02/06/2026
মিরপুরের সেই বন্ধ দরজার ওপাশে: এক মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু এবং আমাদের সমাজের বিবেক
মিরপুরের সেই ফ্ল্যাটে যখন পুলিশ ঢুকল, তখন ঘরজুড়ে শুধু পচনের গন্ধ আর এক ধরনের ভয়াবহ নীরবতা। যে নীরবতা সাধারণ নীরবতা নয়; যে নীরবতা মানুষের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সমাজের মুখোশ খুলে দেয় এবং আমাদের তথাকথিত সভ্যতার সামনে একটি নির্মম আয়না তুলে ধরে।
বিছানায় পড়ে ছিলেন নুরজাহান বেগম। বয়স বাহাত্তর। শরীরে পচন ধরেছে। মৃত্যুর সাত থেকে আট দিন পেরিয়ে গেছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে কেউ জানতে পারেনি তিনি আর বেঁচে নেই। কেউ তাঁর খোঁজ নেয়নি। কেউ দরজায় কড়া নাড়েনি। কেউ একবারও জানতে চায়নি—“মা, আপনি কেমন আছেন?”
এই দৃশ্য কেবল একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি আমাদের সময়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক সামাজিক ট্র্যাজেডিগুলোর একটি। কারণ এখানে শুধু একজন বৃদ্ধা মারা যাননি, এখানে মারা গেছে পারিবারিক মূল্যবোধ, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্পর্কের সেই পবিত্র বন্ধন, যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি জাতি গড়ে ওঠে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, নুরজাহান বেগম কোনো অসহায়, নিঃসন্তান বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ ছিলেন না। তাঁর সন্তানরা সমাজের চোখে প্রতিষ্ঠিত। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, আরেকজন দেশের অন্যতম সেরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আরেকজন বিদেশে বসবাস করেন। সমাজের প্রচলিত মানদণ্ডে এটি একটি সফল পরিবারের গল্প। এমন পরিবারকে আমরা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরি। এমন সন্তানদের নিয়ে গর্ব করি। আত্মীয়স্বজনদের আড্ডায় তাঁদের সাফল্যের গল্প বলা হয়।
কিন্তু আজ একটি প্রশ্ন আমাদের বিবেককে তাড়া করে ফিরছে—
যে সন্তান জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করেও নিজের মায়ের নিঃসঙ্গতা দেখতে পায় না, সে কি সত্যিই সফল?
আমরা সন্তানদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কত কিছুই না করি। ছোটবেলা থেকে কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, ভালো স্কুল, ভালো কলেজ, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়—সবকিছুর পেছনে ছুটি। আমরা চাই আমাদের সন্তান ডাক্তার হোক, ইঞ্জিনিয়ার হোক, সচিব হোক, অধ্যাপক হোক, বিদেশে যাক, বড় চাকরি করুক। কিন্তু এই দৌড়ের মধ্যে আমরা একটি বিষয় ক্রমাগত ভুলে যাচ্ছি—মানুষ হওয়ার শিক্ষা।
আমরা পেশাজীবী তৈরি করছি, কিন্তু মানুষ তৈরি করতে পারছি না।
আমরা মেধাবী তৈরি করছি, কিন্তু হৃদয়বান মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
যে মা একদিন নিজের ঘুম বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জ্বরের রাতে মাথায় পানি ঢেলেছেন, যে মা নিজের নতুন কাপড় না কিনে সন্তানের বই কিনে দিয়েছেন, যে মা নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে সন্তানের প্লেটে খাবার তুলে দিয়েছেন, সেই মা যদি জীবনের শেষ সময়ে একটি ঘরের ভেতরে একা পড়ে থাকেন, তাহলে আমাদের সব অর্জন, সব শিক্ষা, সব উন্নয়ন আসলে কীসের জন্য?
জানা গেছে, নুরজাহান বেগম তাঁর মেয়ের বাসায় থাকতেন। একই ছাদের নিচে মা ও মেয়ে বাস করতেন, কিন্তু আলাদা ঘরে। একজন মানুষ কীভাবে একই বাড়িতে থেকেও এতটা একা হয়ে যেতে পারেন? কীভাবে একজন মা এমন এক অবস্থায় পৌঁছান, যেখানে সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাঁর ঘরে কেউ ঢোকে না? কীভাবে সম্ভব, পাশের ঘরে মানুষ রয়েছে অথচ একজন বৃদ্ধার মৃত্যু এবং মৃত্যুর পরের পচন কারও নজরে আসে না?
এ প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের নয়।
এ প্রশ্ন আমাদের পুরো সমাজের।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে যোগাযোগের প্রযুক্তি সবচেয়ে উন্নত, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সবচেয়ে দুর্বল। আমরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে সেকেন্ডে কথা বলতে পারি, কিন্তু একই বাড়ির একটি ঘরে থাকা বৃদ্ধ মায়ের খোঁজ নিতে পারি না। আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ছবি পোস্ট করি, অসংখ্য স্ট্যাটাস দিই, কিন্তু বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে বসে দশ মিনিট সময় কাটানোর ফুরসত পাই না।
আর যখন নুরজাহান বেগমের সেই শেষ ছবিটির দিকে তাকাই, তখন বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে আসে।
সেখানে দেখা যায় এক বৃদ্ধা নারী নিথর হয়ে শুয়ে আছেন। মুখে আর কোনো অভিযোগ নেই। কোনো অভিমান নেই। কোনো প্রত্যাশাও নেই। যেন জীবনের সমস্ত অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটেছে। একসময় যে মুখ সন্তানদের নিয়ে উদ্বেগে ভরে থাকত, যে চোখ সন্তানের পথ চেয়ে জানালার পাশে বসে থাকত, আজ সেই চোখ চিরতরে বন্ধ।
ছবিটি দেখে মনে হয় না এটি শুধু একজন মৃত মানুষের ছবি।
এটি যেন আমাদের সমাজের বিবেকের ছবি।
এই মুখে আমি হাজারো অবহেলিত মায়ের মুখ দেখতে পাই। দেখতে পাই সেইসব নারীদের, যারা সারাজীবন সন্তানদের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, অথচ শেষ বয়সে এসে নিঃসঙ্গতার কাছে পরাজিত হয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে এই ভেবে যে, মৃত্যুর আগে হয়তো এই মানুষটিও কারও পদধ্বনি শুনতে চেয়েছিলেন। হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলেন, কেউ আসবে। হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁর সন্তানরা তাঁকে ভুলে যায়নি। হয়তো তিনি অপেক্ষা করেছিলেন।
কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হয়েছে এক নিঃসঙ্গ মৃত্যুতে।
পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় দৃশ্য সম্ভবত সেটিই—যখন একজন মা অপেক্ষা করেন, আর কেউ আসে না।
ছবিটির দিকে যতবার তাকাই, ততবার মনে হয় এটি একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের ব্যর্থতার দলিল। এটি আমাদের শেখায়, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য অর্থের অভাব নয়; সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য হলো ভালোবাসার অভাব। সবচেয়ে বড় নিঃস্বতা হলো আপনজনদের উপস্থিতি না থাকা।
এই ছবিটি তাই শুধু একটি মৃত্যুর ছবি নয়।
এটি একটি প্রশ্নচিহ্ন।
একটি নীরব আর্তনাদ।
একটি অব্যক্ত অভিযোগ।
এটি যেন আমাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করছে—“তোমাদের এত ব্যস্ততার পৃথিবীতে, একজন মায়ের জন্য কি সত্যিই একটু সময় ছিল না?”
আজ বাংলাদেশের শহরগুলোতে হাজার হাজার নুরজাহান বেগম রয়েছেন। তাঁরা হয়তো অর্থকষ্টে নেই। তাঁদের জন্য ওষুধ কেনা হয়, বাজার করা হয়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়া হয়। কিন্তু মানুষ কি শুধু ওষুধ আর খাবার দিয়ে বাঁচে?
একজন বৃদ্ধ মানুষের সবচেয়ে বড় চাহিদা হলো সঙ্গ, কথা, ভালোবাসা এবং আপনজনের উপস্থিতি।
যে মা সারাজীবন সন্তানদের নিয়ে বেঁচেছেন, তিনি বৃদ্ধ বয়সে সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করেন সন্তানের কণ্ঠ শোনার জন্য, সন্তানের মুখ দেখার জন্য।
অথচ আমরা সেই মানুষগুলোকেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সবচেয়ে বেশি একা করে দিচ্ছি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তদন্ত হবে, আইনি প্রশ্ন উঠবে, বিভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসবে। কিন্তু আইনের বাইরেও একটি নৈতিক প্রশ্ন থেকে যায়। আমরা কি সত্যিই এমন সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে বৃদ্ধ বাবা-মা কেবল দায়িত্বের একটি অংশ? যেখানে তাঁদের জন্য একটি আলাদা ঘর, কিছু টাকা এবং একজন কাজের মানুষ রাখলেই দায়িত্ব শেষ বলে মনে করা হয়? যেখানে ভালোবাসার জায়গা দখল করে নিচ্ছে আনুষ্ঠানিকতা?
আমরা আজকাল সন্তানদের ইংরেজি শেখাই, কম্পিউটার শেখাই, প্রযুক্তি শেখাই, বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখাই। কিন্তু আমরা কি শেখাই বৃদ্ধ মানুষকে সম্মান করতে? আমরা কি শেখাই মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে? আমরা কি শেখাই বাবার নীরব কষ্ট বুঝতে?
আমরা কি শেখাই যে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পদবি নয়, বরং এমন একজন মানুষ হওয়া, যার উপস্থিতিতে বাবা-মা নিরাপদ বোধ করেন?
সত্যি বলতে, নুরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এই মৃত্যু কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা সামাজিক মর্যাদা কখনোই মানবিকতার বিকল্প হতে পারে না।
একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন সেই সমাজের বৃদ্ধ মানুষগুলো সম্মান, যত্ন এবং ভালোবাসা নিয়ে বাঁচতে পারেন।
আজ যারা নিজেদের বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়ার সময় পান না, তাঁদেরও মনে রাখা উচিত—জীবন একটি চক্র। আজ আপনি সন্তান, কাল আপনি বাবা-মা হবেন। আজ যেভাবে আপনি আপনার বাবা-মায়ের সঙ্গে আচরণ করছেন, আপনার সন্তানরাও একদিন সেই আচরণ থেকেই শিক্ষা নেবে। আপনি যদি আপনার সন্তানকে দেখান যে বৃদ্ধ বাবা-মা গুরুত্বপূর্ণ নন, তাহলে একদিন সেই সন্তানও আপনাকে গুরুত্বহীন মনে করবে।
কারণ মানবিকতা যেমন উত্তরাধিকারসূত্রে যায়, অবহেলাও তেমনি উত্তরাধিকারসূত্রে যায়।
নুরজাহান বেগম আর ফিরে আসবেন না। তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কেমন কেটেছে, শেষ মুহূর্তে তিনি কাকে মনে করেছিলেন, কাকে ডাকতে চেয়েছিলেন, সেই উত্তর আমরা কোনোদিন জানব না। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে গেছে।
সেই আয়নায় আমরা নিজেদেরই মুখ দেখতে পাচ্ছি।
তাই মিরপুরের সেই ফ্ল্যাটের ঘটনা যেন কেবল একটি সংবাদ হয়ে না থাকে। এটি যেন আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। এটি যেন আমাদের বাধ্য করে নিজেদের দিকে তাকাতে।
আজ যদি আপনার মা বেঁচে থাকেন, তাঁর ঘরে যান। তাঁর পাশে কিছুক্ষণ বসুন। তাঁর হাতটা ধরুন। জিজ্ঞেস করুন তিনি কেমন আছেন।
আজ যদি আপনার বাবা বেঁচে থাকেন, তাঁকে একটি ফোন করুন। তাঁর কণ্ঠটা শুনুন।
কারণ পৃথিবীর সব সাফল্য, সব পদমর্যাদা, সব অর্থবিত্ত একদিন অর্থহীন হয়ে যাবে। কিন্তু বাবা-মায়ের জন্য দেওয়া সময়, তাঁদের মুখে ফোটানো একটি হাসি, তাঁদের মনে দেওয়া নিরাপত্তা—সেটিই শেষ পর্যন্ত আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থাকবে।
সচিব হওয়া, অধ্যাপক হওয়া কিংবা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু একজন মায়ের শেষ জীবনে তাঁকে একা না রাখা—তার চেয়েও বড় মানবিক অর্জন আর কিছু নেই।
কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে অসংখ্য সফল মানুষের নাম হারিয়ে গেছে, কিন্তু একজন মায়ের চোখের জল কখনো হারায় না।
আর একজন মায়ের দীর্ঘশ্বাস—সেটি নীরব হলেও, তার প্রতিধ্বনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলে।
--------------------
জাহিদ ইকবাল
জামতলা,নিকুঞ্জ-০২
খিলক্ষেত, ঢাকা।