবেন বলে ৩ মাস আগে ঘোষণা দিলেন। প্রাকৃতিক
সৌন্দর্যের লীলাভূমি, অপরূপ সুন্দর সেই পাখি ডাকা, ছায়াঘেরা পাখির কলতানে মুখরিত আম বাগানটি ছিল গন্ড নামে এক উপাসিকার। নির্দিষ্ট দিনে বুদ্ধ যখন তাঁর ৫ হাজার শিষ্য-প্রশিষ্য নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন, দেখলেন যে তির্থীকরা তান্ত্রিক শক্তির প্রভাবে বাগানের সমস্ত গাছপালা উৎপাটন করে বাগানটিকে একটি হতশ্রী মরুভূমিতে পরিণত করে ফেলেছে। গন্ড উপাসিকা তার বাগানে বুদ্ধের আগমন সংবাদ শুনতে পেয়ে বাগানে এসে এ অবস্থা দেখে ক্রন্দন করতে থাকে। বুদ্ধ তখন তাকে বললেন, তুমি একটি আমের বীচি নিয়ে এস। বুদ্ধের নির্দেশে আমের বীচি আনা হলে বাগানের মাঝখানে তা পুঁতে রেখে তার উপর বুদ্ধের হাত ধোয়া জল দিলে সঙ্গে সঙ্গে সেই বীচি থেকে একটি আমগাছ গজিয়ে উঠে এবং গাছটি ৮০ হাত দীর্ঘ হয়ে চতুর্দিকে শত শত ডালপালা ও সবুজ পাতা বিস্তার লাভ করে। তখন বাগানটি আগের চাইতেও শ্রী ধারণ করে। তখন বুদ্ধ সে উদ্যান থেকে শূণ্যে উঠে বিভিন্ন রকমের ঋদ্ধি প্রদর্শন করতে থাকেন। যেমন, দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায়, শোয়া অবস্থায়, চংক্রমণরত হাত তুলে আশীর্বাদ করা ভঙ্গিতে নানা রকমের ঋদ্ধি প্রদর্শন করেন যা কোনদিন কেউ দেখেনি। মানুষ অবাক বিষ্ময়ে এ দৃশ্য অবলোকন করে সাধুবাদ দিতে থাকে। তখন লক্ষ লক্ষ মানুষের ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল।
৫। মাতাকে ধর্মদান করার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন ♣
গন্ডাম্র বৃক্ষমূলে যমক প্রতিহার্য ঋদ্ধি প্রদর্শন শেষে মহাকারুণিক বুদ্ধ তাঁর মাতাকে ধর্মোপদেশ দেয়ার জন্য ঋদ্ধিবলে তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। সেখানে তিনি ৩ মাস অবস্থান করেন। তথাগতের ৭ম বর্ষাবাস এই তাবতিংস স্বর্গেই যাপন করেছিলেন। সেখানে
তিনি অভিধর্ম দেশনাকালে তাঁর মাতাসহ ৮০ কোটি দেবতার ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল।
৬। ভিক্ষুদের বষার্বাস আরম্ভ ♣
শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমার আজকের এই দিনে মহান মাননীয় ভিক্ষু সংঘের তিন মাসের জন্য বষার্বাস অারম্ভ হয়।তিন মাস শেষে শুভ প্রবারণা পূর্ণিমার পর দিন থেকে এক মাসের জন্য কঠিন চীবর দান শুরু হয়।
®----> জ্যোতিরতন ভিক্ষু
ঢাকা।