08/05/2026
তিন দিনব্যাপী জাহিলিয়াতপূর্ন Shsmc Day পালনের পর জুমার খুতবায় ইমাম সাহেবের নসীহা -
বিগত তিন দিন ধরে এই ক্যাম্পাসে “ডে সেলিব্রেশন”-এর নামে যে অসুস্থ সংস্কৃতির প্রদর্শন হলো, তা সত্যিই আমাদের অন্তরকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। আপনারা এই উম্মাহর উজ্জ্বল নক্ষত্র, জাতির ভবিষ্যৎ চিকিৎসক। আপনাদের মতো মেধাবী ও সম্ভাবনাময় তরুণদের কাছ থেকে জাতি কখনো অর্থহীন উন্মাদনা প্রত্যাশা করে না; বরং আশা করে গঠনমূলক, সৃজনশীল ও মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগ।
এই আয়োজনটি হতে পারত মানবতার সেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত—ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, ব্লাড ডোনেশন প্রোগ্রাম কিংবা জনসচেতনতামূলক কোনো মহৎ কর্মসূচির মাধ্যমে। অথচ আমরা বেছে নিলাম ক্ষণস্থায়ী উচ্ছ্বাস, উদ্দেশ্যহীন বিনোদন এবং ফ্রি মিক্সিং এর মাধ্যমে চরম অশ্লীলতার প্রদর্শন।
এই নাচ-গান আর অশ্লীলতার উন্মাদনা যদি সমাজের অশিক্ষিত বা বিবেকহীন মানুষরা করত, তবে হয়তো মনকে এই বলে সান্ত্বনা দেওয়া যেত যে—তারা অন্ধকারচ্ছন্ন, তারা এর ভয়াবহতা বোঝে না। কিন্তু যখন দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবী ও শিক্ষিত সমাজ, যাদের হাতে আগামীর সুস্থ সমাজ গঠনের দায়িত্ব, তারা এমন অনর্থক ও কুরুচিপূর্ণ কাজে লিপ্ত হয়, তখন বাকরুদ্ধ হয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না।
আমরা পশ্চিমা বিশ্বের নেতিবাচক সংস্কৃতি গ্রহণে যতটা আগ্রহী, তাদের জ্ঞানভিত্তিক উৎকর্ষ, গবেষণামুখী মানসিকতা ও মানবকল্যাণমূলক চর্চা গ্রহণে ততটাই অনাগ্রহী। আপনারা কি জানেন, উন্নত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলো তাদের বিশেষ দিনগুলো কীভাবে উদযাপন করে? হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সেন্টার ফর বায়োএথিক্স। তারা তাদের দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আয়োজন করেছিল Capstone Symposium, যেখানে শিক্ষার্থীদের গবেষণাপত্র উপস্থাপিত হয়।
সেখানে আলোচনা হয়েছিল AI Governance in Healthcare কিংবা Bioethics-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা জনস হপকিন্স মেডিকেল স্কুল তাদের ১২৫ বছর পূর্তিতে সম্মাননা দিয়েছে এমন ব্যক্তিদের, যারা সততা, নেতৃত্ব ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তারা চিকিৎসাকে শুধু একটি পেশা হিসেবে দেখে না; বরং Excellence & Discovery—শ্রেষ্ঠত্ব ও মানবকল্যাণের এক মহৎ অভিযাত্রা হিসেবে বিবেচনা করে।
ইসলামের শাশ্বত শিক্ষা হল- মুমিনের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি কর্মপরিকল্পনা হতে হবে অর্থবহ এবং কল্যাণমুখী। একজন মুমিনের জীবনে অনর্থক বা উদ্দেশ্যহীন কোনো কিছুর অবকাশ নেই; বরং তার প্রতিটি আয়োজনে থাকতে হয় Productivity এবং Creativity -এর ছাপ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সেই সোনালী শিক্ষা ও কর্মতৎপরতা আজ পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের করে নিয়েছে, যার ওপর ভর করে তারা আজ জাগতিক উন্নতির শিখরে আসীন। অথচ আমরা সেই গৌরবময় উত্তরাধিকার ভুলে গিয়ে আজ তাদের বর্জিত আবর্জনা আর অন্তঃসারশূন্য অপসংস্কৃতিকে পরম মমতায় আঁকড়ে ধরছি। অন্ধ অনুকরণের এই মরণনেশায় আমরা এতটাই বিভোর যে, উন্নতির মরীচিকার পিছনে ছুটতে ছুটতে আমরা ক্রমেই পতনের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি।
এই আয়োজনটি হতে পারত আপনাদের পেশাগত, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আত্মিক উন্নতির এক গুরুত্বপূর্ণ সোপান। দেশ-বিদেশের প্রথিতযশা চিকিৎসকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে Career Guideline, Skill Development, Time Management কিংবা Stress Management-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা যেত। সাধারণ মানুষের জন্য Public Health Awareness কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে আপনারা এই মহান পেশার মর্যাদাকে আরও সমুন্নত করতে পারতেন।
বিবেকের কাছে একবার প্রশ্ন করে দেখুন—এই তিন দিনের উন্মাদনা আর হুল্লোড় থেকে আপনারা Productive বা গঠনমূলক কী শিখতে পেরেছেন? আপনাদের ব্যক্তিজীবন বা পেশাগত উন্নতির জন্য এখান থেকে কি কোনো একটি সূত্রও খুঁজে পেয়েছেন?
আপনারা যখন এমব্রায়োলজিতে Fertilization থেকে শুরু করে Organogenesis পর্যন্ত বিস্ময়কর ধাপগুলো অধ্যয়ন করেন, তখন কি একবারও মনে হয় না—এত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত কারুকার্য কোনো উদ্দেশ্যহীন প্রক্রিয়ার ফল হতে পারে না? আপনারা তো Physiology গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। একটি Healthy Kidney কী অপূর্ব দক্ষতায় রক্ত পরিশোধন করছে, এই Heart প্রতি মিনিটে নিরবচ্ছিন্ন স্পন্দনের মাধ্যমে আপনাকে জীবিত রাখছে—এসব কি আমাদের অন্তরে স্রষ্টার প্রতি গভীর ভালোবাসা, বিস্ময় ও বিনয় সৃষ্টি করে না?
মনে রাখবেন, মেডিকেল সায়েন্স কেবল একটি পেশাগত জ্ঞান নয়; এটি আল্লাহর কুদরতের এক জীবন্ত পাঠশালা। এই জ্ঞান আপনাদের রবের অসীম শক্তিমত্তা, প্রজ্ঞা ও সৃষ্টিশৈলীর পরিচয় বহন করে। মেডিকেল সাইন্স আপনাদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে—এই সুবিশাল মহাবিশ্বের পেছনে রয়েছেন এক মহান স্রষ্টা, এক অসীম প্রজ্ঞাময় কারিগর।
আমরা এমন এক সময়ে কুফরি কালচারের উন্মাদনায় মত্ত যখন পার্শ্ববর্তী দেশে উগ্রবাদী হিন্দুরা মুসলমানদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দিচ্ছে, দোকানপাট গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত আমরা দেখছি সেখানে প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে যে, কোনো মসজিদ রাখা হবে না, বরং সব মন্দির বানিয়ে দেওয়া হবে। যেখানে মুসলিমদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছে এবং তাদের ধর্মীয় স্থাপনার পবিত্রতা নষ্ট করা হচ্ছে, সেখানে আমরা কোন বিবেকে তাদের এই অপসংস্কৃতি আর কালার ফেস্টকে আমাদের এই পবিত্র ক্যাম্পাসে আমদানী করছি?
আমি আজ এসব কথা কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বলছি না; বরং একজন ভাই, শুভাকাঙ্ক্ষী ও দায়িত্বশীল মেন্টর হিসেবে আমার দায়িত্ববোধ থেকেই বলছি। আজ যদি আমি আপনাদের সতর্ক না করি, তবে কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।
আমাদের মনে রাখা উচিত, আল্লাহ পাকের কঠোর আজাব ও শাস্তি সহ্য করার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা যেভাবে প্রকাশ্যে পাপে লিপ্ত হচ্ছি, তাতে মনে হচ্ছে আমরা যেন আল্লাহর পাকড়াওকে পাত্তাই দিচ্ছি না! অথচ তাঁর আজাব যখন আসে, তখন তা অত্যন্ত কঠিন হয়। আমাদের সেই দুর্বল শরীর আর নড়বড়ে ঈমান নিয়ে সেই ভয়াবহ শাস্তি আমরা কীভাবে সহ্য করব? তাই আসুন, আল্লাহর গজব নামার আগেই আমরা তাঁর রহমতের চাদরে আশ্রয় নেই এবং কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ ও হিদায়াত দান করুন। আমীন।
ইমাম ও খতিব
জুলাই ২৪ হল মসজিদ
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ