29/01/2023
৩৩ কোটি দেবতা আসলেই কি হিন্দু ধর্মে আছে??
হিন্দুদের কি ৩৩ কোটি দেবতা???
- হ্যাঁ, সত্যিই তাই।
সংস্কৃত "৩৩কোটি" শব্দের অর্থ যে প্রকার বা ধরন, তা যে ৩৩০০ লক্ষ সংখ্যা নয় এটা প্রায় সকলেই অবগত আছেন।
এখন কথা হলো, "দেবতা" শব্দের মানে কি?
"দেবতা" শব্দটির কথা বললে মাথায় আসে এক বা বহু হাত-পা মাথা ওয়ালা কোন কল্পিত দেবতার দেহাবয়ব তথা আশীর্বাদ কর্তা রূপ।
আসলে "দেবতা" বলতে এমন কোন কল্পিত শরীরধারী আশীর্বাদ কর্তা বাস্তবে নেই, কোন কালেও ছিল না, হওয়ারও নয়।
- সংস্কৃত "দেবতা/দেব" শব্দটির ধাতুগত একটা সহজ অর্থ হল "দিব্য গুণ যুক্ত উপকারী শক্তি"।
বাস্তব জগতে এমন বহু উপকারী শক্তি বা প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে, যা মানুষ সহ জগতের কল্যান করছে।
এই ৩৩ কোটি দেবতাও ঠিক তেমনি প্রাকৃতিক বা আধ্যাত্মিক উপাদান তথা উপকারী শক্তি।
৩৩ কোটি দেবতা সমূহ কী কী?
- অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, ইন্দ্র ও প্রজাপতি, এই ৩৩ দেবতা সমস্ত জগৎ ব্যাপীয়া আছে।
এগুলোর কোনটাই কিন্তু আজকের হিন্দুদের উপাস্য শিব, দূর্গা, কালী প্রভৃতি দেবদেবী নয়।
#বেদে_৩৩কোটি_দেবতা
ত্রয়স্ত্রিং শতাস্তুবত ভূতান্য শাম্যন্ প্রজাতিঃ।
পরমেষ্ঠ্যধিপতিরাসিৎ।। (যজুর্বেদ ১৪/৩১)
পদার্থঃ- (ভূতানি অশাম্যন্) যাহার প্রভাবে গতিশীল প্রকৃতি শান্ত হয়, (প্রজাপতিঃ) যিনি প্রজা পালক, (পরমেষ্ঠী) সর্বব্যাপক পরমেশ্বর, (অধিপতিঃ) অধিষ্ঠাতা, (ত্রয়স্ত্রিংশতা) তাহার মহাভূতের তেত্রিশ গুণের, (অন্তবত) কীর্তন কর।
অনুবাদঃ- যাহার প্রভাবে গতিশীল প্রকৃতি শান্ত হয় তথা যিনি প্রকৃতি শাসক, যিনি প্রজার পালক, যিনি সর্বব্যাপক পরমেশ্বর, যিনি সর্বাধিপতি, সেই পরমাত্মার তেত্রিশ ভৌতিক দেব শক্তির অনুশীলন করো তথা গুণকীর্তন করো।
✍️ শতপথ ব্রাহ্মণ (কান্ড ১৪, অধ্যায় ৫) এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৩/৯/২-১১)ঃ-
ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য তাহার শিষ্য শাকল্যকে বলিতেছেনঃ- দেবতা ৩৩টি, অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, ইন্দ্র ও প্রজাপতি, - ইহারা পরমেশ্বরের মহিমাকে প্রকাশ করিতেছে।
✍️ অষ্টবসু (৮ বসু) সমূহ কী কী?
১। অগ্নি (আগুন)
২। বায়ু
৩। পৃথিবী
৪। আদিত্য (সূর্য)
৫। চন্দ্র
৬। নক্ষত্র (তারা)
৭। দ্যৌ (অন্যান্য গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণুসমূহ)
৮। অন্তরীক্ষ (বায়ুমন্ডলের বিভিন্ন স্তর ও এর উপকারী শক্তি)
- এই আট বসু আমাদের সকলকে তথা সমগ্র বিশ্ব জগৎকে বহন বা ধারণ করে আছে। তাই এই উপকারী প্রাকৃতিক উপাদান সমূহ হল ৩৩ কোটি দেবতার মধ্যে অন্যতম।
✍️ একাদশ রুদ্র (১১ রুদ্র) সমূহ কী কী?
্রাহ্মণ (কাঃ১৪, অঃ ৫) অনুসারেঃ-
১। প্রাণ (বায়ু)
২। অপান
৩। সমান
৪। ব্যান
৫। উদান
৬। নাগ
৭। কূর্ম্ম
৮। কৃকল
৯। দেবদত্ত
১০। ধনঞ্জয়, এই দশ প্রাণ (Nervanric Forces) এবং
১১। জীবাত্মা (The Human Spirit)।
#বৃহদারণ্যক_উপনিষদ (৩/৯/২-১১) অনুসারেঃ-
পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় ও পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং জীবাত্মা
৫টি কর্মেন্দ্রিয়-
১। বাক্ (কথা তথা মুখ)
২। পাণি (হাত)
৩। পাদ (পা)
৪। পায়ু (মলদ্বার)
৫৷ উপস্থ (মূত্রাঙ্গ)
৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়-
৬। চক্ষু (চোখ)
৭। কর্ণ (কান)
৮। নাসিকা (নাক)
৯। জিহ্বা
১০। ত্বক
এবং
১১। জীবাত্মা
- এই একাদশ রুদ্র সমূহের ক্রিয়া মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে এবং আত্মার বহির্গমণ তথা মৃত্যুর মাধ্যমে এদের ক্রিয়া শেষ হয়। উভয় অবস্থায়ই এগুলো আমাদেরকে "রোদন" করায় বলে নাম হয়েছে "রুদ্র", যা ৩৩ কোটি দেবতার মধ্যে অন্যতম।
✍️ দ্বাদশ আদিত্য (১২ আদিত্য) সমূহ কী কী?
১। চৈত্র
২। বৈশাখ
৩৷ জৈষ্ঠ্য
৪। আষাঢ়
৫। শ্রাবণ
৬। ভাদ্র
৭। আশ্বিন
৮। কার্তিক
৯। অগ্রহায়ণ
১০। পৌষ
১১। মাঘ
১২। ফাল্গুন
- এই ১২ মাস ১২ আদিত্যকে প্রতিনিধিত্ব করে।
গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত এই তিন মৌলিক ঋতু সহ মোট ছয় ঋতুর পালাবদলে ৩৩ কোটি দেবতার অন্যতম এই ১২ মাস তথা দ্বাদশ আদিত্য সমূহ সম্বৎসর চক্রের অর হিসেবে চক্রাকারে আবর্তন করছে। এর দ্বারা বায়ুমন্ডল তথা আবহাওয়া, জলবায়ু, পরিবেশ প্রকৃতির বৈচিত্র্য টিকে আছে এবং মানুষ সহ সকল জীব ও জড় জগৎ উপকৃত হচ্ছে।
✍️ ইন্দ্র (বজ্র বা বিদ্যুৎ) Electricity or Force.
- বৃষ্টি, শিশির প্রভৃতি প্রাকৃতিক ঘটনা সৃষ্টির নিয়ামক সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি, যা ৩৩ কোটি দেবতার মধ্যে অন্যতম।
✍️ প্রজাপতি (যজ্ঞ বা শুভকর্ম)
- যজ্ঞ বা যে কোন শুভ কর্মের মাধ্যমে মানুষ সহ সকল জীবের ও পরিবেশ প্রকৃতির কল্যাণ সাধিত হয়। তাই এই যজ্ঞ বা শুভকর্ম হল ৩৩ কোটি দেবতার মধ্যে অন্যতম।
👉👉 এই ৩৩ কোটি দেবতা আমাদের সহ সমগ্র বিশ্বকে বাঁচিয়ে রাখছে, টিকিয়ে রাখছে, তাই আমাদের উচিৎ এই তেত্রিশ ভৌতিক দেব শক্তির অনুশীলন তথা প্রযত্ন বা পরিচর্যা করা। কোনভাবেই যেন এ শক্তির অপব্যবহার না করি, জগতের ক্ষতি হয় এমন কাজ যেন আমরা কদাপি না করি। এই হোক আমাদের ব্রত।
ও৩ম্ শান্তি শান্তি শান্তিঃ।।
✍️ Arya আর্যসমাজ