26/04/2022
****বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম****
۞ শবে কদরের ফজিলত ۞
♥হযরত শাহ্ সূফী সাইয়্যেদ বেলাল নূরী আল্ সুরেশ্বরী (মাঃ জিঃ আঃ)♥
---------------------------------------------------------------------------------------------
শবে কদর কি?
আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিবকে উদ্দেশ্য করে প্রশ’ রাখেন, হে মুহাম্মদ, শবে কদর কি? এ সম্মন্ধে যদি আমি আপনাকে অবগত না করাতাম তবে আপনি এর ফজিলত ও বুযুর্গী সম্পর্কে কিভাবে অবগত হতে পারতেন?
অতঃপর আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই উত্তরে বলেছেন, কদরের মাস(রমজান) হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এই রাতে যা কিছু ইবাদত-বন্দেগী করা হয় তা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। তোমরা এই কথাগুলো নিবিড়ভাবে অনুধাবন করতে সচেষ্ট হও যে, একদিন হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের সম্মুখে বণী ইসরাঈলের চার ব্যক্তি সম্পর্কে বললেন, তাঁরা আশি বৎসর পর্যন্ত একাদিক্রমে ইবাদত করেন। এ সময়ের মধ্যে একটি নাফরমানীও তারা করেননি।
তারপর আইউব, যাকারিয়া, খারকীল ও ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস্ সালাম এই চারজন পয়গম্বরের আমলের কথাও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন। এই হাদিস শুনে সাহবাগণ খুবই বিস্মিত ও মনে মনে মর্মাহত হলেন তাদের হায়াত দীর্ঘ না হওয়ার কারনে কম আমল করার সুযোগ থাকায়। এমন সময় হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট আগমন করে উম্মতে মুহাম্মদীর প্রিয় সাহাবাদের মনের অবস্থার উপর শান্তনার বারী বর্ষণ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এর চেয়েও বিস্ময়কর বস্তু আল্লাহ্পাক আপনার উম্মতের জন্য দান করেছেন।
অতঃপর তিনি সূরা কদর পাঠ করে বললেন, যে বিষয়ে আপনার সাহাবারা বিস্মিত হয়েছেন, তা এর চেয়েও বিস্ময়কর। এ কথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুবই আনন্দিত হলেন। তারপর জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম কদর রাত্রিকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম হওয়ার সুসংবাদটি দান করেন। হাজার মাস মানে ৮৩ বছর ৪ মাস।
বর্ণিত আছে, হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উম্মতের বয়স তাঁর সামনে পেশ করা হলে তিনি দেখলেন তাঁর উম্মতের বয়স কম। আর এ স্বল্পতাকে পূর্ণতা দানের জন্যই নবীজির শানে কদর রাত্র দান করা হয়েছে। তাই একবার ভেবে দেখো, আমরা কতটা সে․ভাগ্যবান উম্মত! সূরা কদর পাঠকারী যেন কোরআনের এক চতুর্থাংশ পাঠ করলো। রমজান মাসের শেষ দশদিনের এশার নামাজে সূরা কদর পাঠ করা মুস্তাহাব। তাই আমাদের উচিত, রমজানের নামাজ-রোজায় গভীর মনোযোগী হওয়া।
হযরত ইবনে আব্বাস বলেন, কদর রাতে আল্লাহ তা’য়ালা হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম-কে বলেন, সিদরাতুল মুনতাহার যত ফেরেশতা আছে তাদের সাথে নিয়ে পৃথিবীতে গমন করো কাবা গৃহের নিকট, মুহাম্মদের কবরের নিকট, বায়তুল মুকাদ্দাস এবং তুরে সীনার মসজিদের নিকট। এই চার স্থানে ফেরেশতাগণ তাদের হাতের পতাকা প্রোথিত করেন।
অতঃপর তারা হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালামের আদেশমতো পৃথিবীর এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়েন। প্রত্যেকটি ঘর এবং প্রত্যেকটি স্থান যেখানে কোনো মোমেন পুরুষও নারী থাকে সেখানে উপস্থিত হয়ে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উম্মতের পাপ মার্জনার জন্য দোয়া করেন এবং তসবীহ তাহলীলে মশগুল থাকেন।
🌷দুই দুই রাকা’আতে শবে কদর নামাজ পড়ার নিয়ত ও নিয়মঃ🌷
উচ্চারণঃ নাওয়াইতু আন উছাল্লিয়া লিল্লাহি তা’য়ালা রাক’য়াতাই ছালাতিল লাইলাতুল কাদরি মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।
প্রতি রাক’আতে সূরা ফাতেহার সাথে সূরা কদর (ইন্নাআনযালনা) একবার ও সূরা ইখলাস (কুলহুআল্লাহ) ২৭বার পাঠ করত: দু’ দু’ রাক’আত করে দুই সালামে চার রাকাত নামাজ আদায় করবে। এই নিয়মে নামাজ আদায় করলে সে সমস্ত গুনাহ হতে এমনভাবে মুক্ত হয়ে যাবে, যেন মায়ের গর্ভ হতে আজই ভূমিষ্ট হয়েছে।
প্রতি রাক’আতে সূরা ফাতেহার সাথে সূরা কদর(ইন্নাআনযালনা) একবার ও সূরা ইখলাস (কুলহুআল্লাহ) ৩বার পাঠ করত: দু’ দু’ রাক’আত করে দুই সালামে চার রাকাত নামাজ আদায় করবে। এ নিয়মে নামাজ আদায়কারীকে শবে কদরের রাতের সমস্ত সওয়াব দান করা হবে, তার জন্য রুযী বৃদ্ধি করা হবে। প্রতি রাক’আতে সূরা ফাতেহার সাথে সূরা কদর (ইন্নাআনযালনা) ৩বার ও সূরা ইখলাস (কুলহুআল্লাহ) ৫০বার পাঠ করত: দু’ দু’ রাক’আত করে দুই সালামে চার রাকাত নামাজ আদায় করে শেষের সালাম ফিরাবার পর পুনরায় সিজদায় গিয়ে পড়বে-
‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা-ইলাহা
ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’- তারপর সিজদা হতে উঠে আল্লাহ্পাকের দরবারে যে দোয়া করবে তা ইনশাআল্লাহ কবুল করা হবে। আল্লাহ তা’আলা তাকে অসীম নিয়ামত দান করবেন এবং সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন।
🌷চার চার রাকা’আতে শবে কদর নামাজ পড়ার নিয়ত ও নিয়মঃ🌷
উচ্চারণঃ নাওয়াইতু আন উছাল্লিয়া লিল্লাহি তা’য়ালা আরবাআ রাক’য়াতাই ছালাতিল লাইলাতুল কাদরি মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার। এভাবে যত ইচ্ছা ৮/১২/২০ রাকা’আত নামাজ সারা রাতই জেগে থেকে আদায় করা যাবে।
কদর রাতের পরিচয়
কদর রাত্রির রহস্যময় পরিচয় হলো এই যে,
(১) এই রাত অধিক ঠান্ডা বা অধিক গরম থাকে না,
(২) এই রাতে কুকুর ডাকে না,
(৩) সকালে সূর্য উঠলে মনে হয় যেন সূর্যের কোনো আলো নেই।
শবে কদরের চিহ্ন সম্পর্কে ইমাম নব্বী রহমতুল্লাহে আলাইহি এরূপ বর্ণনা করেছেন যে, যখন ক্বদর রাত আবির্ভুত হয় তখন লক্ষ লক্ষ ফেরেশতা ভু-মন্ডলে নাজিল হয়ে যারা ঐ রাতকে জিন্দা রাখেন তাদের সাথে মোসাফাহ করেন। তাদের মুসাফাহ করার লক্ষণ হলো, ঐ সময়ে অন্ত:করণে অত্যন্ত খুশি অনুভব হয়, চক্ষু হতে অশ্রু নির্গত হয় এবং আল্লাহ্র দিকে খুব বেশী রকম মহব্বত হয়। এ সময় অবশ্যই দোয়া কবুল হয়। এটা পরীক্ষিত।
এই রাত্রিতে ১২ (বারো) রাকাত নফল নামাজ প্রতি রাকাতে আলহামদু সুরার সাথে পনরবার সূরা ইখলাস পাঠ করে আদায় করা সর্বোত্তম। এছাড়াও এই রাতের প্রথম ভাগে গোসল করে, পাক-পবিত্র হয়ে দোয়া-কালাম, তসবীহ-তাহলীল ও কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে রাত্রি পার করে দিতে পারার মধ্যে বিশেষ সওয়াব হাসিল হয়। সওয়াব লাভের আরো একটি বিশেষ উপায় হচ্ছে–
কদর রাত্রিতে ৩বার অর্থাৎ প্রথম রাতে, মধ্য রাতে ও শেষ রাতে উত্তমরূপে গোসল করে প্রতি গোসল বাদ (গোসলের পর) তিন তিনবার করে সূরা ইয়াসীন পাঠ করলে সে ব্যক্তি এরূপ পাপমুক্ত হবে যে, যেন সে আজ নিষ্পাপ অবস্থায় মায়ের গর্ভ হতে ভুমিষ্ঠ হলো।
রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের ২৭তারিখে শবে কদরের রাতে প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কদর (ইন্নাআনযালনা) একবার এবং সুরা এখলাস ২৭বার দ্বারা চার রাকাত নামাজ আদায় করবে সে সমস্ত গুনাহ হতে এমন মুক্ত হয়ে যাবে, যেন মায়ের গর্ভ হতে আজই ভুমিষ্ঠ হয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা তাকে বেহেশতের মধ্যে এক হাজার বালাখানা দান করবেন। এভাবে এই রাতে সারা রাত্র জেগে থেকে নফল ইবাদত করা,
কুরআন তেলাওয়াত, তসবীহ-তাহলীল পাঠ, দান-সদকা করা ও গরীব-দুঃখীর মাঝে অন’ভোজের আয়োজন করাই হলো শবে কদর রাতের প্রকৃত ইবাদত এবং শবে কদরের প্রতি প্রকৃত মর্যাদা প্রদর্শন।
শবে কদরের নামাজ সম্পর্কে হযরত সুরেশ্বরী রহমতুল্লাহে আলাইহি বলেন-
নামাজ পড়িবে যেই পড়িবে নফল।
নফল নিয়ত চাই নহে গন্ডগোল ॥
দোরেকাতী হয় কিবা চার রেকাতি হয়।
যে ছুরা রহিবে মনে পড়িবে নিশ্চয় ॥
নহে পড় কুলহুআল্লাহ হরেক রেকাতে।
তিন পাঁচ সাত নয় বেজোড় যাহাতে ॥
কিম্বা কোন দোয়া দরুদ তছবী তেলায়াত।
যে যাহা জানুক পড়ে বসিয়া তাবত ॥
এ প্রকার কদরেতে এবাদত কর।
গরজ রাখিবে মনে কাহিলীকে ছাড় ॥
রমজানে একুশা রাতে প্রথম কদরে।
তেইশা পঁচিশা আর সাতাশেতে পড়ে ॥
উনত্রিশ তারিখেতে কদর আছয়।
সাতাইশ তারিখ পরে এজমা সবে কয় ॥
সেই দিন হ’তে পারে আসল কদর।
অতএব সেই রাতে রাখিবে খবর ॥
নফল বলিয়া খালি বান্ধিবে নিয়ত।
কদর বরাত আদি নফল তাবত ॥
____________________________________________
__________________
💟 প্রকাশকঃ একমাত্র শাহ্জাদা সাইয়্যেদ শাহ্ সূফী মুক্তাদির নূরী আল্ সুরেশ্বরী💟
(আরো বিস্তারিত পড়ুনঃ রোহবানিয়াত এ ঊলম–৪৯৪ পৃষ্টায়)
নিবেদকঃ সুরেশ্বরীয়া বেলালীয়া প্রকাশনী।