10/07/2024
"নামাজ পড়লে জান্নাত পাওয়া যাবে" এমন কথা সরাসরি কোরআন ও হাদিসে আছে কি?
ইমদাদুল্লাহ
মতিঝিল, ঢাকা।
প্রশ্নঃ
মুহতারাম, বেশ কিছুদিন ধরে একজন বক্তার একটি ভিডিও ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে যে, তিনি বলেছেন, "নামাজ পড়লে জান্নাত পাওয়া যাবে" এমন কথা কুরআনে কোথাও নাই। আর হাদিসের নামে যে প্রচলিত কথা রয়েছে, "নামাজ জান্নাতের চাবি" এ হাদিসের সনদ এবং মতন তিনি খুঁজে পাননি।
মেহেরবানী করে কোরআন ও হাদিসের আলোকে যদি বিস্তারিত বলতেন।
উত্তরঃ
আপনার মতো আরও অনেকেই এই প্রশ্নটি আমাকে করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলে অনেক লম্বা আলোচনা হবে। সংক্ষেপে এ বিষয়ের জবাব দিচ্ছি।
কুরআন হচ্ছে আল্লাহর কালাম। দ্বীন ও শরীয়তের মূল উৎস। আসমানী শিক্ষা ও হেদায়েতের প্রধান স্তম্ভ। আমাদের সবার কর্তব্য, প্রতিদিন অল্প অল্প করে হলেও কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এর শিক্ষা ও হেদায়েত দ্বারা জীবনকে আলোকিত করা।
আমরা যদি এ আলোকগ্রন্থ তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন করি, তাহলে পরিষ্কার দেখতে পাব, ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে নামায। আল্লাহ তাঁর পবিত্র কালামে বিভিন্নভাবে নামাযের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং বিচিত্ররূপে নামাযের প্রতি আহ্বান করেছেন। কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই ওই সব ঈমানদার সফলকাম হয়েছে, যারা তাদের নামাজ খুশু-খুজুর সাথে আদায় করে।’ (সূরা মুমিনুন:১-২)। আল্লাহ তাআলা এরকম আরো বহু আয়াতে নামাজ আদায়কারীদের জন্য সফলতা ও কল্যাণের কথা উল্লেখ করেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার কাছে কল্যাণকর কাজে সফলকাম হবে সেতো জান্নাতেই যাবে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আপনি যেহেতু প্রশ্নে উল্লেখ করেছেন, "নামাজ পড়লে জান্নাত পাওয়া যাবে" এমন কথা সরাসরি কোরআন ও হাদিসে আছে কিনা, তাই এখানে কোরআন ও হাদিসের সরাসরি কিছু দলিল পেশ করছি।
পবিত্র কুরআনের দলিল
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ عَلٰی صَلَوٰتِہِمۡ یُحَافِظُوۡنَ ۘ
এবং যারা নিজেদের নামাযের পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে।
اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡوٰرِثُوۡنَ ۙ
এরাই হল সেই ওয়ারিস,
الَّذِیۡنَ یَرِثُوۡنَ الۡفِرۡدَوۡسَ ؕ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ
যারা জান্নাতুল ফিরদাউসের মীরাস লাভ করবে।তারা তাতে সর্বদা থাকবে।
(—সূরা আল মু'মিনূন, আয়াত- ৯, ১০, ১১)
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ عَلٰی صَلَاتِہِمۡ یُحَافِظُوۡنَ ؕ
এবং যারা তাদের নামাযের ব্যাপারে পুরোপুরি যত্নবান থাকে।
اُولٰٓئِکَ فِیۡ جَنّٰتٍ مُّکۡرَمُوۡنَ ؕ
তারাই জান্নাতে থাকবে সম্মানজনকভাবে।
(—সূরা আল মাআরিজ, আয়াত- ৩৪,৩৫)
হাদিসের দলিল
নিম্নোক্ত হাদিস সম্পর্কে আলোচনা
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ، مُحَمَّدُ بْنُ زَنْجَوَيْهِ الْبَغْدَادِيُّ وَغَيْرُ وَاحِدٍ قَالَ حَدَّثَنَا الْحُسَيْنُ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ قَرْمٍ، عَنْ أَبِي يَحْيَى الْقَتَّاتِ، عَنْ مُجَاهِدٍ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، رضى الله عنهما قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " مِفْتَاحُ الْجَنَّةِ الصَّلاَةُ وَمِفْتَاحُ الصَّلاَةِ الْوُضُوءُ " .
আবু বকর, মুহাম্মাদ ইবন যানজাওয়াইহি আল বাগদাদী (রাহঃ) এবং আরো একাধিক রাবী .... জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেছেনঃ জান্নাতের চাবি হল নামায আর নামাযের চাবি হল উযু।
(—জামে' তিরমিযী, হাদীস নং ৪)
উপরোক্ত হাদিস সম্পর্কে অধিকাংশ মুহাদ্দিসীনে কেরাম বলেছেন, এ হাদিসটির মান সহিহ লিগাইরিহি অর্থাৎ বিশুদ্ধ হাসান পর্যায়ের হাদিস। আপনি উল্লেখ করেছেন, ওই বক্তা বলেছেন, তিনি এই হাদিসের সনদ এবং মতন খুঁজে পাননি।
এটা খুবই দুঃখজনক যে, আমার পড়ালেখার সীমাবদ্ধতার কারণে তো আমি একথা বলতে পারি না যে, এটা হাদিসে নাই। আমার জানা না থাকলে কি হবে? হাদিস শাস্ত্রের আলেমগণের তো ঠিকই জানা আছে।
"নামাজ পড়লে জান্নাত পাওয়া যাবে" সরাসরি এমন কথা বহু হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি সহিহ হাদিস উল্লেখ করছি____
وَرُوِيَ عَن كَعْب بن عجْرَة رَضِي الله عَنهُ قَالَ خرج علينا رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وَنحن سَبْعَة نفر أَرْبَعَة من موالينا وَثَلَاثَة من غربنا مسندي ظُهُورنَا إِلَى مَسْجده فَقَالَ مَا أجلسكم قُلْنَا جلسنا نَنْتَظِر الصَّلَاة قَالَ فأرم قَلِيلا ثمَّ أقبل علينا فَقَالَ هَل تَدْرُونَ مَا يَقُول ربكُم قُلْنَا لَا قَالَ فَإِن ربكُم يَقُول من صلى الصَّلَاة لوَقْتهَا وحافظ عَلَيْهَا وَلم يضيعها اسْتِخْفَافًا بِحَقِّهَا فَلهُ عَليّ عهد أَن أدخلهُ الْجنَّة وَمن لم يصلها لوَقْتهَا وَلم يحافظ عَلَيْهَا وضيعها اسْتِخْفَافًا بِحَقِّهَا فَلَا عهد لَهُ عَليّ إِن شِئْت عَذبته وَإِن شِئْت غفرت لَهُ
رَوَاهُ الطَّبَرَانِيّ فِي الْكَبِير والأوسط وَأحمد بِنَحْوِهِ
হযরত কা'ব ইবন উজরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের চারজন মুক্তদাস এবং তিনজন অপরিচিত ব্যক্তি, এই সাতজন আমরা মসজিদে নববীতে পিঠ ঘেঁষে বসা ছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের কাছে এলেন। তিনি বললেন: কিসে তোমাদের এখানে বসিয়েছে? বললাম: আমরা সালাতের অপেক্ষায় বসে আছি। বর্ণনাকারী বলেনঃ তিনি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন, এরপর তিনি আমাদের কাছে এসে বললেন: তোমাদের রব কি বলছেন, তা কি তোমরা জান? আমরা বললামঃ না। তিনি বললেনঃ তোমাদের রব বলছেন: যে ব্যক্তি যথাসময়ে সালাত আদায় করবে, তা সংরক্ষণ করবে এবং তা হালকা মনে করে নষ্ট করবে না, তাকে আমি জান্নাতে প্রবেশ করাব। আমার পক্ষ থেকে তার জন্য রয়েছে অঙ্গীকার। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি সময়মত সালাত আদায় করবে না, তা সংরক্ষণ করবে না, বরং তা হালকা মনে করে বিনষ্ট করবে, তার জন্য আমার কোন অঙ্গীকার নেই। আমি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দেব, নতুবা তাকে আমি ক্ষমা করব।
{তাবারানীর 'কাবীর' ও 'আওসাত' গ্রন্থে এবং আহমদ অনুরূপভাবে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।}
(—আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব, হাদীস নং ৫৮৬)
عن أبي موسى الأشعري - رضي الله عنه- قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : «من صلى البَرْدَيْنِ دخل الجنة»
আবূ মূসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি দুইটি শীতল সময়ের সালাত (ফজর ও আছর) আদায় করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
(বুখারী, হাদিস নং ৫৭৪; মুসলিম, হাদিস নং ৬৩৫)
وَعَن عبَادَة بن الصَّامِت رَضِي الله عَنهُ قَالَ سَمِعت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول خمس صلوَات كتبهن الله على الْعباد فَمن جَاءَ بِهن وَلم يضيع مِنْهُنَّ شَيْئا اسْتِخْفَافًا بحقهن كَانَ لَهُ عِنْد الله عهد أَن يدْخلهُ الْجنَّة وَمن لم يَأْتِ بِهن فَلَيْسَ لَهُ عِنْد الله عهد إِن شَاءَ عذبه وَإِن شَاءَ أدخلهُ الْجنَّة
رَوَاهُ مَالك وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ وَابْن حبَان فِي صَحِيحه
হযরত উবাদা ইবন সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। কাজেই যে তা সংরক্ষণ করবে এবং তার হকের কোন অংশে কম করবে না, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর ব্যাপারে আল্লাহর অঙ্গীকার রয়েছে। আর যে ব্যক্তি তা করবে না, তার সাথে আল্লাহর কোন চুক্তি নেই। চাইলে তিনি তাকে শাস্তি দেবেন, নতুবা তিনি চাইলে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
{ইমাম মালিক, আবু দাউদ, নাসাঈ ও ইবন হিব্বানের 'সহীহ' গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।}
(—আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব, হাদীস নং ৫৪৯)
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، وَأَبُو كُرَيْبٍ - وَاللَّفْظُ لأَبِي كُرَيْبٍ - قَالاَ حَدَّثَنَا أَبُو مُعَاوِيَةَ، عَنِ الأَعْمَشِ، عَنْ أَبِي سُفْيَانَ، عَنْ جَابِرٍ، قَالَ أَتَى النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم النُّعْمَانُ بْنُ قَوْقَلٍ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِذَا صَلَّيْتُ الْمَكْتُوبَةَ وَحَرَّمْتُ الْحَرَامَ وَأَحْلَلْتُ الْحَلاَلَ أَأَدْخُلُ الْجَنَّةَ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " نَعَمْ " .
আবু বকর ইবনে আবি শাঈবা ও আবু কুরায়ব (রাহঃ) ......... জাবির (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নূমান ইবনে কাওকাল (রাযিঃ) নবী (ﷺ) -এর খিদমতে হাযির হলেন। তিনি আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে অবহিত করুন, যদি আমি ফরয নামায আদায় করি, হারামকে হারাম বলে জানি, হালালকে হালাল জ্ঞান করি, তাহলে আমি কি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব? নবী (ﷺ) বললেন, হ্যাঁ।
(—সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬)