07/08/2026
ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে যেসকল মুসলিম শাসক ইসলামী আইন ও শরয়ী বিধান অনুযায়ী দেশ শাসন করার চেষ্টা করেছেন এবং কুরআন ও সুন্নাহের বিধান বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে কিছুটা অংশ নিয়েছেন তাঁদের নাম এই-
- নাসিরুদ্দীন মাহমূদ (৬৬৪ হিজরী)
- গিয়াস উদ্দীন বলবান (৬৮৬ হিজরী)
- আলাউদ্দীন খিলজী (৭১৬ হিজরী)
- শামসুদ্দীন আলতামাশ (৭৩৩ হিজরী)
- মুহাম্মাদ তুগলুক (৭৫২ হিজরী)
- ফিরোজ শাহ (৭৯৯ হিজরী)
- সেকান্দার ইবনে বাহলুল লূধী (৯২৩ হিজরী)
- শের শাহ সূরী (৯৫২ হিজরী)
- শাহজাহান তৈমুরী (১০৬৮ হিজরী)
- আওরঙ্গজেব আলমগীর (১১১৮ হিজরী)
উল্লেখিত শাসকবর্গ ছাড়া আরো কিছু শাসক ও আমীর উমারা এমন অতীত হয়ে গেছেন, যারা হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অংশে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন এবং একটা পর্যায় পর্যন্ত তারা সফলও হয়েছেন। এ ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ব্যক্তি যিনি ছিলেন তিনি হচ্ছেন মুগল সাম্রাজ্যের শেষ বাদশা বাহাদুর শাহ যাফর, যার পরে ইসলামী হুকুমত নামেমাত্র যতটুকু ছিল তাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ পর্যায়ে এসে হিন্দুস্তানকে দারুল হারব ঘোষণা দেয়ার ক্ষেত্রে শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ এর ঐতিহাসিক ফাতওয়া রয়েছে।
হিন্দুস্তানে (উপমহাদেশ) যত দিন পর্যন্ত মুসলিম শাসকদের অধীনে ইসলামী শরীয়তের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন ছিল, তত দিন পর্যন্ত এ ভূখণ্ডকে দারুল হারব ঘোষণা দেয়ার কোন প্রয়োজন ছিল না; বরং তখন এ ভূখণ্ডকে দারুল হারব বলা জায়েযও ছিল না। কিন্তু যখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এবং রাজত্ব ও শাসন মুসলিম শাসকদের হাত থেকে অমুসলিমদের হাতে চলে গেছে, তখন এ উপমহাদেশের আসল অবস্থা অর্থাৎ এ ভূখণ্ডের শরয়ী অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়া জরুরী ছিল। বিশেষত যখন ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে নবাব সিরাজ উদদৌলা এবং ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ফতেহ আলি টিপু ইংরেজদের হাতে শহীদ হয়ে গেছেন এবং মুসলিম বাহিনী পরাজিত হয়ে গেছে। তখন মুসলমানদের কাছে এমন কোন প্রতিরোধ শক্তি অবশিষ্ট থাকেনি, যে শক্তি দিয়ে ইংরেজদের মোকাবেলা করা যায়, অথবা এমন কোন শক্তি ছিল না, যে শক্তি দিয়ে নিজেদের শাসিত ভূখণ্ডের মধ্যে ইসলামী আইন ও শরয়ী বিধান প্রয়োগ করা যায়।
দিল্লিতে মুগল সাম্রাজ্যের নিভু নিভু বাতিটি তখনো একেবারে নিভে যায়নি। মুগল সাম্রাজ্য তখন শাহ আলম সানীর হাতে ছিল। বাস্তব কথা হচ্ছে, শাহ আলমের হাতে তখন দিল্লি লালকেল্লার শুধুমাত্র দালানগুলো ছিল এবং শাহী আরাম আয়েশ ও সাজসজ্জার উপকরণগুলো ছিল। মুসলমানদের শাসক হিসাবে তার হাতে কিছুই ছিল না। হিন্দুস্তানের উপর না কেন্দ্রীয় হুকুমতের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল, আর না আঞ্চলিক শাসকদের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল। ইংরেজ ও অন্যান্য অমুসলিম শক্তিগুলো এসকল হালাতকে যথাযথভাবে আঁচ করে নিয়েছিল এবং শতভাগ স্বাধীনতার সাথে রাজ্যের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের হাতে নিয়ে ফেলেছে। আইন প্রণয়ন প্রতিষ্ঠান ও আইন প্রয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। আর সামরিক শক্তিগুলোতো আগে থেকেই তাদের হাতে ছিল। মোটকথা হিন্দুস্তানের এমন অবস্থা ছিল, যে অবস্থায় কোন যিম্মাদার আলেম এবং উম্মতের কোন রাহবার স্বস্তির সাথে বেঁচে থাকতে পারেন না। নিজের উপর অর্পিত শরয়ী যিম্মাদারী আদায় না করে এবং নিজের ফরয দায়িত্ব আদায় না করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারেন না।
সিরাজুল হিন্দ শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ হিন্দুস্তান দারুল হারব হওয়ার ফাতওয়া দিলেন এবং একজন রাহবার হিসাবে উম্মতকে এ বার্তা পৌঁছে দিলেন যে, এখন থেকে তোমাদের যিম্মাদারিতে এমন কিছু ফরয দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যেসব যিম্মাদারি একটি দারুল ইসলামের অধিবাসী হিসাবে তোমাদের উপর আগে ছিল না।
যেসকল প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে এবং যেসকল কারণে এ ফাতওয়া সময়ের অনিবার্য ফরয দায়িত্ব ছিল সে কারণগুলো হচ্ছে এই—
১. হিন্দুস্তানে ইসলামী শরীয়তের আইনি অবস্থান বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
২. হিন্দুস্তানের প্রধান শাসক মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ইসলামী আইন প্রয়োগ করতে সক্ষম ছিলেন না।
৩. আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো, আদালত ও আইন প্রণয়ন এসেম্বেলীর উপর কুরআন, হাদীস ও ইসলামী শরীয়তের নিয়ন্ত্রণ চলত না।
৪. আইনের সকল প্রতিষ্ঠান, আদালতসমূহ ও আইন প্রণয়ন এসেম্বেলীগুলো অমুসলিম শক্তির মতামত ও সিদ্ধান্তের অধীনে এবং তাদের মর্জির অধীনে ছিল।
৫. মুসলিমরা তাদের ইবাদাত, লেনদেন ও ইসলামী চালচলনের ততটুকুই করতে পারত, যতটুকু তারা অনৈসলামিক আইন ও অমুসলিম শাসকদের পক্ষ থেকে করার অনুমতি পেত।
৬. সেই শাসন ব্যবস্থা তাদের খরচে মাদরাসা চালাত। কিন্তু মাদরাসায় যেসব মাসআলা পড়ানো হত সেসব মাসআলা সমাজে বাস্তবায়ন করতে দিত না।
৭. সে শাসন ব্যবস্থার কর্ণধাররা মাদরাসার প্রধান হিসাবেও দায়িত্ব পালন করত, কিন্তু কুরআন ও হাদীসের বিধি বিধানকে তারা অন্তর থেকে ঘৃণা করত।
হিন্দুস্তানের এ হালাতগুলো এমন ছিল যার বাস্তবতাকে শত্রু-মিত্র কেউ অস্বীকার করতে পারত না, আর না এগুলোকে অস্বীকার করার কথা তাদের কারো মনে কখনো উঁকি দিয়েছে। কেননা এ হালাতগুলো এমন সূক্ষ্ম তার ও চিকন পাইপ লাইনের মাধ্যমে এ সমাজকে ঘিরে নিয়েছিল যে, অধিকাংশ মুসলমানের খবরও ছিল না, কোথাকার পানি কোথায় গড়িয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু দ্বীনের সচেতন দায়িত্বশীলগণের চোখ এমনভাবে খোলা থাকে যে, তাদের সামনে দিয়ে শরীয়ত বিরোধী কোন পরিস্থিতি এবং শরীয়ত পরিপন্থী কোন পর্ব তাঁদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে যেতে পারে না। পরিস্থিতির শরয়ী বিচার বিশ্লেষণ শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ এ ভারত উপমহাদেশকে দারুল হারব বলে ফাতওয়া দিলেন এবং আল্লাহর বান্দাদের এমন একটি কাফেলা দাঁড়িয়ে গেল যারা এ ফাতওয়ার আলোকে যা যা করার ছিল তা তা করার জন্য প্রস্তুত ছিল।
এ ফাতওয়ার প্রেক্ষাপট এবং যেসকল পরিস্থিতির ভিত্তিতে এ ফাতওয়া দেয়া হয়েছিল সেসব কারণ এখনো হুবহু সেভাবেই বহাল রয়েছে যা এ ফাতওয়া দেয়ার সময় ছিল।
এ ফাতওয়ার প্রায় সোয়া দুইশত বছর পরের সময় আমরা এখন পার করছি। এ সময় পার করতে গিয়ে আমরা এখন দেখব, যেসব প্রেক্ষাপট এবং যেসব কারণকে সামনে রেখে দুইশত সোয়া দুইশত বছর আগে ভারত উপমহাদেশকে দারুল হারব ঘোষণা করা হয়েছিল, সেসব কারণ ও সেসকল পরিস্থিতি ধারাবাহিকভাবে আজো পর্যন্ত বিরাজ করে আসছে? না কি নয়?
এ বিষয়টি কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, বিগত দুই শত বছর যাবত পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে থেকেছে। আর এটি একটি অসম্ভব বিষয় যে, এত দীর্ঘ কাল যাবত কোন প্রকার পটপরিবর্তন ছাড়াই দুনিয়া চলবে। এটা হতে পারে না। শরীয়তের মাপকাঠিতে যদি বিচার করা হয়, তাহলে যেকোন জ্ঞানী ব্যক্তি এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, দুইশত বছর আগের অবস্থা এবং দুইশত বছর পরের অবস্থার মাঝে কোন প্রকার পার্থক্য হয়নি, কোন ব্যবধান আসেনি।
একটু চিন্তা করে দেখুন—
১. ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আইনপ্রণয়ন এসেম্বেলী, আদালতসমূহ এমনিভাবে কোন আইনী প্রতিষ্ঠানের উপর কুরআন, হাদীস ও ইসলামী শরীয়তের কোন প্রকার নিয়ন্ত্রণ নেই, কোন প্রকার প্রধান্য নেই, কোন হাত নেই।
২. উপমহাদেশের এ তিনটি দেশেই প্রতিটি আইন ও প্রতিটি কানুন সেসব দেশের শাসকবর্গের মতামত ও সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে হয়, সে শাসক মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক।
৩. বরং বৃটিশ এ দেশকে যে আইনের উপর পরিচালিত করে একটি দারুল ইসলামকে দারুল হারব বানিয়ে ছেড়েছিল, সেই বৃটিশ আইন কানুন আজও এ উপমহাদেশের দেশগুলোতে আইন প্রণয়নকারী হিসাবে পূর্ণ শক্তি ও সামর্থ্য এবং পরিপূর্ণ সতেজতার সাথে কার্যকরী ও বহাল রয়েছে।
৪. এ দেশগুলোর উপর এমনসব শাসকদের আধিপত্য রয়েছে, যারা পরকালে মুক্তির জন্য শুধুমাত্র একটি ধর্ম অর্থাৎ ইসলামের অনুসরণকে জরুরী মনে করে না।
৫. উপমহাদেশের এ দেশগুলোতে যেসব শাসক রয়েছে তাদের আকীদা বিশ্বাস হচ্ছে, মুসলমানরা তাদের ইসলামী আইন কানুন অনুযায়ী চলতে হলে, শাসকদের বানানো আইন কানুনের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। অমুসলিমদের বানানো আইন থেকে অনুমতি নিতে হবে। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের দুশমনদের বানানো আইন কানুন থেকে অনুমতি নিতে হবে।
৬. এ শাসকদের আকীদা বিশ্বাস হচ্ছে, ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে, কুরআন ও হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে কোন আইন কানূন বানানো এবং তা প্রয়োগ করা অপরাধ এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এসব বিষয়ে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ অর্থাৎ সাবেক হিন্দুস্তান (উপমহাদেশ) এর তিনটি দেশেরই অবস্থা বরাবর। শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ যে সময়ে এ উপমহাদেশকে দারুল হারব হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন সে সময়ের অবস্থা এবং বর্তমানের অবস্থাও বরাবর।
এ পর্যায়ে এসে একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, দারুল হারব হিসাবে হিন্দুস্তান তিনটি পর্ব অতিক্রম করেছে। একটি পর্বতো হচ্ছে, যখন ফাতওয়াটি দেয়া হয়েছে। তখন শাসক ছিল মুসলমান, কিন্তু আধিপত্য ছিল অমুসলিমদের। আদালত ও আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো অমুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে এবং অনৈসলামিক আইনের অধীনে চলত। এ পর্বটি হচ্ছে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্ব হচ্ছে, যখন শাসক অমুসলিম ছিল। এ পর্বটি ছিল ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কাল। তৃতীয় পর্ব হচ্ছে, যখন কিছু অংশের শাসক মুসলিম আর কিছু অংশের শাসক অমুসলিম, কিন্তু প্রত্যেক অংশের উপরই আধিপত্য অমুসলিমদের। আদালত ও আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো অমুসলিম ও অনৈসলামিক আইনের অধীনে আছে। এ পর্বটি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখনো পর্যন্ত চলছে।
এ তিনটি পর্বের পরস্পরে যে পার্থক্যগুলো রয়েছে তার কিঞ্চিত বিশ্লেষণ নিম্নরূপ—
প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে এ ভূখণ্ডের নাম ছিল হিন্দুস্তান। এখন এ ভূখণ্ড আলাদা আলাদা তিনটি নামে পরিচিত: ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ।
প্রথম পর্বে এ ভূখণ্ডের শাসক ছিল মুসলমান, দেশ নামেমাত্র মুসলমানদের হাতে ছিল। কিন্তু সরকারী সকল প্রতিষ্ঠানের উপর অমুসলিমদের আধিপত্য ছিল। দ্বিতীয় পর্বে শাসক অমুসলিম ছিল। আদালত ও আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদেরই হাতে ছিল। আর তৃতীয় পর্বে কিছু অংশের শাসকরা নিজেদেরকে অমুসলিম মনে করে, আর কিছু অংশের শাসকরা নিজেদেরকে মুসলমান মনে করে। তবে সবার আদালত এবং আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো অমুসলিমদের তত্ত্বাবধানে অনৈসলামিক আইনের অধীনে চলে। প্রত্যেক অংশের শাসকবর্গ, চাই তারা নিজেদেরকে মুসলিম মনে করুক বা অমুসলিম মনে করুক, প্রত্যেকে এ আকীদা বিশ্বাস লালন করে যে, আদালত ও আইনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কুরআন, হাদীস ও ইসলামী শরীয়াতের প্রবেশ এবং শরয়ী আইন তথা কুরআন সুন্নাহর আইনের প্রভাব বা প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা চলমান সময়ের সবচাইতে বড় অপরাধ।
প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে অধিকাংশ মুসলমান এবং উম্মতের রাহবারগণ অমুসলিমদের আধিপত্য এবং অনৈসলামিক আইনের অধীনস্থতার উপর অসন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু তৃতীয় পর্বে অধিকাংশ মুসলমান অমুসলিমদের আধিপত্য এবং অনৈসলামিক আইনের অধীনতাকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছে, অথবা তার বিষয়ে নির্লিপ্তভাবে চুপচাপ আছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে অধিকাংশ মুসলমান এসকল পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া এবং নিজেদেরকে মুক্ত করার বিষয়টিকে একটি শরয়ী যিম্মাদারী মনে করত। এখন অধিকাংশ মুসলমান মনে করে, অনৈসলামিক শাসন এবং অনৈসলামিক আইন আদালতের অধীনে জীবন যাপন করাও জীবন যাপনের একটি পদ্ধতি হতে পারে। তবে এদের মধ্য থেকে কেউ মনে করে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোন পথ নেই। আর কেউ মনে করে, এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির কোন প্রয়োজন নেই।
প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে অমুসলিমদের প্রতিনিধিদেরকে গভর্নর ও ভাইসরয় বলা হত, এখন তাদের প্রতিনিধিদেরকে এম্বেসেডার, দূত ও জাতিসংঘের প্রতিনিধি বলা হয়।
প্রথম পর্বে অমুসলিমদের আধিপত্যের কোন আইনি স্বীকৃতি ছিল না, তবে তাদের বাহুবল চলত। দ্বিতীয় পর্বে সব কিছু তাদেরই হাতে ছিল। তৃতীয় পর্বে তাদের আইনি স্বীকৃতি হয়ে গেছে এবং তাদের বাহুবল চলমান থাকা সত্ত্বেও তাদের আধিপত্যকে গোপন করার জন্য অনেক কৌশল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যে বিষয়গুলো সবাই জানেও, আবার সবাই লুকাতেও থাকে। যাকে আপনি ওপেন সিক্রেটও বলতে পারেন।
প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে মনে করা হত, মুসলমানদের জন্য অনৈসলামিক আইনের অধীনে জীবন যাপন করা জায়েয নেই। তৃতীয় পর্বে ব্যাপকভাবে এবং প্রকাশ্যে এ কথা মনে করা হচ্ছে যে, মুসলমানদের জন্য অনৈসলামিক আইনের অধীনে জীবন যাপন করতে কোন সমস্যা নেই।
এ পৃথিবীর কোন একটি ভূখণ্ড দারুল হারব হিসাবে সাব্যস্ত হওয়ার জন্য যে বিষয়গুলো সেখানে পাওয়া যাওয়া জরুরী, সে বিষয়গুলো উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে (ভারত উপমহাদেশে) ছিল, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের পরেও সে বিষয়গুলো (ভারত উপমহাদেশে) উপস্থিত ছিল এবং ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখনো পর্যন্ত সে বিষয়গুলো বহাল আছে।
এরই সাথে সাথে, উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে উপমহাদেশ (হিন্দুস্তান) দারুল হারব হিসাবে ঘোষিত হওয়ার পর মুসলমানদের উপর যে সকল ফরয দায়িত্ব এসেছিল, এমনিভাবে যেসকল ফরয দায়িত্ব ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের পর মুসলমানদের উপর ছিল, সেসকল ফরয ওয়াজিব দায়িত্ব ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখনো পর্যন্ত মুসলমানদের যিম্মাদারিতে রয়েছে গেছে। চাই সে ভূখণ্ডের নাম ভারত হোক, চাই সে ভূখণ্ডের নাম পাকিস্তান হোক, চাই সে ভূখণ্ডের নাম বাংলাদেশ হোক। এ সকল ভূখণ্ডের সকল মুসলমানের উপর সেসব ফরয ওয়াজিব দায়িত্ব হুবহু সেভাবেই বহাল আছে যেভাবে তা দুইশত বছর আগে ফরয ওয়াজিব ছিল। কেননা সেসব ফরয ওয়াজিব দায়িত্ব তাদের যিম্মাদারিতে না থাকার এবং সে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার মত কোন পর্ব বিগত দুইশত বছরে কখনো অতিক্রম করেনি।
[ লেখাটি শাইখ ফজলুর রহমান কাসেমী হাফিজাহুল্লাহর একটি রিসালাহ্ থেকে কপি করা। ]