20/12/2025
অনেকদিন পর এক পারিবারিক মজলিসে আমার এক আত্মীয়ের সাথে দেখা হলো। অনেকদিন পর দেখা হয়ে খুবই ভালো লাগলো। বিভিন্ন কথার পিঠে কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে সে আমাকে এমন একটা কথা বললো—যা এতটাই কষ্ট দিল যে, কিছুক্ষণ আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি আর কথা বাড়াইনি। নিজের মতো চুপচাপ রইলাম।
আমার চোখে পানি চলে আসলো। মনটাই ভেঙে গেল।
চলে যাওয়ার আগে সে কাছে এসে বলল—সে খুবই স্যরি, এত খারাপ কথা তার বলা উচিত হয়নি। আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। মাফ করে দিলাম।
হ্যাঁ, আমি মাফ করে দিয়েছি।
কিছু তীব্র যন্ত্রণা ভোলা যায় না। এরপরও আমি তাকে মেসেজ দিয়েছি, তাকে সালাম দিয়েছি, ভালো ব্যবহার করেছি। অথচ প্রতিবারই মনে হয়েছে—সে কোনো কারণ ছাড়াই, কিছু না জেনেই আমাকে ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক কিছু কথা শুনিয়েছে।
এই যে আমার মনের উচ্ছ্বাস চুপসে গেল—আমি মনে করি, এটাও তার জন্যই এক ধরণের বঞ্চনা। কারণ এই সম্পর্কে যতোটা উচ্ছ্বাস থাকার কথা ছিল যা তার জন্য অনেক স্বতঃস্ফূর্ত দোয়ার দরজা খুলে দিতে পারত, তার প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, বরকতের দরজা খুলে যেত, তার নিজের আচরণই সেই দরজাগুলো বন্ধ করে দিল। দেখুন কারো অশোভনীয় আচরণই কিন্তু তার কর্মের শাস্তি।
যদিও আমরা দু'জন ভদ্র আচরণ করছি, হাসিমুখে কথা বলছি… তবুও ভেতরের ক্ষতটা থেকে গেছে।
এখানে আরেকটা বিষয় অনেকেই ভাবেন, “আমি তো তাকে মাফ করে দিয়েছি। কিন্তু কেন এখনও সে তীব্র যন্ত্রণার স্বাদ আমি ভুলতে পারি না? তাহলে এটা কি আমার দুর্বলতা? এটাই আমার দোষ?
না, এটা কোনো দোষ না। এটা মানবিকতা। এর মানে আমরা রোবট না।
আমি জানি, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই আমার মানবিকতা বোঝেন। আমি তো মানুষ। কেউ কেটে দেওয়া ঘায়ে আবার লবণ ছিটিয়ে দিলে, সেই ব্যথাও আমাকেই বয়ে নিতে হয়।
ইসলাম কিন্তু বলেনি, তোমাকে যে কষ্ট দিয়েছে, তার পেছনেই লেগে থাকো অথবা তার অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে থাকো।
না।
বরং ইসলাম শিখিয়েছে হৃদয় ভেঙে গেলেও ক্ষমা করা, ক্ষমা করার পরও ভেতরে কষ্ট অনুভব করলে ভদ্রতা বজায় রাখা—এই তো সুন্দর সবর।
আমি আমার মানুষ হওয়ার জায়গা থেকে মাফ করে দিয়েছি।
তবুও হঠাৎ কাটা কাটা কথা মনে পড়লে অন্তরে রক্তক্ষরণ হতেই পারে।
কষ্ট পাওয়াটা আমার অপরাধ না। কষ্ট পেয়ে যদি অনেক গীবত করতাম, খারাপ আচরণ করতাম, গুনাহ করতাম তাহলে ভিন্ন কথা। অবশ্যই সেগুলো অপরাধ হতো।
কিন্তু সেই কষ্ট নিয়ে যখন কেউ ভদ্র থাকছে, অন্যের হক নষ্ট করছে না—এই তো সে করছে আল্লাহকে ভালোবেসে, এবং আল্লাহকে ভয় করে।
এটাই তো চেষ্টা আমাদের যেন আল্লাহ আমাদের জান্নাতে ঢুকতে দেন। আর এই চেষ্টাটুকুর কারণেই হয়তো আল্লাহ আমাদের তাঁর রহমত দিয়ে একদিন সম্মানিত করবেন…
আমি খুব দুয়া করি আমার ঐ আত্মীয়ের জিহবার ধার যেন আল্লাহ কমিয়ে দেন, এবং সেও যেন অনেক সুন্দর ভাবে আল্লাহকে ভালোবেসে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে, আল্লাহ যেন তাকেও দুনিয়া আখিরাতে অনেক ভালো রাখে..
আর হয়তো কোনো একদিন, খুশি হয়ে আমাদের দু’জনকেই জান্নাতে একসাথে প্রবেশের সুযোগ দিবেন আমাদের প্রিয় রব! .. সেদিন আর কারো অন্তরে কারো জন্য কোন যন্ত্রণার লেশ মাত্র বাকি থাকবে না ... সেখানে না কেউ কখনো কটু কথা বলবে! না কেউ কখনো কোন কটু কথা শুনবে...
সুবহানআল্লাহ!
আমার সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে এই ভাবনায়—
ইয়া আল্লাহ, এভাবে আমি কি বুঝে অথবা না বুঝে কখনো কাউকে এমন তীব্র কষ্ট দিয়ে ফেলেছি?
কষ্ট দিয়ে থাকলে—সবার আগে হে আল্লাহ আপনি যেন আমাকে মাফ করে দেন। এবং যাকে কষ্ট দিয়েছি, তার হৃদয়ও আপনি নরম করে দেন যেন সে আমাকে মাফ করে দেয়।
কারণ তীব্র কথার যন্ত্রণা ছুরির থেকেও ধারালো।
এজন্যই মনে হয়, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন—
“তুমি কি জানো কী জিনিস সবচেয়ে বেশি মানুষকে জাহান্নামে মুখ থুবড়ে ফেলবে?” সাহাবীরা বললেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তিনি বললেন, “জিহবার ফসল।”
— তিরমিযী, হাদিস ২৪০৮
©