29/06/2026
আত্মিক জাগরণ ও সত্যের অন্বেষায়…
- অঞ্জন সাহা
মানবজীবন এক অদৃশ্য লাভ-ক্ষতির খেরোখাতা। সেই খেরোখাতায় জীবনের সমস্ত হিসেব মিলিয়ে নিতে প্রতিনিয়ত মানুষ সমাজ, সংসার আর জাগতিক মায়া-মোহের পেছনে অবিরাম ছুটে চলে। কিন্তু এই অন্তহীন ছুটে চলার মাঝেও ঈশ্বরপ্রেমী প্রতিটি মানুষের জীবনে এমন কিছু বিশেষ মুহূর্ত্ত আসে, যখন তার কাছে বৈষয়িক লাভ-ক্ষতির খতিয়ানটি একবারেই অর্থহীন বলে মনে হয়। পার্থিব জগতের সমস্ত প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তিগুলোকে এক সুনিপুণ মরীচিকা এবং ভীষণ মেকি বলে বিভ্রম জাগে।
আর ঠিক তখনই তার অবচেতন মন এক অপার্থিব ও চিরন্তন শান্তির আশ্রয়ের সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মনের সব কলুষতা ধুয়ে-মুছে সেই চিরসুন্দরের চরণে নিজেকে সঁপে দিতে ইচ্ছে করে। মন চায় এক বুক উদারতা নিয়ে দয়াময়রূপী স্রষ্টা এবং তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকেই আপন করে নিতে। ইচ্ছে করে এতদিনের বৈষয়িক মোহ, ভেতরের সব ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তা পেছনে ফেলে পরম সত্তার সাথে আত্মিক মিলনের মাধ্যমে এক বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে উঠতে। আজ থেকে শতবর্ষ পূর্বে মহর্ষি মনোমোহনও ঠিক এমনই এক চরম অনুভুতির কথা প্রকাশ করে গিয়েছেন। ‘পাথেয়’ নামক আধ্যাত্মিক কাব্য-সংকলন গ্রন্থে তিনি অত্যন্ত চমকপ্রদভাবে উল্লেখ করে গিয়েছেন -
কবে আমি তব প্রেমে হইব বিহ্বল,
নয়নে বহিবে ধারা হাসি খল্ খল্।
বদনে গদ্ গদ্ বাণী পুলকিত অঙ্গ,
কবে হবে হেন দিন পেয়ে তব সঙ্গ।
চিরসুন্দরের প্রতি সেই অলক্ষ্য ভাবমাধুরীর অন্বেষায় ১৯শে জুন, ২০২৬ ইং (৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) তারিখের পড়ন্ত বিকেলে আনন্দ আশ্রম, ঢাকা মহানগর কমিটি আয়োজন করেছিল “বার্ষিক সমবেত উপাসনা- ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ”শীর্ষক একটি প্রার্থনা-সভার। “একাকী নয় জগৎ লয়ে, চলরে আনন্দ হয়ে: কেনরে কুণ্ঠিত মনে ভয় কিছু নাই “- মহারাজ আনন্দস্বামীর এই অভয় বাণীকে পাথেয় করে তারা সকলেই সেদিন সমবেত হয়েছিলেন শনির আখড়া, দনিয়াস্থ শ্রীশ্রী শনি মন্দির প্রাঙ্গনে। যেখানে আরও এসেছিলেন ঢাকা শহরের নানা প্রান্ত ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দয়াময়প্রেমী ভক্ত-শিষ্যসহ শ্রীশ্রী শনি মন্দির এলাকার অগণিত ভক্তবৃন্দ। সেদিন তাদের পবিত্র পদচারনায় শ্রীশ্রী শনি মন্দির প্রাঙ্গণটি সুর ও ভক্তিরসের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়ে উঠেছিল।
আনন্দ আশ্রম, ঢাকা মহানগর কমিটির সুচারু ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠানটিতে সর্বস্তরের ভক্তকুলের উপস্থিতি ছিল আশাব্যঞ্জক। আয়োজন সফল করতে অনুষ্ঠানের বেশ কিছুদিন পূর্বেই শ্রীশ্রী শনি মন্দিরে ব্যানার প্রদর্শন করা হয় এবং ডাকযোগ ও নানাবিধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের নিকট আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়। এমনকি গত ১৯শে জুন, ২০২৬ তারিখের ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকায় প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে সর্বস্তরের ভক্তবৃন্দকে উপস্থিত থাকার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়। ঢাকা মহানগর কমিটির এই নিবিড় ও সমন্বিত প্রচারণার ফলেই সেদিন অনুষ্ঠানস্থলে ভক্তদের ঢল নামে এবং সমগ্র আয়োজনটি পরম ভাবগাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিক আবহে সম্পন্ন হয়।
সেদিনের মঞ্চে ছিল না কোনো লৌকিক আড়ম্বর; বরং সেখানে শোভা পাচ্ছিল দুই মহাজীবনের প্রতিকৃতি। একদিকে আত্মজ্ঞানী ও সর্বধর্ম-সমন্বয় মতবাদের প্রবাদ পুরুষ মহারাজ আনন্দস্বামী আর অন্যদিকে তাঁরই প্রিয় শিষ্য সাধক-কবি মহর্ষি মনোমোহন। বেলাশেষের কোমল আলোয় তাঁদের প্রশান্তিময় অবয়ব দুটি যেন চেতনার ওপার থেকে এক অতীন্দ্রিয় বার্তা বয়ে আনছিল। মঞ্চের উত্তর দিকে স্থাপিত আরেকটি ব্যানারে শোভা পাচ্ছিল স্বর্গীয় জ্যোতির এক অনির্বাণ আলো। যার মধ্যে জয়দুর্গা দেবী ও মহারাজ আনন্দস্বামী, সৌদামিনী দত্ত ও মহর্ষি মনোমোহন, কমলা রাণী দত্ত ও সুধীর চন্দ্র দত্ত এবং শঙ্করী দত্ত ও বিল্ব ভূষণ দত্তের সেই যুগল ছবিগুলো যেন কেবল ছবিই ছিল না; বরং ছিল এক অবিচ্ছিন্ন সাধন-পরম্পরার গৌরবময় ঐতিহ্যের জীবন্ত আলেখ্য।
উপাসনা মঞ্চে মধ্যমণি হয়ে আচার্যের আসনে উপবিষ্ট ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাতমোড়ায় অবস্থিত আনন্দ আশ্রমের অধ্যক্ষ ও মহর্ষি মনোমোহনের পৌত্রবধূ সাধ্বী শঙ্করী দত্ত। তাঁর মহিমান্বিত উপস্থিতিতে সেদিনের উপাসনা-আয়োজনটি বেলাশেষের স্নিগ্ধ আলোয় শুরু হয়ে নিশীথ রাতের তিমির-ঘন নীরবতা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল এবং একসময় তা জপ, তপ, ধ্যান, অমৃত-কথনের সোপান পেরিয়ে রূপ নিয়েছিল সুর ও সঙ্গীতের এক ভক্তিঘন মহাকাব্যে !
পূর্ব নির্ধারিত সময়েই ওস্তাদ চন্দন আচার্য্যের কন্ঠে মহারাজ আনন্দস্বামী রচিত ‘সংসারে কি আছে রে সুসার, অবোধ মন আমার’ - এই সর্ব্ব ধর্ম্ম গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আয়োজনটির মাঙ্গলিক সূচনা হয়েছিল। অতঃপর বেশ কয়েকটি মলয়া সঙ্গীত পরিবেশন শেষে একে একে বিশিষ্টজনদের হৃদয় নিংড়ানো শুভেচ্ছা বাণীর ভেলায় চড়ে অনুষ্ঠানের তরণীটি ধীরে ধীরে তার চূড়ান্ত গন্তব্যের পানে ভেসে চলেছিল।
ত্রয়ী সঞ্চালক- মনোজ সেন (অপু), স্বামী স্বরূপ রতন দত্ত (দয়ালমণি) এবং মণীন্দ্র চন্দ্র সূত্রধরের প্রাণবন্ত ও ভক্তিপূত অঞ্জলিসদৃশ সঞ্চালনার জাদুকরি ছোঁয়ায় পুরো অনুষ্ঠানটি এক অনন্য মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠে। ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত দয়াময়-অন্তঃপ্রাণ বিশিষ্টজনেরা তাদের অমূল্য বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটিকে আরও ঋদ্ধ করে তোলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- জয়দেব বর্মন, বিনয় দেবনাথ, কানু দেবনাথ, দয়াল দাস পাল, এডভোকেট মামুন কবীর ও দেবাশীষ দাস (সোহেল)। অনুষ্ঠানের এক মাহেন্দ্রক্ষণে স্বামী স্বরূপ রতন দত্ত (দয়ালমণি) মঞ্চের পাশে আসীন অসীম কুমার সাহা (চুনী)-কে একজন প্রচারবিমুখ দয়াময়-সেবক হিসেবে ভক্তকুলের মাঝে পরিচয় করিয়ে দেন। সবশেষে শ্রীশ্রী শনি মন্দিরের সভাপতি সনি ভূষণ দত্ত অনুষ্ঠানটির সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনার পাশাপাশি আগামীতেও এই পূণ্য প্রাঙ্গনে এমন অনুষ্ঠান আয়োজনে পূর্ণ সহাযোগিতার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তার বক্তব্যের সমাপ্তি টানেন।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করে শ্রোতাবৃন্দের হৃদয় মোহিত করে রেখেছিলেন বিশিষ্ট মলয়া শিল্পী ওস্তাদ চন্দন আচার্য্য, স্বামী স্বরূপ রতন দত্ত (দয়ালমণি), শৈলী সূত্রধর ও মজিবুর রহমান (হেলাল)। আকুল কণ্ঠে তারা পরিবেশন করেছিলেন মহর্ষি মনোমোহন বিরচিত মলয়া সঙ্গীত। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো - অই শুন বাজে বাঁশি যমুনা পুলিনে, ধন্য ধন্য দয়াময় নাম, দয়াময় নাম মহামন্ত্র, শুভ দিন হইল উদয়, আমায় তুমি নেও না টেনে, আমি কি তোমার ভজন জানি, জান না কি মনের কথা, হরি বলে বাহু তুলে নেচে আয়, যে নিশা লেগেছে আমার ইত্যাদি। আর তাদের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রে সংগত করেছিলেন- তবলায় অঞ্জন দাস, বাঁশিতে শরীফ মিয়া এবং পারকাশনে সোহেল খান। তাদের সম্মিলিত সুর, তাল ও লয়ের মাধূরীতে পুরো মন্দির প্রাঙ্গনে এক মোহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল।
অনুষ্ঠানের বহূল প্রত্যশিত দ্বিতীয় ও মুল পর্ব অর্থাৎ সন্ধ্যা-আরতি ও আলোচনা পর্বটিও শুরু হয়েছিল নির্ধারিত সময়েই। উপাসনা আচার্য সাধ্বী শঙ্করী দত্তের নিমগ্ন প্রার্থণা এবং উপস্থিত ভক্তদের সমবেত কন্ঠের সন্ধ্যা আরতির মঙ্গল ধ্বনিতে এই পর্বটিও একাত্মতার এক মহাযজ্ঞে পরিনত হয়ে উঠেছিল। সন্ধ্যা আরতি শেষে তিনি তাঁর তিমিরবিনাশী আলোকবর্তিকা-সম অমিয় কথনের মাধ্যমে উপাসনায় আগত প্রতিটি ভক্তের মনের সব সংশয়, সব আঁধার দূর করে তাদের প্রাণের গভীরে এক পরম স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি তুলে ধরেছিলেন মহারাজ আনন্দস্বামী ও তাঁর প্রিয় শিষ্য মহর্ষি মনোমোহনের মতো দুই মহামানবের অমর কীর্তিগাথা; বর্ণনা করেছিলেন তাঁদেরই নির্দেশিত সেই তপোময় সাধন-পথের কথা। শব্দের সুকোমল লালিত্যে তিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন — কীভাবে সেই পথের একনিষ্ঠ অনুশীলনে যেকোনো সাধারণ মানুষও পৌঁছে যেতে পারে আধ্যাত্মিক উত্তরণের এক অনন্য শিখরে।
আপ্লুত কণ্ঠে সেদিন তিনি আরও বলেছিলেন দয়াময়ের পরম বিভূতি ও ব্যাপ্তির কথা - যা এই নশ্বর পৃথিবীর কোনো মানদন্ডে পরিমাপযোগ্য নয়, কেবল ব্যাকুল হৃদয়ের নিঃশব্দ সমর্পণের মধ্যেই অনুভবযোগ্য। দৃপ্তকণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন দয়াময়ের এক ও অদ্বিতীয় পরম সত্তার কথা, যা জগতের সকল ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে একতাবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা জোগায়। সেদিন তাঁর কণ্ঠস্বরে এবং শব্দচয়নে এমন এক দিব্য আলোকরশ্মি ছিল, যার প্রভায় সমগ্র উপাসনাস্থলটি যেন এক মায়াবী জ্যোতির্ময়তায় অবগাহন করেছিল এবং উপস্থিত প্রতিটি প্রাণ এক অনির্বচনীয় প্রশান্তির অতলে হারিয়ে গিয়েছিল। সেই অমিয় কথনের মাঝে তিনি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছিলেন মহর্ষি মনোমোহনের অন্যতম প্রধান শিষ্য ও মলয়া সংগীতের অমর সুরস্রষ্টা ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁর কথা—যিনি ছিলেন বিশ্বনন্দিত সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। যাঁর ঐশ্বরিক ও সুরেলা কণ্ঠে ‘মন মাঝে যেন কার ডাক শুনা যায়’ — এই কালজয়ী মলয়া সংগীতটি শুনে স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও গভীরভাবে মুগ্ধ ও রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন।
উপাসনা কার্য পরিচালনায় তাঁর সুযোগ্য সন্তানদ্বয় সেদিন উপাসনা মঞ্চে পাশে থেকে তাঁকে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। তাঁর একমাত্র পুত্র স্বামী স্বরূপ রতন দত্ত (দয়ালমণি)-র অনিন্দ্যসুন্দর গায়কীতে পরিবেশিত মলয়া সঙ্গীত সবার প্রাণে এক গভীর ভক্তি ও পরম আনন্দের আবহ তৈরি করেছিল। অপরদিকে তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা শ্রীমতী কল্যাণী গুহ দত্তের আবেগমথিত কণ্ঠে উচ্চারিত মনের কথামালা উপস্থিত সবার হৃদয়কে এক অদ্ভুত মায়ায় আচ্ছন্ন করে তুলেছিল। অশ্রুসজল নয়নে তিনি বর্ণনা করেছিলেন সাধনার দৃর্গম পথে তার গর্ভধারিণী মাতা এবং সহোদর ভ্রাতার অসীম ধৈর্য এবং নীরব ত্যাগের কথা। তার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ সবার মনের গভীরে এমন এক আলোড়ন তুলেছিল, যা তার কথা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও এক মায়াবী স্তব্ধতা হয়ে দীর্ঘক্ষণ বিরাজমান ছিল।
সবশেষে সমবেত কণ্ঠে দয়াময় নামসংকীর্তন এবং প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে এই অবিস্মরণীয় আয়োজনের তৃতীয় ও শেষ পর্বের সমাপ্তি ঘটে। সেদিন মহারাজ আনন্দস্বামী ও মহর্ষি মনোমোহনের পুণ্যময় জীবন-আভা যেন প্রতিটি ভক্ত-হৃদয়ের অন্ধকার দূর করে অলৌকিক এক নবপ্রভাতের আবাহন ঘটিয়েছিল। যার ফলে, ভক্তদের কাছে সেই নিশুতি রাতে ঘরে ফেরার পথটি হয়ে উঠেছিল স্বর্গীয় প্রশান্তির এক আলোকময় রাজপথে; আর তাঁদের প্রতি ধমনীতে, প্রতি হৃদস্পন্দনে তখন গুঞ্জরিত হচ্ছিল কেবলই একটি মধুর নাম - 'দয়াময়'।
আনন্দ আশ্রম, ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি মনোরঞ্জন গুহ, সাধারণ সম্পাদক মনোজ সেন (অপু) এবং কোষাধ্যক্ষ মনোজ সাহার সুনিপুণ তত্ত্বাবধানে এবং অন্যান্য সদস্যের অকুণ্ঠ আর্থিক সহযোগিতা ও আন্তরিক অংশগ্রহণের ফলে সেদিনের অনুষ্ঠানটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল। বিশেষ করে সাধারণ সম্পাদক মনোজ সেন (অপু)-র নিরলস পরিশ্রম ও একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা আয়োজনটিকে আরও চিত্তাকর্ষক করে তুলেছিল। এ প্রসঙ্গে সহ-সভাপতি নারায়ণ চন্দ্র সাহা (আকাশ), সাংগঠনিক সম্পাদক কৃষ্ণধন রায় (কনক) এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার দাসের মতো নিবেদিতপ্রাণ ভক্তদের কথাও না বললেই নয়। সেদিন তাদের সুদক্ষ তদারকিতে অনুষ্ঠানে আগত বিপুলসংখ্যক ভক্তের মাঝে প্রসাদ বিতরণ পর্বটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা হয়।
এই আয়োজনের অন্যতম একটি চমৎকার অনুষঙ্গ ছিল গ্রন্থ প্রদর্শনী ও বিক্রয় স্টল। যেখানে মহর্ষি মনোমোহন প্রণীত অমূল্য গ্রন্থরাজি থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। তার ঠিক পাশেই এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে আনন্দ আশ্রম, ঢাকা মহানগর কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত একটি পুস্তিকাও স্থান পেয়েছিল, যেটি প্রকাশে সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক নীলরতন মল্লিক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। অনুষ্ঠানের পুরোটা সময়জুড়ে এই গ্রন্থ স্টলটি সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক দশরথ দাস তার সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র পুত্র রিদময় দাসকে সাথে নিয়ে নজরদারি করেন। সেদিন এই খুঁদে ভক্তটি মহা উদ্দীপনার সাথে সবগুলো গ্রন্থের হিসাব লিপিবদ্ধ করে তার বাবাকে যেভাবে সাহায্য করেছিল, তা এককথায় ছিল অপূর্ব !
পরিশেষে বলা যায়, সেদিনের সেই মহতী আয়োজনটি গতানুগতিক ধারার কোনো বাহ্যিক আড়ম্বরের মোড়কে বন্দী ছিল না; বরং তা পরিগণিত হয়েছিল হৃদয়ের গহীনে দিব্যজ্যোতি প্রজ্বলনের এক মহোৎসবে। সেই উৎসব ভক্তকুলকে নিয়ে গিয়েছিল আত্মিক জাগরণ ও পরম সত্যের এক চিরন্তন অন্বেষণে। আর সেই দিব্য অন্বেষণের পথ ধরেই ভক্তহৃদয়ের ব্যাকুল আকুতি সুরের মূর্ছনায় মূর্ত হয়ে উঠেছিল এই মরমি চরণগুলোতে—
ভক্তি ও প্রেমের এই পুণ্য সুধায়,
চিত্ত জুড়ালো পরম আশায়;
দয়াময় নামে মিটিল আঁধার,
ভক্তি-তরীতে তরিলাম পার।
জয় দয়াময়।
* বিনীত নিবেদন : আয়োজনের এই মহাযজ্ঞে সবার কর্মদক্ষতার মাঝে আমিই (লেখক) ছিলাম একমাত্র অ-কাজের লোক। আর আমার নিষ্ক্রিয় হৃদয়ের একমাত্র সম্বল ছিল কেবলই কিছু কথার ফুলঝুরি, যা আজ কাগজ-কলমে নিবেদন করলাম। কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে সকলে নিজ গুণে এই অধমকে ক্ষমা করবেন।
(২৯শে জুন, ২০২৬ ইং, সোমবার)