13/05/2026
নবিজি (সা.)-এর জীবনের শেষ দিনটি!
মদিনার সোমবারের সেই সকালটা ছিল আর দশটা দিনের চেয়ে আলাদা। বাতাসে যেন এক বিষণ্ণতার সুর বাজছিল। মসজিদে নববিতে সাহাবায়ে কেরাম আবু বকর (রা.)-এর পেছনে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। হঠাৎ আয়েশা (রা.)-এর কক্ষের দরজার পর্দাটা আলতো করে নড়ে উঠল। নবিজি উঁকি দিয়ে তার প্রিয় উম্মতকে শেষবারের মতো তৃপ্তির চোখে দেখলেন। তারপর শুরু হলো চিরবিদায়ে অন্তিম মুহূর্তগুলো...
আনাস ইবনু মালিক বর্ণনা করেন, সোমবার সকল সাহাবি আবু বকরের ইমামতিতে ফজরের সালাত আদায় করছিলেন। এ সময় নবিজি আয়িশার হুজরার পর্দা সরিয়ে তাদের দিকে একবার তাকান। আবু বকর একটু পেছনে সরে আসেন এটা ভেবে যে, নবিজি হয়তো এখন কাতারে প্রবেশ করবেন। তাছাড়া নবিজির উপস্থিতি টের পেয়ে কাতারবদ্ধ লোকজনও উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। তখন তিনি হাতের ইশারায় তাদেরকে সালাত সম্পন্ন করতে বলেন। তারপর হুজরার ভেতর থেকে পর্দা টেনে দেন।
এটাই ছিল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের শেষ সালাত।
দ্বি-প্রহরের সময় নবিজি তার আদরের দুলালি ফাতিমাকে ডাকেন। এরপর তার কানে কানে কী যেন বলেন। এতে ফাতিমা বাচ্চাদের মতো কাঁদতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর নবিজি আবার তাকে ডাকেন। আগের মতোই কানে কানে কিছু একটা বলেন। এবার ফাতিমার মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
আয়িশা বলেন, আমি পরে ফাতিমাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, প্রথমবার বাবা আমাকে বলেছিলেন, এই অসুস্থতায় তিনি দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নেবেন। এটা শুনে আমি কাঁদতে শুরু করি। দ্বিতীয়বার তিনি বলেছিলেন, তার বিদায়ের পর পরিবারের সবার আগে আমিই তার সঙ্গে জান্নাতে দেখা করতে পারব। এতে আমি স্বস্তি পাই।
এ সময় নবিজি তাকে সুসংবাদ দিয়ে বলেন, জান্নাতে তুমিই হবে বিশ্বের সকল নারীর সর্দারনি।
নবিজির শেষ সময়ের কষ্ট দেখে ফাতিমার দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তিনি মুখ ফুটে বলে ফেললেন, আহ, কী কষ্ট হচ্ছে আমার বাবার! সেই কঠিন মুহূর্তেও নবিজি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, আজকের পর তোমার বাবার আর কোনো কষ্ট থাকবে না।
এরপর আদরের দুই নাতি হাসান ও হুসাইনকে কাছে ডাকেন। তাদের চুমু দেন। বেশ কিছু অসিয়ত করেন তাদের ব্যাপারে। এরপর স্ত্রীদের ডেকে উপদেশ দেন।
এ সময় তার যন্ত্রণা যেন ক্রমেই বাড়তে থাকে। খাইবারের বিষমিশ্রিত সেই খাবারের বিষক্রিয়াও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে তার মধ্যে। তিনি আয়িশাকে ডেকে বললেন, আয়িশা, আমি এখনো সেই খাবারের বিষক্রিয়া টের পাচ্ছি। মনে হচ্ছে আমার মেরুদণ্ডটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে সেই বিষের কারণে।
এ সময় তিনি গোটা মানবজাতিকে অসিয়ত করে বলেন, তোমরা সালাতের প্রতি যত্নশীল হবে। দাস-দাসীদের সাথে সুন্দর আচরণ করবে। এ কথা দুটো তিনি বেশ কয়েকবার বলেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তিম মুহূর্ত উপস্থিত হলে আয়িশা তাকে নিজের শরীরের সাথে হেলান দিয়ে বসান। আয়িশা বলতেন, আমার ওপর আল্লাহর বিশেষ এক অনুগ্রহ—আল্লাহর রাসুল আমার ঘরে, আমার পালায়, আমার গলা ও বুকের মাঝখানে মাথা রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন এবং একেবারে শেষ মুহূর্তে আল্লাহ তাঁর রাসুলের লালার সাথে আমার লালা মিলিয়ে দিয়েছেন।
সেদিন আল্লাহর রাসুল আমার গায়ে ভর দিয়ে বসে ছিলেন। হঠাৎ আমার ভাই আব্দুর রহমান ইবনু আবি বকর মিসওয়াক হাতে নিয়ে সেখানে উপস্থিত। আমি লক্ষ করি, আল্লাহর রাসুল বারবার মিসওয়াকের দিকে তাকাচ্ছেন। আমি জানতাম তিনি মিসওয়াক পছন্দ করেন। তাই জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি আপনার জন্য মিসওয়াকটি নেব? তিনি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়েন।
তখন আমি আব্দুর রহমানের কাছ থেকে মিসওয়াকটি নিয়ে আল্লাহর রাসুলকে দিলাম। কিন্তু সেটা তার কাছে বেশ শক্ত লাগছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি মিসওয়াকটি নরম করে দেব? এবারও তিনি আগের মতো মাথা নাড়েন। আমি তা চিবিয়ে নরম করে দিলাম। এরপর তিনি সেটা ব্যবহার করলেন।
[১] সহিহুল বুখারি : ৪৪৬২
[২] সহিহুল বুখারি : ৪৪২৮
এক বর্ণনায় এসেছে, নবিজি সেদিন খুবই চমৎকারভাবে মিসওয়াক করেন। তার সামনে একটি পাত্রে কিছু পানি রাখা ছিল। তিনি সেই পানিতে হাত চুবিয়ে বারবার চেহারায় হাত বোলাচ্ছেন আর বলছেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মৃত্যুযন্ত্রণা বড় কঠিন...!
মিসওয়াক করা শেষ হলে তিনি ওপরের দিকে আঙুল তুলে ইশারা করেন। চোখ মেলে ছাদের দিকে তাকান। হঠাৎ ঠোঁট দুটো আলতো করে নড়ে ওঠে। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন তার দিকে। কান পাতেন ঠোঁটের কাছে। তখন তিনি শেষবারের মতো উচ্চারণ করছিলেন—
مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَأَلْحِقْنِي بِالرَّفِيقِ الأَعْلَى، اللَّهُمَّ الرَّفِيقَ الأَعْلَى
মা‘আল্লাযীনা আন‘আমতা ‘আলাইহিম মিনান নাবিয়্যীনা ওয়াস সিদ্দীক্কীনা ওয়াস শুহাদা-ই ওয়াস স-লিহীন। আল্ল-হুম্মাগফিরলী, ওয়ারহামনী, ওয়া আলহিক্বনী বির্ রফীক্বিল আ‘লা-। আল্ল-হুম্মার রফীক্বুল আ‘লা-।
অর্থ : হে আল্লাহ, নবি, সিদ্দিক, শহিদ ও সৎকর্মশীল-সহ আরও যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন, আমাকেও তাদের দলভুক্ত করে দিন। হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার প্রতি দয়া করুন। আমাকে মিলিত করে দিন আমার প্রিয়তমের সাথে। হে আল্লাহ, আপনিই তো আমার প্রিয়তম।
শেষের বাক্যটি তিনি ৩ বার উচ্চারণ করেন। এরপর তার হাত একদিকে ঝুলে পড়ে। তিনি মিলিত হন তার পরম প্রিয়তম মহান রবের সাথে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
এই মর্মস্পর্শী হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে ১১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার দ্বি-প্রহরে। মৃত্যুর সময় নবিজির বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর ৪ দিন।
আর রাহিকুল মাখতুম
লেখক : শাইখ সফিউর রহমান মুবারকপুরি
অর্ডার করতে ইনবক্স করুন অথবা কমেন্টে দেওয়া লিংক থেকে আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।
সমকালীন প্রকাশন
সুন্দর জীবনের জন্য