31/08/2026
বিখ্যাত ট্রাভেল ডকুমেন্টারি ব্লগার রুহি চেনেট এর এই ডকুমেন্টারি দেখে অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম।
ভিডিওতে উঠে আসা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংক্ষেপে তুলে ধরছি,,
১. তারা নিচের একটি কক্ষে দিনে তিনবার প্রার্থনা করে এবং সারাদিন গবেষণা ও পড়াশোনা করে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা প্রতিদিন ১০ ঘণ্টারও বেশি পড়াশোনা করে। সেখানে প্রায় ৫০০ জন ছেলে রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ইসরাইল থেকে এসেছে। তারা বলছিল, একজন মা যেমন সন্তান প্রসবের সময় নয় মাসের মধ্যে শেষ মাসে সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেন, তেমনি পৃথিবীও এখন শেষ সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, খুব শিগগিরই মাসীহ (দাজ্জাল) আসবেন এবং পবিত্র ভূমিতে তৃতীয় মন্দির নির্মাণ করে তারা সেখানে ফিরে যাবেন।
২. তারা কেউ মোবাইল, ইন্টারনেট ইত্যাদি ব্যবহার করে না। কারণ, তারা বিশ্বাস করে এসব তাদের রুহানিয়াত ও ঈশ্বরের প্রতি মনোযোগ নষ্ট করে দেয়। সুতরাং, এসব থেকে বিরত না থাকলে ইবাদতের স্বাদ নষ্ট হবে এবং তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা অবশিষ্ট থাকবে না।
৩. তাদের আয়-রোজগার ও ক্যারিয়ার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা বলে, এসব নিয়ে এত চিন্তা করার কিছু নেই; ঈশ্বরই ব্যবস্থা করে দেবেন।
৪. তারা ইবাদতের শুরুতেই দান করে এবং জেরুজালেমের দিকে মুখ করে ইবাদত করে। তাদের ইবাদতখানায় স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দান বাক্স রয়েছে। তারা সেসব বাক্সে দান করে।
৫. তারা বারবার জিজ্ঞেস করছিল, ‘আপনি ইহুদি কি না?’ কারণ, তারা ইহুদি ছাড়া অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করে না। এমনকি যোগাযোগের জন্য তাদের আলাদা মোবাইলও রয়েছে। তারা ভিডিও ক্যামেরা পছন্দ করে না; প্রয়োজন হলে ছবি তোলে। ইন্টারনেটের কথা তো বাদই দিলাম — টিভি, সিনেমা ইত্যাদি সম্পর্কেও তাদের তেমন কোনো ধারণা নেই। কোনো খেলোয়াড় বা সেলিব্রিটির নামও তারা জানে না। তারা জানে কেবল তাদের রাব্বি বা ধর্মগুরু কী বলেছেন এবং তিনি কোথায় থাকেন।
৬. তারা সাধারণত ১০ জনের কম সন্তান নেয় না; অর্থাৎ তাদের পরিবারে সন্তানসংখ্যা অনেক বেশি। সন্তান নেওয়া বা সন্তান নেওয়া বন্ধ করার মতো বিষয়েও তাদের রাব্বি বা প্রধান ধর্মগুরুর কাছে যেতে হয়। কারণ, তারা তাঁর কথাকে ঈশ্বরের নির্দেশের মতোই বিশ্বাস করে। তাদের দাবি অনুযায়ী, প্রতি ২০ বছর পরপর তাদের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
৭. তাদের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে তারা তাওরাত অনুযায়ী বিচার করে। এমনকি তারা নিজেদের মধ্যে একে অপরকে খুবই সহযোগিতা করে। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও পরস্পরকে সাহায্য করতে তারা খুব পছন্দ করে। তাদের নিজস্ব পুলিশবাহিনীও রয়েছে, যারা টহল দেয় এবং কোনো ইহুদি নারী অশালীন পোশাক পরেছেন কি না বা মাথা ঢেকে চলছেন কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখে। তাদের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সও রয়েছে। এক কথায়, তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার প্রায় সবকিছুই রয়েছে।
৮. তাদের নারীরা বেশি সন্তান নেওয়া কিংবা টিভি-সিনেমা দেখতে না পারা নিয়ে কোনো অভিযোগ করে না। তারাও শালীন পোশাক পরেন এবং ইবাদতের জন্য ইবাদতগাহে যান। তবে ইবাদতগাহে তাঁদের জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে, যেখানে কাঁচ দিয়ে ঘেরা পৃথক (নারী-পুরুষ) অংশে তাঁদের ইবাদত করতে হয়।
©
আজকের দুনিয়ায় কেউ যদি আপনাকে বলে, “আমি ইলন মাস্ককে চিনি না, রোনালদোকে চিনি না, মেসিকেও চিনি না” আপনি কি বিশ্বাস করবেন?
হয়তো আপনি ভাববেন, লোকটা মজা করছে।
কিন্তু নিউইয়র্কের মতো পৃথিবীর অন্যতম আধুনিক শহরে এমন মানুষ আছেন, যারা সত্যিই এসব নাম জানেন না। এমনকি কেউ কেউ সারাজীবনে একবারও ইন্টারনেট ব্যবহার করেননি।
তারা কারা?
নিউইয়র্কের Hasidic Jewish সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ।
একদিকে নিউইয়র্ক। চারপাশে আকাশচুম্বী ভবন, আইফোন, ইন্টারনেট, Netflix, Instagram, Facebook, TikTok, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ফোরণ। আর সেই একই শহরের ভেতরেই এমন একটি ধর্মীয় সমাজ আছে, যারা নিজেদের বিশ্বাস ও জীবনধারা রক্ষার জন্য আধুনিক পৃথিবীর বিরাট একটি অংশ থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে।
তাদের অনেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। টেলিভিশন দেখেন না। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকেন। তাদের সন্তানদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও ধর্মীয় শিক্ষার ওপর প্রচণ্ড গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধর্ম, পরিবার এবং সম্প্রদায়।
তাদের পরিবারগুলোও বড়। সন্তান জন্ম দেওয়া সেখানে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুরুষদের অনেক সময় দীর্ঘ সময় ধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়ন ও প্রার্থনায় কাটে। নারীদের পোশাক, চুল ঢাকা, পুরুষ-নারীর সামাজিক সম্পর্ক, এমনকি দৈনন্দিন জীবনের অনেক বিষয়েও ধর্মীয় বিধিনিষেধের প্রভাব রয়েছে।
শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, তারা নিজেদের একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক কাঠামোও তৈরি করেছে।
নিজেদের ব্যবসা আছে। নিজেদের সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা আছে। স্বেচ্ছাসেবী অ্যাম্বুলেন্স সেবা আছে। নিজেদের ধর্মীয় আদালত Beth Din-এর মাধ্যমে অনেক পারিবারিক ও দেওয়ানি বিরোধ মীমাংসা করা হয়। Shabbat-এর সময় প্রযুক্তি ও কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য দৈনন্দিন জীবনে বিশেষ ব্যবস্থাও করা হয়।
অর্থাৎ তারা আধুনিক পৃথিবীর মাঝখানে থেকেও নিজেদের জন্য একটি আলাদা পৃথিবী তৈরি করেছে।
এখানে এসে আমার মাথায় একটি প্রশ্ন আসে।
আমরা মুসলমানরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?
যে পৃথিবীতে একজন মানুষ নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস রক্ষার জন্য ইন্টারনেট পর্যন্ত বর্জন করতে পারে, সেখানে একজন মুসলমানের জীবনে ধর্মের জায়গাটা কেন এত সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে?
একজন Hasidic ইহুদি যদি তার ধর্মের কারণে নিজের পোশাক নির্ধারণ করতে পারে, পরিবার পরিচালনা করতে পারে, সন্তানদের ধর্মীয় মূল্যবোধে বড় করতে পারে, Shabbat পালন করতে পারে, নিজের ধর্মীয় আদালতে পারিবারিক বিরোধ মীমাংসা করতে পারে, তাহলে একজন মুসলমান যখন নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করতে চায়, তখন সেটাকে এত অস্বাভাবিক মনে হয় কেন?
একজন ধর্মপ্রাণ ইহুদি নিজের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে চাইলে আমরা সেটাকে তারা religious freedom হিসেবে দেখে।
একজন খ্রিস্টান নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করলে সেটাকে faith মনে করে।
কিন্তু একজন মুসলমান যখন বলে, আমি আমার পোশাকে ইসলামের বিধান মানতে চাই, আমার সন্তানকে ইসলামের মূল্যবোধে বড় করতে চাই, আমার পরিবারে ধর্মীয় নৈতিকতা চাই, তখন কেন তার ওপর এত দ্রুত modern, backward, extreme কিংবা intolerant-এর তকমা বসে যায়?
এই পশ্চিমা দুনিয়া যখন একজন মুসলিম নারীর মাথার হিজাবের দিকে তাকায়, তখন তার চোখে ফুটে ওঠে সন্দেহ। যখন একজন মুসলিম পুরুষ দাড়ি রাখে, তাকে বলা হয় উগ্রবাদী। যখন মুসলিমরা নিজেদের পারিবারিক বিষয় শরিয়াহ অনুযায়ী মীমাংসা করতে চায়, তখন তাকে বলা হয় সমাজবিরোধী চিন্তা। অথচ ওই হাসিদিক ইহুদি সম্প্রদায়ের নিজস্ব "বেথ দিন" আদালত আছে, নিজস্ব টহল বাহিনী আছে, নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স সেবা আছে তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। প্রশ্নটা তখনই ওঠে, যখন প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে থাকি আমরা।
এই দ্বিচারিতার নাম কী? এর নাম "সিলেক্টিভ টলারেন্স" — বেছে বেছে সহনশীলতা। যাদের বিশ্বাস পশ্চিমের রাজনৈতিক স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, তাদের ধর্মপালনকে বলা হয় ঐতিহ্য। আর যাদের বিশ্বাস, যাদের জীবনযাত্রা প্রশ্ন তোলে আধুনিকতার অহংকারকে, তাদের বলা হয় পশ্চাৎপদতা।
অথচ ভেবে দেখুন, যে সমাজ প্রযুক্তির প্রতিটি সুতো দিয়ে আমাদের বেঁধে ফেলেছে, যে সমাজ বলে "সংযুক্ত থাকো, নাহলে পিছিয়ে পড়বে," সেই সমাজই একদল মানুষকে দেখে মুগ্ধ হয় যারা এই শেকল ছিঁড়ে ফেলেছে। প্রশ্ন হলো, শেকলটা কি সত্যিই প্রযুক্তি? নাকি শেকলটা হলো, কার বিশ্বাসকে সম্মান দেওয়া হবে আর কার বিশ্বাসকে সন্দেহের চোখে দেখা হবে, সেই সিদ্ধান্ত?
আমরা যখন আল্লাহর কথা বলি, তখন আমাদের বলা হয় ধর্মান্ধ। আমরা যখন পর্দা করি, তখন আমাদের বলা হয় নিপীড়িত। অথচ তাদের শহরে বসে একটা সম্প্রদায় যখন ঠিক একই রকম বিশ্বাস নিয়ে বাঁচে, তাদের বলা হয় অনুপ্রেরণাদায়ক।
আজকে বিশ্বাসের প্রশ্নে দুনিয়া নিরপেক্ষ নয়, দুনিয়া কাকে সহ্য করবে, আর কাকে করবে না তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হয়েছে।
মুসলমানদের বিশ্বাসের ভিত্তি কারো স্বীকৃতির মুখাপেক্ষী নয়। যে দুনিয়া আজ আমাদের পোশাকে প্রশ্ন তোলে, আমাদের নামাজে সন্দেহ করে, সেই দুনিয়ার চোখে ধরা পড়া বা না পড়াটা কখনোই আমাদের ঈমানের মানদণ্ড ছিল না, আজও নয়।
আল্লাহ বলেন — "নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সে, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান" (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩)। এই আয়াতই আমাদের জন্য যথেষ্ট। দুনিয়ার স্বীকৃতিপত্র লাগে না।
আমাদের কাজ দুনিয়াকে বোঝানো নয়, আমাদের কাজ আল্লাহর কাছে দাঁড়ানো। পোশাকে, বিশ্বাসে, চর্চায় আমরা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি খুঁজি, তবে দুনিয়ার সমালোচনা একদিন নিজেই নিভে যাবে, যেমন রাতের আঁধার ভোরের আলোর সামনে টিকে থাকে না।
-সংগ্রহীত