06/10/2025
উপনিষদ নামটি শুনলেই আমাদের সেই বিদ্যার কথা মনে পড়ে যেখানে প্রতিটি বিষয়ের গভীর রহস্য বিদ্যমান রয়েছে। তাইতো স্বয়ং উপনিষদ নিজেকে পরম গোপনীয় রহস্য বলছে— “য় ইমং পরমং গুহ্যং” (কঠ০ ১।৩।১৭), “বেদান্তে পরমং গুহ্যং” (শ্বেতা০ ৬।২২), “তে বা এতে গুহ্য আদেশা” (ছান্দোগ্য০ ৩।৫।২) ইত্যাদি। ধরুন একটি বালক খেয়াল বশত উপনিষদ পড়তে বসেছে তার কি সেই রহস্য বোঝার মতো জ্ঞান আছে? সে তো রহস্য অনুভব করতে পারবেই না বরং সে সেটা নিয়ে বালকসুলভ কান্না করতে থাকবে। পিতা তার পুত্রকে একটি উপাখ্যান বললেন এখন পুত্র যদি সেই উপাখ্যানের চরিত্রগুলো নিজের চোখে দেখার জন্য কান্না করতে থাকে তাহলে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়ায় বলুন তো? এরকমই কিছু ঘটনা ঘটেছে। আমাদের একজন বালক বন্ধু (অজ্ঞ ভবতি বৈ বালঃ) মনের খেয়ালে “উপনিষদ সংগ্রহ” গ্রন্থটির ‘কঠোপনিষদ’ পড়তেছে। তো পড়তে গিয়ে ওই সেই বালকসুলভ কান্নাকাটি, তাকে এখন উপাখ্যানের চরিত্রগুলো এনে দিতে হবে। সে ভেবেই বসে আছে কঠোপনিষদের উপাখ্যান ঐতিহাসিক কোনো ঘটনা। তো আসুন প্রথমে আমরা আখ্যানটি জেনে নিই, এরপর বিচার করা যাবে।
“বাজশ্রবা ঋষি বিশ্বজিৎ যজ্ঞে তাঁর প্রিয় বস্তুসমূহ দান করছিলেন। কিন্তু তাঁর দানের গাভীগুলো ছিল অত্যন্ত রুগ্ন ও বয়স্ক অর্থাৎ সেসব গাভী দুগ্ধপ্রদান ও সন্তান উৎপত্তিতে অসমর্থ। এটি দেখে বাজশ্রবা উদ্দালকের পুত্র নচিকেতার মনে ভাবনার উদয় হলো যে, পিতা ঋত্বিকদের সঠিক দান করছেন না। এ যজ্ঞের নিয়মানুসারে নিজের প্রিয় বস্তুর দান করতে হয়, এজন্য নচিকেতা পিতাকে বললেন— “আমায় কাকে দান করবেন?” এ কথা বার-বার বলার পর পিতা ক্রুব্ধ হয়ে বললেন— “তোমায় মৃত্যুকে দান করছি।” তখন নচিকেতা পিতার প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য যমের দ্বারে উপস্থিত হলেন।” এরপর যমাচার্য এবং নচিকেতার মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর পর্ব চলতে থাকে যেটি পাঠকবৃন্দ নিজে থেকে পড়ে নেবেন।
এই কাহিনী শুধু উপনিষদেই নয় বরং মহাভারত এবং তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণেও পাওয়া যায় কিন্তু তিনটি গ্রন্থের ঘটনা তিনরকম শুধু চরিত্রগুলো একই। তাহলে পাঠকগণ চিন্তা করুন কঠোপনিষদের এই আখ্যানের ঐতিহাসিকতার ভিত্তি কতটুকু? যদি এটি কোনো ইতিহাস হতো তাহলে তো এতো পার্থক্য থাকতো না। আর একটু বাস্তবমুখী জ্ঞান দিয়ে বিচার করুন তো একটি ছোট বালক স্বশরীরের যমলোকে গিয়ে যমরাজের সাথে কথা বলছেন আবার সেখান থেকে ফিরেও আসতেছেন। এরকম ঘটনা কি জগতে আদৌ ঘটতে পারে? এরকম ঘটনাকে ঐতহাসিক মনে করা মানেই হলো সে রূপকথায় বিশ্বাসী। আর উপনিষদ নিজে যখন এটিকে উপাখ্যান বলছে তখন একে ঐতিহাসিক ঘটনা মনে করা তো মূর্খামী। উপনিষদ বলছে— “নাচিকেতমুপাখ্যানং মুত্যুপ্রোক্তং সনাতনম্॥ (কঠ০ ১।৩।১৬)” অর্থাৎ এটি সনাতন নচিকেত উপাখ্যান। পাণিনীয় সূত্রে বলা আছে— “অনন্ত্যস্যাপি প্রশ্নাখ্যানয়োঃ (পা০ ৮।১।১০৫)” অর্থাৎ প্রশ্নের উত্তরকে আখ্যান বলা হয়। উপাখ্যান শব্দ আখ্যানের পর্যায়বাচী। এজন্য এই উপনিষদে উপাখ্যানরূপে যমাচার্য ও নচিকেতার গুরু-শিষ্য প্রশ্নোত্তর সংবাদ দ্বারা ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রোফেসর রাজারাম সেজন্য বলেছেন— “উপাখ্যানের কল্পনা সর্বাংশে কল্পনাই হবে এমন নয়, এতে ঐতিহাসিক চরিত্রের নাম এবং ঘটনাও স্থান পেতে পারে” সেজন্য অনেক শব্দ যেমন গৌতম, উদ্দালক প্রভৃতি নাম দেখলেই বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয় কারণ উপাখ্যানে চরিত্র সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন নামের উল্লেখ তো থাকবেই। আমরা স্কুলে “হিন্দু ধর্ম শিক্ষা” বইতে তো অনেক উপাখ্যান পড়েছি যেখানে অনেক চরিত্রের নাম আছে, এখন আমরা কি তাদের ইতিহাসের কোনো ব্যক্তি মনে করবো? নাকি সেসব চরিত্র থেকে নীতিশিক্ষা নেব? তাহলে কঠোপনিষদ নিজেই যখন একটি উপাখ্যান তাহলে এতে থাকা ব্যক্তিদের কেনো ঐতিহাসিক চরিত্র মনে করবো? বরং নামগুলো আমরা অধ্যাত্মের সাথে কিভাবে মেলাতে পারি সেটা উপনিষদের ব্যাখ্যাতে খুব সুন্দরভাবে বোঝানো হয়েছে। যেমন নচিকেতাকে “গৌতম” অর্থাৎ গৌতম বংশীয় বলে সম্বোধন করা হচ্ছে। এটি যদি উপাখ্যানের চরিত্র মনে করেন তবে তো প্রশ্নই নেই যদি এটিকে অধ্যাত্মপক্ষে গ্রহণ করেন তবে এর খুব সুন্দর আলংকারীক অর্থ আছে যেটি রাজবীর শাস্ত্রী এবং স্বামী ব্রহ্মমুনি দেখিয়েছেন। গৌ= ইন্দ্রিয়ের ওপর যিনি সংযমশীল, অথবা প্রাণ হচ্ছে গৌতম—অতিশয়ন গচ্ছতীতি গোতমঃ প্রাণঃ গোতম এব গৌতমঃ, স্বার্থে অণ্ প্রত্যয়ঃ। উপনিষদে অধ্যাত্মপক্ষে এগুলোর ব্যাখ্যা করা আছে পাঠকবৃন্দ দেখে নেবেন।
স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক কঠোপনিষদের ভূমিকায় লিখেছেন— “এই উপনিষদে নচিকেতা ও যমের সংবাদ দ্বারা অধ্যাত্ম-বিদ্যা বা ব্রহ্মবিদ্যার নিরূপণ করা হয়েছে। অনেক বিদ্বানের মত হচ্ছে যে, শিষ্য নচিকেতা এবং আচার্য যম কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি। কিন্তু আমাদের বিচার এর থেকে সর্বথা ভিন্ন। আমাদের সিদ্ধান্তে এরা মানব চরিত্র নয়, বরং নচিকেতা জীবাত্মা এবং যম মৃত্যু— এই দুজনের সংবাদ অধ্যাত্মবিদ্যার প্ররোচনার্থ একটি অলংকারের রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। নচিকেতা (জীবাত্মা) এবং যম (মৃত্যু) এর এই আলংকারিক সংবাদ শুধু আজকে নয় বরং সদাকাল থেকে চলে আসছে, যেটি এই উপনিষদেই বলা হয়েছে “নাচিকেতমুপাখ্যানং সনাতনম্। (কঠ০ ১।৩।১৬)” অর্থাৎ নচিকেতা (জীবাত্মা) বিষয়ক উপাখ্যান সনাতন। যম কোনো ব্যক্তি নয়, ইনি দেহবিনাশক মৃত্যু, এতে এই উপনিষদের অন্তঃসাক্ষীও রয়েছে। যমকে মৃত্যু, বৈবস্বত, অন্তক প্রভৃতি মৃত্যুর পর্যায়বাচী শব্দ দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে। “মৃত্যুমুখাৎপ্রমুক্তম্ (কঠ০ ১।১।১১)” মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা— এখানে মৃত্যু কোনো ব্যক্তি হতে পারে না, বরং এটি সংহারক মৃত্যুই। পরবর্তীতে “অয়ং লোকো নাস্তি পর ইতি মানী পুনঃ পুনর্বশমাপদ্যতে মে (কঠ০ ১।২।৬)” এই লোক ভিন্ন পরলোক বা পরমার্থ নেই— এরূপ ভাবনাযুক্ত মানুষ বার-বার আমার (মৃত্যুর) বশীভূত হয়৷ এই উক্তিতেও সংহারক মৃত্যু কোনো ব্যক্তি নয়। যদিও কঠোপনিষদে উক্ত যম ও নচিকেতা যথাক্রমে মৃত্যু ও জীবাত্মা হওয়ার কারণে ব্যক্তি নয়, তবুও আলংকারিক বর্ণনাতে আমরা এটি বলতে পারি যে, নচিকেতা (জীবাত্মা) যম (মৃত্যু) এর শিষ্য। মৃত্যু অর্থাৎ মৃত্যু-ঘটনা থেকে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।”
এটি গেল আর্য বিদ্বানদের সিদ্ধান্ত। পৌরাণিক ভাষ্যকার যেমন— রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী সমর্পনানন্দ কঠোপনিষদ ভাষ্যের শুরুতেই লিখেছেন— “আচার্য প্রথমেই বলছেন তত্রাখ্যায়িকা, এটি একটি আখ্যায়িকা, আখ্যায়িকা মানেই নচিকেতা মৃত্যুর পর যমরাজার বাড়ি কিভাবে গিয়েছিলেন, এই ধরণের কোন প্রশ্ন করা যাবে না। বিদ্যাস্তত্যর্থা, আখ্যায়িকার মাধ্যমে একটা বিদ্যার স্তুতি করা হচ্ছে। এখানে নচিকেতা ও যমরাজার কোন গুরুত্ব নেই, মর্ত্যলোকেরও কোন গুরুত্ব নেই, একমাত্র গুরুত্ব হল উপনিষদের বিদ্যা।.........এখানেও ঠিক সেই রকম, যমরাজার মত বক্তা নচিকেতার মত শ্রোতাকে বলছেন, এটাই বিদ্যার স্তুতি। আখ্যায়িকা এই বিদ্যার জন্যই।”
তো সর্বোপরি আমাদের বালক বন্ধুটি যদি অশান্ত হয়ে পিতার কাছে কান্না করতেই থাকে তাহলে তার জন্য সতর্কবার্তা হচ্ছে, “নাপ্রশান্তায় দাতব্যং নাপুত্রায়াশিষ্যায় বা পুনঃ (শ্বেতা০ ৬।২২)”—অশান্তচিত্ত ব্যক্তিকে, অযোগ্য পুত্রকে অথবা অযোগ্য শিষ্যকে এই ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ দান করা উচিত নয়। ছান্দোগ্যোপনিষদে তো আরো সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, গুরুকে যদি কেউ সসাগর বিত্তপূর্ণ বসুন্ধরাও দান করে, তবুও এই বিদ্যা অযোগ্য শিষ্যকে বলবে না, কারণ এই বিদ্যা সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ (ছান্দোগ্য০ ৩।১১।৫-৬)।