17/04/2022
ফাযায়েলে রমযান!
·
হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন যে, রােযা মানুষের জন্য ঢালস্বরূপ, যতক্ষণ উহাকে ফাড়িয়া না ফেলে।
ফায়দাঃ ঢাল হইবার অর্থ হইল, মানুষ যেভাবে ঢাল দ্বারা নিজের হেফাজত করে ঠিক তেমনিভাবে রােযার দ্বারাও নিজের দুশমন অর্থাৎ শয়তান হইতে আত্মরক্ষা হয়। এক রেওয়ায়াতে আসিয়াছে, রােযা আল্লাহর আজাব হইতে রক্ষা করে। অপর এক রেওয়ায়াতে আছে, রােযা জাহান্নাম হইতে বাঁচাইয়া রাখে ; এক রেওয়ায়াতে বর্ণিত হইয়াছে যে, কেহ আরজ করিল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! রােযা কোন জিনিসের দ্বারা ফাড়িয়া যায়? তিনি ফরমাইলেন, মিথ্যা এবং গীবত দ্বারা। উপরােক্ত দুইটি রেওয়ায়াত এবং এইরূপ আরও বিভিন্ন রেওয়াতে রােযা রাখা অবস্থায় এই ধরনের কাজ হইতে বাঁচিয়া থাকার তাকীদ আসিয়াছে এবং এই কাজগুলিকে যেন রােযা বিনষ্টকারী হিসাবে সাব্যস্ত করা হইয়াছে। আমাদের এই যুগে রােযা রাখিয়া আজে-বাজে কথাবার্তায় মশগুল হওয়াকে সময় কাটানাের উপায় মনে করা হয়। কোন কোন ওলামায়ে কেরামের মতে মিথ্যা ও গীবত দ্বারা রােযা ভঙ্গ হইয়া যায়। এই দুইটি বিষয় এই সকল ওলামায়ে কেরামের নিকট খানাপিনা ইত্যাদি অন্যান্য রােযা ভঙ্গকারী জিনিসের মতই। আর অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে যদিও রােযা ভঙ্গ হয় না কিন্তু রােযার বরকত নষ্ট হইয়া যাওয়ার ব্যাপারে সকলেই একমত।
মাশায়েখগণ রােযার ছয়টি আদব লিখিয়াছেন। রােযাদার ব্যক্তির জন্য এই বিষয়গুলির প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরী।
১নং. দৃষ্টির হেফাজত করা।
যেন কোন অপাত্রে দৃষ্টিপাত না হয়। এমনকি স্ত্রীর প্রতিও যেন কামভাবের দৃষ্টি না পড়ে। সুতরাং বেগানা মহিলার তাে প্রশ্নই উঠে না। এমনিভাবে কোন খেলাধুলা ইত্যাদি নাজায়েয কাজের দিকেও যেন দৃষ্টি না যায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন, দৃষ্টি ইবলীসের তীরসমূহের মধ্য হইতে একটি তীর। যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার ভয়ে উহা হইতে বাঁচিয়া চলিবে, আল্লাহ তায়ালা তাহাকে এমন ঈমানী নূর দান করিবেন যাহার মিষ্টতা ও স্বাদ সে তাহার দিলের মধ্যে অনুভব করিবে। সূফীয়ায়ে কেরাম ‘অপাত্রে দৃষ্টিপাত করা এর ব্যাখ্যা এই করিয়াছেন যে, এমন যে কোন জিনিসের প্রতি দৃষ্টিপাত করা ইহার অন্তর্ভুক্ত, যাহা অন্তরকে আল্লাহ তায়ালা হইতে সরাইয়া দিয়া অন্য কিছুর দিকে আকৃষ্ট করিয়া দেয়।
২নং. জবানের হিফাজত করা।
মিথ্যা, চুগলখােরী, বেহুদা কথাবার্তা, গীবত, অশ্লীল কথাবার্তা, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি সবকিছুই ইহার অন্তর্ভুক্ত। বুখারী শরীফের রেওয়ায়াতে আছে, রােযা মানুষের জন্য ঢালস্বরূপ। তাই রােযাদারের উচিত, সে যেন তাহার জবান দ্বারা কোন অশ্লীল বা মূর্খতার কথাবার্তা যেমন ঠাট্টা-বিদ্রুপ, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি না করে। যদি কেহ ঝগড়া করিতে আসে, তবে বলিয়া দিবে যে, আমি রােযাদার। অর্থাৎ যদি কেহ আগে বাড়িয়া ঝগড়া শুরু করিয়া দেয় তবুও তাহার সহিত ঝগড়ায় লিপ্ত হইবে না। যদি লােকটি বুদ্ধিমান হয় তবে তাহাকে বলিয়া দিবে যে, আমি রােযা রাখিয়াছি। আর যদি লােকটি বেওকুফ ও নির্বোধ হয় তবে নিজের অন্তরকে বুঝাইয়া দিবে যে, তুই রােযা রাখিয়াছিস ; তাের জন্য এই সকল বেহুদা কথাবার্তার জওয়াব দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করিয়া গীবত ও মিথ্যা হইতে বাঁচিয়া থাকা অত্যন্ত জরুরী। কেননা অনেক ওলামায়ে কেরামের নিকট ইহা দ্বারা রােযা ভঙ্গ হইয়া যায়। যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যমানায় দুইজন মহিলা রােযা রাখিয়াছিল। রােযা অবস্থায় তাহাদের এমন তীব্র ক্ষুধা লাগিল যে, সহ্যের সীমা ছাড়াইয়া গিয়া প্রাণ নাশ হইবার উপক্রম হইয়া গেল। সাহাবায়ে কেরাম (রাযিঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবগত করিলে তিনি তাহাদের নিকট একটি পেয়ালা পাঠাইয়া দিলেন এবং দুইজনকেই উহাতে বমি করিতে বলিয়া দিলেন। উভয়ে বমি করিলে দেখা গেল যে, উহার সহিত গােশতের টুকরা এবং তাজা রক্ত বাহির হইয়াছে। লােকেরা আশ্চর্যান্বিত হইলে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইলেন, ইহারা আল্লাহর দেওয়া হালাল রুজির দ্বারা রােযা রাখিয়াছিল বটে ; কিন্তু পরে হারাম জিনিস ভক্ষণ করিয়াছে। অর্থাৎ দুই মহিলাই মানুষের গীবতে লিপ্ত ছিল। এই হাদীসের দ্বারা আরও একটি বিষয় জানা যায় যে, গীবত করার কারণে রােযার কষ্ট খুব বেশী অনুভব হয়। যেমন এই দুই মহিলা রােযার কারণে মরণাপন্ন হইয়া গিয়াছিল। অন্যান্য গােনাহের অবস্থাও ঠিক তদ্রপ। অভিজ্ঞতার দ্বারাও ইহার প্রমাণ পাওয়া যায় যে, খােদাভীরু মুত্তাকী লােকদের উপর রােযার কষ্টের সামান্যতম প্রভাবও পড়ে না। পক্ষান্তরে ফাসেক লােকদের প্রায়ই খারাপ অবস্থা হইতে দেখা যায়।
অতএব যদি কেহ চায় যে, রােযার কষ্ট তাহার অনুভব না হউক, তবে ইহার জন্য উত্তম পন্থা হইল যে, রােযা অবস্থায় যাবতীয় গােনাহ হইতে বাঁচিয়া থাকিবে ; বিশেষতঃ গীবতের গােনাহ হইতে, যাহাকে লােকেরা রােযা অবস্থায় সময় কাটাইবার একটি উপায় মনে করিয়া রাখিয়াছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে গীবতকে নিজের মৃত ভাইয়ের গােশত বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। হাদীস শরীফেও এই ধরনের বহু ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে। যেগুলি দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, যাহার গীবত করা হয় প্রকৃত পক্ষেই তাহার গােশত ভক্ষণ করা হয়। একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুসংখ্যক লােককে দেখিয়া এরশাদ ফরমাইলেন, তােমরা দাঁতে খেলাল করিয়া লও। তাহারা আরজ করিল, আমরা তাে আজ গােশত খাই নাই। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইলেন, তােমাদের দাঁতে অমুক ব্যক্তির গােশত লাগিয়া রহিয়াছে। পরে জানা গেল যে, তাহারা ঐ ব্যক্তির গীবত করিয়াছিল। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। কেননা, এই বিষয়ে আমরা খুবই গাফেল ও উদাসীন। সাধারণ লােক তাে দূরের কথা ; খাছ লােকেরাই ইহাতে লিপ্ত রহিয়াছে। যাহাদেরকে দুনিয়াদার বলা হয়। তাহাদের কথা বাদ দিলেও যাহাদেরকে দ্বীনদার বলিয়া মনে করা হয় তাহাদের মজলিসও সাধারণতঃ গীবত হইতে খুব কমই মুক্ত থাকে। আরাে আশ্চর্যের বিষয় হইল, অধিকাংশ লােকই ইহাকে গীবত বলিয়াই মনে করে। যদি নিজের অথবা কাহারাে মনে একটু খটকা লাগেও তখন উহাকে ‘বাস্তব ঘটনা বলিতেছি' বলিয়া চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কেহ জিজ্ঞাসা করিল যে, গীবত কি জিনিস? তিনি এরশাদ ফরমাইলেন, গীবত হইল কাহারও পশ্চাতে এমন কথা বলা যাহা তাহার কাছে অপছন্দনীয়। লােকটি জিজ্ঞাসা করিল, যাহা বলা হইল যদি বাস্তবিকই তাহার মধ্যে এই বিষয়টি থাকে তবে কি হইবে? হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইলেন, তবেই তাে ইহা গীবত হইবে। আর যদি বিষয়টি আসলেই তাহার মধ্যে না থাকে তবে তাে উহা মিথ্যা অপবাদ। একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুইটি কবরের নিকট দিয়া যাওয়ার সময় এরশাদ ফরমাইলেন, এই দুই কবরবাসীকে আজাব দেওয়া হইতেছে। একজনকে এইজন্য যে, সে মানুষের গীবত করিত। অপরজন পেশাব হইতে সতর্কতা অবলম্বন করিত না। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইলেন, সূদের সত্তরটিরও বেশী স্তর রহিয়াছে। এইগুলির মধ্যে সর্বনিম্ন ও হালকা স্তরটি নিজের মায়ের সহিত জেনা করার সমতুল্য। আর সূদের একটি দেরহাম পঁয়ত্রিশবার জেনার চেয়েও অধিক মারাত্মক। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও সবচেয়ে ঘৃণ্যতম সূদ হইল মুসলমানের ইযযত-সম্মান নষ্ট করা। হাদীস শরীফে গীবত এবং মুসলমানের ইযযত-সম্মান নষ্ট করার উপর কঠোর হইতে কঠোর ধমকি আসিয়াছে। আমার দিল চাহিতেছিল যে, এইগুলি হইতে বেশকিছু পরিমাণ রেওয়ায়াত এখানে একত্রিত করিয়া দেই। কারণ, আমাদের মজলিসগুলি এই সকল বিষয়ের দ্বারা খুব বেশী ভরপুর থাকে। কিন্তু বর্তমান আলােচনার বিষয়বস্তু ভিন্ন হওয়ার কারণে এখানেই শেষ করিতেছি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এই মুসীবত হইতে রক্ষা করুন। বিশেষ করিয়া বুযুর্গ মুরুব্বী ও দোস্ত-আহবাবদের দোয়ার বদৌলতে আমি গােনাহগারকেও হেফাজত করুন। কেননা আমি বাতেনী রােগ-ব্যাধিতে খুবই আক্রান্ত রহিয়াছি।
অর্থাৎ হে আল্লাহ! অহংকার, আত্মগরিমা, অজ্ঞতা, উদাসীনতা, হিংসা, বিদ্বেষ, অন্যের প্রতি খারাপ ধারণা, মিথ্যা, ওয়াদা খেলাফী, রিয়াকারী, জিদ মিটানাে, গীবত, দুশমনী এমন কোন্ রােগ আছে, যাহা আমার মধ্যে নাই। হে আল্লাহ! আমাকে সমস্ত রােগ-ব্যাধি হইতে আরােগ্য দান করুন, আমার হাজত-জরুরত পুরা করিয়া দিন। আমার অন্তর রােগাক্রান্ত ; আপনি উহাকে সুস্থ করিয়া দিন।
৩নং. জিনিস যাহার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া রােযাদারের জন্য জরুরী উহা হইল, কানের হেফাজত।
প্রত্যেক অপ্রিয় বিষয় যাহা মুখে বলা বা জবান হইতে বাহির করা নাজায়েয উহার প্রতি কর্ণপাত করাও নাজায়েয। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন, গীবতকারী এবং গীবত শ্রবণকারী উভয়ই গুনাহের মধ্যে অংশীদার হয়।
৪নং. জিনিস শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে হেফাজত করা।
যেমন হাতকে নাজায়েয বস্তু ধরা হইতে, পা কে নাজায়েয বস্তুর দিকে যাওয়া হইতে বিরত রাখা। অনুরূপভাবে শরীরের অন্যান্য অঙ্গগুলিকেও বিরত রাখা। এমনিভাবে ইফতারের সময় পেটকে সন্দেহযুক্ত খাবার হইতে হেফাজত করা। যে ব্যক্তি রােযা রাখিয়া হারাম মাল দ্বারা ইফতার করে, তাহার অবস্থা ঐ ব্যক্তির মত, যে কোন রােগের জন্য ঔষধ ব্যবহার করে, কিন্তু উহার সাথে সামান্য বিষও মিশাইয়া লয়, ফলে তাহার সেই রােগের জন্য ঔষধটি উপকারী হইবে কিন্তু সাথে সাথে এই বিষ তাহাকে ধ্বংসও করিয়া দিবে।
৫নং জিনিস ইফতারের সময় হালাল মাল হইতেও এত বেশী না খাওয়া, যাহার দ্বারা পেট পুরাপুরি ভরিয়া যায়। কেননা, ইহাতে রােযার উদ্দেশ্য নষ্ট হইয়া যায়। রােযার দ্বারা উদ্দেশ্য হইল, কামপ্রবৃত্তি ও পশু শক্তিকে দুর্বল করা এবং নূরানী ও ফেরেশতাসুলভ শক্তিকে বৃদ্ধি করা। এগার মাস পর্যন্ত অনেক কিছু খাওয়া হইয়াছে ; এখন যদি একমাস কিছুটা কমাইয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে কি জান বাহির হইয়া যাইবে? কিন্তু আমাদের অবস্থা তাে এই যে, ইফতারের সময় পিছনের কাজা সহ এবং সেহরীর সময় সামনের অগ্রিম সহ এতবেশী পরিমাণে খাইয়া লই যে, রমযান ছাড়া এবং রােযা না রাখা অবস্থায়ও এত পরিমাণ খাওয়ার সুযােগ আসে না ; রমযানুল মােবারক যেন আমাদের জন্য ভােজের উৎসব হইয়া যায়। ইমাম গাযালী (রহঃ) লিখিয়াছেন যে, মানুষ যদি ইফতারের সময় অধিক ভােজন করিয়া ক্ষতির পরিমাণ পােষাইয়া নেয়, তবে রােযার উদ্দেশ্য অর্থাৎ নফসের খাহেশ ও শয়তানের শক্তি দমন করা কিভাবে হাসিল হইতে পারে। আসলে আমরা শুধু খানার সময় পরিবর্তন করিয় দেই, ইহা ছাড়া আর কোন কিছুই পরিবর্তন করি না। বরং খানার বিভিন্ন পদ আরও বাড়াইয়া লই, অন্য মাসে যাহা সহজে করা হয় না। মানুষের অভ্যাস কতকটা এমন হইয়া গিয়াছে যে, ভাল ভাল বস্তু রমযানের জন্য রাখিয়া দেয়। আর নফস সারাদিন ভূকা থাকার পর যখন এইগুলি সামনে পায় তখন খুব পরিতৃপ্ত হইয়া আহার করে। ফলে কামপ্রবৃত্তি দুর্বল হওয়ার পরিবর্তে আরও উত্তেজিত হইয়া জোশে আসিয়া যায়। এইভাবে রােযার উদ্দেশ্যের বিপরীত হইয়া যায়। রােযার মধ্যে শরীয়ত যে সকল উদ্দেশ্য ও উপকারিতা রাখিয়াছে উহা তখনই হাসিল হইতে পারে যখন কিছুটা ক্ষুধার্তও থাকা হইবে। বড় উপকার তাে উহাই যাহা উপরে বলা হইয়াছে। অর্থাৎ কামভাব ও পশুপ্রবৃত্তিকে দমন করা। আর ইহাও কিছু সময় ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকার উপরই নির্ভর করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমান, শয়তান মানুষের শিরায় শিরায় চলাচল করে। তােমরা ক্ষুধার দ্বারা উহার চলাচল বন্ধ করিয়া দাও। নফস ক্ষুধার্ত থাকিলেই সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৃপ্ত থাকে। পক্ষান্তরে নফস যখন পরিতৃপ্ত হয় তখন সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভুকা থাকে। রােযার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হইল গরীব দুঃখীদের সহিত সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং তাহাদের অবস্থা অনুভব করা। এই উদ্দেশ্য তখনই হাসিল হইতে পারে যখন সেহরীর সময় দুধ জিলাপী দিয়া পেট এত বেশী না ভরে যে, সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্ষুধাই না লাগে। গরীব-দুঃখীদের সহিত মিল ও সামঞ্জস্য তখনই হইবে যখন কিছু সময় ভুকা থাকিয়া ক্ষুধার যন্ত্রণাও ভােগ করিবে। এক ব্যক্তি বিশরে হাফী (রহঃ) এর নিকট উপস্থিত হইয়া দেখিতে পাইল যে, তিনি শীতে কাঁপিতেছেন। অথচ তাঁহার নিকট তখন শীতের কাপড় ছিল। লােকটি জিজ্ঞাসা করিল, ইহা কি কাপড় খুলিয়া রাখার সময়? তিনি বলিলেন, বহু গরীব মানুষ রহিয়াছে, তাহাদেরকে সাহায্য করিবার মত শক্তি আমার নাই। অন্তত এইটুকু সহানুভূতি তাে প্রকাশ করিতে পারি যে, আমি তাহাদের মত একজন হইয়া যাই। সূফী মাশায়েখগণ ব্যাপকভাবে এই বিষয়ে সতর্ক করিয়াছেন। ফকীহগণও এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলিয়াছেন। ‘মারাকিল ফালাহ’ কিতাবের গ্রন্থকার লিখিয়াছেন, সেহরীতে এত বেশী খাইবে না যেমন ভােগবিলাসীরা খাইয়া থাকে। কেননা ইহা রােযার উদ্দেশ্যকে নষ্ট করিয়া দেয়। আল্লামা তাহতাবী (রহঃ) ইহার ব্যাখ্যায় লিখিয়াছেন যে, এইখানে রােযার উদ্দেশ্য বলিতে এই কথা বুঝানাে হইয়াছে যে, যেন কিছুটা ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব হয় যাহাতে উহা অধিক সওয়াব লাভের কারণ হয় এবং গরীব-দুঃখীদের প্রতি সমবেদনা সৃষ্টি হয়। স্বয়ং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন যে, কোন পেট পূর্ণ করা আল্লাহর নিকট এত অপছন্দনীয় নয়, যত অপছন্দনীয় উদর পূর্ণ করা। এক জায়গায় হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন, মানুষের জন্য কয়েকটি লােকমাই যথেষ্ট যাহা তাহার কোমর সােজা রাখিতে পারে। আর যদি কোন ব্যক্তি খাইতেই চায় তবে তাহার জন্য ইহার চেয়ে বেশী যেন না হয় যে, পেটের তিনভাগের একভাগ খানার জন্য রাখিবে, আরেক ভাগ পানির জন্য রাখিবে, আরেক ভাগ খালি রাখিবে। হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধারে কয়েকদিন রােযা রাখিতেন মাঝে কোন কিছুই আহার করিতেন ; ইহার কোন তাৎপর্য তাে অবশ্যই থাকিবে।
আমি আমার মুরুব্বী হযরত মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী (রহঃ) কে দেখিয়াছি যে, পুরা রমযান মুবারকে তাহার ইফতার ও সেহরী এই দুই ওয়াক্তের খাওয়ার পরিমাণ আনুমানিক দেড়খানা চাপাতি রুটির বেশী হইত না। কোন খাদেম জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিতেন যে, ক্ষুধা হয় না ; বন্ধুবান্ধবদের খাতিরে তাহাদের সহিত বসিয়া যাই। আর ইহার চাইতেও বড় ব্যাপার হইল হযরত মাওলানা শাহ আবদুর রহীম সাহেব রায়পুরী (রহঃ) সম্পর্কে শুনিয়াছি যে, একাধারে তাঁহার কয়েকদিন এমনভাবে কাটিয়া যাইত যে, ইফতার ও সেহরীর জন্য সারারাত্রে খাবারের পরিমাণ দুধবিহীন কয়েক কাপ চা ব্যতীত আর কিছুই হইত না। একবার হযরতের নিষ্ঠাবান খাদেম হযরত মাওলানা আবদুল কাদের সাহেব (রহঃ) বিনয়ের সহিত আরজ করিলেন, হযরত! আপনি তাে কিছুই আহার করিতেছেন না, এইভাবে তাে আপনি খুবই দুর্বল হইয়া যাইবেন। হযরত বলিলেন— আল-হামদুলিল্লাহ, জান্নাতের স্বাদ হাসিল হইতেছে। আল্লাহতায়ালা যদি আমাদের ন্যায় গােনাহগারদিগকেও এই সকল বুযুর্গদের অনুসরণ করার তাওফীক দান করেন তবে তাহাও অনেক সৌভাগ্যের কথা।
শেখ সাদী (রহঃ) বলেনঃ—
অর্থঃ পেটপূজারীরা জানে না যে, ভরা পেট হেকমত ও প্রজ্ঞা হইতে খালি হইয়া থাকে।
৬নং. যে বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখা একজন রােযাদারের জন্য জরুরী তাহা এই যে, রােযা রাখার পর এই ভয়ে ভীত হওয়া যে, নাজানি এই রােযা কবূল হইতেছে কিনা। অনুরূপভাবে প্রত্যেক এবাদত শেষ করার পর এই ধারণা পােষণ করা চাই যে, যে সকল ভুলত্রুটির প্রতি সাধারণতঃ নজর যায় না নাজানি সেইরকম কিছু ঘটিয়া যাওয়ার কারণে এই এবাদত আমার মুখের উপর মারিয়া দেওয়া হয় কিনা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন, কুরআন তেলাওয়াতকারী অনেকেই এমন আছে যাহাদের উপর কুরআন লানত করিতে থাকে। তিনি আরও এরশাদ ফরমাইয়াছেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাহাদের ফয়সালা হইবে তাহাদের মধ্যে একজন শহীদও থাকিবে। তাহাকে ডাকা হইবে এবং দুনিয়াতে তাহাকে আল্লাহ তায়ালার যে সমস্ত নেয়ামত দেওয়া হইয়াছিল সেইগুলি স্মরণ করাইয়া দেওয়া হইবে আর সে ঐ সমস্ত নেয়ামত স্বীকার করিবে। অতঃপর তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে যে, এই সমস্ত নেয়ামতের সে কি হক আদায় করিয়াছে। সে আরজ করিবে তােমার রাস্তায় জিহাদ করিয়াছি ; এমনকি শহীদ হইয়া গিয়াছি। এরশাদ হইবে, তুমি মিথ্যা বলিতেছ, বরং জিহাদ এইজন্য করিয়াছিলে যে, লােকে তােমাকে বাহাদুর বলিবে। আর তােমাকে তাহা বলা হইয়াছে। অতঃপর হুকুম হইবে ফলে তাহাকে উপুড় করিয়া টানিয়া জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে। অনুরূপভাবে একজন আলেমকে ডাকা হইবে এবং তাহাকেও ঠিক একইভাবে আল্লাহ তায়ালার সকল নেয়ামত স্মরণ করাইয়া জিজ্ঞাসা করা হইবে যে, এই সকল নেয়ামত লাভের বদলায় সে কি আমল করিয়াছে। সে আরজ করিবে, এলেম শিখিয়াছি এবং মানুষকে শিখাইয়াছি। তােমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য কুরআন তেলাওয়াত করিয়াছি। এরশাদ হইবে, তুমি মিথ্যা বলিয়াছ। বরং তুমি উহা এইজন্য করিয়াছিলে যে, লােকে তােমাকে বড় আলেম বলিবে। সুতরাং দুনিয়াতে উহা বলা হইয়াছে। তাহার ব্যাপারেও হুকুম হইবে ফলে উপুড় করিয়া টানিয়া জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে। এমনিভাবে একজন ধনবানকে ডাকা হইবে এবং নেয়ামতসমূহ উল্লেখ করিয়া তাহার স্বীকারােক্তি নেওয়ার পর জিজ্ঞাসা করা হইবে যে, আল্লাহর এই নেয়ামতসমূহের দ্বারা সে কি আমল করিয়াছে। সে বলিবে, নেক কাজের কোন রাস্তা আমি ছাড়ি নাই যেখানে মাল খরচ করি নাই। এরশাদ হইবে, তুমি মিথ্যা বলিয়াছ, উহা এইজন্য করিয়াছিলে যে, লােকে তােমাকে দানশীল বলিবে এবং তােমাকে তাহা বলা হইয়াছে। অতঃপর তাহার ব্যাপারেও হুকুম হইবে ফলে উপুড় করিয়া টানিয়া তাহাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে। আল্লাহ পাক হেফাজত করুন। এই সবকিছুই হইল এখলাস না থাকার পরিণতি। এই ধরনের বহু ঘটনা হাদীস শরীফে উল্লেখিত হইয়াছে। এইজন্য রােযাদার ব্যক্তির উচিত, নিজের নিয়তের হেফাজত করিবার সাথে সাথে কবুলিয়তের ব্যাপারে ভয়ও করিতে থাকিবে এবং দোয়াও করিতে থাকিবে যে, আল্লাহ তায়ালা আমার রােযাকে আপন সন্তুষ্টির কারণ বানাইয়া লন। কিন্তু সাথে সাথে এই বিষয়টিও লক্ষ্য রাখিবে যে, নিজের আমলকে কবুল হওয়ার যােগ্য মনে না করা ভিন্ন জিনিস আবার দয়াময় মনিবের মেহেরবানীর উপর দৃষ্টি রাখা একটি ভিন্ন বিষয়। তাহার মেহেরবানী ও করুণার রীতি-নীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ; তিনি কখনও গােনাহের উপরও সওয়াব দিয়া দেন, সেইক্ষেত্রে আমলের ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা না বলিলেও চলে।
অর্থাৎ, অঙ্গভঙ্গী ও লাস্যময় চালচলনই কেবল তাহার সৌন্দর্য মাধুরী নহে, বরং প্রিয়ার আরাে কত যে নাম না জানা মনমাতানাে ভাবভঙ্গী রহিয়াছে!
উপরােক্ত ছয়টি বিষয় সাধারণ নেককারদের জন্য জরুরী। আর খাছ লােক ও আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বুযুর্গদের জন্য এইগুলির সাথে আরও একটি সপ্তম বিষয়কে বাড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। তাহা হইল, অন্তরকে আল্লাহ ব্যতীত আর কোন বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হইতে দিবে না। এমনকি রােযা রাখা অবস্থায় এই খেয়ালও করিবে না যে, ইফতারের জন্য কোন কিছু আছে কিনা। কারণ, ইহাও দোষণীয় বলা হইয়াছ। কোন কোন মাশায়েখ লিখিয়াছেন যে, রােযা অবস্থায় সন্ধ্যায় ইফতারের জন্য কোন জিনিস হাসিলের ইচ্ছা করাও দোষণীয়। কেননা ইহাতেও আল্লাহর রিযিক দেওয়ার ওয়াদার উপর ভরসা কম আছে বলিয়া বুঝা যায়। 'শরহে এহইয়া' গ্রন্থে কোন কোন মাশায়েখের ঘটনা লিখা হইয়াছে যে, যদি তাহাদের নিকট ইফতারের ওয়াক্তের পূর্বে কোথাও হইতে কিছু আসিয়া যাইত তবে তাহা অপর কাহাকেও এইজন্য দিয়া দিতেন যে, হয়ত অন্তর উহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া যাইবে এবং তাওয়াক্কুলের মধ্যে কোন প্রকারের কমি হইয়া যাইবে। কিন্তু মনে রাখিতে হইবে যে, ইহা হইল বড় মরতবার লােকদের জন্য। আমাদের মত লােকদের জন্য এইরূপ উঁচু বিষয়ের লােভ করাও অবান্তর। এই মর্তবায় পৌছিবার আগে এমন পন্থা অবলম্বন করার অর্থ হইল নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করা। মুফাসসিরগণ লিখিয়াছেন যে,
کتب عليکم الصيام
অর্থাৎ, 'তােমাদের উপর রােযা ফরয করা হইয়াছে' আল্লাহ তায়ালার এই হুকুম দ্বারা মানুষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপরই রােযা ফরয করা হইয়াছে। সুতরাং জিহবার রােযা হইল মিথ্যা হইতে বাঁচিয়া থাকা। কানের রােযা হইল যাবতীয় নাজায়েয কথা শ্রবণ করা হইতে বাঁচিয়া থাকা। চোখের রােযা হইল সকল প্রকার নাজায়েয ও অহেতুক জিনিসের প্রতি নজর করা হইতে বাঁচিয়া থাকা। অনুরূপভাবে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্যও রােযা আছে। যেমন নফসের রােযা হইল, লােভ-লালসা ও জৈবিক চাহিদা হইতে বাঁচিয়া থাকা। দিলের রােযা হইল দুনিয়ার মহবত হইতে দিলকে খালি রাখা। আত্মার রােযা হইল আখেরাতের স্বাদ ও সুখ-শান্তির কামনা হইতেও বাঁচিয়া থাকা। আর সর্বোচ্চ শ্রেণীর খাছ রােযা হইল গায়রুল্লার অস্তিত্বের কল্পনা হইতেও বাঁচিয়া থাকা।