21/08/2026
🔥আজ আবার চাই অগ্নিহোত্রের দীপ্তিশিখা! 🔥
🔰 আজ আমাদের আত্মবিস্মৃত হৃদয়ে আবার আগুন চাই! চাই অগ্নিহোত্রের সেই দীপ্তিশিখা—যে শিখা শুধু বেদীর উপর জ্বলে না, মানুষের অন্তরের ঘুমন্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোলে; যে শিখা শুধু অন্ধকার দূর করে না, অজ্ঞান, জড়তা, অলসতা, কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধেও মানুষকে দাঁড়াতে শেখায়!
মনে রেখো—বৈদিক দর্শনে পরমাত্মা পরমেশ্বরই সর্বোচ্চ আলোকের উৎস। যজ্ঞাগ্নি সেই পরম আলোর স্বয়ং পরমেশ্বর নন; বরং তাঁর সৃষ্টির এক প্রত্যক্ষ, জীবন্ত ও শিক্ষাময় প্রকাশ। পরমেশ্বর যজ্ঞাগ্নির রূপ, গতি, তেজ, পবিত্রতা ও কর্মধারার মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে যে শিক্ষা রেখেছেন, সেই শিক্ষাই গ্রহণ করতে হবে। অগ্নিকে দেখে আমাদের শিখতে হবে—কীভাবে নিজে জ্বলে অন্যকে আলোকিত করতে হয়, কীভাবে ঊর্ধ্বমুখী হতে হয়, কীভাবে অশুদ্ধিকে দহন করে বিশুদ্ধতার দিকে এগিয়ে যেতে হয়, কীভাবে নিস্তেজ না হয়ে সর্বদা কর্মমুখর থাকতে হয়।
এই যজ্ঞাগ্নি আমাদের সামনে পরমার্থের এক জীবন্ত উপমা। সে স্থির হয়ে পড়ে থাকে না—তার শিখা সর্বদা ঊর্ধ্বমুখী। যেন ঘোষণা করে—হে মানব! তোমার জীবনও নিচের দিকে টেনে নেওয়া প্রবৃত্তির কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য নয়; তোমার গতি ঊর্ধ্বমুখী হোক!
▪️পরমেশ্বরের সৃষ্টির সুশৃঙ্খল বিধানে অগ্নির কার্য কত বিস্ময়কর! আলো, তাপ, রূপান্তর, শোধন ও শক্তির যে অসংখ্য প্রকাশ আমরা প্রকৃতিতে দেখি, তার সঙ্গে অগ্নিতত্ত্বের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অগ্নির তেজে বনস্পতি, বীরুধ ও লতাসমূহের জীবনধারাও প্রকৃতির বৃহত্তর শক্তিচক্রের সঙ্গে যুক্ত। অতএব অগ্নি আমাদের শেখায়—জীবন মানেই শক্তির সঠিক প্রয়োগ, বিকাশ এবং কল্যাণের দিকে অগ্রসর হওয়া।
পরমেশ্বর যজ্ঞকে দেবযজ্ঞের প্রধান সাধন করেছেন। যজ্ঞে অগ্নি হব্য গ্রহণ করে, তাকে রূপান্তরিত করে, পরিবেশে বিস্তার ঘটায়। এই কর্মধারার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এক মহৎ শিক্ষা—গ্রহণ করো, কিন্তু শুধু নিজের জন্য নয়; গ্রহণকে রূপান্তরিত করে কল্যাণের পথে ফিরিয়ে দাও।
পরমেশ্বরের বিধানে ঋতুচক্রের পরিবর্তন, প্রকৃতির নানা রূপান্তর এবং পদার্থের পরিবর্তনের সঙ্গে অগ্নিতত্ত্বের সম্পর্ক রয়েছে। তাই বেদ অগ্নিকে ‘ঋত্বিক’ বলে সম্বোধন করে। আবার যজ্ঞের হব্য গ্রহণ করে রূপান্তরের কার্য সাধন করার জন্য তিনি ‘হোতা’। আর মহামূল্য সম্পদের দীপ্তি ও রূপান্তরের সঙ্গেও অগ্নির সম্পর্ক—তাই ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রে তাঁকে বলা হয়েছে—
অগ্নিমীল়ে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্।
হোতারং রত্নধাতমম্॥
ঋগ্বেদ ১।১।১
এই একটি মন্ত্রের মধ্যেই অগ্নিকে ঘিরে কত গভীর শিক্ষা! অগ্নি যজ্ঞের পুরোহিত—কারণ সে যজ্ঞের কর্মকে সামনে এগিয়ে নেয়। অগ্নি দেব—কারণ তার কার্য কল্যাণকর ও আলোকময়। অগ্নি ঋত্বিক—কারণ সে ঋত বা সুশৃঙ্খল বিধানের সঙ্গে যুক্ত। অগ্নি হোতা—কারণ সে আহুতি গ্রহণ করে। আর ‘রত্নধাতম’—কারণ তার কার্যধারার সঙ্গে মূল্যবান রূপান্তর ও দীপ্তির সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু হে মানুষ, শুধু মন্ত্র উচ্চারণ করলেই হবে না! অগ্নির কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হবে!
যজ্ঞাগ্নির শিখার দিকে তাকাও। সে নিজে জ্বলে—অন্যকে আলো দেয়। সে নিজের জন্য আলো জমিয়ে রাখে না। সে অন্ধকারের সঙ্গে আপস করে না। সে যা গ্রহণ করে, তাকে রূপান্তরিত করে। সে ঊর্ধ্বমুখী। সে স্থবির নয়। সে সর্বদা সক্রিয়।
তোমার জীবন কি এমন?
তুমি কি নিজে জ্বলে অন্যের জীবন আলোকিত করছ?তোমার জ্ঞান কি শুধু তোমার নিজের মধ্যে বন্দী, নাকি সমাজকেও আলোকিত করছে?তোমার শক্তি কি শুধু নিজের ভোগের জন্য, নাকি মানুষের কল্যাণে নিবেদিত?তোমার জীবন কি ঊর্ধ্বমুখী, নাকি কামনা, লোভ, ভয় ও অলসতার ভারে নিচের দিকে পতিত?
অগ্নি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে যেন এই প্রশ্নই ছুড়ে দেয়!
ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রে অগ্নির এই মহিমা ঘোষণার পর আমরা দেখি—অগ্নির কত বিচিত্র রূপ ও উপমা বৈদিক সাহিত্যে এসেছে। কোথাও গৃহের পবিত্রতার প্রতীক ‘গার্হপত্য’, কোথাও ঈশ্বরার্পিত আহুতির ‘আহবনীয়’, কোথাও রক্ষাকারী শক্তির প্রতীক। পরমেশ্বরের সৃষ্টিতে অগ্নিতেজের মহিমার কারণে মহাবিষ্ণু অগ্নিজন্মা, দেবদেব শিব অগ্নিকেতু এবং কার্তিকেয় অগ্নিভূ নামে পরিচিত। অগ্নিমুখ মন্ত্রও সেই তেজ, দীপ্তি ও শক্তির জয়গান করে। অগ্নি কেবল বেদীর একটি শিখা নয়; অগ্নি মানুষের ভাষায় তেজ, দীপ্তি, শক্তি, রূপান্তর ও মহিমার এক গভীর প্রতীক।
🔰পবিত্র ঋগ্বেদে অগ্নির মহিমাকে কেন্দ্র করে প্রায় ২০০টি সম্পূর্ণ সূক্ত আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে। পরমাত্মা প্রদত্ত অগ্নির গুণাবলিকে সেখানে ঘৃতপৃষ্ঠ, মন্দ্রজিহ্ব, সপ্তরশ্মি এবং সদ্ধচক্ষু প্রভৃতি দিব্য বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে।
এবার শোনো—অগ্নি আমাদের কী শিক্ষা দেয়!
সাধুর্ন গৃধ্নুরস্তেব শূরো যাতেব ভীমস্ত্বেষঃ সমৎসু ॥
ঋগ্বেদ ১।৭০।১১
= পরমাত্মা আমাদের যজ্ঞাগ্নির মাধ্যমে শিক্ষা দিচ্ছেন— সাধু-সন্তদের মতো অপরিসীম স্নেহশীল, উদার ও শ্রদ্ধেয়, বীর ধনুর্বাণধারীর মতো পরাক্রমশালী, শাস্তি প্রদানকারীর মতো ভীষণ ও কঠোর, এবং জীবনের নানা সংগ্রামে উদ্ভাসিত ও প্রদীপ্ত—এমনই হলেন অগ্নি, যিনি এই জগতের আলো, প্রাণ ও শক্তি।
এই হলো অগ্নির শিক্ষা!
শুধু কোমল হলেই হবে না—প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে।শুধু জ্ঞানী হলেই হবে না—সেই জ্ঞানকে কর্মে প্রয়োগ করতে হবে।শুধু শান্ত হলেই হবে না—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসও থাকতে হবে।শুধু নিজের মুক্তি চাইলে হবে না—নিজের আলো দিয়ে অন্যের অন্ধকারও দূর করতে হবে।
অগ্নি তাই আমাদের শেখায়—হৃদয়ে করুণা রাখো, হাতে শক্তি রাখো, বুদ্ধিতে প্রখরতা রাখো এবং কর্মে তেজ রাখো!
🔰ঈশ্বরীয় ভাব ও দিব্য প্রেরণার আরেকটি চিত্র দেখুন—
স ইদস্তেব প্রতি ধাদসিষ্যঞ্ছিশীত তেজোঽয়সো ন ধারাম্।
চিত্রধ্রজতিররতির্যো অক্তোর্বের্ন দ্রুষদ্বা রঘুপত্মজংহাঃ ॥
ঋগ্বেদ ৬।৩।৫
অর্থাৎ হে মানবগণ! অগ্নি যার গতি বা বিচরণ বিস্ময়কর, যা নির্দিষ্ট কোনো বস্তুতে আবদ্ধ নয়, তা রাতের পাখির মতো নানা তরল ও অন্যান্য পদার্থের মধ্যে বিদ্যমান। এটি ধীরগতির উড্ডয়ন ত্যাগ করে কোনো কিছুতেই আবদ্ধ না হয়ে ধনুর্ধরের শরেরন্যায় দ্রুত গতিতে ধাবিত হয়; আর তা স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল শিখা ধারণ করে এবং নিজের তেজ ও দীপ্তিকে তীক্ষ্ণ করে তোলে।
হে মানবগণ! এই অগ্নির শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করো!
তোমার মধ্যেও চেতনার একটি অগ্নি আছে। তোমার বুদ্ধি নিস্তেজ হয়ে থাকার জন্য নয়। তোমার শক্তি অপচয় করার জন্য নয়। তোমার জীবন জড়তার কাছে পরাজিত হওয়ার জন্য নয়!
তোমার জ্ঞানকে শাণিত করো!তোমার চরিত্রকে শাণিত করো!তোমার কর্মশক্তিকে শাণিত করো!তোমার বিবেককে শাণিত করো!
অলসতা তোমাকে গ্রাস করতে পারবে না। হতাশা তোমাকে পরাজিত করতে পারবে না। অজ্ঞান তোমার পথ রুদ্ধ করতে পারবে না।
কারণ তোমার হৃদয়ে জাগুক সেই অগ্নি—যে অগ্নি তোমাকে প্রতিদিন আরও সত্যনিষ্ঠ, আরও পবিত্র, আরও শক্তিশালী ও আরও কল্যাণমুখী করে তুলবে!
☑️ আরো শোনো—
তিগ্মং চিদেম মহি বর্পো অস্য ভসদশ্বো ন যমসান আসা।
বিজেহমানঃ পরশুর্ন জিহ্বাং দ্রবির্ন দ্রাবয়তি দারু ধক্ষৎ ॥
ঋগ্বেদ ৬।৩।৪
অর্থাৎ, তাঁর পথ ক্ষুরের ধারের মতো তীক্ষ্ণ যা আমরা অনুসরণ করতে চাই, তাঁর রূপ ও কান্তি মহান এবং উজ্জ্বল প্রদীপ্ত, সোমপায়ী বা সংযমী অশ্বের ন্যায় তাঁর মুখ উন্মুক্ত, তাঁর জিহ্বা কুঠারের মতো তীক্ষ্ণ, এবং তিনি খাঁটি গলনাঙ্ককের (ধাতু গলানো কারিগর) মতো কাঠিন্যকে গলিয়ে দেন ও অগ্নির ন্যায় কাঠের তৈরি সামাজিক কুসংস্কারকে পুড়িয়ে ভস্ম করেন।
এখানেই অগ্নির আরেকটি মহাশিক্ষা!
যা কঠিন, তা সবসময় অটল নয়।যা জমাট, তা সবসময় অপরিবর্তনীয় নয়।যে সমাজে কুসংস্কার জমাট বেঁধেছে, জ্ঞানের অগ্নি তাকে গলাতে পারে।যেখানে অন্যায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে, সত্যের তেজ তাকে ভেঙে দিতে পারে।
যেমন অগ্নির উত্তাপে কঠিন ধাতু গলে শোধিত হয়, তেমনি জ্ঞানাগ্নি ও যজ্ঞাগ্নির আদর্শে আমাদের সমাজের কুসংস্কার, অন্যায়, অজ্ঞতা, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক জঞ্জালকে দূর করতে হবে।
অগ্নি ধ্বংস করে—কিন্তু ধ্বংসের জন্য ধ্বংস করে না। সে অশুদ্ধিকে দহন করে বিশুদ্ধতার পথ তৈরি করে। এই পার্থক্যটি বুঝতে হবে!
অগ্নির শিক্ষা হিংসার শিক্ষা নয়; অগ্নির শিক্ষা হলো অশুভের বিরুদ্ধে শুদ্ধতার সংগ্রাম।
🔰বেদ ঘোষণা করে—
যদ্দেবানাং মিত্রমহঃ পুরোহিতোঽন্তরো যাসি দূত্যম্ ।
সিন্ধোরিব প্রস্বনিতাস ঊর্ময়োঽগ্নের্ভ্রাজন্তে অর্চয়ঃ ॥
ঋগ্বেদ ১।৪৪।১২
অর্থাৎ, পরমেশ্বরই হলেন দূরদর্শী মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু! প্রাতঃকালের যজ্ঞাগ্নির শিখা যখন সমুদ্রের তরঙ্গমালার মতো জ্বলে ওঠে, তা মূলত পরমেশ্বরেরই প্রজ্ঞা ও করুণার আহ্বান—যা মানুষকে হৃদয়ের গভীরে পরমাত্মার সাথে যুক্ত হতে প্রেরণা দেয়।
প্রভাত এসেছে।আলো এসেছে।অগ্নি জ্বলে উঠেছে।তবে তুমি কেন ঘুমিয়ে থাকবে?
যজ্ঞাগ্নির ঊর্ধ্বমুখী শিখা যেন বলে— “মানুষ, তুমিও ঊর্ধ্বে ওঠো!”
তোমার চিন্তা ঊর্ধ্বে উঠুক।তোমার চরিত্র ঊর্ধ্বে উঠুক।তোমার সমাজ ঊর্ধ্বে উঠুক।তোমার দেশ ঊর্ধ্বে উঠুক।তোমার জীবন সত্য, জ্ঞান ও কল্যাণের পথে ঊর্ধ্বমুখী হোক!
🔰বেদ ঘোষণা করে—
বি পাজসা পৃথুনা শোশুচানো বাধস্ব দ্বিষো রক্ষসো অমীবাঃ।
সুশর্মণো বৃহতঃ শর্মণি স্যামগ্নেরহং সুহবস্য প্রণীতৌ॥
ঋগ্বেদ ৩।১৫।১
= হে অগ্নি, আলো ও তেজের অধিপতি, তীব্র প্রসারমান উত্তাপ ও দীপ্তিময় আলোর সুপবিত্র শোধনকারী! হিংসার রূপ নেওয়া সমস্ত সংক্রামক ও মরণঘাতী ব্যাধি এবং শত্রুতার বিনাশকারী শক্তিকে প্রতিহত করুন, দূর করুন ও ঠেকিয়ে রাখুন; যেন আমি এই প্রশস্ত পৃথিবীজুড়ে পরম শান্তি, সুরক্ষা ও যজ্ঞীয় প্রগতির মহান প্রভুর আশীর্বাদপুষ্ট নিয়ম-শৃঙ্খলার অধীনে, এক আনন্দময় গৃহে পরম সুখে ও শান্তিতে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারি।
▪️কিন্তু আজ?
আজ আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?
যে বৈদিক জ্ঞান মানুষকে জাগাতে পারত, আমরা সেই জ্ঞান ভুলে যাচ্ছি। যে যজ্ঞের আগুন আমাদের শুদ্ধতার শিক্ষা দিতে পারত, আমরা তার অন্তর্নিহিত শিক্ষাকে ভুলে শুধু বাহ্যিক আচারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছি। আর তারই সুযোগে সমাজে অনাচার, নারী-নির্যাতন, যৌতুকের দানব, নৈতিক পতন, অজ্ঞতা ও কুসংস্কার শিকড় গেড়ে বসছে।
ঘর আছে—কিন্তু ঘরে আলো নেই।শিক্ষা আছে—কিন্তু জ্ঞানের তেজ নেই।আচার আছে—কিন্তু চরিত্র নেই।শব্দ আছে—কিন্তু সত্যের আগুন নেই!
তাই আজ আবার চাই অগ্নিহোত্রের দীপ্তিশিখা!
চাই সেই অগ্নি, যা আমাদের ঘুম ভাঙাবে।চাই সেই অগ্নি, যা আমাদের আত্মবিস্মৃতি পোড়াবে।চাই সেই অগ্নি, যা অলসতা দগ্ধ করবে।চাই সেই অগ্নি, যা কুসংস্কারের শিকড় গলিয়ে দেবে।চাই সেই অগ্নি, যা অন্যায়ের সামনে আমাদের মেরুদণ্ড সোজা করবে।চাই সেই অগ্নি, যা জ্ঞানকে দীপ্ত করবে, চরিত্রকে পবিত্র করবে এবং কর্মকে তেজস্বী করবে!
অতএব হে অমৃতের সন্তানগণ—’উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত’ ওঠো!
আর কত ঘুমাবে?
তোমার অন্তরে যে ঐশ্বরিক সম্ভাবনা আছে, তাকে চিনতে শেখো! পরমেশ্বর তোমাকে জড়তা, অন্ধকার ও দুর্বলতার জন্য সৃষ্টি করেননি। তোমার মধ্যে যে জ্ঞান, বিবেক, সাহস ও কর্মশক্তি দিয়েছেন, তাকে প্রজ্জ্বলিত করো!
যজ্ঞাগ্নির শিখার দিকে তাকাও এবং নিজেকে প্রশ্ন করো—
আমি কি জ্বলছি?আমি কি আলোক দিচ্ছি?আমি কি ঊর্ধ্বে উঠছি?আমি কি অশুদ্ধতাকে পুড়িয়ে শুদ্ধতার পথে এগোচ্ছি?আমি কি নিজের জীবনকে অন্যের কল্যাণে নিবেদন করছি?
যদি উত্তর ‘না’ হয়—তবে আজই জ্বলে ওঠো! ‘আ রোহ তমসো জ্যোতিঃ‘—অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এগিয়ে চলো।
পরমেশ্বরের অসীম করুণা এবং নিজের অন্তর্নিহিত তেজকে সম্বল করো। নিজের ভিতরের অজ্ঞতা, ভয়, অলসতা, পাপপ্রবৃত্তি ও দুর্বলতাকে দগ্ধ করো। কিন্তু মনে রেখো—এই অগ্নি কোনো মানুষের বিরুদ্ধে নয়; এই অগ্নি অশুভের বিরুদ্ধে, অজ্ঞতার বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, নিজের দুর্বলতার বিরুদ্ধেই প্রথমে জ্বালাতে হবে।
আজ প্রয়োজন এমন মানুষ, যারা নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করবে—বৈদিক জ্ঞান মৃত অতীত নয়; বৈদিক জ্ঞান জীবনের জাগরণ!
আজ প্রয়োজন এমন হৃদয়, যেখানে যজ্ঞের আগুন জ্বলে।আজ প্রয়োজন এমন মস্তিষ্ক, যেখানে জ্ঞানের আলো জ্বলে।আজ প্রয়োজন এমন চরিত্র, যা অগ্নির মতো পবিত্র।আজ প্রয়োজন এমন কর্মী, যে অগ্নির মতো নিরন্তর কর্মশীল।আজ প্রয়োজন এমন মানুষ, যে নিজে দীপ্ত হয়ে শত মানুষকে দীপ্ত করতে পারে!
এসো, পরমাত্মার প্রতি নিজেদের সমর্পিত করি। এসো, যজ্ঞের পবিত্র আদর্শকে জীবনে ধারণ করি। এসো, অগ্নির শিখার কাছ থেকে শিখি—নিজে জ্বলো, অন্যকে জ্বালাও; নিজে আলোকিত হও, অন্যকে আলোকিত করো; নিজে শুদ্ধ হও, সমাজকেও শুদ্ধতার পথে নিয়ে চলো!
🔰আর সেই অগ্নিশিখার সামনে দাঁড়িয়ে ঋগ্বেদের মহাবাণী উচ্চারণ করি—
আ তে অগ্ন ইধীমহি দ্যুমন্তং দেবাজরম্।
যদ্ধ স্যা তে পনীয়সী সমিদ্দীদয়তি দ্যবীষং স্তোতৃভ্য আ ভর ॥
ঋগ্বেদ ৫।৬।৪
= এসো, আমরা তোমাকে প্রজ্জ্বলিত করি—হে জীবনের আলো ও অগ্নি, উদার পরমেশ্বর, দীপ্তিময় ও অজর-অমর; যাতে তোমার শিখার বিস্ময়কর ও প্রশংসনীয় আলো দ্যুলোকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এবং তুমি ভক্তদের জন্য খাদ্য ও শক্তি বহন করে আনো।
আজ আবার চাই সেই অগ্নিহোত্রের দীপ্তিশিখা!
বেদীর অগ্নি জ্বলুক—আর তার সঙ্গে জ্বলুক আমাদের বিবেক!
অগ্নির শিখা ঊর্ধ্বে উঠুক—আর তার সঙ্গে ঊর্ধ্বে উঠুক আমাদের জীবন!
অগ্নি অন্ধকার দূর করুক—আর আমরা দূর করি অজ্ঞতার অন্ধকার!
অগ্নি অশুদ্ধিকে দহন করুক—আর আমরা দহন করি নিজেদের দুর্বলতা ও কুসংস্কার!
অগ্নি চারদিকে আলো ছড়াক—আর আমরা আমাদের জ্ঞান, চরিত্র ও কর্মের আলো সমাজে ছড়িয়ে দিই!
কারণ অগ্নিহোত্রের সত্য শিক্ষা শুধু বেদীতে আগুন জ্বালানো নয়—অগ্নির গুণকে জীবনে জ্বালানো।
আজ তাই আবার ডাক দাও—
জাগো!উঠো!জ্বলে ওঠো!ঊর্ধ্বে ওঠো!নিজেকে শুদ্ধ করো!সমাজকে আলোকিত করো!সত্যের পথে অটল হও!
আজ আবার চাই—অগ্নিহোত্রের দীপ্তিশিখা!
🖋 শ্রী দীপংকর সিংহ দীপ
ব্যাকরণ-বেদান্ত-স্মৃতি-পৌরোহিত্য-আয়ুর্বেদতীর্থ
শিক্ষা ও শাস্ত্রার্থ সমন্বয়ক
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর