30/05/2026
অহংকার জিনিসটা আমাদের অন্তরে খুব গোপনে চলে আসে। তাই এটা থেকে দূরে থাকার জন্য প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস প্র্যাক্টিস করা খুব দরকার।
যেমন ধরেন, চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা কিন্তু হারাম না। কিন্তু আমাদের রসূল (সা.) এভাবে বসে খেতে পছন্দ করতেন না। কারণ সে আমলে অহংকারীরা এভাবে হেলান দিয়ে আয়েশ করে খেতো। রসূল (সা.) নিজেকে অহংকার থেকে দূরে রাখতে এভাবে বসতেন না। অহংকার থেকে বেঁচে থাকার এটা কত সুন্দর একটা প্র্যাক্টিস!
রসূল (সা.) বলেছেন: "আমি হেলান দিয়ে খাবার খাই না।"
(সহিহ বুখারি: ৫৩৯৮)
উনি আল্লাহর কাছে সবসময় দুয়া করতেন, "হে আল্লাহ! আমাকে মিসকিন বা গোলাম হিসেবে রাখেন, আর পরকালেও গোলামদের সাথেই হাশর দিয়েন।" উনি দুনিয়াতে নিজেকে একদম অহংকারমুক্ত রাখতে চাইতেন এবং সবসময় নিজেকে আল্লাহর একজন সাধারণ গোলাম মনে করতেন।
রসূল (সা.) এভাবে দুয়া করতেন: "হে আল্লাহ! আমাকে মিসকিন অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখো, মিসকিন অবস্থায় মৃত্যু দাও এবং কেয়ামতের দিন মিসকিনদের দলেই আমার হাশর করো।"
(তিরমিজি: ২৩৫২)
ঠিক একইভাবে, কেউ রসূলের সম্মানে দাঁড়িয়ে যাক এটাও উনি পছন্দ করতেন না। কারণ যার সম্মানে দাঁড়ানো হচ্ছে, তার মনে একটা অহংকার বা বড়ত্ব চলে আসতে পারে। মানুষ যেন এই ফাঁদে না পড়ে, রসূল (সা.) সেই প্র্যাক্টিসটাই শিখিয়েছেন।
হযরত আনাস (রা.) বলেন: "সাহাবিদের কাছে রসূল (সা.)-এর চেয়ে প্রিয় কোনো মানুষ ছিল না। তাও উনি যখন আসতেন, উনারা দাঁড়িয়ে যেতেন না। কারণ উনারা জানতেন রসূল (সা.) এটা পছন্দ করেন না।"
(তিরমিজি: ২৭৫৪)
এক সাহাবির একটা সুন্দর ঘটনা আছে। উনি নিজের জন্য আর উনার গোলামের জন্য হুবহু একই রকম জামা বা চাদর কিনেছিলেন। অন্য এক সাহাবি দেখে বললেন, আপনি চাইলে তো নিজের জন্য দুইটাই রেখে দিতে পারতেন, একটু ভালো দেখাতো।
তখন উনি বললেন, রসূল (সা.) আমাদের বলেছেন নিজের গোলাম বা শ্রমিকদের সেটাই পরতে দিতে যা আমরা নিজেরা পরি, আর সেটাই খেতে দিতে যা আমরা নিজেরা খাই।
রসূল (সা.) বলেছেন: "তারা তোমাদেরই ভাই, আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। তাই যার অধীনে কোনো ভাই থাকে, সে যেন তাকে সেটাই খাওয়ায় যা সে নিজে খায় এবং সেটাই পরতে দেয় যা সে নিজে পরে।" (সহিহ বুখারি: ৩০)
আমাদেরও উচিত এই কাজগুলো প্র্যাক্টিস করা। নিজেকে শ্রমিক বা অন্য সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা বা ভিআইপি দেখানোর কী দরকার?
নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সুন্দর কাপড় পরা সম্পূর্ণ জায়েজ। কিন্তু সেটা না করে একদম সাদাসিধে লাইফস্টাইল লিড করা, নিজের কাজের লোক বা শ্রমিকের সাথে একই রকম ড্রেস পরা বা তাদের একই মানের জিনিস কিনে দেওয়াটাই হলো আসল নম্রতা। এতে মন থেকে অহংকার দূর হয়, আর এটাই রসূলের শেখানো পথ।
নাহলে অহংকার কিন্তু কোনো না কোনোভাবে অন্তরে ঢুকে যাবেই। অহংকার আসলে কী? সবসময় নিজেকে প্রশ্ন করুন আর নিজের প্রত্যেকটা কাজের সাথে মিলিয়ে দেখুন।
রসূল (সা.) খুব সহজ করে অহংকারের সংজ্ঞা দিয়েছেন।
রসূল (সা.) বলেছেন: "অহংকার হচ্ছে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে ছোট বা তুচ্ছ মনে করা।" (সহিহ মুসলিম: ৯১)
মানে আপনার কাছে একটা সত্য কথা আসলো, কিন্তু আপনি সেটাকে মেনে নিলেন না বা রিজেক্ট করে দিলেন। হয়তো একজন ছোট পদের মানুষ বা রাস্তার কোনো গরিব মানুষ আপনাকে একটা ভালো বা সঠিক কথা বলেছে, কিন্তু আপনি নিজের ইগো বা স্ট্যাটাস ধরে রাখার জন্য তার কথা শুনলেন না, এটাই হলো অহংকার।
অথবা আপনি একটা বড় পজিশনে আছেন, তাই নিজের চেয়ে ছোট কারো কাছ থেকে কোনো জ্ঞান বা পরামর্শ নিবেন না, এটাই অহংকার।
কিংবা আপনি নিজেকে অনেক বড় টাকাওয়ালা, অনেক সুন্দর, হ্যান্ডসাম বা দামী জিনিসপত্রের মালিক মনে করছেন। নিজের গাড়ি, আইফোন, বাইক আর দামী পোশাক শো-অফ করে মানুষকে নিজের চেয়ে ছোট দেখাচ্ছেন, এটাই হলো অহংকার।
অহংকারী জান্নাতে যাবে না, কিন্তু সেই জান্নাতে না যাওয়া কেমন অসম্ভব এই ব্যপারে আল্লাহ্ বলেনঃ
"অহংকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না উট সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে। আর এভাবেই আমি অপরাধীদের প্রতিফল দিয়ে থাকি।" (আল-আ'রাফ, আয়াত: ৪০)
সুইয়ের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করা যেমন অসম্ভব, অহংকারীর জান্নাতে যাওয়াও তেমনি অসম্ভব।