Guru Dasaswara Maha Deva Shiva Mondir,dayagonj.dhaka.

Guru Dasaswara Maha Deva Shiva Mondir,dayagonj.dhaka. IT IS PRAYER TEMPLE FOR LORD SHIVA

05/09/2022
18/05/2022

শক্তিপূজায় 'বলি',
আবশ্যকীয় উপাচার

সনাতন ধর্মে পশুবলি প্রথা দৃষ্টিকটু হলেও, শাস্ত্রে নিষিদ্ধ নয়।শুধুমাত্র বৈষ্ণব শাস্ত্রাদিতে পশুবলির আবশ্যকতা খুব একটা পাওয়া যায় না। এর অন্যতম কারণ বৈষ্ণব শাস্ত্রাদিতে ও উপাসনায় অহিংসা তত্ত্বের প্রভাব এবং শ্রীরামানুজাচার্য, শ্রীমধ্বাচার্য, শ্রীনিম্বার্ক এই প্রধান চার বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রধান আচার্যবৃন্দ সকলেই দক্ষিণ ভারতের। আর বলার অপেক্ষা রাখে না, দক্ষিণ ভারতে ঐতিহাসিকভাবেই নিরামিষাশী প্রভাব প্রবল। সেখানে বহু মুসলিম এবং খ্রিস্টানরাও নিরামিষাশী।এই নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসেরই সরাসরি প্রভাব পরেছে বৈষ্ণব সম্প্রদায়গুলোর উপরে। কিন্তু এর পরেও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের বেদের পরে প্রধানতম গ্রন্থ শ্রীমদ্ভাগবত এবং বিষ্ণু পুরাণে ধূপ, প্রদীপ, উপহার এবং বলি দ্বারা পূজা করতে বলা হয়েছে। তবেই দেবী সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করবেন।

অর্চিষ্যন্তি মনুষ্যাস্ত্বাং সর্বকামবরেশ্বরীম্‌ ।
ধূপোপহারবলিভিঃ সর্বকামবরপ্রদাম্‌ ।।
( শ্রীমদ্ভাগবত: ১০. ২.১০)

"তুমি সর্বলোকের সকলের প্রার্থনাপূরণকারিণী বরদাদেবীরূপে পূজিতা হবে। লোকে ধূপ,প্রদীপ, উপহার এবং বলি দ্বারা সকল মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্যে তোমার পূজা করবে।"

আদ্যাশক্তি মহামায়ার উদ্দেশ্যে শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের মত এই একইপ্রকারের কথা বিষ্ণু পুরাণেও পাওয়া যায়।

সুরামাংসোপহারৈশ্চ ভক্ষ্যভোজ্যৈশ্চ পূজিতা ।
নৃণামশেষকামাংস্ত্বং প্রসন্না সম্প্রদাস্যসি ।।
( বিষ্ণু পুরাণ: ৫.১.৮৬)

"হে দেবী! সুরা ও মাংস, ভক্ষ্য ও ভোজ্য দ্বারা তোমায় পূজা করলে তুমি প্রসন্ন হয়ে মনুষ্যগণের সর্ব প্রার্থিত বিষয় প্রদান করবে।"

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের দশম স্কন্ধে আরও পাওয়া যায়, ব্রজের গোপীগণও ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে পাওয়ার উদ্দেশ্যে বলি প্রদানসহ দেবী কাত্যায়নী ভদ্রকালীর অর্চনা করতেন।বৃন্দাবনের গোপকুমারীরা অতি প্রত্যূষে সূর্যোদয়ের পূর্বে যমুনার জলে স্নান সেরে নদীর তটভূমিতে বালুকাময় মাটি দিয়ে দেবীর মূর্তি নির্মাণ করে চন্দনাদি গন্ধদ্রব্য, সুগন্ধি পুষ্পের মালা, বলি, ধূপ, দীপ, নানাপ্রকার উপহার দ্রব্য, পল্লব, ফল এবং তণ্ডুলাদির দ্বারা কাত্যায়নী, মহামায়া, মহাযোগিনী, অধীশ্বরী ভদ্রকালীর পূজা করতেন।

শ্রীশুক উবাচ
হেমন্তে প্রথমে মাসি নন্দব্রজকুমারিকাঃ।
চেরুর্হবিষ্যং ভুঞ্জানাঃ কাত্যায়ন্যর্চনব্ৰতম্॥
আপ্লুত্যাম্ভসি কালিন্দ্যা জলান্তে চোদিতেঽরুণে।
কৃত্বা প্রতিকৃতিং দেবীমানর্চুর্নৃপ সৈকতীম্॥
গন্ধৈর্মাল্যৈঃ সুরভিভির্বলিভির্ধূপদীপকৈঃ। উচ্চাবচৈশ্চোপহারৈঃ প্ৰবালফলতণ্ডুলৈঃ॥
(শ্রীমদ্ভাগবত:১০.২২.১-৩)

"শ্রীশুকদেব বললেন- বললেন—পরীক্ষিৎ ! এরপর হেমন্ত ঋতুর প্রথম মাস অর্থাৎ মার্গশীর্ষ বা অগ্রহায়ণ মাসে নন্দমহারাজের ব্রজভূমির কুমারীগণ দেবী কাত্যায়নীর পূজা তথা ব্রত আচরণে প্রবৃত্ত হলেন। এই সময়ে তাঁরা শুধুমাত্র হবিষ্যান্নই গ্রহণ করতেন।

মহারাজ ! গোপকুমারীরা অতি প্রত্যূষে দিগন্তে অরুণাভাস দেখা দিতে না দিতে যমুনার জলে স্নান সেরে জলসমীপেই তটভূমিতে বালুকা দিয়ে দেবীর মূর্তি নির্মাণ করে চন্দনাদি গন্ধদ্রব্য, সুগন্ধি পুষ্পের মালা, বলি, ধূপ, দীপ, নানাপ্রকার উপহার দ্রব্য, পল্লব, ফল এবং তণ্ডুলাদির দ্বারা তাঁর পূজা করতেন।"

ধর্ম ভিন্ন হলেও পাঠাবলি এবং কুরবানির উদ্দেশ্য এবং প্রকৃতি প্রায় একই প্রকারের বলা চলে। দুটিই যারযার নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে সৃষ্টিকর্তার নামে সমর্পণ করে সেই পবিত্র মাংস খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা। আমি আমার এ জীবনে কোন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে কোনদিন দেখিনি কোরবানির বিরুদ্ধে কখনো কোন নেতিবাচক মন্তব্য করতে। সে অশিক্ষিত রিক্সাওয়ালা হোক অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। কারণ বিষয়টি তাদের ধর্মগ্রন্থে রয়েছে।কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থের বিবিধ স্থানে পশুবলির শাস্ত্রীয় নির্দেশনা থাকার পরেও, তথাকথিত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের কিছু পণ্ডিতম্মন্য ব্যক্তি শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। তাদের মধ্যে এমন একটি ভাব; যদি সে বলির বিরুদ্ধে না বলে, বলির বিরুদ্ধে না লিখে তবে সে প্রগতিশীলদের কাতারে ঠাই পাবে না। এরাই আবার পশুমাংস ভোজনের সময়ে মাংসের পাতিল খালি করে ফেলে। দেখা যায়, মাংস যে রান্না করেছে তারই ভাগ্যে জোটে না বা কিঞ্চিৎ পরিমাণ জোটে। এই দ্বৈতচরিত্রের ব্যক্তিরা ভয়ংকর। বঙ্গদেশে মনসাপূজা, দুর্গাপূজা এবং কালীপূজা আসলেই এই তথাকথিত নিজে পশুভক্ষক হয়েও, ঋতুভিত্তিক পশুপ্রেমীগণ শীতনিদ্রা ত্যাগ করে জেগে উঠেন। পেটের পাকস্থলীতে হজমের অপেক্ষায় পশুমাংস নিয়ে তারা সক্রিয়ভাবে শাস্ত্রীয় পশুবলির বিরুদ্ধে লেখালেখি, প্রচারণা শুরু করে দেন। কিছু সস্তা বালখিল্য যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন, সনাতন ধর্মে পশুবলি অধর্মাচরণ এবং অশাস্ত্রীয়। কিন্তু বিষয়টি তা নয়; বরং সম্পূর্ণ উল্টো। অবশ্য বৈষ্ণব সম্প্রদায় এই ঋতুভিত্তিক পশুপ্রেমীগণের পর্যায়ভুক্ত নয়। তাদের উদ্দেশ্য মহত্তম। তারা তাদের সাধন জীবনে অগ্রসর হতে সর্বদা উদ্ভিজ্জ আমিষ ভোজন করেন।এতে তাদের শরীর ও মস্তিষ্ক শান্ত হয়ে দৈবীপথে ঊর্ধ্বগামী হয়।পশুবলি প্রসঙ্গে বলতে হয়, আমি বিশ্বাস করি আর না করি, শাস্ত্রীয় পশুবলি প্রথা কিঞ্চিৎ দৃষ্টিকটু একথা সত্য। কিন্তু পশুবলি সনাতন ধর্মে অশাস্ত্রীয় নয়। প্রায় সকল শাস্ত্রগ্রন্থেই পশুবলির নির্দেশনা রয়েছে।শাক্ত সম্প্রদায়ের বেদের পরে প্রধান গ্রন্থ শ্রীচণ্ডী। এ শ্রীচণ্ডীতে একাধিক স্থানে বলি প্রদানের কথা রয়েছে। পূজায় পশুবলি প্রদানের নির্দেশনা দেবী স্বয়ং নিজমুখেই দিয়েছেন :

বলিপ্রদানে পূজয়ামগ্নিকার্যে মহোৎসবে।
সর্বং মমৈতচ্চরিতমুচ্চার্যং শ্রাব্যমেব চ।।
জানতাজানতা বাপি বলিপূজাং তথা কৃতম্ । প্রতীচ্ছিষ্যাম্যহং প্রীত্যা বহ্নিহোমং তথা কৃতম্ ॥
(শ্রীচণ্ডী:১২.১০-১১)

"বলিদানে, দেবতার পূজায়, যজ্ঞ ও হোমাদিতে এবং মহোৎসবে আমার এই মাহাত্ম্য সম্পূর্ণরূপে পাঠ ও শ্রবণ করা কর্তব্য।
আমার মাহাত্ম্যপাঠের পর বিধিজ্ঞানপূর্বক বা অজ্ঞানপূর্বক অনুষ্ঠিত বলিদানসহকারে পূজা এবং আমার উদ্দেশে অনুষ্ঠিত হোমাদি আমি প্রীতিপূর্বক গ্রহণ করি।"

যজ্ঞাদি কর্মে পশুবধজনিত পাপ হয় না। বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব রচিত বেদান্তসূত্রেও বলা হয়েছে:

অশুদ্ধমিতি চেৎ, ন, শব্দাৎ ॥
(ব্রহ্মসূত্র:৩.১.২৫)

"যদি এইরূপ বলা হয় যে, যজ্ঞাদিতে পশু ইত্যাদি বলি হয় বলে উহা পাপ।কিন্তু তা নয় — কারণ এর শাস্ত্রীয় প্রমাণ রয়েছে।"

শ্রুতিতে পশুবধের বিধান আছে— এবং এই কর্মের শুধুমাত্র পুণ্য ফলই হবে বলা আছে। বেদান্তসূত্রের এ সূত্রটির মাধ্যমে পূর্বসূত্রে উপস্থাপিত যজ্ঞে পশুবলি বিরোধীদের সকল আপত্তিটির খণ্ডন করা হয়েছে। আপত্তিটি ছিল যে, জীব যজ্ঞাদিতে পশু হননাদি দুষ্কর্মে পাপে লিপ্ত হয়ে বৃক্ষগুল্মাদি জন্ম প্রাপ্ত হয়। এই আপত্তিকে খণ্ডন করে বেদান্তসূত্রকার ব্যাসদেব বলেন, যজ্ঞে পশুহননাদি দ্বারা যজ্ঞকর্তার কোন পাপ বা অশুভ কর্মফলের সৃষ্টি হয় না— কারণ এটি শাস্ত্রানুমোদিত।

মহাভারতে বিবিধ স্থানেই পশুবলির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। ভীষ্মপর্বে অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদগীতায় পূর্বে যে 'দুর্গাস্তব' রয়েছে, সে পবিত্র স্তোত্রের মধ্যেও অর্জুন দেবীকে "সর্বদা মহিষরক্তপ্রিয়ে!" বলে সম্বোধন করেছেন। কৌরবপক্ষীয় দুর্য্যোধনের সৈন্য যুদ্ধের জন্য উপস্থিত হয়েছে দেখে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর যুদ্ধজয়সহ কল্যাণের জন্য বললেন। হে মহাবাহু অর্জুন, তুমি পবিত্রচিত্ত হয়ে যুদ্ধের অভিমুখে থেকে শত্রুগণের পরাজয়ের জন্য 'দুর্গাস্তব' পাঠ কর। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুন রথ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে কৃতাঞ্জলি হয়ে দুর্গাস্তব পাঠ করেন।

মহিষাসৃক্ প্ৰিয়ে নিত্যং কৌশিকি পীতবাসিনি ।৷ ৷
অট্টহাসে কাকমুখি নমস্তেঽস্তু রণপ্ৰিয়ে।।
(মহাভারত: ভীষ্মপর্ব, ২৩.৮)

"সর্বদা মহিষরক্তপ্রিয়ে! কৌশিকি! পীতবসনে!
অট্টহাসে! কাকবদনে! রণপ্রিয়ে! তোমায় নমস্কার।।"

মানববৎসলা দুর্গা অর্জুনের ভক্তি এবং স্তোত্রে সন্তুষ্ট হয়ে শ্রীকৃষ্ণের সম্মুখে আকাশে আবির্ভূত হলেন। দেবী দুৰ্গা বললেন— "হে দুৰ্দ্ধৰ্ষ পাণ্ডুনন্দন ! তুমি অল্পকালের মধ্যেই সকল শত্রুগণকে জয় করবে। কারণ, স্বয়ং নারায়ণ তোমার সহায় এবং তুমিও মহর্ষি নরের অবতার ; সুতরাং তুমি শত্রুগণের কেন—স্বয়ং ইন্দ্রেরও অজেয়।"

যুদ্ধজয়ের বরদান করে দেবী অন্তর্হিত হলেন। অর্জুনও দেবীকর্তৃক বর লাভ করে ধর্মযুদ্ধে জয়লাভের নিশ্চয়তা পেলেন। এরপরে অর্জুন নিজের উত্তম রথে আরোহণ করে রথের সারথি শ্রীকৃষ্ণসহ দিব্য শঙ্খধ্বনি করলেন।

দেবীপুরাণের বিভিন্ন স্থানে পশুবলির প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। দেবতারা বলি দিয়ে দেবীর পূজা করেছেন, সন্তুষ্ট করেছেন।

বরঞ্চ সর্বলোকানাং প্রপদৌ ভয়নাশিনী।।
বলিঞ্চ দদ্যুর্ভূতানাং মহিষাজামিষেণ চ।।
( দেবীপুরাণ: ২১.৪-৫)

"সেই ভয়নাশিনী দেবী সকল লোককেই অভয় প্রদান করলেন। ভূতগণ মধ্যে মহিষ, ছাগ ইত্যাদি বলি দেবীকে প্রদান করলেন।"

দেবীপুরাণে পশুবলি প্রসঙ্গে প্রজাপতি ব্রহ্মা বললেন:

জলদান্তে আশ্বিনে মাসি মহিষারিনিবর্হিণীম্‌ ।
দেবী সম্পূজয়িত্বা তু অষ্টমী হ্যর্দ্ধরাত্রিষু ।
যে ঘাতয়ন্তি সদা ভক্ত্যা তে ভবন্তি মহাবলাঃ ।।
( দেবীপুরাণ:২১.৯)

"বর্ষা প্রভাতে আশ্বিন মাসে অষ্টমী অর্ধরাতে দেবীকে নিষ্ঠার সাথে পূজা করে যারা মহিষ, ছাগ বলি প্রদান করেন, জগতে তাঁরা মহাবলশালী হয়ে থাকেন।"

দেবী দুর্বলদের পূজা কখনোই গ্রহণ করেন না। অনেক দুর্বলচিত্ত অহিংসার নামে নিজের নপুংসকতা এবং দুর্বলতাকে আচ্ছাদিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু দেবীর শরণে থাকলে মনুষ্যের কোন ভয় নেই। দেবী তাঁর আশ্রিত ভক্তের সর্বপ্রকার ভয় হরণ করে নেন।

পদ্মস্থা চর্চ্চিকা রৌপ্যা ধর্মকামার্থমোক্ষদা ।
প্রেতস্থা সর্ব্বভয়হা নিত্যং পশুনিপাতনাৎ ।।
( দেবীপুরাণ:২৩.১৬)

"কমলাসনা দেবীমূর্তি আরোগ্য, ধর্ম, কাম, অর্থ ও মুক্তি প্রদান করেন। প্রেতাসনা দেবী পশুবলি গ্রহণ করে নিত্য সর্ববিধ ভয় হরণ করেন।"

প্রেতাসনা বলতে প্রেত বা শবের ওপর অধিষ্ঠিতা দেবী বোঝানো হয়েছে। কালী, তারা, চামুণ্ডা সবাই শবাসনা। দেবীকে পূজা করলে দেবী নিজেই চতুর্বিধ ফল দেন।শুভনিশুম্ভ বধ করেছেন যে কৃষ্ণবর্ণা হস্তে মুণ্ড এবং ত্রিশুলধারিণী কৌশিকীদেবী (কালী) বলি মাংসে অত্যন্ত তৃপ্তা হন।

বলিমাংসৌদনাহারাং কৃষ্ণগন্ধস্রজপ্রিয়াম্‌ ।
তুরুস্কাগুরুহোমেন বিকারিভয়নাশিনীম্‌ ।।
( দেবীপুরাণ: ৫০.৩৮)

"বলি, মাংস, অন্ন, নৈবদ্য এই দেবীর খুব প্রিয় । এই দেবীকে কৃষ্ণবর্ণ চন্দন , মালা দিতে হয় । তুরুস্ক , অগুরু ইত্যাদি দ্বারা হোম করলে দেবী সর্বভয় নাশ করেন । "

দেবী রক্তমালা ও রক্তবস্ত্র ধারণ করেন। বিধিভাবে পূজা করলে এই দেবী সর্ব্বসিদ্ধি প্রদান করেন ।দেবীপুরাণে কার্ত্তিক মাসের চতুর্দশী ও অমাবস্যা তিথিতে বলি দিয়ে দেবীর পূজা বিধান আছে-

তুলাস্থে দীপদানেন পূজা কার্য্যা মহাত্মনা ।
দীপবৃক্ষাঃ প্রকর্তব্যা দীপচক্রাস্তথাপরা ।।
দীপযাত্রা প্রকর্তব্যা চতুর্দ্দশ্যাং কুহূষ চ ।
সিনীবালীস্তথা বৎস তদা কার্য্যং মহাফলম্‌ ।
সর্বশেষে প্রকর্তব্যা বলিপূজাহোমোৎসবম্‌ ।
নৈরাজনং প্রকর্তব্য নৃনাগতুরগাদিষু।
কার্তিক্যাং কারয়েৎ পূজা যাগং দেবীপ্রিয়ং সদা।।
( দেবীপুরাণ: ৫৯.২৩-২৬)

"কার্ত্তিক মাসে দীপমালা দান করে পূজা করবে। ঐ মাসের চতুর্দশী এবং অমাবস্যার দিন দীপমালা, দীপচক্র ও দীপবৃক্ষাদি নির্মাণ করিবে। ঐ দিবস বলি- পূজা- হোম করা কর্তব্য। দেবতাদের অভ্যুত্থান ও মনুষ্য, অশ্ব, হস্তি প্রভৃতির নীরাজন করবে (যুদ্ধযাত্রার পূর্বে অস্ত্রশস্ত্রাদি পরিষ্কারকরণ তথা অর্চনাকরণ)। কার্তিক মাসে দেবীর পূজা এবং দেবীর উদ্দেশ্য যজ্ঞ করবে। যজ্ঞ দেবীর অত্যন্ত প্রিয়।"

দেবীপুরাণেই স্বয়ং ব্রহ্মা বলেছেন- উদর তৃপ্তির জন্য প্রানী হত্যা করে খেলে পাপ। কিন্তু যজ্ঞের উদ্দেশ্যে দেবতাকে উৎসর্গ করে, সেই উৎসর্গিত মাংস গ্রহণ করলে কোন পাপ স্পর্শ করে না।

ব্রহ্মোবাচ-
যজ্ঞার্থে পশবঃ সৃষ্টা যজ্ঞেম্বেষাং বধঃ স্মৃতঃ ।
অন্যত্র ঘাতনাদ্দোষো বাঙ্মনঃকায়কর্ম্মভিঃ ।।
দেবার্থে পিতৃকার্যেষু মনুষ্যর্থে পুরন্দর ।
বধয়ন্‌ ন ভবেদেন অন্যথা মহাকিল্বিষী ।।
নবকৃষরপূপাণি পায়সং মধুসর্পিষী।
বৃথামাংসঞ্চ নাশ্নীয়াদ্দেবপিতৃ অহোমিতম্।।
( দেবীপুরাণ: ৯৭.৩-৫)

"ব্রহ্মা বললেন, হে পুরন্দর ! যজ্ঞের জন্যই পশুর সৃষ্টি । যজ্ঞে তাদের বধ শাস্ত্রে বিহিত রয়েছে । যজ্ঞের কার্য্যে , বাক্য , মন , কায় ও কর্ম ছাড়া বাকী কর্মে পশুঘাত করলে পাপ হয়।
দেবকার্য্যে, পিতৃকার্য্যে ও মনুষ্যকৃত্যে পশুবধ করলে পাপ হয় না। এর বিপরীতে করলে বরং পাপ হয় ।
দেবতা ও পিতৃগণকে নিবেদিন না করে নূতন কৃষর, পিঠা, পায়স, মধু, ঘৃত ও দেবতাকে অনিবেদিত বৃথামাংস ভক্ষণ করবে না।"

পশুবলি প্রসঙ্গে বরাহপুরাণে বলা হয়েছে :

বরাহ উবাচঃ
মার্গমাংসং ভরং ছাগং শাকং সমনুধুজ্যতে ।
এতান্‌ হি প্রাপণে দদ্যান্মম্ম চৈতৎ প্রিয়াবহম্‌ ।।
বুজানো বিততে যজ্ঞে ব্রাহ্মণে বেদপারগে ।
ভাগো মমান্তি তত্রাপি পশূনাং ছাগ্লস্য চ ।।
মহিষং বর্জয়েন্মস্যং ক্ষীরং দধি ঘৃতং ততঃ ।
বর্জ্জয়েত্তত্র মাংসানি যজুষা বৈষ্ণবোহশ্নৃতে ।।
পরং পায়সপি বর্জ্যানি তন্মাংসং চেতক খুরে ।
পক্ষিণাঞ্চ প্রবক্ষ্যামি যে প্রযোজ্যা বসুন্ধরে ।।
যে চৈব মম ক্ষেত্রেষু উপযুজ্যন্তি নিত্যশঃ ।
লাবুকং কার্ত্তিকঞ্চৈব প্রশস্তঞ্চ কপিঞ্জলম্‌ ।।
( বরাহ পুরাণ:১১৯.১১-১৫ )

"মৃগমাংস , ছাগ মাংস ও শসমাংস আমার অতি প্রিয় । সুতরাং এসব আমাকে নিবেদন করে দেবে। বিস্তৃত যজ্ঞে ছাগ ও অনান্য পশু দান করে বেদপারগ ব্রাহ্মণ কে সমর্পণ করলে আমি তাহার অংশভাগী হই।
আমাকে মহিষ মাংস , ক্ষীর, দৈ ও ঘি দান করতে হয়। কোনো কোনো বৈষ্ণবব্রতে মাংস দান করাও নিয়ম। হে বসুন্ধরা ! সম্প্রতি আমাকে যে সকল পাখীর মাংস আমাকে দিতে হয় তা উল্লেখ করছি, শ্রবণ করো।
লাবক, কার্ত্তিক , কাপিঞ্জল ও অনেক প্রকার মাংস আমার কাজে প্রযুক্ত । যে সব দ্রব্য আমার কাজে দান করতে হয় তা বললাম।"

ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে দেবী দুর্গা এবং দেবী মনসার পূজায় অত্যাবশকীয় পূজার উপাচার হিসেবে বলি প্রদান করতে বলা হয়েছে:

মহিষেণ বর্ষশতং দশবর্ষঞ্চ ছাগলাৎ ।
বর্ষং মেষেণ কুস্মাণ্ডৈঃ পক্ষিভির্হরিণৈস্তথা ।।
( ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ:প্রকৃতিখণ্ড.৬৪.৯৪)

"দেবী দুর্গা মহিষবলি দিলে শতবর্ষ , ছাগল বলিতে দশ বৎসর , মেষ- কুস্মাণ্ড বলিতে এক বছর প্রসন্না থাকেন।"

পঞ্চম্যাং মনসাখ্যায়াং দেব্যৈ দদ্যাচ্চ যো বলিম্।
ধনবান্ পুত্রবাংশ্চৈব কীর্তিমান্ স ভবেদ্ ধ্রুবম্।।
(ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ : প্রকৃতি খণ্ড, ৪৬.৯)

"পঞ্চমী তিথিতে দেবী মনসাকে যে ব্যক্তি বলি প্রদান করে, সে ধনবান, কীর্তিমান এবং পুত্রবান হয়।"

জয় ত্বং কামভূতেশ সর্ব্বভূতসমাবৃতে ।
রক্ষ মাং নিজভূতেভ্যো বলিং গৃহ্ন নমোঽস্তু তে ।।
( গরুড় পুরাণ:পূর্ব খণ্ড, ৩৮.১৮ )

"ওঁ জয় ত্বং কামভূতেশে – ইত্যাদি মন্ত্রে সিংহবাহিনী মহিষমর্দিনী দেবীকে বলিপ্রদানপূর্বক পূজা সমাপন করবে।"

বৃহর্দ্ধমপুরাণের পূর্বখণ্ডে মহাষ্টমীতে উপবাস অবলম্বন করে এবং নবমীতে বলিদান দ্বারা মহাভক্তিসহকারে দেবীর দুর্গার পূজা করতে দেবী স্বয়ং আদেশ করেছেন। ঐ দুইদিন কোটীযোগিনীরও পূজা অবশ্য কর্তব্য। অষ্টমী নবমীর সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজার গুরুত্ব অপরিসীম।

সপ্তম্যাং গৃহমানীয় পূজয়েন্মাং দিনদ্বয়ম্।
নানাবিধৈশ্চ বলিভিঃ পূজাজাগরণাদিভিঃ।।
অষ্টম্যামুপবাসেন নবম্যা বলিদানতঃ।
অর্চ্চয়েন্মাৎ মহাভক্ত্যা যোগিনীশ্চাপি কোটিশঃ ॥ অষ্টমীনবমীসন্ধিকালোঽয়ং বৎসরাত্মকঃ।
তত্রৈব নবমীভাগঃ কালঃ কল্পাত্মকো মম ॥
(বৃহর্দ্ধমপুরাণ: পূর্বখণ্ড,২২.২৭-২৯)

"সপ্তমিতে গৃহে এসে পূজা করবে। এরপরে দুইদিন নানাবিধ বলি, পূজা, ও জাগরণাদি দ্বারা আমার পূজা করবে। মহাষ্টমীতে উপবাস অবলম্বন করবে এবং নবমীতে বলিদান দ্বারা মহাভক্তিসহকারে আমার পূজা করবে। ঐ দুইদিন কোটীযোগিনীরও পূজা অবশ্য কর্তব্য। অষ্টমী নবমীর সন্ধিক্ষণে আমার পূজার বৎসর তুল্য কাল। এরমধ্যে আবার নবমীক্ষণ কল্পস্বরূপ কাল।অর্থাৎ অষ্টমীক্ষণে একবার পূজা করলে দেবীর বৎসরব্যাপী পূজার ফল লাভ হয়। নবমীক্ষণে পূজা করলে কল্পব্যাপী পূজার ফল লাভ হয়।"

দেবীভাগবতের নবমস্কন্ধে বলা হয়েছে, দেবী মনসাকে যে ব্যক্তি বলি প্রদান করে, সে ধনবান, কীর্তিমান এবং পুত্রবান হয়। তাই সর্বদা নিষ্ঠার সাথে বলিদান করে দেবীকে পূজা করে সন্তুষ্ট করা প্রয়োজন।

নত্বা ষোড়শোপচারং বলিঞ্চ তৎপ্রিয়ং তদা।
প্রদদৌ পরিতুষ্টশ্চ ব্রহ্মাবিষ্ণুশিবাজ্ঞয়া।।
(দেবীভাগবত: নবমস্কন্ধ, ৪৮.১১৪)

"দেবরাজ ইন্দ্র ভক্তিযুক্ত শুদ্ধ হৃদয়ে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিবের আজ্ঞায় বলিসহ ষোড়শ উপচারে মনসাদেবীর পূজা করলেন।"

মনুসংহিতাতেও শ্রীরূপা লক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে ‘শ্রিয়ৈ নমঃ’ মন্ত্রোচ্চারণ পূর্বক এবং ‘ভদ্রকাল্যৈ নমঃ' মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক ভদ্রকালীর উদ্দেশ্যে বলি প্রদানের বিধি পাওয়া যায়।

উচ্ছীর্ষকে শ্রিয়ৈ কুর্য্যাদ্ভদ্রকাল্যৈ চ পাদতঃ। ব্রহ্মবাস্তোষ্পতিভ্যাক্ত বাস্তুমধ্যে বলিং হরেৎ।।
(মনুসংহিতা:৩.৮৯)

"উচ্ছীর্ষক অর্থাৎ প্রসিদ্ধ দেবগৃহের শীর্ষস্থানে বা গৃহস্থের শয়নগৃহের ঊর্দ্ধভাগে উত্তর বা পূর্বদিকে লক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে ‘শ্রিয়ৈ নমঃ’ মন্ত্রোচ্চারণ পূর্বক বলি প্রদান করবে এবং ভদ্রকালীর উদ্দেশ্যে ‘ভদ্রকাল্যৈ নমঃ' মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক বলি প্রদান করবে। গৃহমধ্যে ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে ‘ব্রহ্মণে নমঃ’ ও বাস্তুদেবতার উদ্দেশ্যে ‘বাস্তোষ্পতয়ে নমঃ' মন্ত্রোচ্চারণ করে বলি প্রদান করবে।"

দেবী কালীর উদ্দেশ্যে পাঠাবলি প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের উক্তি স্মর্তব্য। তিনি বলেছেন, মা কালী চিরকাল ভক্তের সমর্পিত পাঠাবলি গ্রহণ করেছেন, যখন এই সৃষ্টি যতদিন থাকবে এর কোন ব্যত্যয় হবে না। তিনি এই দেশীর মূলধারার ধর্ম ও সংস্কৃতির বিরোধিতাকারী বিধর্মীদের চিন্তা এবং সংস্কৃতির অনুসারী নব্যপন্থীদের উপরে ব্যাপকভাবে বিরক্ত ছিলেন। তাই স্বামী বিবেকানন্দ তাদের উদ্দেশ্যে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, যদি এদেশীয় পরম্পরাগত সংস্কৃতি পছন্দ না হয়, তবে সরে পড়তে। এ প্রসঙ্গে তিনি সুর চড়া করে আরও বলেন, দু-চারজনের জন্য দেশসুদ্ধ লোককে হাড়-জ্বালাতন সহ্য করা কখনোই সম্ভব নয়। যাদের এদেশীয় মূলধারা সংস্কৃতি পছন্দ না হয়; তারা চড়ে অন্যত্র চলে যেতে পারে, তাদের জন্য সমগ্র পৃথিবী পড়ে রয়েছে। কিন্তু তা নয়, তাদের অন্যত্র যাওয়ারও মুরদ নেই আবার ; আবার এদেশে বসে এদেশের পরম্পরায়গত ধর্ম সংস্কৃতিরই দিবারাত্রি বিরোধিতা করবে।

"এদেশে সেই বুড়ো শিব বসে আছেন, মা কালী পাঁঠা খাচ্ছেন, আর বংশীধারী বাঁশী বাজাচ্ছেন। ঐ বুড়ো শিব ষাঁড় চড়ে ভারতবর্ষ থেকে একদিকে সুমাত্রা, বোর্নিও, সেলিবিস, মায়, অস্ট্রেলিয়া আমেরিকার কিনারা পর্যন্ত ডমরু বাজিয়ে এককালে বেড়িয়েছেন, আর একদিকে তিব্বত, চীন, জাপান, সাইবেরিয়া পর্যন্ত বুড়ো শিব ষাঁড় চরিয়েছেন, এখনও চরাচ্ছেন; ঐ যে মা কালী - উনি চীন জাপান পর্যন্ত পূজা খাচ্ছেন, ওঁকেই যীশুর মা মেরী করে ক্রিশ্চানরা পূজা করছে। ঐ যে হিমালয় পাহাড় দেখছ, ওরই উত্তরে কৈলাশ, সেথা বুড়া শিবের প্রধান আড্ডা। ও কৈলাশ দশমুণ্ড-কুড়িহাত রাবণ নাড়াতে পারেননি, ও কি এখন পাদ্রী-ফাদ্রীর কর্ম! ঐ বুড়ো শিব ডমরু বাজাবেন, মা কালী পাঁঠা খাবেন, আর কৃষ্ণ বাঁশী বাজাবেন—এ দেশে চিরকাল। যদি না পছন্দ হয়, সরে পড় না কেন? তোমাদের দু-চারজনের জন্য দেশসুদ্ধ লোককে হাড়-জ্বালাতন হতে হবে বুঝি ? চড়ে খাওগে না কেন? এত বড় দুনিয়াটা পড়ে তো রয়েছে। তা নয়। মুরদ কোথায়? ঐ বুড়ো শিবের অন্ন খাবেন, আর নিমকহারামী করবেন, যীশুর জয় গাইবেন—আ মরি!"
(বাণী ও রচনা (ষষ্ঠ খণ্ড) ২০১৫: ১১৮- ১১৯)

তথ্য সহায়তা:
১. স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (ষষ্ঠ খণ্ড), উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা: সেপ্টেম্বর ২০১৫

কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক
সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

24/04/2022

JOY SHIVA

Address

45 Sharat Gupta Road , Narinda
Dhaka
DHAKA-1100

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Guru Dasaswara Maha Deva Shiva Mondir,dayagonj.dhaka. posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share

Category